July 2, 2022, 10:53 am

ফিডের দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে দেশের মৎস্য ও প্রাণী খাতের খামারিরা

যমুনা নিউজ বিডিঃ  আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে দেশে মৎস্য ও প্রাণিজ খাদ্য উপাদানের দাম। গত দুই বছরে মৎস্য ও প্রাণিজ খাদ্য তৈরির উপাদানের দাম বেড়েছে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশেরও বেশি। ফলে হু হু করে বাড়ছে ফিড উৎপাদন খরচ। ফলে বেশি দাম দিয়ে ফিড কিনে পোলট্রি, মৎস্য ও গো-খামারিরা পোষাতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে ছোট ও মধ্যম সারির খামারিরা মহাবিপাকে পড়েছে। লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে বাধ্য হয়ে অনেক উদ্যোক্তাই খামার বন্ধ করে দিয়েছে। ফিড তৈরি উপাদানের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধিতে একদিকে যেমন খামারিরা লোকসানে ধুঁকছে, অন্যদিকে মাছ, গোশতের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তারাও ভুগছে। আর ফিড মালিকরা বলছে, উচ্চমূল্যের কাঁচামাল কিনে ফিড উৎপাদন করে তার যথাযথ দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কাঁচামাল সঙ্কটে অনেক ফিড মিলই এখন বন্ধ হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন, ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে দেশে ফিড উৎপাদনের উপাদান ভুট্টা, গম, সয়াবিনসহ সব ধরনের কাঁচামালের সঙ্কট রয়েছে। আর ওসব কাঁচামালের বেশির ভাগই আমদানি করতে হয়। করোনা মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, সয়ামিল রফতানি চালু রাখা ও গম আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাবে ফিডের কাঁচামালের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এমন অবস্থায় শুধু যে মৎস্য ও প্রাণিজ খাদ্যের দাম বেড়েছে তা নয়, ভ্যাকসিনসহ অন্যান্য পণ্যের দামও বেড়েছে। মৎস্য ও প্রাণিজ খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ওই খাতের উদ্যোক্তারা মহাবিপাকে পড়েছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আরো অনেক ফিড মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তাতে হুমকিতে পড়বে পুরো মৎস্য ও প্রাণী খাত। ডিম, দুধ, মাছ ও গোশতের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ফলে হুমকির মুখে পড়বে জনগণের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা।
সূত্র জানায়, ফিড তৈরিতে ৫০-৫৫ শতাংশ ভুট্টা এবং ৩০-৩৫ শতাংশ সয়ামিলের দরকার হয়। কয়েক মাসের ব্যবধানে সয়ামিলের দাম ৩০ শতাংশ এবং ভুট্টার দাম ১৮ শতাংশ বেড়েছে। গত আগস্টে সয়ামিলের দাম ছিল প্রতি কেজি ছিল ৫৪ টাকা, গত মার্চে তা বেড়ে ৭০ টাকা হয়েছিল। আর বর্তমানে তা ৬৬ টাকার উপরে বিক্রি হচ্ছে। গত ১১ মার্চ ব্রয়লার মুরগির ফিডের দাম ছিল প্রতি কেজি ৫৭ টাকা, আর গত ১৭ মে থেকে তা হয়েছে ৬৩ টাকা। গত দুই বছরে ফিড মিলের অন্যতম প্রধান উপাদান সয়াবিন মিলের দাম বেড়েছে ৮৮ শতাংশ। অন্য কাঁচামালের দাম বেড়েছে ১২৩ শতাংশ পর্যন্ত। বর্তমানে কাঁচামালসহ মোট উৎপাদন খরচ বাড়ন্ত অবস্থায় রয়েছে। প্রতি কেজি ব্রয়লার ফিডে তিন-চার টাকা, লেয়ার ফিডে আড়াই থেকে সাড়ে তিন টাকা, ক্যাটেল ফিডে সাড়ে তিন থেকে চার টাকা, ডুবন্ত ফিশ ফিডে আড়াই থেকে সাড়ে তিন টাকা এবং ভাসমান ফিশ ফিডে চার-পাঁচ টাকা পর্যন্ত খামারিদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। আর কাঁচামালের দাম বাড়ায় বড় ফিড মিলগুলো তাদের উৎপাদন ১৫-২০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। বিগত ২০২০ সালের মার্চে ভুট্টার কেজি ছিল ২৪ দশমিক ১৭ টাকা, চলতি মে মাসে তা হয়েছে ৩৫ টাকা। ৩৭ দশমিক ২৫ টাকার সয়াবিন মিলের দাম এখন ৭০ টাকা। ৩৮ দশমিক ৫০ টাকার ফুল ফ্যাট সয়াবিনের দাম হয়েছে ৭৬ টাকা। ২১ দশমিক ২৫ টাকার রাইস পলিস কিনতে হচ্ছে ৩৬ দশমিক ৩৩ টাকায়। ১৩৩ দশমিক ৩৩ টাকার এল-লাইসিন ২৫০ টাকা, ২০০ টাকার ডিএলএম ৩৩০ টাকা, ৫৪ টাকার পোলট্রি মিল ১১০ টাকা এবং ১০০ টাকার ফিশ মিল কিনতে হচ্ছে ১৫০ টাকায়।
সূত্র আরো জানায়, দেশেই যখন ফিড মিলের কাঁচামালের চরম সঙ্কট চলছে তখনও ভারতে সয়ামিল রফতানি বন্ধ হয়নি। যদিও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে সয়ামিল রফতানি বন্ধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল। ফিডমিল মালিকদেরও জোরালো দাবি রয়েছে নিজস্ব চাহিদা পূরণে যেন সয়ামিল রফতানি বন্ধ করা হয়। সয়ামিল ও ভুট্টাসহ প্রয়োজনীয় কাঁচামাল জোগান কম থাকায় দেশের ছোট ও মাঝারি অনেক ফিড মিলই বন্ধ হয়ে গেছে।
এদিকে দেশে নিবন্ধিত খামারির সংখ্যা ৯০ হাজার। তবে সারা দেশে এক লাখেরও বেশি হাঁস-মুরগির খামার রয়েছে। কিন্তু লোকসানে ব্যবসা টানতে না পেরে ৪০ শতাংশেরও বেশি খামারি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে ওই খাতে কতটা খারাপ প্রভাব পড়বে তা কল্পনাও করা যাচ্ছে না। সবকিছু মিলে খামারিরা সাংঘাতিক দুশ্চিন্তায় আছে। এমন অবস্থায় বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল সরকারের কাছে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কর অবকাশ সুবিধা; ব্যাংকের সুদের হার ৪.৫ শতাংশ নির্ধারণ; পূর্বের ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ এবং আগামী এক বছরের জন্য ইনস্টলমেন্ট বন্ধ রাখা; আসন্ন বাজেটে পোলট্র্রি, মৎস্য ও পশুখাদ্য তৈরিতে ব্যবহৃত সব ধরনের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে সব প্রকার আগাম কর (এটি), অগ্রিম আয়কর (এআইটি), উৎসে কর (সোর্স ট্যাক্স), মূসক ও শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ অঞ্জন জানান, এ খাতের ৮০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানিনির্ভর। প্রধান কাঁচামাল সয়ামিল ও ভুট্টার দাম বেড়েছে দ্বিগুণ। ডলারের দাম বাড়ায় পশুখাদ্যের দাম দ্বিগুণ বেড়েছে। এক বছর আগেও প্রতি কেজি সয়ামিল পাওয়া যেত ২০-২২ টাকায়, এখন তা বেড়ে ৬৬ থেকে ৭০ টাকা হয়েছে। বিশ্ববাজারে ভুট্টার দাম ৪০ ডলার থেকে বেড়ে ১২০ ডলার হয়েছে।
একই প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব শাহ এমরান জানান, দেশে পর্যান্ত কোরবানির গরু আছে। কিন্তু সমস্যা হলো খাদ্যের দাম বেশি। গত এক বছরে পশুখাদ্যের দাম ৫০ শতাংশের উপরে বেড়েছে। খাদ্যের উচ্চমূল্যের প্রভাব কোরবানির পশুর বাজারে অবশ্যই পড়বে।
এ বিষয়ে সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম গনমাধ্যমকে জানান, সয়ামিল রফতানি বন্ধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়েছিল। বাণিজ্যমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছিলেন এটা যাতে বাইরে না যায় তার ব্যবস্থা করবেন। আমরা মনে করি, সেটি এখনো বিবেচনাধীন আছে।

নিউজটি শেয়ার করুন


© All rights reserved © jamunanewsbd.com
Design, Developed & Hosted BY ALL IT BD