May 27, 2024, 3:18 am

কসবায় বিলুপ্তির পথে খেজুরের রস

কসবা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি: শীতের শুরুতেই গ্রাম-বাংলার বিভিন্ন পাড়া-গাঁয়ে খেজুর গাছ থেকে সুস্বাদু রস সংগ্রহের কাজে মেতে উঠতেন গাছিরা। জানান দিতো শীতের আগমনী বার্তা। কালের বিবর্তনে সেই ঐতিহ্য এখন অনেকটা স্বপ্নের মতো। দেখা মেলে না কোমরে গামছা বাঁধা সেই গাছিদের। বাংলার ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু খেজুর রসের সঙ্গে সম্পৃক্ত পেশার এক নাম ‘গাছি’। আর এ পেশায় গাছিদের সংখ্যাও কমে গেছে। ফলে কিছু গাছ টিকে থাকলেও পরিচর্যার লোক পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে রসের সঙ্গে হারাতে বসেছে খেজুর গাছ সম্পৃক্ত পেশা-গাছি। নতুন প্রজন্ম ভুলতে বসেছে খেজুরের রসের স্বাদ। এক সময় শীত মৌসুমের শুরুতেই ভোরের কুয়াশা অতিক্রম করে গ্রামগঞ্জের গাছিরা মোটা দড়ি, বেতের ঝুড়ি কোমরে বেঁধে ছুটে চলতেন গ্রামের মেঠো পথ ধরে। ঝুড়ির ভেতরে থাকতো কয়েক রকমের গাছ কাটা দা, বালি রাখার চোঙা, রসের হাঁড়ি বা ঠিলা এমনকি দা ধার দেয়ার বিভিন্ন সরঞ্জাম।

শীতের শুরুতেই গাছ পরিচর্যা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন গাছিরা। গাছের উপরে উঠে গাছের সাথে নিজেকে বেঁধে করতেন গাছ পরিচর্যা। কার আগে কে গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করতে পারবে এই প্রতিযোগিতা ছিলো নিত্য দিনের কাজ। খেজুর রসে তৈরি নানা প্রকার পিঠা-পায়েস ছিল মানুষের নবান্নের সেরা উপহার। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই খেজুর রস। এমন একটা সময় ছিলো গোটা শীত মৌসুমজুড়ে রসের পিঠা, পায়েস, গুড় তৈরি হতো ঘরে ঘরে। শীত আসার সাথে সাথে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়ত গাছীরা। সময়ের সাথে সাথে একদিকে যেমন খেজুর গাছ বিলুপ্ত হতে চলেছে, অন্যদিকে অভিজ্ঞ গাছির অভাবে বিলুপ্ত হতে চলেছে নতুন গাছিও। বর্তমানে বাজারে খেজুরের রসের চাহিদা ব্যাপক। প্রতি লিটার খেজুরের রস বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা দরে ও ১৫ লিটারের কলস বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২’শ টাকায় এবং প্রতি কেজি গুড় বিক্রি হচ্ছে ৪’শ টাকায়।

রাস্তার পাশে, জমির আইল, পরিত্যাক্ত জমিতে বিনা পরিচর্যায় যে কোন ধরনের মাটিতে এ প্রজাতির গাছ ভালো জন্মায়। কসবা উপজেলা কৃষি অফিস, কৃষকদের উচ্চ ফলনশীল আরব জাতের পাশাপাশি দেশীয় খেজুর গাছ রোপণ করার জন্য পরামর্শ দিচ্ছেন। এতে রস ও গুড়ের চাহিদা পূরণ ছাড়াও খেজুর রস বিক্রি করে আর্থিক ভাবে লাভবান হওয়া যাবে। অপরদিকে খেজুর গাছের পাতা দিয়ে পাটিসহ বিভিন্ন কুটির শিল্পের কাজ করা ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু আগের মতো গ্রামের রাস্তার দু’পাশে সারি সারি খেজুর গাছ আর নেই। গ্রামের রাস্তাগুলো সংস্কার ও নতুন করে খেজুর গাছ রোপনে মানুষের অনাগ্রহের কারণে নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ ও খেজুরের রস। তবে এখনও গ্রামে দু’একটি বাড়ির উঠানের আশপাশে কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিছু খেজুর গাছ।

এক সময় অনেকেই এলাকার বিভিন্ন স্থানে ও হাট-বাজারে রস বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতো। আবার কেউ কেউ সকালে রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করতো। প্রতি বছর শীত মৌসুমে অযত্নে অবহেলায় পথে প্রান্তরে পড়ে থাকা খেজুর গাছের রস ও গুড় বিক্রি করে এ সময় বাড়তি আয় করতো। গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি জানান, কয়েক বছর আগেও শীত মৌসুমে খেজুর রসের তৈরি নানা প্রকার পিঠা-পায়েসসহ বিভিন্ন খাবার তৈরি করা হতো। এখন আর খেজুর রস না পাওয়ায় সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত। শীত মৌসুমে অতিথিদেরকে রসের তৈরি পায়েস দিয়ে আপ্যায়ণ করানোর প্রচলন এখন ভুলতেই বসেছেন গ্রামাঞ্চলের মানুষ। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে খেজুরের রস রূপকথার গল্পের মতো হয়ে যাচ্ছে। কয়েকজন গাছি জানান, পরিচর্যার অভাবে খেজুর গাছ মারা যাচ্ছে। আর যে হারে নিধন হচ্ছে তাতে এক সময় হয়তো খেজুর গাছ দেখাই যাবে না। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। কারণ নতুন করে খেজুর গাছ রোপনে মানুষ আগ্রহী হচ্ছে না। তালগাছ রোপনের মত খেজুর গাছ রোপনে সরকারী-বেসরকারী প্রচারণা থাকলে খেজুর গাছের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতো। সরকার কোনো পদক্ষেপ না নিলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে গ্রাম বাংলার আরো একটি ঐতিহ্য।

কসবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাজেরা বেগম বলেন, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু খেজুরের রস, শীত মৌসুম আসার সঙ্গে সঙ্গে রস সংগ্রহের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকেন গাছিরা। গাছিদের খেজুর গাছ পরিচর্যার কাজটি এক ধরনের শিল্প। এর জন্য দরকার হয় বিশেষ দক্ষতা। ডাল কেটে গাছের শুভ্র বুক বের করার মধ্যে রয়েছে কৌঁশল, রয়েছে ধৈর্য। খেজুরের রস থেকে বিভিন্ন রকমের গুড় তৈরি করে থাকেন গাছিরা। দিন দিন এই শিল্প বিলুপ্তির পথে। আমরা মানুষকে অন্যান্য গাছের পাশাপাশি খেজুর গাছ লাগানোর পরামর্শ দেবো।

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © jamunanewsbd.com
Design, Developed & Hosted BY ALL IT BD