সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:৩৭ পূর্বাহ্ন

সুইস ব্যাংকে অর্থ সঞ্চয় কমছে, মুদ্রাপাচার কমেনি

সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশীদের জমানো টাকার পরিমাণ সামান্য কমেছে। তবে মুদ্রা পাচার আগের তুলনায় আরো বেড়েছে। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ২০২০ সালে দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশীদের জমানো অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৬ হাজার ৩০ লাখ সুইস ফ্রাঁ। বাংলাদেশে মুদ্রায় যার পরিমাণ পাঁচ হাজার ২০৩ কোটি টাকা। আগের বছর জমানো অর্থের পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশীদের জমানো অর্থের পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছিল ২০১৬ সালে, যার পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা। বর্তমান সরকার যখন ক্ষমতাসীন হয় সেই ২০০৯ সালে সুইস ব্যাংকে মোট জমানো টাকার পরিমাণ ছিল এক হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিগত ১২ বছরে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশীদের টাকা জমানোর পরিমাণ বেড়েছে প্রায় পাঁচগুণ।

সুইস ব্যাংকে জমানো সব টাকাই যে অবৈধ পথে উপার্জিত তা নয়। এর মধ্যে কিছু টাকা আছে বৈধভাবে উপার্জিত কিন্তু নানা কারণেই সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকসমূহে তা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তবে বেশির ভাগ অর্থই অবৈধ পথে উপার্জিত। বিশ^ব্যাপী অবৈধ অর্থ উপার্জনকারীদের নিরাপদ সংরক্ষণাগার হচ্ছে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংক। সুইস সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক এতদিন তাদের ব্যাংকিং সেক্টরে জমাকৃত বিদেশীদের অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করত না। ফলে অবৈধ অর্থ উপার্জনকারীরা সে দেশের ব্যাংকে অর্থ জমা রেখে নিরাপদ বোধ করতেন। কিন্তু এখন তারা প্রতি বছরই বিদেশী আমানতকারীদের অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করে থাকে। এখন আর অবৈধ অর্থ পাচারকারীদের গোপনীয়তা রক্ষিত হচ্ছে না। গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটি (জিএফআই) তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ৫৯০ কোটি মার্কিন ডলার সমতুল্য ৪৯ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা পাচার হয়। ২০১৪ সালে মোট ৯১১ কোটি মার্কিন ডলার সমতুল্য সাড়ে ৭৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়।

সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশীদের অর্থ জমার পরিমাণ সংক্রান্ত যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে বাংলাদেশীদের জমানো অর্থের পরিমাণ সামান্য হলেও কমেছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, অবৈধ অর্থের মালিকরা টাকা পাচার কমিয়ে দিয়েছে। এখনো পৃথিবীর অনেক দেশ আছে যেখানে অর্থ নিয়ে গেলে সেই অর্থ উপার্জনের বৈধতা বা সূত্র জানতে চাওয়া হয় না। কিছু কিছু দেশ আছে যারা নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের দেশে অর্থ নিয়ে যাওয়ার জন্য বিদেশীদের উদ্বুদ্ধ করে। যেমন মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ নামে একটি প্রকল্প আছে যেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে মালয়েশিয়ার নাগরিকত্ব দেয়া হয়। অনেকেই তাদের অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাচ্ছে। তারা মূলত মালয়েশিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়ার আশায় সে দেশে অর্থ নিয়ে যায়। বাংলাদেশী নাগরিকরা এখন আর ঝুঁকি নিয়ে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে টাকা জমানোর চেষ্টা খুব একটা করছে না। বরং তারা অন্যান্য দেশে মুদ্রা পাচার করে নিয়ে তা সংরক্ষণ করছে।

মুদ্রা পাচার যেকোনো দেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই কঠোর হস্তে এটা দমন করা প্রয়োজন। অনেকেই বলে থাকেন, কালো টাকা সাদা না করতে দিলে দেশের মূল্যবান অর্থ বিদেশে পাচার হবেই। এই ধারণা যে মোটেও ঠিক নয় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ বিগত প্রতিটি সরকারই কোনো না কোনোভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু তাতে খুব বেশি মানুষ তাদের অবৈধ অর্থ বৈধ করেনি। কালো টাকা সাদা করা বা অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করার সুযোগ দানের মধ্যে কোনো সমাধান নেই। এটা বরং অসৎভাবে অর্থ উপার্জনের চর্চাকেই চাঙ্গা করছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, দেশে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হলেই অর্থ পাচার বন্ধ হবে। এটা মোটেও গ্রহণযোগ্য কোনো বক্তব্য হতে পারে না। বিনিয়োগ পরিবেশের উপর অর্থ পাচার নির্ভর করে না। তবে অর্থমন্ত্রী প্রকারান্তরে একটি বিষয় স্বীকার করেছেন, তা হলোÑ দেশে কার্যকর বিনিয়োগ পরিবেশ বিদ্যমান নেই। বিনিয়োগ পরিবেশ কেন নেই তা তো সরকারেরই জানার কথা।

মানুষ স্থানীয়ভাবে বিনিয়োগ করতে না পারার কারণেই মুদ্রা পাচার করে তা নয়, এর মূলে অন্য কারণ রয়েছে। বিনিয়োগের পরিবেশ নেই তা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। বিশ^ব্যাংকের বিজনেস ডুয়িং সূচকে বছর দুই আগে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৬তম। বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা) কর্তৃপক্ষ বলেছিল, তারা দুই বছরের মধ্যে এই সূচক দুইয়ের ঘরে নামিয়ে আনবে। এ জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু কিছু দিন আগে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেছেন, এ সূচক দুই অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনা সম্ভব নয়। এ জন্য আরো সময় প্রয়োজন। এ ছাড়া দুর্নীতি রোধ করা না গেলে এই সূচকে খুব একটা অগ্রগতি হবে না। কিন্তু তারা যখন বলেছিল- দুই বছরের মধ্যে এই সূচক ডাবল ডিজিটে নামিয়ে আনা হবে তখন অনেকেই আশান্বিত হয়েছিলেন। মানুষকে আশান্বিত করার পর আশাহত করল কিন্তু তাদের কোনো জবাবদিহি করতে হলো না।

দেশের অর্থনীতি যখন মারাত্মকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে তখন মুদ্রা পাচারের মতো অপকর্মগুলো বেশি ঘটতে থাকে। মানুষ সাধারণত তার বৈধভাবে উপার্জিত অর্থ দেশের বাইরে পাচার করে না। অনৈতিক উপায়ে উপার্জিত অর্থই বিদেশে পাচার করে। কাজেই মুদ্রা পাচার রোধ করতে হলে প্রথমেই দেশের অভ্যন্তরে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের সব রাস্তা বন্ধ করতে হবে। এটা ঠিক, দুর্নীতি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা যাবে না। তবে নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দুর্নীতির সীমা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা যেতে পারে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, কারা মুদ্রা পাচার করে তার তথ্য সরকারের কাছে নেই। তালিকা দিলে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। এই তালিকা কে দেবে? তালিকা প্রণয়নের দায়িত্ব কার? অর্থ মন্ত্রণালয়, যারা দেশের অর্থনীতির দেখভাল করেন তারাই যদি মুদ্রা পাচারকারীদের তথ্য দিতে না পারেন তাহলে অন্যেরা কিভাবে তা দেবে?

দুর্নীতি বন্ধ করার পরিবর্তে যদি দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ অবাধে ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হয় সেটা হবে দুর্নীতিবাজদের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ। সরকার কোন পথ বেছে নেবে সেটা তাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে সাধারণ মানুষ চায় না যে, দেশ থেকে মূল্যবান অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাক। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, ২০০১ সালে প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) বার্ষিক প্রতিবেদনে দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশকে সবার শীর্ষে স্থান দিয়েছিল। সেই সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। পরবর্তীতে আরো চার বছর বাংলাদেশ দুর্নীতিতে শীর্ষস্থান দখল করে। এ নিয়ে অনেক ধরনের সমালোচনা করা হয়। কিন্তু সমালোচকরা একবারও ভেবে দেখে না যে, একটি দেশ হঠাৎ করেই দুর্নীতিতে বিশ^চ্যাম্পিয়ন হয় না। অনেক দিনের জমে থাকা দুর্নীতিই এক সময় দেশটিকে শীর্ষ স্থানে নিয়ে যায়। আর টিআই ২০০১ সালে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল তাতে ২০০০ সালের চিত্রই প্রতিফলিত হয়েছে। কাজেই সেই সময় কি বিএনপি-জামায়াত জোট রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন ছিল? পরবর্তী বছরগুলোতে দুর্নীতিতে বাংলাদেশ বিশ^চ্যাম্পিয়ন না হলেও দুর্নীতি কমেছে এটা কি দাবি করা যাবে?

কুমিল্লার চান্দিনা এলাকা থেকে নির্বাচিত সরকারদলীয় সংসদ সদস্য, সাবেক ডেপুটি স্পিকার অধ্যাপক আলী আশরাফ জাতীয় সংসদে বলেছেন, বড় চোরদের দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারের কারণে ঘৃণা ও লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়। এসব বিষয়ে শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। বাজেট বাস্তবায়নে দক্ষতা না বাড়লে দুর্নীতি বন্ধ করা না গেলে বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন। তারপরও দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ম্য কমছে না বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে।
সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে এভাবে মুদ্রা পাচার চলতে থাকবে, নাকি তা বন্ধ করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে? দেশের সাধারণ মানুষ মুদ্রা পাচারের মতো জঘন্য অপরাধ মেনে নিতে পারছে না। তারা মুদ্রা পাচার বন্ধে সরকারের দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চায়।

লেখক : এম এ খালেক ,অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

Please Share This Post in Your Social Media


© All rights reserved ©  jamunanewsbd.com