রবিবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২২, ১২:২৬ অপরাহ্ন

ক্রিপ্টোকারেন্সীই ভবিষ্যত

ক্রিপ্টোকারেন্সি হল বাইনারি উপাত্তের একটি সংকলন যা বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। ক্রিপ্টোগ্রাফির সুরক্ষিত প্রক্রিয়ায় এর লেনদেন শুধু অনলাইনে সম্পন্ন হয়। এটি ইন্টারনেট নির্ভর কারেন্সি যা ফিয়াট মানি (যেমন ব্যাংক নোট, কয়েন) থেকে ভিন্ন এবং যার  বাস্তব অস্তিস্ত্ব নেই। এর অন্যতম বড় সুবিধা হলো ততক্ষনাৎ লেনদেন এবং  দ্রুত সময়ে  মালিকানার সীমানাবিহীন হস্তান্তর। ২০১৭ সাল থেকে এটি  দ্রুত বর্ধনশীল বাজারে পরিণত হয়েছে।

ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ব্লকচেইন:
তৃতীয় কোন পক্ষ কিংবা ব্যাংকের সাহায্য ছাড়া অর্থ হস্তান্তর করার সর্বাধুনিক এই ডিজিটাল প্রক্রিয়াটি ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্লকচেইন ব্যবহার করে সম্পন্ন করে।  এতে ব্যাংকের চাইতে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে কোন অর্থ লেনদেন নিশ্চিত করা হয় । সিস্টেমটি  তাৎক্ষণিক এবং কোন ধরণের লুটপাট বা হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বিহীন। এই প্রযুক্তির নাম হল ব্লকচেইন, যাকে বর্তমানে বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তিবিদ ভবিষ্যতের ব্যাংকিং টেকনোলজি হিসাবে দেখছেন।  কিছু প্রভাবশালী দেশের কয়েকটি ব্যাংক ইতোমধ্যে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এই প্রযুক্তির পেছনে। ২০০৯ সালে সর্বপ্রথম  ডিসেন্ট্রালাইজড ক্রিপ্টোকারেন্সি হিসেবে বিটকয়েন সৃষ্টি করা হয়।

সাতোশি নাকামোতো – বিটকয়েনের রহস্যময় স্রষ্টা   :
ব্লকচেইন সিস্টেম এবং সেটার জন্য প্রথম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েন ডিজাইন ও ডেভেলপ করেন  সাতোশি নাকামোতো। কেননা সাতোশি নাকামোতোর পরিচয় এখনও জানা যায়নি। এটা হতে পারো কোন ব্যাক্তি, গোষ্ঠি, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির কোডনেম। ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামে কোন এক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এই মুদ্রাব্যবস্থার প্রচলন করে যা পিয়ার-টু-পিয়ার মুদ্রা বলে অভিহিত হয়। অনেকে বলেন সাতোশি নাকামাতো একজন মানুষ নন, এটা একটা টিম। সেই টিম গুগলের ভেতরের একটা টিম হতে পারে, অথবা আমেরিকার এনএসএ (ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি) হয়তো এমন একটা গবেষণা টিম তৈরি করে গোপনে এ কাজ করেছে। তাই তারা পর্দার অন্তরালেই থেকে গেছে। দুনিয়াজুড়ে এত এত মিডিয়া, কম্পিউটার গিক ও হ্যাকার, তাদের সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে থাকা সাংঘাতিক একটা আশ্চর্য ব্যাপার।

ব্লকচেইন প্রযুক্তি:
ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে থার্ড পার্টির সাহায্য ছাড়া গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা বজায় রেখে, একজন গ্রাহক হতে অন্য গ্রাহকের মধ্যে  লেনদেনের একটি মাধ্যমই এই ব্লক চেইন। ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহার  করে দ্বিতীয় কোন পক্ষের সাথে তৃতীয় কোন মাধ্যম (থার্ড পার্টি)  ছাড়া সরাসরি বিনিময়  মাধ্যম এই ব্লক চেইন প্রযুক্তি। এখানে তৃতীয় পক্ষ বলতে বিদ্যমান লেনদেনে সাহায্যকারী ও অনুমতি প্রদানকারী মাধ্যম গুলোকে বলা হচ্ছে। যেমন, আপনি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এ কোন বন্ধুর কাছে টাকা পাঠালে সেখানে ব্যাংক এর সাহায্য নেন যা মূলত থার্ড পার্টি অথবা দেশ থেকে বাইরে বৈধ ভাবে টাকা পাঠাতে সরকারের অনুমতি নিতে হয় যা ব্যতিরেক আপনি কারেন্সি আনা নেওয়া করতে পারেন না। আর এখানেই ব্লক চেইন প্রযুক্তি আপনাকে থার্ড পার্টির সাহায্য ব্যতিরেকে সহজেই লেনদেন করতে সাহায্য করবে। ক্রিপ্টোকারেন্সি হিসেবে এখানে ডিজিটাল মানি কাজ  করে যার কোন ফিজিক্যাল উপস্থিত নেই। ব্লক চেইন প্রযুক্তি ওয়েব ও ইন্টারনেট -এর মতো বা তার চেয়েও বেশি সম্ভাবনাময় একটি প্রযুক্তি ও প্লাটফর্ম! এর দ্বারা বাস্তব জীবনে এবং অনলাইনে লেনদেন সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো কোন প্রকারের ছাড়াই মিটিয়ে ফেলা যায়। নির্দিষ্ট একটি সময়ের মধ্যে সারা পৃথিবী জুড়ে যত অর্থের বা সম্পদের লেনদেন হচ্ছে সেই লেনদেনের সকল এনক্রিপটেড তথ্য একসাথে নিয়ে একটা ব্লক বানানো হয়। সেই ব্লক দিয়ে ক্রমানুসারে সাজানো সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয় একটা ডিস্ট্রিবিউটেড এবং ডিসেন্ট্রালাইজড লেজারকেই মূলত ব্লকচেইন বলা হয়।

অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের যাবতীয় লেনদেন রেকর্ড করার জন্য লেজার বুক ব্যবহার করা হয় । সফটওয়্যারে এই রেকর্ড থাকে ডেটাবেইজে। ব্লকচেইন এরকম একটা লেজার, যেখানে পাশাপাশি একটার পর একটা এরকম অনেকগুলো ব্লক থাকে। প্রত্যেকটা ব্লকের ভিতর থাকে একটা সময়ে মাঝে সারা পৃথিবীতে যত ট্রানজেকশান হয়েছে সেটার সকল ডেটা। এই এনক্রিপ্টেড  ডেটা পড়তে গেলে প্রাইভেট কী লাগবে। অর্থাৎ আপনি যদি এখানে ট্রাঞ্জেকশান করে থাকেন তাহলে সকল তথ্য আপনার নির্ধারিত প্রাইভেট কী ব্যবহার করে পড়তে পারবেন, অন্য কেউই পারবেনা। তবে মানুষ যেটা দেখবে তা হল ট্রানজেকশনের পরিমাণ। তবে কার অর্থ কার কাছে গিয়েছে  জানা যাবেনা; কারন শুধুমাত্র পরিচয়  এড্রেস দিয়ে চলে যাবে টাকা। কোন পরিচয় থাকবে না।
ব্লকচেইনের প্রত্যেকটা ব্লক সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয়। একবার চেইনে একটা ব্লক যোগ হয়ে গেলে সেটাতে কোন প্রকারের পরিবর্তন অসম্ভব। ব্লকগুলো পাশাপাশি তাদের সৃষ্টির ক্রমানুসারে বসে। প্রত্যেকটা ব্লক তার আগে কোন ব্লক আছ সেটা জানে। এভাবে একটা ব্লকের সাথে আরেকটা কানেক্টেড। ব্লকচেইন ডিস্ট্রিবিউটেড এবং ডিসেন্ট্রালাইজড সিস্টেম, অর্থাৎ সারা পৃথিবীতে বলতে গেলে একই ব্লকচেইনের সব ইউজার বা ক্ষেত্রবিশেষে বিশেষ ইউজারদের কাছে একেবারে কার্বন কপি আছে। কাজেই একটা বা শ-খানেক সার্ভার বা কম্পিউটার একসাথে নস্ট হয়ে গেলেও ব্লকচেইনের কিছুই হবেনা।

ব্লকচেইন প্রযুক্তির সুবিধা: 
নিরাপত্তা: ব্লকচেইন টেকনলজি খুব নিরাপদ কৌশল কারণ প্রতিটি লেনদেন ক্রিপ্টোগ্রাফি কৌশল দ্বারা এনক্রিপ্ট করা হয়। এবং হ্যাশিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিটি ব্লকের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা হয়।
পরিচয় গোপন: এছাড়াও ব্লকচেইন সিস্টেমে ব্যবহারকারীর পরিচয় গোপন থাকে।

চুরি ও দুর্নীতি প্রতিরোধ: প্রতিনিয়ত ইনফরমেশন গুলো আপডেট হওয়ার কারণে এখানে তথ্য চুরি হওয়া অথবা দূর্নীতি হওয়া একেবারেই অসম্ভব।
স্বচ্ছতা: যখন ব্লকে ডেটা রেকর্ড করা হয়, তার পূর্বে একবার ব্লকচেইনের লেনদেন যাচাই করা হয়। এই সিস্টেমে ডেটা মুছে ফেলা যায় না, যার ফলে ডেটার স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
তৃতীয় পক্ষের ঝামেলা থেকে মুক্তি: ব্লকচেইন প্রযুক্তির জন্য কোন তৃতীয় পক্ষের প্রয়োজন হয় না। ফলে বিশ্বের যে কোনো জায়গা থেকে যে কেউ খুব সহজেই লেনদেন করতে পারে কোন রকম ঝামেলা ছাড়া। যা বর্তমানে প্রচলিত ব্যাংকিং সিস্টেমে অত্যন্ত ঝামেলাপূর্ণ।

ক্রিপ্টোকারেন্সী বিটকয়েনের বৈধতা:
বেশিরভাগ দেশ বিটকয়েনের বৈধতা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেনি, বরং অপেক্ষা এবং দেখার পদ্ধতি গ্রহণ করা পছন্দ করে। কিছু দেশ কিছু নিয়ন্ত্রক তত্ত্বাবধান করে বিটকয়েনের বৈধ ব্যবহারে পরোক্ষভাবে সম্মতি দিয়েছে। যাইহোক, ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত, এল সালভাদর একমাত্র দেশ যা বিটকয়েনকে আইনি টেন্ডার হিসাবে স্বীকৃতি দেয়।  যুক্তরাষ্ট্র: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিটকয়েনের প্রতি সাধারণভাবে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে, যদিও বেশ কয়েকটি সরকারি সংস্থা অবৈধ লেনদেনের জন্য বিটকয়েনের ব্যবহার রোধ বা কমাতে কাজ করে। ডিশ নেটওয়ার্ক (ডিআইএসএইচ), মাইক্রোসফট, সাবওয়ে এবং ওভারস্টক (ওএসটিকে) এর মতো বিখ্যাত ব্যবসা বিটকয়েনে পেমেন্টকে স্বাগত জানায়। কানাডা: কানাডা সাধারণভাবে বিটকয়েন-বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখে এবং এটি নিশ্চিত করে যে ক্রিপ্টোকারেন্সি অর্থ পাচারের জন্য ব্যবহার করা হয় না। বিটকয়েনকে কানাডা রেভিনিউ এজেন্সি (সিআরএ) একটি পণ্য হিসেবে দেখে । অস্ট্রেলিয়া: কানাডার মতো, অস্ট্রেলিয়া বিটকয়েনকে অর্থ বা বৈদেশিক মুদ্রা মনে করে না, অস্ট্রেলিয়ান ট্যাক্সেশন অফিস (এটিও) এটিকে মূলধন লাভ করার উদ্দেশ্যে একটি সম্পত্তি হিসেবে রায় দেয়। ইউরোপ: ২২ অক্টোবর, ২০১৫ তারিখে, ইউরোপীয় কোর্ট অব জাস্টিস (ইসিজে) রায় দিয়েছে যে ডিজিটাল মুদ্রা কেনা-বেচাকে সেবার সরবরাহ বলে মনে করা হয় এবং এটি সকল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সদস্য দেশগুলিতে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) থেকে মুক্ত। । ফিনল্যান্ডে, সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ট্যাক্সেস (CBT) বিটকয়েনকে একটি আর্থিক সেবা হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করে ভ্যাট ছাড়ের মর্যাদা দিয়েছে। বেলজিয়ামের ফেডারেল পাবলিক সার্ভিস ফাইন্যান্সও বিটকয়েনকে ভ্যাট থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। সাইপ্রাসে বিটকয়েন নিয়ন্ত্রিত হয় না।  যুক্তরাজ্যের ফাইন্যান্সিয়াল কন্ডাক্ট অথরিটি (এফসিএ) একটি বিটকয়েনপন্থী অবস্থান নিয়েছে এবং নিয়ন্ত্রক পরিবেশ ডিজিটাল মুদ্রার সহায়ক হতে চায়। বিটকয়েন যুক্তরাজ্যে এর কিছু কর নিয়মের অধীনে রয়েছে। বুলগেরিয়ার ন্যাশনাল রেভিনিউ এজেন্সি (এনআরএ) বিটকয়েনকে তার বিদ্যমান কর আইনের আওতায় এনেছে। জার্মানি বিটকয়েনের জন্য উন্মুক্ত, যেখানে এটি আইনী বিবেচিত হয় কিন্তু কর্তৃপক্ষগুলি বিনিময়, খনির, উদ্যোগ বা ব্যবহারকারীদের সাথে আচরণ করছে কিনা তার উপর নির্ভর করে ভিন্নভাবে কর আরোপ করা হয়।

বাংলাদেশে কি ভাবছে:
বাংলাদেশে খুব সীমিত আকারে বিটকয়েন কেনাবেচার কথা জানা যায়।  তবে আইন অনুযায়ী বিটকয়েন বা অন্য কোন ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচা বা সংরক্ষণ করা বেআইনি বলে জানাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলছেন, বাংলাদেশে বিটকয়েনের কোন অনুমোদন নেই। যেহেতু অনুমোদন নেই, সুতরাং এই জাতীয় লেনদেন বৈধ নয়। ভার্চুয়াল মুদ্রায় লেনদেনের দ্বারা মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন সম্পর্কিত আইনের লঙ্ঘন হতে পারে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক করে দিয়েছে। এ ধরনের লেনদেনের মাধ্যমে আর্থিক এবং আইনগত ঝুঁকি রয়েছে বলে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক উল্লেখ করেছে।
গত ১৮ মে ২০২১ বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের সহকারী পরিচালক শফিউল আজম ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে ব্যাংকের অবস্থান জানান সিআইডিকে লেখেন, ‘ক্রিপ্টোকারেন্সির মালিকানা, সংরক্ষণ বা লেনদেন স্বীকৃত না হলেও এটিকে অপরাধ বলার সুযোগ নেই মর্মে প্রতীয়মান হয়।’ ওই চিঠিতে তিনি আরও বলেন, ভার্চ্যুয়াল মুদ্রায় লেনদেনের ফলাফল হিসেবে দ্বিতীয় পর্যায়ে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭; সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২–এর আওতায় অপরাধ হতে পারে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সিআইডি এ নিয়ে অনুসন্ধান করে দেখতে পারে।

বিটকয়েনের আকাশ্চুম্বি দাম:
২০০৯ সাল হতে শুরু হয়ে  গত ২০ অক্টোবর ২০২১ প্রতি বিটকয়েনের দাম ছাড়িয়েছে ৬৫ হাজার ডলার । সব ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সির মধ্যে যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ইটিএফ একধরনের বিনিয়োগ তহবিল, যা স্টক এক্সচেঞ্জগুলোতে কেনাবেচা করা যায়।  অথচ গত মাসেও দাম এত ছিল না। সেপ্টেম্বর শেষে বিটকয়েনের দাম ছিল ৪৩ হাজার ডলারের আশপাশে। পরবর্তীতে বাড়া-কমার মাধ্যদে ৫ ই জানুয়ারি ২০২২ এ এসে দাঁড়িয়েছে ৪৬,৭৬৭.৯১ মার্কিন ডলারে।  বিটকয়েন নির্ভর আরও ইটিএফ যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে আসার অপেক্ষায় রয়েছে। দেশটির সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন পর্যালোচনা শেষে অনুমোদন দিলে সেগুলোর লেনদেন শুরু হবে।

ক্রিপ্টোকারেন্সি- ঝুঁকি না সম্ভাবনার দুনিয়া:
ক্রিপ্টোকারেন্সির গোপনীয়তা পদ্ধতি ঈর্ষণীয়। এক সময়ের সুইস ব্যাংক গ্রাহকের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সির মালিকের নামটির গোপনীয়তা চূড়ান্ত ভাবে রক্ষিত। আর যেখানেই গোপনীয়তা, সেখানেই করের হিসাব রাখা দুষ্কর। এর লেনদেন জানা প্রায় অসম্ভব।  এই কয়েন থাকে ডিজিটাল লকারে। কেউ পাসওয়ার্ড ভুললেই  চিরকালের মতো কয়েন হারিয়ে যাবে।  এটাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কয়েনের দাম বাড়ার একটা অন্যতম কারণ। এই কয়েনের সংখ্যা কিন্তু সীমিত।২০২১ সালের হিসেবে যার মূল্য ২৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।  ক্রিপ্টোকারেন্সির দর কমবেশি প্রতিদিন ২০ শতাংশ ওঠানামা করার নজিরও তৈরি হয়েছে। দামের এই ওঠানামাই অনেকের কাছে ক্রিপ্টোকারেন্সির মূল আকর্ষণ।
আজ ক্রিপ্টোকারেন্সি কিছু মানুষের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। যে কেউ তাঁর পরিচয় গোপন রেখে অনেকটা সাধারণ মুদ্রার মতোই ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করতে পারবেন। মাঝখানে কোনও ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানব্যাতিত  ক্রিপ্টোকারেন্সি এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির ওয়ালেটে ‘ট্রান্সফার’ হয়। ফলে বিনিয়োগ বা লেনদেনের সম্পূর্ণ ভাগীদার সেই ব্যক্তি নিজেই। ঠিক একই কারণে, বিপদে পড়লেও আবার নিজেকেই সামলাতে হবে। আরও স্পষ্টভাবে বললে, অজানা কোনও বিপদ এলে তা সামলানোর জন্য কোনও ক্রেতা সুরক্ষা দপ্তর বা সরকারি সংস্থার দায়বদ্ধতা থাকার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। যুক্তরাষ্ট্রের হল শুরু, চীনের হল সারা:
বিটকয়েন মাইনিংয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘খেলোয়াড়’ ছিল চীন। তবে যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ সেন্টার ফর অলটারনেটিভ ফাইন্যান্সের তথ্য বলছে, সে জায়গা এবার দখলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মূলত সব ধরনের ভার্চ্যুয়াল মুদ্রায় লেনদেন নিষিদ্ধ করায় শীর্ষ অবস্থান হারাল চীন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ গত মে মাসের শেষ দিকে বিটকয়েনসহ সব ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন ও মাইনিং (নতুন ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা তৈরি) বন্ধে উদ্যোগ নেয়। এরপর এই খাত একরকম ধ্বংস হয়ে যায়। মাইনিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা কার্যক্রম বন্ধ করে দেন, কেউ কেউ বিদেশেও পাড়ি জমাতে শুরু করেন।

ভার্চুয়াল মুদ্রার ভবিষ্যৎ মার্কিন যুক্তরাষ্টে:
মারাত্মক গোপনীয়তা আর নিরাপত্তার চাঁদরে ঢাকা এই মুদ্রা হতে চীন কেন সরে গেল এটি একটি বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। হয়ত চীনা প্রশাসন সময়ের আগে এটির পৃষ্ঠপোষকতা করে প্রযুক্তি নির্ভর ফাটকাবাজির সম্ভাবনা দেখে পিছিয়ে গেছে।  কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখানে বড় ধরণের বাজি ধরেছে। প্রযুক্তি নির্ভর এইট মুদ্রা ব্যবস্থার বিকাশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আরো একবার বিশ্বে নিজ প্রভুত্ব কায়েম করতে মরিয়া হয়ে পড়েছে।  যুক্তরাষ্ট্র জানে ব্যক্তি অধিকার রক্ষার মাধ্যমে প্রযুক্তির কাঁধে সওয়ার হয়েই শুধু পুরোনো বিশ্ব-মোড়লিটা ফিরে পাওয়া যেতে পারে।

ভার্চুয়াল মুদ্রাই ভবিতব্য :
বিশ্ব-ব্যাপী অনলাইন মার্কেট আর ভার্চুয়াল দুনিয়ার জন্য ডিজিটাল মুদ্রার বিকল্প নেই। নিরাপত্তার সাথে নিমিষে কেনাকাটা আর  মুদ্রা হস্তান্তর প্রক্রিয়া একমাত্র ক্রিপ্টোকারেরেন্সিতেই সম্ভব। ব্যক্তি পরিচয়ের গোপনীয়তা রক্ষা আর স্বচ্ছতার সাথে লেনদেন সংঘটন সামর্থ আর অন্য কোনো উপায়ে সম্ভব না।  এই মুদ্রার প্রতি মানুষের তীব্র আকর্ষণ এবং ভার্চুয়াল দুনিয়ায় নিরাপত্তা সামর্থ বৃদ্ধি একে এরই মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিনিময় মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।  পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশ একে পর্যবেক্ষনে রেখেছে।
পৃথিবীর এক বিরাট অংশ মানুষ তাদের বিনোদন আর দৈনন্দিন প্রয়োজনের সাথে ভার্চুয়াল জগৎকে একাকার করে ফেলেছেন।  এখন গেমস মানেই ভার্চুয়াল রিয়েলিটি। এখন নতুনত্ব মানেই ভার্চুয়াল জগতের  হাতছানি। আধুনিক মানুষের  মনোজগত  ভার্চুয়াল রিয়েলিটি দখল করে নিয়েছে।  তাই তার যোগ্য সাথী হতে যাচ্ছে ভার্চুয়াল মুদ্রা -ক্রিপ্টোকারেরেন্সি।  বিভিন্ন দেশের সরকার এই বিষয় মানতে বাধ্য হচ্ছে।  সালভাদর হয়ত দেশ হিসেবে প্রথম স্বীকৃতি দাতা; কিন্তু প্রযুক্তি উন্নত দেশগুলোই এ মুদ্রার প্রধান পৃষ্ঠপোষক।

কাগজের মুদ্রা ৭ম শতাব্দীতে চীনে   তাং রাজবংশের সময় প্রথম চালু হলেও  ক্রমান্বয়ে ঊনবিংশ শতাব্দীতে এর বিশ্ব ব্যাপী বিস্তার ঘটে। মাত্র আড়াই শত বৎসরের মধ্যে এটি ভার্চুয়াল মুদ্রার মুখোমুখি হয়ে পড়েছে।  ২০০৯ সালে আরম্ভ হওয়া নতুন মুদ্রা ব্যবস্থা মাত্র এক যুগের মধ্যে কাগজের মুদ্রাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।  কোনো কোনো বিজ্ঞজন মনে করেন প্রযুক্তির এই যুগে কাগজের মুদ্রা আর হয়ত দুই যুগ তার প্রাধান্য বজায় রাখতে পারবে।

লেখক : আলাউদ্দিন মল্লিক প্রধান সমন্বয়ক, আমরা ৯৯ শতাংশ (আপহোল্ড ৯৯) ।

Please Share This Post in Your Social Media


© All rights reserved ©  jamunanewsbd.com