February 25, 2024, 8:52 am

আগস্ট থেকে প্রায় এক হাজার বিরোধী দলের নেতা-কর্মীর কারাদণ্ড হয়েছে

বগুড়া নিউজ ২৪: ৭ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে সাম্প্রতিক সময়ে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার বিএনপির নেতা-কর্মীরা বেশির ভাগই দোষী সাব্যস্ত হয়েছে পুলিশ সদস্যদের জবানবন্দির ভিত্তিতে। যা মামলাগুলোর সুষ্ঠু বিচার নিয়ে সংশয় সৃষ্টি করে বলে মত আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞদের। সূত্র বলছে, গত ২১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক অনুষ্ঠানে আইনজীবীদের অগ্নিসংযোগ সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলার পর নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া তীব্র হয়। যদিও বিএনপির দাবি বিশেষ ক্ষমতা আইন, বিস্ফোরক দ্রব্য আইন, দণ্ডবিধিসহ অন্যান্য ধারায় দায়ের করা মামলাগুলো ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’। আইনজীবী ও আদালতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা থেকে এ পর্যন্ত সারাদেশে বিভিন্ন সহিংসতার মামলায় বিএনপির ৮ শতাধিক নেতাকর্মীকে সাজা দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর তেজগাঁও, কামরাঙ্গীরচর, গুলশান ও পল্টন থানায় দায়ের করা চারটি মামলায় গত সোমবার অন্তত ৪২ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর এক নেতাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এর ফলে ১ আগস্ট থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন আদালতে ৬২টি মামলায় বিএনপির ৯৬১ জন বিরোধী দলের নেতা-কর্মীকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। চলতি মাসের গত ১১ দিনে ২০টি মামলায় বিএনপির অন্তত ২৪৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, নভেম্বরে ৩৩টি মামলায় বিএনপির ৬১৫ জন, অক্টোবরে ছয়টি মামলায় বিএনপির ৭১ জনকে এবং ২৭ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে আগস্টে। সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপিসহ বিরোধী দলের বিরুদ্ধে মামলাগুলো আলাদিনের প্রদীপের মতো দ্রুত ও রাতারাতি শেষ হওয়া দেখে আমি বিস্মিত। তিনি বলেন: “বিএনপির মামলার মতো, আমি কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই যেন সকল বিচারাধীন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়; অন্যথায়, দ্রুত বিচার নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। বিরোধীদের দোষী সাব্যস্ত হওয়া বেশিরভাগ মামলাই ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে পুলিশ বা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থকদের দ্বারা দায়ের করা হয়েছিল। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, সরকার বিএনপি নেতাকর্মীদের মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় দ্রুত শাস্তির জন্য নিম্ন আদালতকে ব্যবহার করছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপির বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক গতিতে বিচার চলছে এবং তারা আদালত থেকে ন্যায়বিচার পেতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিএনপির রাজনীতিতে শূন্যতা সৃষ্টি করে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার লক্ষ্যে মাঠের আন্দোলন ও রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে এমন বিএনপি নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক মামলায় সাজা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি নেতারা। দলটির বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন, মামলা-মোকদ্দমা এবং পুরোনো মামলায় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ঘন ঘন রায়ের মধ্যে ২৮ অক্টোবর ঢাকায় তাদের মহাসমাবেশ ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে বিএনপি হরতাল-অবরোধ চালিয়ে আসছে। এমনকি সহিংসতার অভিযোগে পুলিশ কর্তৃক দায়ের করা সাম্প্রতিক কিছু মামলায় বিএনপির বেশ কয়েকজন নিহত নেতা-কর্মীকে জড়ানো হয়েছিল। আইনজীবী মাসুদ আহমেদ বলেন, এসব মামলায় পুলিশ নিজেরা বাদী এবং সাক্ষী, আর কোনো স্বতন্ত্র সাক্ষী নেই বললেই চলে। শুধু পুলিশের জবানবন্দির ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরাও তাদের মক্কেলদের রক্ষা করার সুযোগ পাচ্ছেন না। এটা নজিরবিহীন, বলেন তিনি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চেয়ারপারসন আইনজীবী জেডআই খান বলেন, উচ্চ আদালতে রায় চ্যালেঞ্জ করা হলে শুধুমাত্র পুলিশের জবানবন্দির ভিত্তিতে বিরোধী দলের দোষী সাব্যস্ত হবে না। কোনো ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কোনো বিচার হতে পারে না। এটা আইনের শাসনের লঙ্ঘন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে কোনো সরকারই আইনের শাসনের দিকে নজর দেয় না। আদালত সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের সহিংসতার অভিযোগে পল্টন থানায় দায়ের করা মামলায় ২০ নভেম্বর ঢাকার একটি মহানগর হাকিম আদালত দলের কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুব-নবী-খান সোহেলসহ বিএনপির ২৫ জনকে ৩০ মাসের কারাদণ্ড দেন। ২৫ জনের মধ্যে মাত্র ছয়জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত বিএনপির বিরুদ্ধে এই রায় দেন। মামলার বাদীসহ ছয়জন সাক্ষীর সবাই পুলিশের সদস্য এবং কোনো স্বতন্ত্র সাক্ষী ছিল না। আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী ফারুক হোসেন বলেন, বিচার শুরুর ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে মামলাটি শেষ হয়েছে। বিএনপি নেতা আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েলের আইনজীবী মিশ সওদাগর বলেন, ঢাকার একটি আদালত নভেম্বর মাসে জুয়েলকে একটি সহিংসতার মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে, যেখানে ১৩ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র পাঁচজন সাক্ষ্য দেন। সাক্ষী সকলেই পুলিশ সদস্য। জুয়েলের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলায় প্রসিকিউশনের ২৯ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ৫ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন। পাঁচজনই পুলিশ সদস্য ছিলেন এবং মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য কোনো স্বাধীন সাক্ষী ছিল না। ২০১৮ সালে গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগে রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলায় গত ৩০ নভেম্বর যুবদল নেতা রজব আলী পিন্টুসহ বিএনপির ১১ জনকে ৩০ মাসের কারাদণ্ড দেন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। আসামিপক্ষের আইনজীবী জিল্লুর রহমান বলেন, মামলায় পাঁচজন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন, যাদের সবাই পুলিশ সদস্য। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর তাপস কুমার পাল বিচার দ্রুত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘পুলিশের জবানবন্দির ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে আইনের লঙ্ঘন নেই।

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © jamunanewsbd.com
Design, Developed & Hosted BY ALL IT BD