December 9, 2022, 4:05 pm

যেসব আমলে জান্নাতে প্রাসাদ তৈরি হয়

যমুনা নিউজ বিডিঃ মহানবী (স.) উম্মতকে কিছু আমলের জন্য বিশেষ পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। আর নবীজি যখন গুরুত্ব দিয়ে কোনো পুরস্কার ঘোষণা করেন, বিশ্বাস রাখতে হবে যে, সেটি নিশ্চয়ই অনেক লোভনীয় ও মূল্যবান হবে। বিষয়টি অনেকে অনুধাবন করতে পারেন না। কিন্তু একজন সত্যিকার মুমিন কখনও সেসব নেক আমলের ব্যাপারে উদাসীন হতে পারেন না। এর মধ্যে আবার কিছু আমল রয়েছে, যেগুলোর প্রতিদান হিসেবে আল্লাহ তাআলা জান্নাতে অনিন্দ্যসুন্দর প্রাসাদ তৈরি করে দেন বলে কোরআন-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

জান্নাতে প্রাসাদের ওয়াদা দিয়ে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন, যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হবে নহর, তাতে তারা চিরদিন থাকবে এবং (ওয়াদা দিচ্ছেন) স্থায়ী জান্নাতে পবিত্র বাসগৃহের। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে সন্তুষ্টি সবচেয়ে বড়। এটাই মহাসফলতা।’ (সুরা তাওবা: ৭২)

দুনিয়ার সময়গুলো হেলায় নষ্ট না করে সেসব নেক আমলের মাধ্যমে জান্নাতে প্রাসাদ নির্মাণের জোগান দেওয়া মুমিনের উচিত। নিচে নবীজির ঘোষণা অনুযায়ী, যেসব সহজ আমলে আল্লাহ তাআলা জান্নাতে নেয়ামতে পরিপূর্ণ প্রাসাদ তৈরি করেন, তা উল্লেখ করা হলো।

হাদিসে এসেছে- যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির প্রত্যাশায় মসজিদ তৈরি করে দেন, ১০ বার সুরা ইখলাস তেলাওয়াত করেন আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতে একটি, যে ২০ বার পড়বে তার জন্য ২টি এবং যে ৩০ বার পড়বে তার জন্য ৩টি রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করে দেবেন। এ কথা শুনে হজরত ওমর (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! জান্নাতে তো আমাদের অনেক প্রাসাদ থাকবে। মহানবী (স.) বলেন, আল্লাহ তাআলার দয়া ও মেহেরবানি আরও ব্যাপক ও বিস্তৃত। (বুখারি: ১/৫৫৪; মুসলিম: ২৪; দারেমি: ২/৪৫৯)

ঝগড়া আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় জিনিস। কেউ যদি ঝগড়া বর্জন করে আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতে ঘর নির্মাণ করবেন। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ন্যায়সংগত হওয়া সত্ত্বেও ঝগড়া পরিহার করবে আমি তার জন্য জান্নাতের বেষ্টনীর মধ্যে একটি ঘরের জিম্মাদার; আর যে ব্যক্তি তামাশার ছলেও মিথ্যা বলে না আমি তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে একটি ঘরের জিম্মাদার। আর যে ব্যক্তি তার চরিত্রকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে আমি তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত একটি ঘরের জিম্মাদার।’ (আবু দাউদ,হাদিস : ৪৮০০)

দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ফরজ। পরকালে আল্লাহ তাআলা নামাজিদের পুরস্কারে ভূষিত করবেন। আর কিছু নামাজ আছে যেগুলো মহানবী (স.) নিয়মিত গুরুত্বের সঙ্গে আদায় করতেন। ইসলামি পরিভাষায় এগুলো ‘সুন্নতে মুয়াক্কাদা’ নামে অভিহিত। এসব নামাজ আল্লাহ তাআলার নৈকট্য হাসিলের মাধ্যম। আরও কিছু নামাজ আছে যেগুলো পড়লে সওয়াব, না পড়লে গুনাহ নেই। এগুলোকে বলা হয় ‘নফল’। এ নামাজগুলো বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ও বরকতময়। মহানবী (স.)-এর ভাষ্যমতে যে ব্যক্তি দিন-রাতে ১২ রাকাআত নামাজ আদায় করেন আল্লাহ তাআলা জান্নাতে তার জন্য একটি প্রাসাদ তৈরি করে দেবেন। ফজরের নামাজশেষে সূর্য কিছু দূর ওঠার পর যে নফল নামাজ আদায় করা হয় তা ‘সালাতুদ দোহা’ বা চাশতের নামাজ নামে পরিচিত। যে ব্যক্তি ১২ রাকাত চাশতের নামাজ আদায় করবেন তাকে জান্নাতে স্বর্ণের তৈরি একটি প্রাসাদ দেওয়া হবে। মাগরিব ও এশার নামাজের মধ্যবর্তী সময়ে নফল নামাজের নাম ‘সালাতুল আওয়াবিন’। যে ব্যক্তি ১০ বা ২০ রাকাত আওয়াবিনের নামাজ আদায় করবেন তিনি জান্নাতে একটি প্রাসাদ প্রাপ্ত হবেন। (মুসনাদে আহমদ: ৬/৩২৭; নাসায়ি: ৩/২৬২; মুসতাদারাক: ১/৩১১; ইবনে খুজায়মা: ১১৮৮; তিরমিজি: ৪৭৩; ইবনে মাজাহ: ১৩৭৩, ১৩৮০; কানযুল উম্মাল: ১৯৪২৬; ইবনে হিব্বান: ৪৪৬)

রমজানে রোজা পালন করা ফরজ। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা সিয়াম সাধকদের জীবনের সব পাপ মোচন করে দেবেন এবং পরকালে অফুরন্ত নেয়ামত দান করবেন। কিছু রোজা আছে নফল যেগুলো পালন করলে বিস্ময়কর ফলাফল মেলে। যে ব্যক্তি রমজানে রোজা রাখেন, তার প্রতিটি সেজদায় ১৫শ নেকি আমলনামায় লিপিবদ্ধ করা হয় এবং জান্নাতে রক্তিম নীলকান্তমণি বা সবুজ গোমেদ পাথর দিয়ে তৈরি একটি প্রাসাদ তার জন্য প্রস্তুত রাখা হবে। যে ব্যক্তি বুধ, বৃহস্পতিবার ও জুমার দিন রোজা রাখেন আল্লাহ তাআলা জান্নাতে এমন একটি প্রাসাদ হস্তান্তর করবেন, যা তার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত। (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ : ৩/১৪৩; আত-তারগিব: ২/১২৬)

আরও কিছু নেক আমল যেমন- যে ব্যক্তি নফল রোজা রাখেন, জানাজায় শরিক হন, অসুস্থ মানুষকে দেখতে যান, মিসকিনদের অন্ন জোগান, ফরজ নামাজের কাতার সোজা রাখেন এবং কাতারের শূন্যস্থান পূরণ করে নেন, মিথ্যা ছেড়ে দেন, ঝগড়া বিবাদ পরিহার করেন, উত্তম চরিত্র গ্রহণ করেন, বৃহস্পতিবার রাতে অথবা জুমার দিন সুরা দোখান তেলাওয়াত করেন; এসব আমলের বিনিময়ে জান্নাতে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং একটি প্রাসাদ তাকে দেওয়া হবে। (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ৩/১৬৩; ইবনে মাজাহ: ৯৯৫)

মহানবী (স.) আরও বলেন, যারা ঈমান আনবেন, মুসলমান হবেন এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করবেন তাদের জন্য জান্নাতের নিম্নস্তরে একটি, মধ্যস্তরে একটি এবং উচ্চস্তরে একটি প্রাসাদ তৈরি করা হবে। আমি মুহাম্মদ (স.) তার জিম্মাদারী নিলাম (সুনান নাসায়ি: ৬/২১; তাবারানি: ১৮/৩১১)

উত্তম ও সুন্দর আচরণেও জান্নাতে প্রাসাদ তৈরি হয়। একবার এক বেদুইন দাঁড়িয়ে নবীজিকে প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসুল (স.), এসব প্রাসাদ কাদের জন্য? তিনি বললেন, যারা উত্তম ও সুমধুর কথা বলে, ক্ষুধার্তকে খাবার দেয়, প্রায়ই রোজা রাখে এবং লোকেরা রাতে ঘুমিয়ে থাকাবস্থায় জাগ্রত থেকে আল্লাহ তাআলার জন্য নামাজ আদায় করে, তাদের জন্য।’ (জামে তিরমিজি: ২৫২৭)

হাটবাজার ও শপিংমলে প্রবেশ করে বিশেষ দোয়া পড়লে আল্লাহ তাআলা তার আমলনামায় এক লাখ নেকি লিপিবদ্ধ করেন, এক লাখ পাপ মার্জনা করেন এবং জান্নাতে রাজপ্রাসাদ তৈরি হয়ে যায়। দোয়াটি হচ্ছে- আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলক ওয়া লাহুল হামদ, ইউহয়ি ওয়া ইউমিত, ওয়া হুয়া হাইউন লা ইয়ামুত বিয়াদিহিল খায়ের, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির।’ (তিরমিজি: ৩৪২৫; ইবনে মাজাহ: ২২৩৫)

আমরা আরও একটি সহজ আমলটি করতে পারি এবং ছোট শিশুকেও শেখাতে পারি। যার মাধ্যমে জান্নাতে ঘর তৈরি হবে। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘যখন কেউ বিছানায় যায় এরপর ডান দিক হয়ে বালিশে মাথা রাখে, আর এ দোয়া পড়ে, (অর্থ) হে আল্লাহ, আমি আমার চেহারাকে অর্থাৎ যাবতীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে তোমার হাতে সমর্পণ করলাম। আর আমার সব বিষয় তোমার কাছে সমর্পণ করলাম এবং আমার পৃষ্ঠদেশ তোমার আশ্রয়ে সোপর্দ করলাম। আমি তোমার গজবের ভয়ে ভীত ও তোমার রহমতের আশায় আশান্বিত। তুমি ছাড়া কোনো আশ্রয়স্থল নেই এবং নেই মুক্তি পাওয়ার স্থান। তুমি যে কিতাব অবতীর্ণ করেছ, আমি তার ওপর ঈমান এনেছি এবং তুমি যে নবী পাঠিয়েছ আমি তাঁর ওপর ঈমান এনেছি। আর এভাবে রাত যাপন করে তাহলে তার জন্য জান্নাতে ঘর নির্মাণ করা হবে।’ (মুসনাদে আহমদ: ১৫১৬৪)

কোনো ঈমানদারের সন্তান যখন মারা যায়, ফেরেশতাদের ডেকে আল্লাহ তাআলা জানতে চান, আমার বান্দারা কী বলেছে? ফেরেশতারা জবাব দেবেন, তারা মন্দ কিছু বলেনি বরং আপনার প্রশংসা করেছে এবং ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়েছে। আল্লাহ তাআলা তাদের হুকুম দেন- তাদের জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ তৈরি করো এবং তার নাম দাও ‘বায়তুল হামদ’। মৃতব্যক্তির জন্য যারা কবর খনন করেন তারাও প্রাসাদ পাবেন। (কানযুল উম্মাল: ৪৩৫৭০)

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে উল্লিখিত আমলগুলো বেশি বেশি করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © jamunanewsbd.com
Design, Developed & Hosted BY ALL IT BD