May 24, 2024, 7:21 am

উঁকি মারছে কাঞ্চনজঙ্ঘা, প্রস্তুত তেঁতুলিয়া

পঞ্চগড় প্রতিনিধিঃ  দেশের মানচিত্রের সর্ব উত্তরে অবস্থিত পঞ্চগড় জেলা। হিমালয়ের খুব কাছে অবস্থানের কারণে এখানকার আবহাওয়া প্রাণ প্রকৃতি সব কিছুই ভিন্ন। তাই পঞ্চগড় জেলাকে হিমালয় কন্যা হিসেবেই সবাই জানে। ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে এই তেঁতুলিয়া হানাদার মুক্ত ছিল পুরো ৯ মাস। ৭১ এর মুক্তাঞ্চল তেঁতুলিয়া ডাক বাংলোর টিলা থেকে শীত মৌসুমে দেখা যায় হিমালয় পর্বতমালায় অবস্থিত বিশ্বের তৃতীয় অবস্থানে থাকা সুউচ্চ পর্বত কাঞ্চনজঙ্ঘা।

সমুদ্রপৃষ্ট থেকে যার উচ্চতা ৮ হাজার ৫৮৬ মিটার বা ২৮ হাজার ১৬৯ ফুট। খুব কাছ থেকে এই পর্বত দেখতে যেতে হবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলা শহর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে টাইগার হিলে। সেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দূরত্ব মাত্র ৭৯.৮ কিলোমিটার।

কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে ১৬৫ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা থেকেই দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রধান শৃঙ্গ। আকাশ পরিস্কার থাকলে পঞ্চগড় জেলা শহর থেকেও দেখা মিলবে কাঞ্চনজঙ্ঘার। তবে এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে আর মাত্র কয়েকটা দিন। শরতের মেঘ কেটে গেলেই উত্তরাকাশে খালি চোখে দেখা যাবে কাঞ্চনজঙ্ঘা।

অবশ্য ইতোমধ্যে কাঞ্চনজঙ্ঘার ঝলকানি অবলোকন করেছে পঞ্চগড়ের মানুষ। গত সপ্তাহে সকালের দিকে সামান্য উঁকি মেলেছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা। তবে খুব কম সময়ের পাশাপাশি স্পষ্টও ছিল না। এ নিয়ে গণমাধ্যমে কিছু সংবাদ প্রচারের পর যোগাযোগ শুরু করে দিয়েছেন ভ্রমণপিপাসুরা। অনেকে আবার হোটেলে সিট বুকিং দিয়েও রেখেছেন। পর্যটকদের বরণে প্রস্তুত হচ্ছে তেঁতুলিয়া উপজেলা প্রশাসন। তেঁতুলিয়াকে পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তুলতে সহযোগিতায় নেমেছে এলাকার সকল শ্রেণি মানুষও। অন্যদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তা বিধানে প্রস্তুত তেঁতুলিয়া ট্যুরিস্ট পুলিশ।

পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম জানান, হিমালয়ের কোলে অবস্থানের কারণে শীতকালে এই জেলার তাপমাত্রা সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে আসে। তীব্র শীতে জনজীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। অভাবী ছিন্নমুল মানুষ হয়ে পড়ে কর্মহীন, সরকারি সহায়তার পাশাপাশি বিত্তবানদের সহায়তায় বিপন্ন মানুষদের পাশে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু এখানকার প্রকৃতি দারুণ এক উদারতায় পর্যটকদের টানে। অক্টোবর থেকেই শুরু হয় দেশের নানা স্থান থেকে আসা পর্যটকদের আগমন। প্রকৃতির উদারতায় আগতরা প্রাণ খুলে উপভোগ করে পঞ্চগড়ের সমতল ভূমির চা বাগান, বতহা নদনদীর বুক থেকে নুড়ি পাথর উত্তোলনের দৃশ্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা, ভিতরগড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক, মহারাজার দিঘী, মির্জাপুর শাহি মসজিদ, পঞ্চগড়ের মহিলা কলেজে অবস্থিত রকস মিউজিয়াম।

কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া দেখতে হলে যেতে হবে তেঁতুলিয়ায়। সকালে উত্তরের আকাশ মেঘমুক্ত আর কুয়াশা না থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মিলে খুব সহজে। তেঁতুলিয়ার ঐতিহাসিক ডাকবাংলো অন্যান্য জায়গার চেয়ে খানিকটা উঁচু হওয়ায় সেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় পরিস্কারভাবে। সূর্যোদয়ের রেশ পড়ে দেখা যায় এই দৃশ্য। বেলা বাড়ার সাথে সাথে রোদের তেজ বেড়ে যায়। সেই সাথে ক্রমেই মিলিয়ে যেতে থাকে কাঞ্চনজঙ্ঘা। আবার শেষ বিকেলেও আরেকবার দেখা মিলে কাঞ্চনজঙ্ঘা। তবে দিনের বেলাতেও দেখা যাবে সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ৬ হাজার ৭শ ফুট উচ্চতার দার্জিলিং পাহাড়ের সাপ চলার মত আঁকাবাকা সড়কে যানবাহন চলাচলের দৃশ্য। আর পাহাড়ের ঢালে পাহাড়িদের বাড়িঘর। আর রাতের বেলা পাহাড়িদের বাড়ির আলোতে দেখা যায় ঠিক যেন আকাশের তারার মতই দার্জিলিং। এই দৃশ্য দেখার জন্য অবশ্যই তেঁতুলিয়াতেই অবস্থান করতে হবে।

উচ্চতার দিক থেকে পৃথিবীর মধ্যে প্রথম অবস্থানে হিমালয় পর্বতমালার মাউন্ট এভারেস্ট। সমুদ্রপৃষ্ট থেকে এভারেস্ট শৃঙ্গের উচ্চতা ৮ হাজার ৮৪৮ মিটার বা ২৯ হাজার ২৯ ফুট। আর দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা একই পর্বতমালার পর্বত কেটু’র উচ্চতা ৮ হাজার ৬১১ মিটার বা ২৮ হাজার ২৫১ ফুট। কাঞ্চনজঙ্ঘার পাঁচটি চূড়ার মধ্যে তিনটি চূড়া পড়েছে উত্তর সিকিমে আর দু’টি চূড়া পড়েছে নেপালের মেচি জোনের তাপলেজাং জেলায়। তবে নেপাল ও সিকিম থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার সুউচ্চ চূড়া দেখা যায় না। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলা শহর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে টাইগার হিল থেকে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘার সবগুলো শৃঙ্গ। যেখানকার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ২ হাজার ৫৯০ মিটার বা ৮ হাজার ৪৮২ ফুট। এই উচ্চতা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দূরত্ব সোজা পূর্বে ৭৯.৮ কিলোমিটার। সেখান থেকে মাউন্ট এভারেস্টের দূরত্ব ১৭২ কিলোমিটার।

সূর্যোদয়ের সময় পাহাড়ের মাঝ দিয়ে সূর্য উদয় হয়ে আলো ছড়ায় বরফে আচ্ছাদিত কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায়। এসময় বিভিন্ন রং ধারণ করে কাঞ্চনজঙ্ঘা। সেই আলো প্রতিফলিত হয় আশপাশের বিভিন্ন পাহাড়ে। আর এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন টাইগার হিলে জড়ো হয় হাজারও পর্যটক। তবে সে সময় আকাশে মেঘ জমাট থাকলে ওই দৃশ্য দেখার সুযোগ হয়না অনেকের। বিশেষ করে অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত আকাশে মেঘ কম থাকায় সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় কাঞ্চনজঙ্ঘা। এই সময়টাতে পর্যটকরা বেশি ভিড় করে টাইগার হিলে। বছরের বাকি সময়টাতে তাদের ভাষায় সানরাইজ দেখা ভাগ্যের ব্যাপার। কারণ অধিকাংশ সময়ই আকাশে মেঘ জমে থাকার কারণে সকালে সূর্যোদয় দেখা খুবই বিরল।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে খুব সহজে পঞ্চগড়ে আসা যায়। ঢাকা থেকে পঞ্চগড়ের দূরত্ব প্রায় ৫শ কিলোমিটার। আর পঞ্চগড় থেকে তেঁতুলিয়ার দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার। তেঁতুলিয়া থেকে বাংলাবান্ধা ১৭ কিলোমিটার। পঞ্চগড় থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব ৮০০ কিলোমিটার। আর বাংলাবান্ধা থেকে টেকনাফের দূরত্ব ১০২১ কিলোমিটার। দেশের যে কোন স্থান থেকে সড়ক, রেল ও বিমানে করে পঞ্চগড়ে আসা যায়।

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © jamunanewsbd.com
Design, Developed & Hosted BY ALL IT BD