বুধবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২১, ০৫:৪৮ পূর্বাহ্ন

পোল্ট্রি শিল্প ধ্বংসের কারণ ও প্রতিকার

দেশের ১৮ কোটি মানুষের প্রোটিনের চাহিদা মেটানোয় পোল্ট্রি শিল্প বেশ গুরুত্ব বহন করে আসছে। তাছাড়া বেকার সমস্যা দূরীকরণেও এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা অনস্বীকার্য। আমাদের দেশে পোল্ট্রি শিল্প আশির দশকে শুরু হলেও মূলত ২০০০ সালের পর থেকে এর বিস্তার লাভ করে। বর্তমানে এই শিল্পে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রায় দেড় কোটি লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে।

এই শিল্প ধ্বংস হওয়ার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে চাহিদার তুলনায় অধিক উৎপাদন, পোল্ট্রি চাষে বিদেশী কো¤পানির অনুপ্রবেশ, শুধু রান্নার মাংস হিসেবে ব্যবহার করা, বিদেশে রফতানি না করা, উৎপাদিত মুরগির সরকার কর্তৃক নির্ধারিত মূল্য না থাকা ও রোগ নির্ণয়ের জন্য ডাক্তার-ল্যাবরেটরি না থাকা। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে করোনার প্রভাব, মুরগির মাংসের উপকারিতা সম্পর্কে ভোক্তার ধারণা না থাকা, মুরগির খাদ্য, ওষুধ-ভ্যাকসিন, অন্যান্য উপকরণের অধিক মূল্য বৃদ্ধি এবং বাচ্চা উৎপাদনকারী হ্যাচারি কৃষিভিত্তিক হলেও ব্যাংক ঋণের লভ্যাংশ ও বিদ্যুত বিল বাণিজ্যিক হারে নেয়ার কারণে পোল্ট্রি শিল্প আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

প্রোটিনের উৎস হিসেবে উন্নত বিশ্বে যেমন কানাডা, জাপান, আমেরিকা বছরে একজন মানুষ গড়ে মাংস খায় প্রায় ৪২ থেকে ৪৪ কেজি, মালয়েশিয়ায় প্রতিজন গড়ে বছরে মুরগির মাংস খাচ্ছে ৪০ কেজি, সেখানে আমাদের দেশে প্রতিজন মুরগির মাংস খায় বছরে মাত্র ৪ থেকে ৫ কেজি। বর্তমানে বাংলাদেশের ব্রয়লার এবং লেয়ার বাচ্চা উৎপাদনকারী হ্যাচারির সংখ্যা প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি। আমাদের দেশে শুধু ব্রয়লার বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ পিস, যা দিয়ে মাংস উৎপাদন হচ্ছে প্রায় তিন হাজার টন। কিন্তু প্রতিদিন চাহিদা আছে মাত্র দুই হাজার টন। বর্তমানে প্রতিদিন উৎপাদন বেশি হচ্ছে প্রায় এক হাজার টন। এ কারণেই উৎপাদনকারীরা দীর্ঘদিন ধরে ব্রয়লার মুরগির দাম পাচ্ছে না।

উন্নত দেশের মানুষ আমাদের দেশের তুলনায় মুরগির মাংস খায় ৮ থেকে ৯ গুণ বেশি, ডিম খায় ৭ থেকে ৮ গুণ বেশি। দেশে মুরগির মাংস এবং ডিমের চাহিদা এত কম থাকা সত্তে¡ও ভ্রান্তনীতির কারণে ইতোমধ্যে বিদেশী কোম্পানিগুলো দেশে প্রবেশ করে পোল্ট্রি শিল্প ধ্বংস করার জন্য জোরেশোরে ব্রয়লার বাচ্চা, ডিম ও কমার্শিয়াল মুরগি উৎপাদন শুরু করেছে। বিদেশী এই সমস্ত কোম্পানি প্রতিদিন বাচ্চা উৎপাদন করছে প্রায় ৬ লাখ পিস।

বর্তমানে ব্রয়লার বাচ্চা উৎপাদন খরচ প্রায় ৩২ টাকা থেকে ৩৩ টাকা হলেও বিদেশী আগ্রাসন এবং অধিক উৎপাদনের কারণে গত প্রায় ৪ বছরের বেশি সময় ধরে (১ জুলাই ২০১৭ থেকে এই পর্যন্ত) ব্রয়লার বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০ থেকে ২০ টাকার মধ্যে। এই বিরাট লোকসানের কারণে কিছু হ্যাচারি ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, বাকিগুলো বন্ধ হওয়ার পথে। অনুসন্ধানে মুরগির মাংস না খাওয়ার কারণ সম্বন্ধে জানা যায়, কোন এক প্রচার মাধ্যমের অপপ্রচারের জন্য মুরগির মাংস না খাওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। মুরগির খাদ্য তথাকথিত ট্যানারি বর্জ্যদ্রব্য দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। এ কারণে পোল্ট্রি মুরগি মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। আসলে বিষয়টি কতটুকু সত্য এটা বিচার-বিবেচনায় আনা হয়নি। এক সময় হয়ত কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ট্যানারি বর্জ্য ব্যবহার করে থাকতে পারে, তার মানে এই নয় যে, তার ধারাবাহিকতা এখনও চলে আসছে। তবে সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চয়ই এই অসাধু ব্যবসায়ীদের আর এগোতে দেবে না এটাই আমাদের বিশ্বাস। দেশে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ পিস মুরগি উৎপাদন হলেও রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বা ল্যাবরেটরি নেই।

মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বুদ্ধির বিকাশ ঘটাতে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য মুরগির মাংসের মাধ্যমে প্রোটিনের অভাব দূর করা সম্ভব। চাহিদামতো মুরগির মাংস খেলে প্রোটিনের অভাব পূরণের মাধ্যমে নিউরোট্রান্সমিটার সঠিকভাবে কাজ করবে। এতে মানুষের বুদ্ধির বিকাশ ঘটবে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে, কাজের স্পৃহা বৃদ্ধি পাবে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

গত ২০ বছরে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে মুরগির খাবার, ভ্যাকসিন, ওষুধ, সরঞ্জামাদির দাম বর্তমানে ৭ থেকে ১০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া জনশক্তির মূল্য বেড়েছে ৫ থেকে ৭ গুণ। কিন্তু দুঃখের বিষয় গত ২০ বছরে মুরগির চাহিদা না বাড়ায় দামের তেমন কোন পরিবর্তনই হয়নি। মৃতপ্রায় পোল্ট্রি শিল্প রক্ষার্থে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে (প্রাণিসম্পদ) অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত পোল্ট্রি শিল্পকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। বিদেশী যে সমস্ত বড় বড় মুরগির ফার্ম আমাদের দেশে জেঁকে বসেছে সেগুলোকে বন্ধ করতে হবে। দেশের বড় বড় বাচ্চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, হ্যাচারিগুলোকে অবশ্যই শৃঙ্খলার মধ্য থেকে চাহিদা অনুযায়ী বাচ্চা উৎপাদন করতে হবে অথবা উৎপাদনের সঙ্গে মিল রেখে মুরগির মাংস বিদেশে রফতানি করতে হবে। হ্যাচারির উৎপাদিত ব্রয়লার বাচ্চার মূল্য প্রতি পিস কমপক্ষে ৪০ থেকে ৫০ টাকা ও উৎপাদিত মুরগির দাম কমপক্ষে ২০০ টাকা প্রতি কেজি নির্ধারণ করতে হবে। দেশের মানুষের মুরগির মাংস খাওয়ার উপকারিতা সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টির লক্ষ্যে পাঠ্যপুস্তক, সংবাদপত্র, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় জোর প্রচার করতে হবে। শুধু রান্না করে খাওয়া নয়, উন্নত দেশের মতো বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে মুরগির মাংস সংযুক্ত করে দেশে-বিদেশে রফতানি করতে হবে।

দেশের বেকার সমস্যা দূরীকরণে পোল্ট্রি শিল্প বিরাট ভ‚মিকা রাখতে পারে। নিয়মতান্ত্রিকভাবে উৎপাদন বৃদ্ধি করে বিদেশে রফতানি করলে এই শিল্প প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে অনেকাংশে বেকার সমস্যা দূর করাসহ প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। এছাড়া মুরগির বিষ্ঠা জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করে ফসলের ফলন বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদেশ থেকে রাসায়নিক সার আমদানি অনেকাংশ কমানো সম্ভব। কাজেই এ শিল্পকে অবহেলার চোখে না দেখে এখনই সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সুপরিকল্পিতভাবে পোল্ট্রিনীতি বাস্তবায়ন হলে মৃতপ্রায় এই শিল্পকে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব। এতে বেকার সমস্যা দূর হবার সঙ্গে সঙ্গে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।

লেখক : এম এ কাদের ,সাংবাদিক

Please Share This Post in Your Social Media


© All rights reserved ©  jamunanewsbd.com