July 4, 2022, 12:19 am

সংসদে অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবে বেপরোয়া পুলিশ

যমুনা নিউজ বিডিঃ রাজনৈতিক ব্যবহারের কারণে দেশের পুলিশ বাহিনী এখন দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতায় টিকে থাকতে তাদের অপকর্মকে সরকার প্রশ্রয় দিতে বাধ্য হচ্ছে। পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের দমন-পীড়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুমসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে এসব কথা বলেছেন সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি, বিএনপিসহ বিরোধী সদস্যরা। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তাঁরা এসব অভিযোগ তুলে ধরেন সংসদের বৈঠকে। এর আগে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়। সম্পূরক বাজেটে জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত ১৭৮ কোটি ১৬ লাখ ২৯ হাজার টাকা বরাদ্দ দাবি করা হয়। এই বরাদ্দ ছাঁটাইয়ের প্রস্তাব করেন ১০ এমপি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের অনুপস্থিতিতে বিরোধী সদস্যদের এসব অভিযোগের জবাব দেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, পুলিশে কেউ খারাপ নেই- এটা কেউ হলফ করে বলছে না। কিন্তু দেখতে হবে যারা অন্যায় করছে, তাদের সরকার বরদাশত করছে কিনা। যারা অন্যায় করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

গণফোরামের মোকাব্বির খান বলেন, পুলিশ বাহিনীর কনস্টেবল থেকে শুরু করে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নানা অপরাধে জড়িত হওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। এর কারণ, যেসব পুলিশ অপরাধ করছে, তার শাস্তি হচ্ছে না। এ কারণে গোটা পুলিশ বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

বিএনপির রুমিন ফারহানা বলেন, এ সরকারের আমলে পুলিশ এখন আর রাষ্ট্রীয় বাহিনী নয়; দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। নতুন সমস্যায় পড়ার আশঙ্কায় মহাবিপদে পড়লেও মানুষ এখন আর পুলিশের কাছে যেতে চায় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিচারবহির্ভূত হত্যা-গুম তো করেই। হেফাজতে নিয়ে নির্যাতন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর প্রতিকার চাইতে গেলেও নেমে আসে নির্যাতন।

জাতীয় পার্টির শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, আজকে পুলিশের কেউ অন্যায় করলে মানবাধিকার কমিশন নিশ্চুপ থাকে। কোনো পুলিশ অন্যায় করলে সব পুলিশ একত্র হয়ে তাকে সাপোর্ট করে। এতে করে জুডিশিয়ারি অসহায় হয়ে যায়। জনগণের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে; কিন্তু তাদের যাওয়ার জায়গা নেই। পুলিশকে বুঝতে হবে, ‘পি’-ফর পোলাইট। পুলিশ মনে করে, অস্ত্র তার হাতে; তার কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। তারা সীমাহীন ক্ষমতার মালিক। তিনি সংসদে মানবাধিকারবিষয়ক সর্বদলীয় বিশেষ কমিটি করার প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, এই মানবাধিকারবিষয়ক কমিটি জনগণের যে কোনো অভিযোগ এলে তা তদন্ত করবে এবং দায়বদ্ধ করবে।

বিএনপির হারুনুর রশীদ বলেন, পুলিশ বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলার বাদী ও সাক্ষী হয়। এতে প্রমাণ করে, দেশের বিচার ব্যবস্থার অবস্থা কতটা নাজুক। সরকারি দল চায়, পুলিশ তাদের কথামতো চলবে। এই ধারা থেকে বের হয়ে না আসতে পারলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে নিতে পারব না।

তিনি বলেন, র‌্যাবের ডিজির সফর উপলক্ষে নিরাপত্তার নামে তার নিজ জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে সব সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গেটে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সেখান থেকে কোনো শিক্ষার্থীকে বের হতে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা-গুমের অভিযোগ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে। ক্ষমতায় থাকার জন্য পুলিশ বাহিনীকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।

হারুনুর রশীদ বলেন, নির্বাচন কমিশন নামে প্রতিষ্ঠানটি বিলুপ্ত করে দেন। এটাকে পুলিশ বাহিনীর হাতে ন্যস্ত করে দেন। নির্বাচন কমিশনের কী প্রয়োজন, খামোখা! পুলিশের আইজিপিকে ইসির প্রধান করে দেন। তাদের অধীনে নির্বাচন দেন।

আইনকে সরকার নিজেদের করায়ত্ত রাখতে চায়- সাবেক আইজিপি শহীদুল হকের এমন মন্তব্য তুলে ধরে বিএনপির আরেক এমপি মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘সাবেক হলেই বলে, কিন্তু বর্তমান থাকতে কেন বলে না? যেমন দেখলাম সাবেক সিইসি কে এম নূরুল হুদাকে, যিনি নির্বাচন নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। এই ফ্রুটিকা যদি আগেই খেত, আরও ভালো করেই বলতে পারত।’

তিনি বলেন, কোর্টে আমরা বারবার গিয়েছি; কিন্তু খালেদা জিয়ার মুক্তি পাইনি। সরকারের নির্বাহী আদেশে তিনি মুক্তি পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই, কোর্টে গিয়ে কোনো ফয়সালা হবে না। তাই বলব, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক। ভারতে রাসুল (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদকারী মুসলমানদের বাড়ি ভাঙচুর কেন করা হচ্ছে- তার জবাব চাইলে বিএনপির এই এমপি ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনারকে তলবের দাবি করেন।

জাতীয় পার্টির রওশন আরা মান্নান বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছু ভালো কাজ করছে। কিছু খারাপ কাজও করছে। এই খারাপগুলো শোধরানো দরকার।

জবাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, পুলিশ বাহিনীকে নিয়ে দেওয়া বক্তব্য রাজনৈতিক। পুলিশের কাজ দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন। বর্তমান সরকারের অধীনে পুলিশ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করছে। অনিয়মের কারণে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা চাকরি হারাচ্ছেন। অনেকে বাড়াবাড়ির কারণে বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। শাস্তি পেয়েছেন। পুলিশে কেউ খারাপ নেই- এটা কেউ হলফ করে বলতে পারবে না। কিন্তু দেখতে হবে, যারা অন্যায় করছে, তাদের সরকার বরদাশত করছে কিনা।

নিউজটি শেয়ার করুন


© All rights reserved © jamunanewsbd.com
Design, Developed & Hosted BY ALL IT BD