সোমবার, ২১ Jun ২০২১, ০৯:২৭ অপরাহ্ন

কালের সাক্ষি ফরিদপুরের মথুরাপুর দেউল

যমুনা নিউজ বিডিঃ ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার গাজনা ইউনিয়নের মথুরাপুর গ্রামে অবস্থিত মথুরাপুর দেউল। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের মধুখালী বাজার থেকে মধুখালী-রাজবাড়ী ফিডার সড়কের দেড় কিলোমিটার উত্তরে এবং মধুখালী-বালিয়াকান্দি আঞ্চলিক সড়কে মধুখালী সদর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে গাজনা ইউনিয়নে সড়কের পশ্চিম দিকে অবস্থিত। এর বিপরীত দিক দিয়ে বয়ে গেছে চন্দনা নদী।
মথুরাপুরের এই ঐতিহাসিক দেউলকে ঘিরে স্থানীয় অধিবাসীদের নিকট হতে জানা যায় অনেক তথ্য। মথুরাপুর গ্রামের সন্তান বর্তমানে একটি পাটকলের কর্মকর্তা মোঃ সেলিমুজ্জামান এই দেউলটি সম্পর্কে বলেন, দেউলটিতে অনেক নকশা ও মুর্তি অঙ্কিত রয়েছে। সেখানে লক্ষনের তৈরি মুর্তিও রয়েছে। সেই থেকে অনেকের ধারণা এটি পাল বংশের আমলের। তবে প্রচলিত আরেকটি কথাও রয়েছে যে রাজা মথুরা নামে একজন রাজা ছিলেন যিনি এটি তৈরি করেন। তবে রাজা মথুরার ব্যাপারে আর কিছুই জানা নেই। আবার এটি মোঘল আমলে যুদ্ধক্ষেত্রের ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে তৈরি করা হয়েছিলো বলেও অনেকে মনে করেন।
সেলিমুজ্জামান বলেন, আমরা ছোটবেলায় দেখেছি সেখানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পুজা করতেন। এছাড়া সেখানে মেলাও হতো। তবে এখন আর এসব হয়না। তার মতে এই দেউলটি দেশের প্রাচীণ স্থাপনার একটি অনন্য কীর্তি। এটিকে কেন্দ্র করে এখানে পর্যটনভিত্তিক শিল্প গড়ে ওঠা সম্ভব।
মথুরাপুর দেউলের লাগোয়া উত্তরদিকের প্রতিবেশী ফরিদপুর চিনিকল শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা রায়হান শিকদার বলেন, ছোটবেলায় দেখেছি দেউলে একটি ছোট সাইনবোর্ড ছিলো। সেখানে উল্লেখ ছিলো যে এটি মোঘল সা¤্রাজ্যের আগে সেনাপতি মানসিংহের স্মৃতিস্তম্ভ। সেটি এখন নেই। বর্তমানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে একটি বড় সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। সেখানে এর ঐতিহাসিক বিবরণ লেখা রয়েছে।

দেশবরেণ্য অনেক লোক এটি দেখতে এসেছেন। এখনও আসেন অনেকে। দেশে এমন স্থাপনা আরো দু’টি স্থানে থাকলেও এটিই সেরা। এজন্য এই স্থাপনাটিকে ঘিরে সরকার আরো উন্নয়নমুলক কাজ হাতে নিতে পারে। এতে এই স্থানটি একটি অন্যতম পর্যটন স্থান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে বলে রায়হান শিকদার মনে করেন।
তিনি জানান, অনেকে এই দেউরটিকে একটি গায়েবী স্থাপনা বলার চেষ্টা করে তবে প্রকৃত অর্থে এটি একটি স্মৃতিস্তম্ভ। এই দেউলটি প্রতিদিন অনেক পর্যটক দেখতে আসেন। তবে এখানে আসা দর্শণার্থীরা দীর্ঘসময় কাটাতে এসে বিপাকে পরেন। এখানে কোন টয়লেট নেই। বাধ্য হয়ে আমাদের বাড়িতেই তারা ধর্ণা দেন। এজন্য আমরা প্রতিনিয়ত একটি বিড়ম্বনায় পরি। এখানে কোন শেড বা ছাউনিও নেই। বৃষ্টি এলে দর্শনার্থীদের দাড়ানোর কোন জায়গা থাকেনা। গাড়ি পার্কিংয়েরও কোন ব্যবস্থা নেই। একজন কেয়ারটেকার রয়েছেন। কিন্তু দেউলের পেছনে অনেকে এসে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়। এনিয়ে ঝামেলাও বাঁধে।
রায়হান শিকদার বলেন, শত শত বছরের প্রাচীণ এই দেউলটি দীর্ঘকাল অযতেœ অবহেলায় পড়ে থাকলেও এর গায়ে কোনদিন শ্যাওলা পড়েনি। কিন্তু ২০০০ সালে যেই সংস্কার কাজ করা হয়েছে সেগুলো নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে। তিনি জানান, দেউলের সাথেই অনেক পুরনো একটি কালিমন্দির ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের পরপর মন্দিরটি ভেঙে যায়। সেটি আর সংস্কার করা হয়নি।
উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুসারে, সংগ্রাম সিং নামক বাংলার এক সেনাপতি এটি নির্মাণ করেছিলেন। ১৬৩৬ সালে ভূষণার বিখ্যাত জমিদার সত্রাজিতের মৃত্যুর পর সংগ্রাম সিংকে এলাকার রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেয়া হয় এবং তৎকালীন শাসকের ছত্রছায়ায় তিনি বেশ ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন। এলাকার রীতি অনুসারে তিনি কাপাস্তি গ্রামের এক বৈদ্য পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করেন এবং মথুরাপুর বসবাস শুরু করেন। অন্য এক সূত্র মতে, স¤্রাট আকবরের বিখ্যাত সেনাপতি মানসিং রাজা প্রতাপাদিত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের স্মারক হিসেবে এই দেউল নির্মাণ করেছিলেন। সে অনুযায়ী, মথুরাপুর দেউল একটি বিজয়স্তম্ভ। তবে সূত্রটির সত্যতা নিরূপণ সম্ভব হয়নি।
এই দেউলটি বারোকোন বিশিষ্ট এবং মাটি থেকে প্রায় ২১.২ মিটার উঁচু; যার ভিতর একটি ছোট কক্ষ রয়েছে। এটি তৎকালীন ভবনগুলোর মধ্যে একমাত্র বারো কোণবিশিষ্ট কাঠামো। বারোটি কোণ থাকায় ওপর থেকে দেখলে এটিকে তারার মতো দেখা যায়। এর দুইটি প্রবেশপথ আছে একটি দক্ষিণমুখী, অন্যটি পশ্চিম মুখী। দেউলটির উচ্চতা ৮০ ফুট। স্থাপনাটির মূল গঠন উপাদান চুন-সুরকির মিশ্রণ। দেউলের বাইরের দেয়ালটি লম্বালম্বিভাবে সজ্জিত, যা আলোছায়ার সংমিশ্রণে এক দৃষ্টিনন্দন অনুভূতির সৃষ্টি করে। পুরো স্থাপনায় টেরাকোটার জ্যামিতিক ও বাহারি চিত্রাঙ্কন রয়েছে। তবে দেউলটির কোথাও কোনো লেখা পাওয়া যায়নি। বাংলার ইতিহাসে এর নির্মাণশৈলী অনন্য বৈশিষ্ট্য বহন করে। এটি প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর ও বাংলাদেশ সরকারের একটি সম্পদ।

Please Share This Post in Your Social Media


© All rights reserved ©  jamunanewsbd.com