শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০২:২০ অপরাহ্ন

চরকার আদিজন্ম ভারত, ইউরোপের শিল্পে যেভাবে জনপ্রিয় হলো

যমুনা নিউজ বিডিঃ চাঁদের বুড়ি চরকা কাটার গল্প ছোটবেলা থেকেই সবাই জানি। চরকা হলো তুলা থেকে সুতা তৈরির এক লৌকিক যন্ত্রবিশেষ। তবে শিল্প বিপ্লবের আগে ইউরোপে সুতাকাটতে চরকার ব্যাপক প্রচলন ছিল। সেখানে সুতাকাটতো প্রবীণ নারী। তরুণরা সাধারণত এই কাজ করতো না। চরকার ইতিহাস বেশ পুরোনো। তবে বিতর্কিতও বটে।

জেএম কেনোয়ার এবং সিন্ধু সভ্যতার অধ্যয়নের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতো কিছু বিদ্বান মনে করেন যে কাদামাটির ছাপ থেকে সুতোর একস্বরূপ এবং আঁটসাঁট বুনন স্পিন্ডল বাদ দেওয়ার পরিবর্তে স্পিনিং হুইল ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয় , তবে মুখতার আহমেদের মতে, ঘূর্ণায়মান হোর্ল বা আবর্তে সিন্ধু মানুষ প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ব্যবহার করছে এই চরকা।

ভারত থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চরকার ব্যবহার হয়েছিল

ভারত থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চরকার ব্যবহার হয়েছিল

টম কোথরেনের মতো পণ্ডিতদের মতে, ৫০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টাব্দে ভারতে চড়কা উদ্ভাবিত হয়েছিল। এরপর ১০৩০ সালে ভারত থেকে এর প্রচলন ঘটে বাগদাদে। পরবর্তীকালে ১০৯০ সালে বাগদাদ থেকে চীনে বিস্তার লাভ করে। ১২৮০ সালে বাগদাদ থেকে ব্রিটেন এবং ১৩৫০ সালে ফ্রান্সে প্রচলন হয় চরকার। শিল্প বিপ্লবের পর উন্নত বিশ্বে চড়কার বিলুপ্তি ঘটে। কিন্তু এখনো এর আদি নিবাস ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের  তাঁতীদের কাছে সুতাকাটতে চরকাই একমাত্র ভরসা।

চীন সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পোশাক শিল্পে চাকার প্রচলন ছিল

চীন সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পোশাক শিল্পে চাকার প্রচলন ছিল

ইসামীর ফুতুহ-উস-সলাতীন গ্রন্থ থেকে জানা যায়, চৌদ্দ শতকের মাঝামাঝি উত্তর ভারতে সুতা কাটা যন্ত্র চরকা বা চরখার ব্যাপক প্রচলন ছিল। বাংলায় এ যন্ত্রের প্রচলন ঘটে চৌদ্দ শতকের শেষ দিকে। বিভিন্ন চীনা পর্যটকের ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকে সে প্রমাণ পাওয়া যায়। তাছাড়া ১৫ শতক থেকে বাংলার যেসব মসলিনসহ অন্যান্য মোটা সুতিবস্ত্র তৈরির জন্য সুতা তৈরি করা হতো তার জন্য ব্যবহৃত হতো চরকা। ১৬ শতকের প্রথম দিকে জনৈক পর্তুগিজ পর্যটক দুয়ার্তো বার্বোসা লিখেছিলেন, বাংলার লোকজন চরকায় সুতা কেটে বস্ত্র বয়ন করে। পুরুষেরা তৈরি করত চরকাযন্ত্র আর মেয়েরা সে যন্ত্রে সুতা কাটত। মূলত মোটা সুতিবস্ত্র বয়নের জন্য যে সুতোর দরকার হতো তা চরকায় কাটা হতো।

সে সময় মূলত বয়স্কো নারীরাই চরকায় সুতা কাটার কাজ করতেন

সে সময় মূলত বয়স্কো নারীরাই চরকায় সুতা কাটার কাজ করতেন

মসলিনের মতো সূক্ষ্ম বস্ত্র বয়নের জন্য ছিল আদিম যন্ত্র টাকু বা তকলির ব্যবহার। তবে বাংলায় ব্যবহৃত চরকার বিশদ বিবরণ কোথাও লিপিবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়নি। তবে বর্তমান চরকার কাঠামো দেখে ধারণা করা হয় যে তা বিবর্তনের কয়েকটা ধাপ পার হয়ে এসেছে। চরকার চাকাই হলো মূল অংশ। চক্কর বা ঘূর্ণনের দ্বারা সুতা তৈরি হয় বলেই নাম চরকা। চক্র বা চাকার সাথে একটা হাতলের যোগসূত্র স্থাপন করা হয় ফিতে বা রশি দিয়ে। হাতল হাত দিয়ে ঘোরানো হয়। হাতের কুশলতায় চিকন বা মোটা সুতা তুলা থেকে তৈরি করা হয়। চরকা সাধারণত কাঠ দিয়ে তৈরি হয়। চাকমা মেয়েরা প্রায় সবাই চরকায় সুতা কাটতে জানে এবং তাঁতে সুতিবস্ত্র বয়নে বেশ পারদর্শী। তারা জুমের কার্পাস তুলা থেকে সুতা তৈরি করে। তারা চরকাকে বলে চরকি।

কাজের সুবিধার্থে চরকায় হাতলের পরিবর্তে আসে মেশিন

কাজের সুবিধার্থে চরকায় হাতলের পরিবর্তে আসে মেশিন

বাংলাদেশের মুসলমান ও হিন্দু তন্তুবায়কে বলে ‘জোলা’ ও ‘তাঁতি’। এরাই চরকায় সুতা কাটে এবং সেসব সুতা দিয়ে বস্ত্র বোনে। মধ্যযুগে এ দেশে চরকার ব্যাপক প্রচলন ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে কাপড়ের কল আসায় এই গ্রামীণ বস্ত্র বয়ন শিল্পে ভাটা পড়ে। ধীরে ধীরে কমে আসে চরকার ব্যবহার। এখন অধিকাংশ তাঁতিই কলের সুতা ব্যবহার করে, চরকায় আর সুতা কাটে না। এমনকি উপজাতি গ্রামে গিয়েও দেখা গেল পুরনো চরকা পড়ে আছে অনাদরে, অব্যবহারে নষ্ট হচ্ছে। তাই এ যন্ত্রটি তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।

কাজের সুবিধার্থে চরকার চাকা ঠিক থাকলেও এর আকার পরিবর্তন হয়েছে। বহনের সুবিধার জন্য কম্প্যাক্ট চরকাও তৈরি হয়েছিল ১৮ শতকে। একসময় হাতে ঘুরানো চরকাই ছিল। পরবর্তীতে পা দিয়ে চলতি এবং আরো পরে এসে মেশিনে চালিত চরকাও তৈরি হয়েছে। এখনো গ্রাম বাংলায় তাঁতিদের ঘরে এই চরকা দেখা যায়।

গান্ধিজি চরকা কাটছেন

গান্ধিজি চরকা কাটছেন

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতারাচরখাকে তাদের শিক্ষার সঙ্গে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ভারতীয়দের বিশ্বাস চরকা ভারতের জনগণের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও স্বাধীনতা অর্জন সহায়তা হবে। সেজন্য ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে চরকার ব্যবহার করা হয়। পরবর্তীতে ভারতীয় পতাকায় ব্যবহার হয় চরকার ছবি।

Please Share This Post in Your Social Media


© All rights reserved ©  jamunanewsbd.com