মঙ্গলবার, ০৩ অগাস্ট ২০২১, ০২:২৫ অপরাহ্ন

রাণীনগরের কাশিমপুর রাজবাড়ি

রাণীনগর (নওগাঁ) প্রতিনিধিঃ  নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার একমাত্র ঐতিহাসিক স্থান কাশিমপুর রাজবাড়ি। দখল দূষণ আর যত্রতত্র বসতবাড়ি গড়ে ওঠায় সময়ের বিবর্তনে রাষ্ট্রীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এই জমিদার বাড়িটি এখন ধ্বংসের শেষ প্রান্তেÍ রয়েছে। রাজবাড়ির জমির একটি অংশে কাশিমপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহার করা হলেও তাদের নজরদারির অভাবে স্থানীয় প্রভাবশালীরা এখন দখল করে নিয়েছে।
অনেকে জায়গা দখল করে গরু রাখার গোয়ালঘর হিসেবে ব্যবহার করছে। সব মিলে ঐতিহাসিক স্থানটি এখন দিন দিন বিরান ভূমি আর দখল দারিত্বের রাজ্যে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু সরকারি এই বিশাল সম্পত্তি রক্ষায় কার্যকরি ভূমিকা নিয়ে সৌন্দর্য বর্ধণের কাজ করে একটি মিনি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কয়েকবার উদ্যোগ নিলেও নানান জটিলতার কারণে সামনে এগুতে পারেননি তিনি। অবৈধ দখলবাজদের কবলেই এখন কাশিমপুর রাজবাড়ির বিশাল সম্পত্তি।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে নওগাঁর ছোট যমুনা নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক কাশিমপুর রাজবাড়ি। এই রাজ পরিবারের অনেক সদস্যই কিছুটা মেজাজি হওয়ার কারণে রাজত্ব চলাকালিন এই বাড়িটিকে পাগলা রাজার বাড়ি বলে খ্যাতি ছিল। বর্তমানে রাজবাড়িরর শেষ অংশটুকু গরুর গোয়ালঘর হিসেবে ব্যবহার করায় নূন্যতম নিদর্শনও আজ শেষের পথে। দুটি মন্দিরের কিছু অংশ এখনো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাজবাড়ির মূল ভবনের সামনের চারটি গম্বুজ, উত্তর পাশে হাওয়াখানা ও পশ্চিম পাশে একটি দূর্গা মন্দির ছিল। প্রতিনিয়ত মন্দিরে পূজা ও সন্ধ্যায় জ্বালানো হতো প্রদীপ, শোনা যেত শঙ্খ’র উলুধ্বনি। মন্দিরের পাশে ছিল বৈঠকখানা, পুকুর ও নদীর ধারে একটি কাঁচের ঘরের তৈরি বালিকা বিদ্যালয়।
স্থানীয় প্রবীণরা বলছেন, কাশিমপুরের পাগলা রাজা নাটোরের রাজার বংশধর। শ্রী অন্নদা প্রসন্ন লাহিড়ী বাহাদুর ছিলেন এই রাজত্বের শেষ রাজা। তার চার ছেলে ও এক মেয়ে ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর কাশিমপুর রাজবংশের সব সদস্য রাজত্ব ছেড়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে চলে যান। শুধু ছোট রাজা শ্রী শক্তি প্রসন্ন লাহিড়ী বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত এই রাজবাড়িতে বাস করতেন। সময়ের বিবর্তনে সে পরিস্থিতি বুঝে সবার অজান্তে কাশিমপুর রাজবাড়ির ঘর-দরজা, অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও অঢেল সম্পদ রেখে সেও ভারতে চলে যায়। এই রাজবাড়িটির শুধুমাত্র আবাসিক এলাকা ছিল ২ একর ১৯ শতাংশ। এই রাজবাড়িটির নিদর্শনসমূহ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে সকল কারুকার্য আজ ধ্বংসের শেষ প্রান্তে। এলাবাসীর দাবি, দখলবাজদের কাছ থেকে জমি উদ্ধার করে এখানে একটি মিনি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হোক।
কাশিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মকলেছুর রহমান বাবু বলেন, স্বাধীনতার পর কাশিমপুর রাজার বংশধররা কয়েক দফায় সবাই এই রাজত্ব ছেড়ে ভারতে চলে যায়। তারা চলে যাওয়ায় স্থানীয় কিছু ব্যক্তি রাজার এই বিশাল সম্পত্তি দখলে নেয়। এক সময় বিভিন্ন কায়দায় উপজেলা ভূমি অফিস থেকে লিজ নেওয়ার কথা আমি শুনেছি। সরকারি উদ্যোগে রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন করলে এখানেও গড়ে উঠতে পারে ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য দর্শনীয় স্থান।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুশান্ত কুমার মাহাতো বলেন, স্থানীয়ভাবে ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো রক্ষা করা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। তবে সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এসব নির্দশনগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়িত্ব পালন করে থাকে। আমি রাজবাড়ির অবশিষ্ট এই নির্দশনকে রক্ষা করার জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানাবো। আর নতুন করে কাউকে জায়গা লিজ দেওয়া হবে না। যে সব জায়গা লিজ দেওয়া আছে, তা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবো। এই কাজটি করার জন্য আমি সবার সার্বিক সহযোগিতা কামনা করছি। কারণ আমাদের ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে আমাদেরকেই রক্ষা করতে হবে।

Please Share This Post in Your Social Media


© All rights reserved ©  jamunanewsbd.com