বুধবার, ২৩ Jun ২০২১, ১২:০২ অপরাহ্ন

বগুড়ায় গরম বাতাসে ৫০০ বিঘা ধানের ক্ষতি

যমুনা নিউজ বিডিঃ মাত্রাতিরিক্ত গরম বাতাস আর ঝড়ের কারণে বগুড়ায় অন্তত ৪৯৪ বিঘা জমির ধানে পরাগায়নে সমস্যা হয়েছে। এতে এসব জমির ধানে অন্তত ৪৫ শতাংশ চিটা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষকদের অন্তত ৩১ লাখ টাকার লোকসানে পড়তে হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবার জেলার ১২ টি উপজেলায় বোরো ধানের চাষ হয়েছে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬১৫ হেক্টর জমি। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লক্ষ্য ৬২ হাজার মেট্রিক টন। এবার বোরা ধান রোপন করার পর থেকে আবহাওয়া ভালো ছিল। কিন্তু গত ৪ এপ্রিল বিকেলে কাল বৈশাখী ঝড়েরর সাথে গরম বাতাস হওয়ার কারণে ধানের রেনুর পরাগায়নে সমস্যা হয়েছে। কৃষি দপ্তরের ৯ এপ্রিলের হিসাবে জেলায় অন্তত ৮০ হেক্টর জমির ধার অন্তত ৪৫ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর মধ্যে সারিয়াকান্দি উপজেলায় ৫০ হেক্টর, ধুনটে ৭৫ হেক্টর, সোনাতলায় ৪৫ বিঘার ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাকী ধানের ক্ষতি হয়েছে নন্দীগ্রাম ও গাবতলী উপজেলায়। তবে এই দুই উপজেলায় ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বোরো ধানের শীষ বের হওয়ার আগে তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড থাকতে হয়। তাহলে পরাগায়ন ভালো হয়। ধানের ফলনও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু গত ৪ এপ্রিলের ঝড়ে বৃষ্টির চেয়ে বাতাসের পরিমাণ বেশি ছিল। বাতাস ছিল ৩৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের চেয়ে বেশি। এ কারণে ধানের রেনুর পরাগায়নে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। পরাগায়ন না ঘটে শীষে এখন ধানগুলো একদম সাদা অথবা কালো হয়ে গেছে। এসব ধানের মধ্যে কোনো দানা নেই। সবগুলো চিটায় পরিণত হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গমর বাতাসে ক্ষতির ফলে ধানের ফলন অন্তত ৪৫ শতাংশ কমে যাবে।

সাধারণত বোরো ধান প্রতি বিঘায় গড়ে ২০ মণ করে ফলন হয়। গরম বাতাস ও ঝড়ের কারণে সেই ফলন এবার ক্ষতিগ্রস্ত প্রতি বিঘায় ১০ থেকে ১১ মণ করে হবে। ৫৪ শতাংশ চিটা হলে বিঘাপ্রতি ৯ মণ করে ধানের উৎপাদন কমে যাবে। এ হিসাবে জেলায় ৪৯৪ বিঘায় মোট ৪ হাজার ৪৪৬ মণ ধান কম উৎপাদন হবে। মৌসুমে এই ধান বিক্রি হয় সাধারণত গড়ে ৭০০ টাকা মণ করে। এ হিসেবে এই ধানের বাজার মূল্য দাড়ায় ৩১ লাখ ১২ হাজার ২২০ টাকা। এই ক্ষতি হবে পুরোটা কৃষকের।

সারিকান্দির হাটফুলবাড়ি এলাকার ৬ বিঘা জমিতে ২৮ জাতের ধান চাষ করেছেন সাজু প্রামানিক। গমর ঝড়ো হাওয়ার প্রভাব পড়েছে তার জমিতেও। জানান, ‘এবছর ধানের উঠতি সময়ে আবহাওয়া অনেক ভালো ছিল। আশা করেছিলাম ভালো ফলন পাব। কিন্তু কদিন আগের ঝড় সর্বনাশ করে দিয়ে গেলো। এখন ধানের শীষগুলো সাদা হয়ে যাচ্ছে। এখন মনে হচ্ছে অর্ধেক ফলনও পাব না।’

একই এলাকায় চার বিঘা জমি বর্গা নিয়ে বোরো ধান চাষ করেছেন মো. ফিরোজ মিয়া। তিনি বলেন, ‘আজকে সকালে (৯ এপ্রিল) জমিতে ধান শীষ সবগুলো কালো। শীষে কোনো ধান নেই। সবগুলো চিটা। এবার যে কীভাবে সংসার চলবে তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেছি।’

পৌনে তিন বিঘা জমির ধান একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানান হাটফুলবাড়ি এলাকার হবিবর রহমান। তিনি বলেন, ‘ঝড়ের পর জমিতে ১০ আনা ধানে কোনো দানা নেই। শীষ যেগুলো বের হচ্ছে সেগুলোও মরা। ধান থেকে এবার খড় ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাবে না। আমার ৬০ বছর জীবনে এমন ক্ষতি দেখি নি।’

আরেক চাষী আবজাল মোল্লা। এক বিঘা জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেছেন তিনি। জানালেন, সম্প্রতি গরম বাতাসের ঝড় আর বালু হাওয়ার কারণে সব শেষ হয়ে গেছে। ঝড়ের দিনে পরাগায়নের জন্য যে রেনু বের হয়েছিল বা ধানের দুধ তৈরি হয়েছিল সেগুলোই নষ্ট হয়ে গেছে। অর্ধেক ধান ঘরে তোলা গেলেও আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করব।

জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল হালিম বলেন, এটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বেশ কয়েক বছর পর এই এমন অবস্থার কবলে পড়েছে কৃষি অঞ্চল। ৪ এপ্রিলের যেসব রেনু বের হয়েছিল তা থেকে ধান হওয়ার কোনো সম্ভবনা নেই। সবগুলো চিটা হবে। এমনকি পরে যেগুলো রেনু বের হবে সেগুলোতে চিনা হওয়ার সম্ভবনা বেশি। এ হিসেবে এই ঝড়ের কারণে উপজেলায় প্রায় ৩৫০ বিঘা জমিতে প্রায় ৪৫ শতাংশ ধান কম হবে।

তিনি আরও বলেন, প্রাকৃতিক এই দুযোগ থেকে বাঁচাতে আমাদের কিছু করণীয় নেই। তবে ধানের জমিতে এখন পানি রাখতে হবে। তাহলে চিটা কিছুটা কমতে পারে।

ধুনট উপজেলার কুড়িগাতি এলাকার কৃষক আরিফুল ইসলাম বলেন, এবার তাদের জমির ধান অধিকাংশ চিটা হয়ে গেছে। এতে লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন ব্যয় তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছে। আর মাত্র ২০-২২ দিন বাদেই ধান কাটা শুরু করব। এই সময় এমন ঘটনা ঘটল।

ধুনট উপজেলায় গরম বাতাসের কারণে ৭৫ বিঘা জমির ধান ৫০ শতাংশ নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ মুশিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, গত ৪ এপ্রিলে ঝড়ের সময় বাতাসের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রির উপরে থাকার কারণে ধানের পরাগায়নে সমস্যা হয়েছে। মাঠ ঘুরে দেখা গেছে উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে ৫০ শতাংশ চিটা হবে।

সোনাতলা উপজেলায় গরম বাতাসে অন্তত ৪৫ বিঘা ধান ক্ষতি হয়েছে বলে জানান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ আহমেদ। তিনি বলেন, তার উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত জমির ধানে ৪৫ শতাংশের বেশি চিটা হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা দুলাল হোসেন বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে কারও হাত নেই। এই ক্ষতির পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। আরও বাড়তে পারে। কারণ সবগুলো জমির ধানের শীষ এখনো বের হওয়া শেষ হয়নি।

Please Share This Post in Your Social Media


© All rights reserved ©  jamunanewsbd.com