July 6, 2022, 5:04 am

শব্দ দূষণ এ যুগের এক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা

শব্দ বা আওয়াজ হলো ধ্বনি-তরঙ্গ। শব্দের কম্পন যখন সহনযোগ্য এবং সুখময় স্তরে থাকে, সহজভাবে তখন তাকে শব্দ বলে। এটি মানুষের বাগ্যন্ত্র বা অন্য কোনো উৎস থেকে উৎপাদিত বা সৃষ্টি হয়ে আমাদের কর্ণকুহরে এসে পৌছায়। কিন্তু, যখন এটা কানে তীক্ষè ও কর্কশ লাগে, তখন তা শব্দ দূষণে পরিণত হয়। মানুষ সাধারণত ১৫ থেকে ২০ কিলোহার্টজ স্পন্দনের শব্দ শোনে। শব্দ স্পন্দন যখন এই সীমা অতিক্রম করে, তখনই শব্দ দূষণ ঘটে।

যে শব্দে একসময় মানুষের ঘুম আসতো এবং ঘুম ভাঙতো, যে শব্দে মানুষের মন জুড়িয়ে যেত, যে শব্দে মানুষের মন-প্রাণ আনন্দে আপ্লুত ও বিমোহিত হয়ে যেত, সেসব শব্দ এখন কোখায়? অবশ্য সব শব্দ বদলে যায়নি, সব শব্দ বদলে যেতে পারে না। কিন্তু আমাদের ভালোলাগা ও ভালোবাসার সেই শব্দগুলো এখন কোথায় যেন হারিয়ে গেছে অচেনা, অজানা, অপ্রত্যাশিত কিছু বিকট, উৎকট ও অদ্ভুত শব্দের ভিড়ে। তাই শব্দ এখন দূষণ, শব্দ এখন যন্ত্রণার, শব্দ এখন বেদনার।

কোটি কোটি বছরের বিবর্তনে মানুষ প্রকৃতির শান্ত শব্দকে সুরক্ষার সাথে যুক্ত করেছে। পাখপাখালির ডাক, মৃদু শব্দ, সংগীতের সুর শ্রæতিমধুর এমনকি অনেক লোক প্রকৃতির শব্দ উপভোগ করার পরিবর্তে হেডফোন পরে এবং গান শোনেন যে উপহারটি কোনও পাখির শব্দ বা একটি বসন্তের জল পড়ার শব্দ তা কোনও প্রক্রিয়াটির কারণে হারিয়ে যাচ্ছিল যা একধরণের বধিরতার সদৃশ।

শব্দ দূষণের একটি অন্যতম প্রধান কারণ হলো যানবাহন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যানবাহনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে ফলে যানবাহন থেকে শব্দ দূষণ দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। যানবাহনে ব্যবহৃত হাইড্রোলিক ভেঁপু, বাস, লরি, মোটরগাড়ি, মটরসাইকেল, ব্যাটারী চালিত অটোরিক্সা, রেল, উড়োজাহাজ। এছাড়া উচ্চ শব্দে কথা বলা, মাইক বাজানো, সিডি, ইটভাঙ্গা মেশিন, নির্মাণ কাজ, মিছিল-মিটিংয়ের আওয়াজ, কলকারখানার শব্দ, আতসবাজী-পটকার আওয়াজ, লোকজনের চিৎকার-চেঁচামেচিতেও রীতিমতো শব্দ দূষণ ঘটায়।

ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন এর মতে ইউরোপে প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন ট্রাফিক শব্দ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ট্রাফিক পুলিশদের অবস্থাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দিনদিন শ্রবণ শক্তির সমস্যায় ভুগছেন এমন ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে- এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। একজন ট্রাফিক পুলিশ বলেন, বাসায় কথা বললে আমার স্ত্রী সন্তানরা বলে, ‘আমি নাকি বেশী জোরে কথা বলি, এদিকে লো সাউন্ডে কথা বললে আমার কানে পৌঁছায় না। এখন কি করবো? আমরা রাস্তায় কাজ করি, শব্দ থাকবেই, আর জনগণ সচেতন নয় বলে জানান তিনি।’

বাংলাদেশে সরকারের শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় স্পষ্টতই বলা আছে, আবাসিক এলাকার শেষ সীমনা থেকে ৫০০ মিটারের মধ্যে নির্মাণ কাজের জন্য ইট-পাথর ভাঙার মেশিন ব্যবহার করা যাবে না। আবাসিক এলাকায় রাত ৯ টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল এবং দিনের অন্য সময়ে ৫৫ ডেসিবেল অতিক্রম করতে পারবে না। হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত আশ-পাশে ১০০ মিটার পর্যন্ত নিরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে রাতে ৪০ ও দিনে ৫০ ডেসিবেল শব্দ মাত্রা নির্ধারণ করা আছে। অথচ এই বিধিমালা সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। শব্দ দূষণে দোষী হিসেবে প্রমাণিত হলে অপরাধের জন্য একমাসের কারাদন্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা দু ধরনের দন্ডই প্রদান করার বিধান রয়েছে। মানুষের আইন মানার অনীহা তখন তৈরী হয় যখন সে দেখে যে অপরাধ করলে, যেমন রাতের বেলা নির্মাণ কাজ করলে কোন কিছু হয় না। আইন প্রয়োগ না হওয়াটা যখন সমাজের মানুষ দেখতে পায় তখন তারা শব্দ দূষণ বা অন্য কোন অন্যায় করাটা স্বাভাবিক মনে করে। তাই আইন বাস্তবায়নে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা জরুরি।

বার্সেলোনা ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথের একটি গবেষণা থেকে জনা যায় যে, মানুষের কান অনুসারে ডেসিবেলে পরিমাপ করা শব্দ স্কেল ০ শুনানির সর্বনিম্ন স্তর, ১০-৩০ নিম্ন কথোপকথোনের সমান নিম্ন শব্দ স্তর, ৩০-৫০ সাধারণ কথোপকথোনের সমান নিম্ন স্তর, ৫৫ স্বাচ্ছন্দিক স্বাচ্ছন্দ্যের মাত্রা গড়ে, ৬৫ ডাবিøউএইচও কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত অ্যাকোস্টিক সহনশীলতার সর্বোচ্চ অনুমোদিত স্তর, ৬৫-৭৫ টেলিভিশনে বিরক্তিকর শব্দ, ৭৫-১০০ কানের ক্ষতি শুরু হয়, অস্বস্তিকর সংবেদন এবং ঘাবড়ান সৃষ্টি করে, ১০০-১২০ বধিরতার ঝুঁকি, ১২০ শব্দ ব্যথা সীমা।

শব্দ দূষণ স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে একটি প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়। এর ফলে মস্তিস্কের ক্ষতি, বধিরতা, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়াবন্ধ, উচ্চ রক্তচাপ, মাথা ব্যথা, ঘুমের ব্যাঘাত, মানসিক ভারসাম্য নষ্ট, মেজাজ খিটখিটে হয় ও কাজে অমনোযোগিতা আসে। যেকোনো শব্দ দূষণই গর্ভবতী মায়েদের ক্ষতি করে দারুণভাবে। শব্দ দূষণের ফলে মানুষের ঘুম, শ্রবণশক্তি, মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের অবনতি হয়।

উচ্চ আওয়াজ শ্রবণ আঘাতের ঝুঁকিতে বেশী। এই আঘাতগুলি অন্ত:কর্ণের কোষগুলি এবং ক্ষতিগ্রস্ত শ্রবণকে ধ্বংস করে। তীব্র শব্দ কানের পর্দাতে বেশ জোরে ধাক্কা দেয়, যা কানের পর্দাকে নষ্টও করে দিতে পারে। শ্রবণগুলি হ্রাস যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে, সামাজিক সম্পর্কে বাধা দেয়, বিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব এবং হতাশার অনুভুতি সৃষ্টি করে। নাক কান গলার রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, শব্দ দূষণে মানুষের স্থায়ী মানসিক বৈকল্য দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত শব্দের কারণে কানের নার্ভ ও রিসেপ্টর সেলগুলো নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে মানুষ ধীরে ধীরে শ্রবণ শক্তি হারাতে থাকে। অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে দীর্ঘদিন কাটালে শ্রবণ শক্তি ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়ে বধির হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশী। শব্দ দূষণের কারণে সবচেয়ে বেশী ক্ষতির শিকার হচ্ছে শিশুরা। কোমলমতি শিশুদের স্নায়ু এমনিতেই থাকে দুর্বল। তারা স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চশব্দে আতঙ্কিত হয়। ফলে তাদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের করা এক জরিপে উঠে এসেছে যে মাত্রাতিরিক্ত শব্দের কারণে ইতোমধ্যেই দেশের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়েছে। শব্দ দূষণ এ যুগের এক গুরুত্বপূর্ণ, জলজ্যান্ত সমস্যা। দিন দিন এ সমস্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। শব্দ দূষণের পরিণাম ভয়াবহ। বর্তমানে শব্দ দূষণ যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেটা খুবই আশঙ্কাজনক। কিন্তু এই সমস্যা মানুষেরই তৈরী। ফলে আমরা একটু সচেতন হলেই শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ করাটা অসম্ভব কিছুই না।

হর্ন বাজানো সম্ভবত বাংলাদেশে গাড়ি চালকদের বদভ্যাস। ট্রাফিক সিগনাল ও জ্যামে আটকে থাকার সময় সামনে এগুনো যাবে না জেনেও হর্ন বাজান তারা। সামনে কেউ ধীর গতিতে চললে, পথচারীকে উদ্দেশ্য করে প্রতিনিয়ত হর্ন বাজানো হয়। আজকাল লক্ষ্য করা যায় কিছু উৎশৃঙ্খল যুবক মটরসাইকেল চালানোর সময় উচ্চ বিকট শব্দ সৃষ্টি করে। ইদানিংকালে সারাদেশ সহ বগুড়া শহরেও ৭০-৮০ হাজার ব্যাটারী চালিত অটোরিক্সার অত্যাচারে শহরে চলাফেরা করা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণে অকারণে হর্ন বাজানোর ফলে শব্দ দূষণ অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। এতে আর কয়দিন পরে হয়তো আমাদের শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়ে এমন পর্যায়ে যাবে যে, কানে কম শোনার কারণে মানুষের সাথে কথার দ্বন্দ্ব লেগে যাবে। কারণ কথা ঠিকভাবে শুনতে না পারলে, কথার উত্তর দিতেও গোলমাল লেগে যাবে। এখন সময় এসেছে এবিষয় গুলি ভেবে দেখবার।
নির্মাণ কাজের জন্য ইটের খোয়া অবশ্যই দরকার। শহরের মধ্যে যত্রতত্র আমরা ইট ভাঙার মেশিন ব্যবহার করে শব্দ ও বায়ু দূষণ দুটোই একসাথে করে যাচ্ছি অকাতরে। এর ফলে আমাদের শহরের পরিবেশ যে, প্রতিনিয়তই দূষণ হচ্ছে এর প্রতিকার করার যেন কেউ নেই। আমরা এর থেকে পরিত্রাণ পেতে, ভাটা থেকেই ইট ভেঙ্গে নিয়ে এসে শহরে নির্মাণ কাজ করতে পারি। বিষয়টি ইটভাটা মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সুদৃষ্টি দেয়ার অনুরোধ রইল।

শব্দ দূষণে বিশ্বের শীর্ষ রাজধানী শহর এখন ঢাকা। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচীর সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। দ্বিতীয় স্থানে ভারতের উত্তর প্রদেশের মুরাদাবাদ এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে পাকিস্তানের ইসলামাবাদ। তালিকার শীর্ষ ৫ শহরের মধ্যে রাজশাহী চতুর্থ এবং ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটি পঞ্চম। অর্থাৎ শব্দ দূষণে শীর্ষ ৫ শহরের মধ্যে ৪টিই দক্ষিণ এশিয়ার। এসব তথ্যগুলো আমাদেরকে আতঙ্ক করে তুলছে। দূষণযুক্ত শব্দ থেকে তাই নিস্তার পাওয়াটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য এখন অত্যন্ত জরুরি।

শব্দ দূষণ অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে। শব্দ দূষণের এই ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে হলে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। আমাদের দ্বারা কোনোভাবেই যেন শব্দ দূষণ সৃষ্টি না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রয়োজনে আইনের যথার্থ প্রয়োগ ঘটিয়ে শব্দ দূষণের জন্য দায়ী সবাইকে শাস্তি দিতে হবে। তাহলেই শব্দ দূষণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত হবে। শব্দ দূষণ কমাতে আমাদেরকে লোকাহল থেকে দূরে কলকারখানা নির্মাণ করতে হয়। সুস্থভাবে বেশী দিন বেঁচে থাকার জন্য শব্দ দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়া সবারই কর্তব্য। তাই সবাই সচেতন হলে শব্দ দূষণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। আজকের দিনে শব্দ দূষণ প্রতিকারে উদ্যোগ ও সচেতনতা অতীব প্রয়োজনীয়। জনগণের সচেতনতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সরকার, প্রশাসন ও দূষণ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা আন্তরিকভাবে অগ্রণী হবে এটাও কাম্য।

লেখকঃ পরিবেশ কর্মী ও প্রাবন্ধিক
ziasapno@gmail.com
০১৭২৮-৪২৬০৮৬

নিউজটি শেয়ার করুন


© All rights reserved © jamunanewsbd.com
Design, Developed & Hosted BY ALL IT BD