December 9, 2022, 3:34 pm

রাজশাহীতে কাঠের আসবাবের বাড়ছে কদর হাতের কারুকার্যে শুকনো কাঠে দৃষ্টিনন্দন নকশা!

মঈন উদ্দীন, রাজশাহী: বোর্ড, স্টিল আর প্লাস্টিকের যুগে কাঠের আসবাবপত্রের চাহিদা কমে গেছে এই কথা হলফ করে কেউ বলতে পারবে না। তবে কাঠ ব্যবসায়ীরা বলেন তাদের ব্যবসা দিনকে দিন কমে যাচ্ছে। বিলাসী ও রুচিশীল আসবাব বলতে এখনো মানুষ কাঠের আসবাবপত্রই বোঝে। কেননা শহরের ঘর সাজাতে কাঠের ফার্নিচারের বিকল্প নেই। শহুরে বিলাসিতার এই স্রোতে খানিকটা ভাটা হয়তো পড়েছে, তবে সেটার কদর কমেনি একটুও। বিলাসীতা নয়, প্রয়োজনে আসবাবপত্র কেনেন এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়। আর তাদের আসবাবপত্রে নকশাতো অবশ্যই চায় আর এ চাহিদা পূরণের চেষ্টা করছেন কাঠের নকশা মিস্ত্রিরা। তেমনি বেশকিছু নকশা ফার্নিচারের দোকান রাজশাহী নগরীর উপকন্ঠ বায়া অঞ্চলে।
বায়া বাজারে ঢুকতেই শোনা যায় কাঠের খট খট শব্দ। কেউ কাঠ কাটছেন, কেউবা মনের মাধুরী দিয়ে ফুটিয়ে তুলছেন কাঠের ওপর দৃষ্টিনন্দন নকশা। দোকানে দোকানে কারিগরদের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতন। হাতুড়ি-বাটালের সাহায্য কাঠে এঁকে দিচ্ছেন নানান নকশা। মনের গাঁথুনি দিয়ে কাঠের উপর খোদাই করে ফুল ফোটান নকশা শিল্পীরা। এর মধ্যেই খদ্দের আসছে যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই যে দোকানের আসবাবপত্রের ডিজাইন ভালো, সেখানেই খদ্দেরের আনাগোনা বেশি। ছোট-বড় খাট, কাঠের আলমারি, ড্রেসিংটেবিল, ওয়ারড্রোব, চেয়ার, টেবিল, বেঞ্চসহ সব ধরনের কাঠের আসবাবপত্র পাওয়া যাচ্ছে এসব দোকানে। আর এই ফুল ফোটানোর মধ্য দিয়েই চলে তাদের জীবন-জীবিকা। এ অঞ্চলের প্রায় শতাধিক পরিবার এই পেশার সঙ্গে জড়িত।
কথা হয় এমনি এক নকশা শিল্পীর সঙ্গে। ১৬ বছর বয়স থেকে কাঠের উপর বিভিন্ন নকশা এবং ফুল ফোটার কাজ করে আসছেন। সেই সময় হাতে খড়ি হলেও তিনি এখন একজন পরিপূর্ণ মিস্ত্রি। তার থেকে শিখেছেন অনেকেই। আগে অন্যের দোকানে কাজ করতেন এখন নিজস্ব দোকান দিয়েছেন। অভাবের কারনে পড়ালেখা বেশি করতে পারেনি। ক্লাশ ফাইভ পর্যন্ত পড়ে আর পড়তে পারেনি। তবে পড়ালেখা না করলেও কাজে মনোযোগ ও প্রবল ইচ্ছা শক্তি থাকায় তিনি আজ সফল হয়েছেন’,বলছিলাম রাজশাহীর নগরীর উপকন্ঠ বায়া বাজারের ভ্যানচালক পিতা আব্দুস সাত্তারের ছেলে নকশা মিস্ত্রি আক্তার হোসেনের কথা। আক্তারা এখন প্রতিষ্ঠিত একজন নকশা কারীগর ও ফার্নিচার ব্যবসায়ী। তিনি এখন নিজেই দোকান দিয়েছেন বায়া বাজারে প্রবেশ করতেই বিমানবন্দর সড়কের পশ্চিম পাশে। দোকানের নাম দিয়েছেন “নিউ মডেল ফার্নিচার এন্ড নকশা ঘর”।
আক্তার হোসেন বলেন, ২০ বছর যাবৎ এই কাজ করছি। প্রথম দিকে নকশার ব্যাপারে তেমন অভিজ্ঞতা ছিল না। অন্যের দোকানে কাজ করতে করতে কাজ শিখেছি। এর পর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। তিনি বলেন, বর্তমানে অটোবিসহ অত্যাধুনিক বিভিন্ন কোম্পানীর আসবাবপত্র বের হলেও একটুও চাহিদা কমেনি নকশা ওয়ালা কাঠের ফার্নিচারের। আধুনিক ওইসব আসবাবপত্র দেখতে সুন্দর হলেও টেকসই খুব একটা ভালো না, তাই মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। আর দিন দিন মানুষ যত আধুনিক হচ্ছে ততই কদর বাড়ছে নিত্য নতুন ডিজাইনের কাঠের ফার্নিচারের।
নকশা কারিগর পলাশ জানান, নকশা একটি হস্তশিল্প তাই নকশার কাজের কদর রয়েছে সারা দেশে। তবে চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, সেভাবে বাড়ছে না নকশা কারিগর। নকশার কাজ শিখতে বেশ সময় লাগে এবং এ কাজে পারিশ্রমিক বেশি হলেও বর্তমানে বিভিন্ন কাজের সুযোগ সৃষ্টি হওয়াতে অনেকে এ কাজের দিকে বেশি ঝুঁকছেন না। যদি মনোযোগ দিয়ে কাজ করে নকশার কাজ ভালোভাবে আয়ত্ত করতে একজন কারিগরের ৫-৬ বছর সময় লাগে। আর একজন কারিগর পরিপূর্ণ মিস্ত্রি হলে প্রতি মাসে ১৮-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পান। যারা সহকারি মিস্ত্রি হন তারা ৮-৯ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পান। তবে এক্ষেত্রে নকশার দোকানের মালিক কাজের অর্ডার নেন। তিনি ফার্নিচার দোকানের মালিকদের থেকে বিভিন্ন দামে ডিজাইনের অর্ডার নিয়ে তার কারিগরদের দিয়ে করান। নকশা বেশি হলে খাটের ক্ষেত্রে নেওয়া হয় ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত, সোফা সেটের ক্ষেত্রে ৬ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে এ সমস্ত দোকানে দাম তুলনামূলক কম। দেড় থেকে দুই হাজার টাকায় পাওয়া যাবে ডাবল খাট। কিছুটা নকশাকরা একই আকারের খাট পাওয়া যাচ্ছে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকায়।
শুধু বায়া অঞ্চল নয় জেলার বিভিন্ন বড় হাট বাজার ও ইউনিয়নের ছোটো ছোটা বাজারগুলোতেও এখন গড়ে উঠেছে ফার্নিচারের দোকান। এসব দোকানে চুক্তি ভিত্তিক কাজ করে থাকেন নকশা কারিগররা।
অনেকেই হয়তো জানেন না যে প্রায় একই রকমভাবে সস্তায় কাঠের আসবাবপত্রে নকশা করা হয় বায়া অঞ্চলে। যারা জানেন তাদের অনেকেই এখানে আসেন সস্তায় কাঠের আসবাব তৈরি করতে। এখানকার দোকানগুলোর সুবিধা হলো খুবই অল্পসময়ের মধ্যে আপনার প্রয়োজন এবং পছন্দমতো আসবাববা নিয়ে নিতে পারবেন চাহিদামাফিক। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানকার খদ্দেররা ওয়ারড্রোব, বুকশেল্ফ, আলমারি বানাতে আসে। পড়ার টেবিল, ডাইনিং টেবিল, কম্পিউটার টেবিলসহ সব ধরনের টেবিলের বিপুল চাহিদা আছে বলে জানান এখানকার দোকানিরা।

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © jamunanewsbd.com
Design, Developed & Hosted BY ALL IT BD