বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০২:১০ পূর্বাহ্ন

সংবাদপত্রের ইতিহাসের এক মুকুট মনির অজানা কথা

ছবির মানুষটির নাম মজির উদ্দীন আহমেদ। বগুড়ার সাংবাদিকদের কাছে তিনি বগুড়া প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে পরিচিত। বগুড়া প্রেস ক্লাবের দেয়ালে তাঁর ছবি প্রদর্শিত হয়ে আসছে।
১৯৬০ সাল ছিল বগুড়া প্রেস ক্লাবের জন্য একটি ঐতিহাসিক বছর। ঐ বছর হাতে গোণা কয়েকজন সংবাদ সেবী মানুষ মিলে বগুড়ায় প্রতিষ্ঠা করেন বগুড়া প্রেস ক্লাব।
বগুড়ার সংবাদ পত্রের ইতিহাস অনুসন্ধানে দেখা যায় ১৯৪৮ সালে মজির উদ্দীন ও মোজাম পাইকারের যুগ্ম সম্পাদনায় বের হয় ” উত্তর বঙ্গ ” নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। পত্রিকাটির প্রকাশক ছিলেন তৎকালীন ”মুসলিম লীগ দলীয় নেতা আব্দুল হামিদ খান”(বগুড়া চরিত কোষ)।‌ তৎকালীন মুসলিম লীগের বগুড়ার একশ্রেণীর নেতারা সাপ্তাহিক ” উত্তরবঙ্গের” ভূমিকা পছন্দ করেন নি। সম্পাদক দু’জন তাদের কাছে চক্ষুশূল হয়ে উঠেন। আয়ুষ্কাল তাই বেশিদিন ছিলনা।
এরপর ১৯৪৯সালে মজির উদ্দীন ” নিশান ” নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। মজির উদ্দিন আহমেদ মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরোধী ছিলেন। তিনি রাজনীতিতেও একজন সফল সংগঠক ছিলেন। ১৯৫৪ সালে ঐতিহাসিক যুক্তফ্রন্টের প্রাথী হয়ে বগুড়া থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে বগুড়ায় তার বিশিষ্ট ভূমিকা ছিল। সংগ্ৰামী এই মানুষটি সেদিন তার বন্ধু ও ভাই সমতুল্য ক’জন সংবাদপত্র সেবীকে নিয়ে গঠন করেন ”বগুড়া প্রেস ক্লাব”।
উত্তর জনপদের প্রাচীনতম এই প্রেস ক্লাবের সদস্য হতে পেরে আমি গর্বিত। আরো গর্বিত যে তার প্রতিষ্ঠিতা ঐতিহাসিক চরিত্র মজির উদ্দীন আহমেদের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। তা ১৯৭২ সালের কথা সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে তখন চারিদিকে পূর্ণবাসন তৎপরতা। আমাদের মহল্লার যুব সমাজ ও মুরুব্বি অভিভাবক কেউ পিছিয়ে নেই। সংগঠনের মাধ্যমে সুষ্ঠু ভাবে করার জন্য সকলের মতামত নিয়ে গঠন করা হলো ” মুক্তি সংসদ” নামে একটি সামাজিক সংগঠন। রিলিফ অপারেশনের পাশাপাশি সাহিত্য সংস্কৃতি কর্মকান্ডও হাতে নেওয়া হয়। আমাদের ”মুক্তি সংসদ”থেকে একটি সাহিত্য সংকলন প্রকাশ করার উদ্যোগ নেয়া হয়। লেখা সংগ্ৰহ করে কোন প্রেসে যাওয়া হবে ? এই প্রশ্নে সহকর্মী ও মুরুব্বিদের মতামত নিয়ে ঠিক হলো বাড়ির কাছে নামাজগড় মজির মিয়ার প্রেসে যাওয়া হবে। একদিন সকালে গল্প,কবিতা,ছড়া, কৌতুক, ধাঁধা ইত্যাদি লেখা নিয়ে উপস্থিত হলাম ঐ প্রেসে। আমাদের কাঙ্খিত মানুষটি প্রেসেই বসে ছিলেন। তখন তার বয়স ছিল ৭৫এর উপর। তাকে আমাদের সংকলন ছাপানোর কথা বলতেই তিনি জানতে চাইলেন, ডিসি অফিস থেকে সংকলন প্রকাশ করার অনুমতি নিয়েছি কি না?
আমাদের বড় ভাই কবি শহীদুল্লাহ (মন্টু ভাই), মনোজ দাদার কাছ থেকে আগেই শুনেছিলাম, প্রেস থেকে ঐ রকম প্রশ্ন করা হলে কী উত্তর দেওয়া হবে। আমি সেই মতে তাকে বললাম , সংগঠন বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সংকলন প্রকাশের জন্য ডিসির পারমিশন লাগেনা। কথাটা তিনি জানতেন না তা নয়। তিনি আমাদের টোকা দিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন আমরা ভরকে যাই কী না। তারপর তিনি আমার কাছ থেকে লেখাগুলো নিলেন। কয় ফরমা হতে পারে তার একটা ধারনা দিলেন। বললেন, ছাপানোর সংখ্যার উপর কাগজের দাম ও ছাপা খরচ খরচ পড়বে। যতদূর মনে পড়ে সেই সংকলনটি ডিমাই সাইজ কাগজের তিন ফরমা ছিল।
নাম ছিল ”দিশারী’,’ সম্পাদক ছিলাম আমি নিজে।
আমার জীবনের প্রথম একটি সংকলনের কাজ যার হাত দিয়ে সুসম্পন্ন করার সুযোগ হয়েছিল সে দিন কিন্তু আমার জানা ছিলনা তিনি বগুড়া প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা। তা জানছি অনেক বছর পর। জানার পর তার প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে পড়ে। অনেক দিনের বাসনা ছিল বগুড়ার রাজনৈতিক ও সাংবাদিক অঙ্গনের মুকুটমনি মজির উদ্দীন আহমেদের উপর দুটি কথা লিখব। আজ আল্লাহ পাক আমাকে সেই সুযোগ দিলেন। আমি তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। দোয়া করি আল্লাহ তার এই নেক বান্দার কোনো একটি নেক আমলের বদৌলতে জান্নাতবাসী করুন।আমিন।
লেখকঃ আব্দুর রহিম বগরা, সাংবাদিক ও গবেষক

Please Share This Post in Your Social Media


© All rights reserved ©  jamunanewsbd.com