June 13, 2024, 1:55 pm

আসল প্যাকেটে নকল ওষুধে সয়লাব

যমুনা নিউজ বিডি: দেশে দীর্ঘদিন ওষুধের বাজার দখল করে রেখেছিল টিটেনাস ইঞ্জেকশন দিয়ে তৈরি ‘হেপাটাইটিস বি’ রোগের নকল ভ্যাকসিন, আটা-ময়দা-সুজি দিয়ে তৈরি নকল ‘অ্যান্টিবায়োটিক’। এসব অপরাধে সক্রিয় ছিল বেশ কয়েকটি চক্র। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এসব পুরনো চক্র দমন করা হলেও প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে নতুন নতুন চক্র।

এসব চক্র শুধু নকল ওষুধই নয়, মানহীন প্রেগনেন্সি টেস্টিং কিট ও কনডমের মতো সামগ্রী উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। বিভিন্ন অনুমোদিত কোম্পানির আসল প্যাকেট বা মোড়ক ব্যবহার করায় এসব চিকিৎসা সামগ্রী নকল কিনা সেটাও বোঝার উপায় নেই। এছাড়া দামও তুলনামূলক অনেক কম। ফলে রোগী ও সাধারণ মানুষ এসব নকল ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী কিনে প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

সম্প্রতি রাজধানীর বাবুবাজারে একটি মানহীন প্রেগনেন্সি টেস্টিং কিট ও খোলা কনডম প্যাকেটজাত করার কারখানার সন্ধান পেয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর ও ডিবি পুলিশ। কারখানাটি থেকে বিপুল পরিমাণ প্রেগনেন্সি টেস্টিং কিট ও খোলা কনডম উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া একই এলাকার ৬টি ফার্মেসি থেকে ৩০ লাখ টাকার নকল ওষুধ জব্ধ করা হয়েছে।

শনিবার ডিবি পুলিশ ও ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের যৌথ অভিযানে এসব নকল ওষুধ ও অবৈধ কারখানার সন্ধান পাওয়া যায়।

অনুমোদিত কোম্পানির আসল প্যাকেট বা মোড়ক ব্যবহার করায় এসব চিকিৎসা সামগ্রী নকল কিনা সেটাও বোঝার উপায় নেই। এছাড়া দামও তুলনামূলক অনেক কম।

জানা গেছে, ৬টি প্রতিষ্ঠান থেকে ৩০ লাখ টাকার নকল ওষুধ জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে নাঈম ফার্মেসি থেকে ২৯ ধরনের, শাকিল ব্রাদার্স থেকে ১৭ ধরনের, সাহরা ড্রাগস থেকে ৪৬ ধরনের, রাজীব এন্টারপ্রাইজ থেকে ১৭ ধরনের, আল আকসা মেডিসিন থেকে ১১ ধরনের ও আলাউদ্দিন মেডিসিন থেকে ১৭ ধরনের নিবন্ধনহীন নকল ওষুধ জব্দ করা হয়।

এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের তত্ত্বাবধায়ক (ঔষধ) রোমেল মল্লিক বলেন, বাবুবাজারের আবদুল আলিম মার্কেটে একটি কারখানায় দুপুর আড়াইটা থেকে ডিবি পুলিশ ও ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর যৌথ অভিযান চালায়। অভিযানে দেখা গেছে, কারখানাটিতে নকল প্রেগনেন্সি কিট তৈরি করা হতো। এছাড়া খোলাবাজারের কনডম এখানে প্যাকেটজাত করা হতো। অভিযানে বিপুল পরিমাণ নকল প্রেগনেন্সি কিট ও খোলা কনডম জব্দ করা হয়।

রোমেল মল্লিক বলেন, এসব ওষুধের আনুমানিক মূল্য ৩০ লাখ টাকার বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওষুধ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক আশরাফ হোসেন বলেন, নকল প্রেগনেন্সি কিট প্যাকেটে ভরা অবস্থায় পাওয়া গেছে। এসব প্রেগনেন্সি কিট ব্যবহারকারীদের সঠিক তথ্য দেয় না। যে কারণে ব্যবহারকারীদের অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটতে পারে।

আশরাফ হোসেন বলেন, প্রেগনেন্সি কিট তৈরি করার ক্ষেত্রে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের অনুমোদন নিতে হয়। ঐপ্রতিষ্ঠানটির কোনো অনুমোদন নেই। একই সঙ্গে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের একটি বিষয় এখানে থাকতে হয়, যা ছিল না। খোলা কনডমগুলো কোথা থেকে তারা এনেছে, তা জানা যায়নি।

নকল প্রেগনেন্সি কিট তৈরি করা হতো। এছাড়া খোলাবাজারের কনডম প্যাকেটজাত করা হতো। নকল প্রেগনেন্সি কিট প্যাকেটে ভরা অবস্থায় পাওয়া গেছে। এসব প্রেগনেন্সি কিট ব্যবহারকারীদের সঠিক তথ্য দেয় না। যে কারণে ব্যবহারকারীদের অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটতে পারে।

প্রাণ রক্ষার ওষুধ নিয়ে ভয়ঙ্কর প্রতারণা
হেপাটাইটিস ‘বি’ রোগ প্রতিরোধে ব্যবহৃত হতো প্রাণ রক্ষাকারী কোরিয়ান ভ্যাকসিন হেপাবিগ ‘বি’। মানুষের জীবন রক্ষাকারী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ ভ্যাকসিন নকল করতো একটি চক্র। মাত্র ১০ টাকার টিটেনাস ইনজেকশন দিয়ে তৈরি করা এ নকল ভ্যাকসিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হতো সাড়ে ৪ হাজার টাকায়।

শুধু হেপাবিগ নয়, ভিটামিন ডি-৩ অ্যাম্পুল ইনজেকশন, রেসোগাম পি, ক্লোপিকজল ডিপোর্ট, ফ্লুয়ানজল ডিপোর্টসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ভ্যাকসিন ও নকল অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করতো চক্রটি।

গত ৯ এপ্রিল রাজধানীর কোতোয়ালি থানা এলাকায় ও কেরাণীগঞ্জে অভিযান চালিয়ে ঐ চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ। এ সময় উদ্ধার করা হয়েছে অন্তত কোটি টাকার নকল ভ্যাকসিন।

মাত্র ১০ টাকার টিটেনাস ইনজেকশন দিয়ে তৈরি করা এ নকল ভ্যাকসিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হতো সাড়ে ৪ হাজার টাকায়।

আটা-ময়দা-সুজি দিয়ে বানানো হতো অ্যান্টিবায়োটিক
নামী ফার্মাসিউটিক্যালসের নামে আটা, ময়দা, সুজি দিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক বানানো হতো। এরপর তা সারাদেশের বিভিন্ন বাজারে ছাড়া হতো। গত ১ এপ্রিল এ চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ। এ সময় ৪ লাখ ৯৬ হাজার পিস নকল অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ধার করা হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা।

গ্রেফতাররা হলেন- শাহীন, শহীদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম, হৃদয়, হুমায়ুন। রোববার রাজধানীর মতিঝিল ও বরিশালে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

ডিবি পুলিশ জানায়, গ্রেফতাররা ঢাকার সাভারে ও কুমিল্লায় কারখানা স্থাপন করে নকল অ্যান্টিবায়োটিক ট্যাবলেট-ক্যাপসুল তৈরি করতেন। পরে তা ট্রাক বা পিকআপে করে বরিশালে মজুত করতেন। সেখানে গুদামজাত করে ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন জেলায় কুরিয়ারের মাধ্যমে সরবরাহ করতেন। চক্রটি গত ৮-১০ বছর ধরে এ প্রতারণা করে আসছিল।

গ্রেফতারকৃতরা ৮০টি ইউনানি ওষুধ কোম্পানির ভেজাল ওষুধ তৈরির বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। সেই তথ্য ওষুধ প্রশাসনকে জানানো হয়েছে বলেও জানিয়েছে ডিবি পুলিশ।

নামী ফার্মাসিউটিক্যালসের নামে আটা, ময়দা, সুজি দিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক বানানো হতো। এরপর তা সারাদেশের বিভিন্ন বাজারে ছাড়া হতো।

চাকরি হারিয়ে নকল ওষুধ বিক্রি, আছেন ফার্মেসি মালিকও
রাজধানীতে ভেজাল ওষুধ বিক্রি চক্রের তিন সদস্যকে আটক করা হয়েছে। এ সময় প্রায় দেড় লাখ টাকার নকল ওষুধ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত ২৮ মার্চ রাজধানীর নবাবগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে এ ভেজাল ওষুধ উদ্ধার ও চক্রের তিন সদস্যকে আটক করা হয়।

পুলিশ জানায়, ওষুধ বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন প্রকাশ চন্দ্র মজুমদার। চাকরি চলে গেলে তিনি নকল ওষুধ বিক্রি শুরু করেন। ফার্মেসির মালিক নুরুজ্জামান খানের সহযোগিতায় এ ব্যবসা চলছিলো। এরপর তাদের দলে যোগ দেন আরেক ফার্মেসি মালিক উৎপল সরকার। কমদামে ভেজাল ওষুধ কিনে তা বিভিন্ন ফার্মেসিতে বিক্রি করতেন তারা।

ওষুধ বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। চাকরি চলে গেলে নকল ওষুধ বিক্রি শুরু করেন। এক ফার্মেসি মালিকের সহযোগিতায় এ ব্যবসা চলছিল। এরপর তাদের দলে যোগ দেন আরেক ফার্মেসি মালিক। কমদামে ভেজাল ওষুধ কিনে তা বিভিন্ন ফার্মেসিতে বিক্রি করতেন তারা।

প্রশাসনের কঠোর অবস্থান ও নির্দেশনা
নকল ও ভেজাল জীবন সুরক্ষাসামগ্রীর বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেছেন, ওষুধ-ভ্যাকসিন মানুষের জীবন বাঁচায়। এসব গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষাসামগ্রী নিয়ে যারা প্রতারণা করে তাদের প্রতিরোধ করতে হবে। হাসপাতালগুলোতে যেন নকল ওষুধ বা ভ্যাকসিন ঢুকতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। এই সতর্কতা সারাদেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, ভেজাল ও নকল ওষুধ ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে আছে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরও। জানা গেছে, গত ১৫ বছরে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদনকারী ৪৫টি কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন লাইসেন্স সাময়িক বাতিল বা বাতিল, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ স্থগিত করা হয়েছে। প্রশাসনের সাপ্তাহিক ও মাসিক সভায় সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © jamunanewsbd.com
Design, Developed & Hosted BY ALL IT BD