January 28, 2023, 9:00 pm

সরকারের দায়িত্ব রাষ্ট্রের নাগরিককে ভাল রাখা

সংবিধানের অধীনে বিশেষ ব্যবস্থায় ৪টি বিশেষ উপকরণ নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়। এই উপাদানগুলো হচ্ছে, নির্দিষ্ট ভূখন্ড, সার্বভৌমত্ব, নির্দিষ্ট জনসংখ্যা এবং জনগণের দ্বারা গঠিত সরকার। এর মধ্যে সরকার হচ্ছে সবচেয়ে সর্ম্পকাতর নিয়ামক এবং একমাত্র পরিবর্তনশীল উপকরণ। বাকি তিনটি রাষ্ট্রের এখতিয়ার এবং স্থায়ী উপাদান। সরকার হচ্ছে একটি দেশের জনগণ এবং সম্পদের পাহারাদার, রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যবস্থাপক মাত্র। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ছাড়া সরকারের নিজস্ব কোনো সম্পদ বা শক্তি অর্জন বা সৃষ্টি বা দায়িত্ব থাকে না। সাধারণভাবে যাকে সবাই সরকারি সম্পদ বলে মনে করে তা আসলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ, যার জিম্মাদার হচ্ছে সরকার। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয় সরকারের ওপর। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় প্রথমেই উল্লিখিত ‘আমরা বংলাদেশের জনগণ’, সেই জনগণ যদি কোনো সরকারকে উপযুক্ত মনে না করে তাহলে সেই সরকার পরিবর্তিত হতে পারে। তবে রাষ্ট্র থাকে অপরিবর্তনীয়। রাষ্ট্রের কোনো পরিবর্তন নেই।

একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ড, জনগণ, সরকার এবং সার্বভৌমত্ব নিয়ে একটি দেশ বা রাষ্ট্র গঠিত হয়। রাষ্ট্র ও নাগরিক একে অন্যের পরিপূরক। রাষ্ট্র হচ্ছে এমন এক সংগঠন যা নির্দিষ্ট ভূখন্ডে আইনানুগ বলপ্রয়োগের সব মাধ্যমের উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রাখে, যাদের মধ্যে রয়েছে সশস্ত্রবাহিনী, নাগরিক, সমাজ, আমলাতন্ত্র, আদালত এবং আইন-শৃংখলা রাকারী বাহিনী। একটি দেশ গঠন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। রাতারাতি তা হয় না। জটিল এই প্রক্রিয়ায় নাগরিককে খুব সতর্কতার সাথে ভূমিকা রাখতে হয়। দার্শনিক প্লেটো তার রিপাবলিক গ্রন্থে দেশ গঠনে নাগরিকের কি কি ভূমিকা থাকতে পারে তার একটি সুনির্দিষ্ট ফর্মূলা দিয়েছেন। সক্রেটিস নাগরিকদের Virtue of knowledge এর কথা বলেছেন।

রাষ্ট্র এবং সরকার দুটো সম্পূর্ণ আলাদা সত্তা। যখনই এবং যেখানে রাষ্ট্র এবং সরকার যথা সচেতনতায়, যত্নে ও যৌক্তিকতায় স্ব স্ব অবস্থানে অধিষ্ঠান সম্ভব হয়েছে তখন সেখানে সে দেশে সার্বিক উন্নয়ন টেকসই হতে পেরেছে। সরকার হলো কোনো দেশের সর্বোচ্চ সংস্থা ও কর্তৃপক্ষ যার মাধ্যমে দেশটির শাসন কার্য পরিচালিত হয়। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সরকার জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা গঠিত হয়। সরকারের মৌলিক দায়িত্ব জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী দেশের নিরাপত্তা বিধান করা, সমাজের শান্তি বজায় রাখা, মানুষের জান-মাল রা করা এবং বিবাদের ক্ষেত্রে বিচারকার্য পরিচালনা করা।

রাষ্ট্র হলো পূর্ণতর, সমগ্র এক স্বত্তা, যা সকলের, সার্বজনীন, স্থায়ী, বিমূর্ত ভৌগলিক এক মৌলিক প্রতিষ্ঠান। যা সার্বভৌম সবার সব ধরনের আইন ও অধিকারের উৎস। রাষ্ট্র হল সমগ্র আর সরকার হল এর একটি অংশ মাত্র। অধ্যাপক গার্নার এর মতে, রাষ্ট্র যদি হয় জীবদেহ, তবে সরকার হল এর মস্তিষ্কস্বরূপ। সকল জনসমষ্টি নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত; কিন্তু সরকার গঠিত হয় সমগ্র জনসমষ্টির একটি ক্ষুদ্র অংশ দ্বারা। রাষ্ট্র হল একটি সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান; কিন্তু সরকার হল এর মুখপাত্র মাত্র। রাষ্ট্র্র কম-বেশি চিরস্থায়ী, কিন্তু সরকার পরিবর্তনশীল।

তাই নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় নাগরিক সমাজের অন্যতম দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সরকারের দুটোরই সুষম ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য সচেতন কার্যক্রম পরিচালনা করা। এখন সরকার যেহেতু রাষ্ট্রের পে দায়িত্ব পালন করে মাত্র, তাই তার সমালোচনাকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমালোচনা বলা যাবে না। কারণ রাষ্ট্রই নাগরিক কে সেই অধিকার দিয়েছে। নাগরিকদের মধ্য থেকেই স্বল্প সময়ের জন্য রাষ্ট্র্র পরিচালনায় সরকার গঠিত হয়। আবার নাগরিক চাইলে সেই সরকার বদলেও দেয়া যায়। তাই সরকারের সমালোচনা কখনোই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচারণ নয়। বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধিতা নয়।

প্রতিটি রাষ্ট্রেরই মূল্যবান সম্পদ হলো সৎ, যোগ্য ও নীতিবান নাগরিক। রাষ্ট্রের অগ্রগতির জন্য অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন নাগরিকের প্রয়োজন। নাগরিকরা বিভিন্নভাবে দেশ গঠনে সহায়তা করে। কেউ তার মেধা দিয়ে, কেউ তার প্রজ্ঞা দিয়ে, কেউ তার সাহস দিয়ে, কেউ তার দৈহিক শ্রম দিয়ে, কেউ তার পরামর্শ দিয়ে, কেউ তার সৃষ্টি দিয়ে। রাষ্ট্র্র গঠনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শেক্সপিয়ার, প্লেটো, এ্যারিস্টিটল সহ আরও অনেকের অবদান অনিস্বীকার্য। কাজেই রাষ্ট্র্র গঠনে একজন নাগরিক তার যোগ্যতা অনুযায়ী ভূমিকা রাখতে পারে। একজন নাগরিক নেতা নাও হতে পারে কিন্তু তার মাঝে নেতৃত্বের গুণাবলী থাকতে হবে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অখন্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অুন্ন রাখার জন্য প্রত্যেক নাগরিককে সর্বদা সজাগ এবং চরম ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রত্যেক নাগরিককেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে হবে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের এমনকি রাষ্ট্রের বেআইনী কোন কাজের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো নাগরিকদের নৈতিক দায়িত্ব।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকের সব অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা। স্বাধীন দেশে নাগরিক তার জীবন যাপনে রাষ্ট্রের কাছে যেসব অধিকার পাওয়ার দাবি রাখে তন্মধ্যে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা অন্যতম নাগরিক অধিকার। স্বাধীন রাষ্ট্র্র এসব অধিকার দিতে বাধ্য, এমনটি আছে সংবিধানে। রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার থেকে স্থানীয় সরকার পর্যন্ত সব খাতের দায়িত্ব জনগণের জীবনমানের সুখ ও দুঃখের নজরদারি করা। এসব দেখার জন্য সরকারের বহু ধরনের প্রশাসনিক দফতর রয়েছে। এসব দফতরের পেছনে নাগরিকের কষ্টার্জিত করের অর্থের বিনিময়ে তাদের লালন পালন করা হয়। স্পষ্ট কথায় তাদের বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা, বাসাবাড়ি ও পেনশন পর্যন্ত দেয়া হয়। লাখ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জনগণের করের অর্থে রাষ্ট্র্র পরিচালিত হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমরা সুবিধাজনক অবস্থানে নেই কারণ, সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়- রাষ্ট্র্র শুধু নাগরিকদের কাছে আনুগত্যই দাবি করছে। কিন্তু রাষ্ট্র সংবিধান প্রদত্ত নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না; বরং ক্ষেত্র বিশেষে রাষ্ট্র্র ব্যবস্থায় বা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নাগরিক অধিকার ক্ষুন্ন করার ঘটনাও ঘটছে। তারা আইনি আশ্রয় লাভেও বঞ্চিত হচ্ছেন। রাষ্ট্র তাদের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। জনগণের অধিকার দেখার দায়িত্ব যাদের কাছে রয়েছে, তারা এখন নাক-কান বন্ধ করে বোবার স্বর্গে বাস করছেন।

বেশ কিছুদিন ধরে খাদ্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের মূল্য উর্ধ্বগামী। বাঁধা আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে দিশেহারা মানুষ। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে মানুষ নতুন করে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে পড়েছে। পারিবারিক বাজেট কাটছাট করেও টিকে থাকা এখন তাদের পে কষ্টকর। ‘মানুষ ভালো নেই- জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে পিষ্ট মানুষ, ক্রয়মতা কমে গেছে। দ্রব্যমূল্যে এমনিতেই আকাশচুম্বী। এর মধ্যে একের পর এক মূল্যবৃদ্ধির দুঃসংবাদ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।’ একটা সংসার চালাতে যেসব বাজার সদাই দরকার হয় তার সবকিছুর দামই চড়া। কিছুদিন পর পর নতুন নতুন পণ্যের দাম বেড়ে যায়। কিছুদিন আগে পিয়াজ-আলু, ডিম নিয়ে লঙ্কাকান্ড শুরু হয়েছিল। এখন চাল ও তেলের বাজারে অস্থিরতা চলছে। একবার যেটা বাড়ে আর কমার কোনো লণ দেখা যায় না।

দেশের শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সব হাটবাজার অনিয়ন্ত্রিত। মফস্বলের বাজার অথবা শহরের ফুটপাথ থেকে নামীদামি মার্কেটে পণ্য কেনাবেচায় নাগরিকের মৌলিক অধিকার রা হচ্ছে না। হাটবাজারে কাঁচা তরিতরকারি থেকে শুকনো খাবার পর্যন্ত সবখানেই পণ্যবাজার সীমাহীনভাবে অনিয়ন্ত্রিত। তরিতরকারি চাল, ডাল, পেঁয়াজ, মরিচ, শাকসবজি সবকিছু ইচ্ছে মতো চড়া দাম হাঁকিয়ে সাধারণ জনগণের অতিরিক্ত পকেট কাটা হচ্ছে। ভোক্তা নিজের চাহিদা পূরণ করতে বাজারে অসহায়। পণ্যবাজার যেন সেকেন্ডে সেকেন্ডে লাফিয়ে লাফিয়ে ফেঁপে উঠছে। ব্যবসায়ীরা ইচ্ছে মতো মাছ, গোশত, তরিতরকারির দাম হাঁকিয়ে নিচ্ছে। একইভাবে দোকান মার্কেটে অন্যান্য ব্যবহার্য্য জিনিসপত্রের দামও প্রতিদিন আকাশচুম্বী। নিত্যপণ্যের দামের এমন ঊর্ধ্বমুখীর জন্য করোনা মহামারিতে উৎপাদন কমে যাওয়া, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা, অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতা, সরকারের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ও সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীদের কারসাজিকে দায়ী করা অমুলক হবে না। আবার কেউ কেউ অভ্যন্তরীণ বাজারের সুশাসনের অভাবকেও দায়ী করছেন।
এ দিকে সরকারি দফতরে কাজকর্মে নাগরিকের যাওয়া-আসা করতেই হয়। সেখানেও কোনোভাবে নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে না। টেবিলে টেবিলে পদে পদে হয়রানি ও অবৈধ অর্থ লেনদেন করে জনগণকে মাসের পর মাস অপো করে অফিস কাজ শেষ করতে হয়। গণতান্ত্রিক দেশ, গণতান্ত্রিক সরকার, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি, সরকারি প্রশাসন কী দিচ্ছে জনগণকে, আর জনগণ অনিয়ন্ত্রিত বাজারে প্রতিনিয়ত প্রতারিত ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। রাষ্ট্রের সব খাতে প্রশাসনিক হয়রানি আর বাজারের লাগামহীন অনিয়ন্ত্রিত পণ্যমূল্যে জনগণের নিঃশ্বাস যায় আর আসে। ভাগ্যিস বাংলাদেশের জনগণের নিঃশ্বাস একটু লম্বা,তাই নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখীর জন্য এখনও লাইফ সাপোর্টে যেতে হচ্ছে না। এটাও সরকারের জন্য বিরাট পাওয়া।

যে করেই হোক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ থেকে নিম্নস্তর পর্যন্ত শৃঙ্খলার বাস্তবায়ন থাকতে হবে। অন্যথায় উচ্ছৃঙ্খল ও অনিয়ন্ত্রিত জাতিতে পরিণত হবে এ দেশ। নাগরিক ছাড়া কোনো রাষ্ট্র্র হয় না। আবার নাগরিক ছাড়া কোনো রাষ্ট্র চলতে পারে না। জনগণ অর্থ সরকার, সরকার অর্থ জনগণ। জনগণের সুখ-দুঃখ, ন্যায়-অন্যায়, পাওয়া না পাওয়া অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সরকার। তাই সাধারণ মানুষের কষ্ট বিবেচনায় নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে দ্রুত পদপে গ্রহন করতে হবে। এক কথায় সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের মানুষকে ভালো রাখা।

লেখকঃ পরিবেশ কর্মী ও প্রাবন্ধিক, ziasapno@gmail.com
০১৭২৮-৪২৬০৮৬

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © jamunanewsbd.com
Design, Developed & Hosted BY ALL IT BD