সোমবার, ২১ Jun ২০২১, ০৭:৩০ পূর্বাহ্ন

পকেটে মাস্ক মুখে নেই, কালাইয়ে স্বাস্থ্য বিধির বালাই নেই

কালাই প্রতিনিধিঃ জীবন ও জীবিকার তাগিদে বিধি-নিষেধ এবং শর্ত দিয়ে সরকার খুলে দেয়েছে হাট-বাজারের দোকান, মার্কেট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। সেই সঙ্গে গণপরিবহন চলাচলও স্বাভাবিক করে দিয়েছেন। সরকারের দেয়া বিধি-নিষেধ ও শর্ত কোথাও কেউ মানছে না। করোনা মহামারীর সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে মাস্ক পড়া, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কাজ কেউ তেমন করছেন না জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার নাগরিকরা। সরকার এক পরিপত্রে সবার জন্য মাস্ক পড়া বাধ্যতামূলক করে আদেশ জারি করেলেও এ উপজেলায় বিভিন্ন কর্মস্থলে, হাট-বাজার, মার্কেট, বিপণি-বিতান, গণপরিবহন, সামাজিক অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক কর্মসূচি বা কর্মকান্ডে এবং রাস্তায় পথচারীরা এ নিয়ম নীতি মেনে তেমন চলছেনা। মাস্ক না পড়ার পেছনে নানা অজুহাত দাঁড় করাচ্ছেন অনেকেই, আবার না পড়ার কারণ জানতে চাইলে ক্ষেপে উঠছেন কেউ কেউ। মাস্ক পড়লেই কি করোনাভাইরাস ঠেকানো যাবে? মাস্ক পড়লে দম বন্ধ হয়ে আসে, মাস্ক পড়লে ঠিকমতো কথা বলা যায়না, মাস্ক পড়লে বিরক্ত লাগে- এমন নানা অজুহাতে মাস্ক ছাড়াই ঘর থেকে বের হয়ে পড়ছেন কালাই উপজেলার নাগরিকরা। ফলে এই উপজেলায় প্রতিদিনই করোনারভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশস্কা রয়েছে।

সরেজমিনে উজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এই উপজেলায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বালাই নেই। উপজেলার বিভিন্ন রাস্তাঘাটে পথচারীরারা গা ঘেঁষাঘেঁষি করে চলাচল করছেন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চায়ের দোকান ও খাবার হোটেলগুলোতে আড্ডায় জমে থাকলেও কারো মুখে থাকেনা কোন মাস্ক। দিনের বেলা কেউ মাস্ক পড়েছেন, আবার অনেকে পড়েননি, কেউ পকেটে রেখেছেন। কেউ আবার মুখ থেকে সরিয়ে থুঁতনিতে রেখে দিয়েছেন। অনেকেই এক কানে ঝুলে রেখেছেন। কখনও মুখ উন্মুক্ত করে শুধু নাকে, কখনও বা শুধু মুখে। আবার মাস্ক ব্যবহারের অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও অনেকেই একটি মাস্ক বারবার ব্যবহার করছেন। কেউ কেউ তো মাস্ক হাতেও বেঁধে রাখেছেন। আর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও সামাজিক দূরত্ব মানার কোনো চিহ্নই পাওয়া যাচ্ছেনা। উপজেলায় এ পর্যন্ত ১শ ৯৭ জন মানুষের করোনা রোগী সনাক্ত হয়েছে এবং তিন জন করোনায় মৃত্যু হলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি মোটেই তোয়াক্কা করছে না কেউ। আবার উপজেলার বিভিন্ন সড়কে বিপুল সংখ্যক ইজিবাইক, অটোরিকশা, বেটারি চালিত ভ্যান ও বাসে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে লোকজন উঠানামা করে চলাচল করছেন। বিভিন্ন হাট-বাজারের মুদি দোকানগুলোতে ভিড় করছে মানুষ। সেখানে সামাজিক দূরত্ব মানছে না কেউ। কালাই পৌরসভার ফুটপাতের মার্কেট, কাঁচাবাজার, ওষুধের দোকান ও বিপনী বিতানগুলো দোকানদাররা কোন স্বাস্থ্য বিধি মানছে না। আবার সেখানে ক্রেতারাও স্বাস্থ্যবিধি মানছেনা। যে যার মতো গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থেকে জিনিসপত্র কেনাকাটা করছে। মার্কেটের প্রবেশপথে হ্যান্ড স্যানিটাইজার এর ব্যবস্থা রাখার নির্দেশ থাকলেও তা পর্যাপ্ত নেই। প্রতিটি দোকানের সামনে হাত ধুয়ার হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখার নির্দেশ থাকলেও মানছে না দোকানিরা। মানা হচ্ছে না সামাজিক দূরত্ব, মানা হচ্ছে না সরকারের দেয়া বিধি-নিষেধ কিংবা স্বাস্থ্যবিধি। এক কথায়-এই উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার, দোকান, হোটেল ও মার্কেটগুলোতে লোকজনের সমাগম দেখে বোঝাই মুশকিল যে দেশে করোনাভাইরাস নামে ভয়াবহ কোনো সংক্রমণ ব্যাধি আছে। ফলে করোনা ঝুঁকি বাড়ছে বলে উপজেলার সচেতন মহলের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হচ্ছে।

কালাই পৌরসভার পাঁচশিরা বাজারে ফুটপাতে চায়ের দোকানগুলোতে আড্ডায় জমে আছে সবাই। সেখানে কারো মুখে মাক্স নেই। সেখানে চা পান করছেন হাবিব ও হাফিজসহ অনেকেই। তাদের কারো মুখে মাস্ক নেই। মুখে মাস্ক নেই কেন? জানতে চাইলে হাবিব হেসে বলেন, মাস্ক আছে তো, পকেটে রেখেছি। মাস্ক মুখে রাখলে বিরক্ত লাগে। আর তার সঙ্গে থাকা হাফিজ বলেন, মাস্ক বেশিক্ষণ পড়ে থাকতে পারি না। তাই একটু পর পর বের করে পড়ি।

কালাই আহলে হাদিস মসজিদ কমপ্লেক্সে কাপড় কেনাকাটার জন্য এ দোকান ঐ দোকানে ঘোরাঘুরি করছেন আলেয়া বেগম। সেই সময় তার মুখে মাস্ক নেই, মাস্ক নেই কেন? তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাস্ক পড়লে দম বন্ধ হয়ে আসে। ঠিকমতো কথা বলা যায় না, বললেও আরেকজন তা বোঝে না। এজন্য মাস্ক পড়েনি।

তার পাশেই একই পরিবারের পাঁজজন এসেছেন ঈদের আগাম কাপড় কেনাকাটা করতে, কারোরই মুখে মাস্ক ছিলনা। আপনাদের মুখে মাস্ক নেই কেন জিজ্ঞেস করতেই উল্টো ক্ষেপে গিয়ে সালেয়া বেগম নামে এক মেয়ে বলেন, আমরা মাস্ক না পড়লে আপনার কি সমস্যা হচ্ছে? এই বলেই তারা সেখান থেকে সরে যায়।

উপজেলার পুনটহাটের মুদি দোকানী মিলনের মুখে মাস্ক নেই। মাস্ক নেই কেন? তা জানতে চাইলে তিনি কোনো কথা বলেননি। তার টেবিলের ড্রয়ার থেকে মাস্ক বের করে মুখে পড়েন।

আবু হোসেন নামে একজন কালাই পৌর কাঁচা-বাজারে এসেছেন। মুখে মাস্ক নেই। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি না হয় নাই পড়লাম, অনেক মানুষই তো মাস্ক পড়েনি। আর মাস্ক পড়লেই কি করোনাভাইরাস ঠেকানো যাবে?
উপজেলার মোলামগাড়ীহাটে দেখা হলো ইদ্রিস নামে এক বেটারি চালিত ভ্যান চালকের সঙ্গে। তিনি মুখে মাস্ক না পড়ে হাতে বেঁধে রাখেছেন। মুখে মাস্ক নেই, হাতে কেন? কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রচুর পরিমাণ রোদ ওঠে। গরমও পরেছে, মাস্ক পডরলে আরো বেশি গরম লাগে, তাই পড়িনি।

উপজেলার মোসলেমগঞ্জহাটে কাঁচাবাজার করতে এসেছে সুজাউল, আতিকুর, ফারুক ও আনিসুর। তারা সবজি দোকান থেকে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে প্রযোজনীয় কাঁচাসবজি কেনছেন। তাদের মুখে মাস্ক নেই। কেন মাস্ক নেই তা জানতে চাইলে সুজাউল ও আনিসুর জানায়, বাসায় কাঁচাসবজি লাগবে তাই বাসা থেকে মোসলেমগঞ্জহাটে এসেছেন। এাছাড়াও নানা কারণে প্রায়ই সময় তারা ঘর থেকে বের হচ্ছে। তাই সব সময় মাস্ক পড়ে বের হতে পারছেন না তারা।

উপজেলার মাত্রাইহাটে মুদি ব্যবসায়ী আব্দুল মতিন বলেন, সরকার বেঁধে দেওয়া নিয়ম মেনেই দোকানে বেচাকেনা করার চেষ্টা করছি। কিন্তু অনেক কাস্টমাররা সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার জন্য বারবার বললেও তারা কথা শোনতে চাই না। দোকানের সামনে এসে শুধু চেচামেচিই করে। তাই অনেক সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে বেচা-কেনা করা কষ্ট হয়ে ওঠে।

উপজেলার জিন্দারপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জিয়াউর রহমান জিয়া বলেন, করোনাভাইরাস একটি মারাত্মক রোগ। এর জন্য জনগণকে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। সরকারি নিষেধ অমান্য করেই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন যেখানে সেখানে এলোমেলো ও জটলা ভাবে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অহেতুক ঘোরাফেরা করছে। পূর্বের তুলনায় মাস্ক ব্যবহারের সংখ্যাও অনেক হ্রাস পেয়েছে। করোনা ভাইরাস সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার জন্য উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগ মিলে সার্বিকভাবে কাজ করার প্রয়োজন। তাছাড়া এই উপজেলায় প্রতিদিনই করোনারভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশস্কা রয়েছে। সেই সঙ্গে উপজেলার প্রাসনের কঠোর নজর ও হস্থক্ষেপের জোরদাবী জানাচ্ছি।

কালাই সরকারি মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, মহামারি করোনা ভাইরাসে বিপর্যস্ত পুরো পৃথিবী। বাংলাদেশও পরেছে এর ভয়াল থাবা। কিন্তু সরকারের বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করার এখন অনেকটা আগের মতোই সবকিছু চলছে। দেশে করোনাভাইরাস নামে ভয়াবহ কোনো সংক্রমণ ব্যাধি আছে জনগণ তা মনে করছেন না। আবার নানা কারণেই মানুষের মধ্যে বিরক্ত ও অবিশ্বাস জন্মেছে। মানুষ মনে করছে দেশে তেমন করোনা ভাইরাস নেই। সেই জন্য স্বাস্থ্যবিধি মানতে সঠিক গাইডলাইন তৈরি করতে হবে।

কালাই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ আবু তাহের মো.তানভীর হোসেন বলেন, করোনা ভাইরাসের টিকা আসার পর মানুষ এখন কিছুই মানে করছে না। মহামারি করোনা ভাইরাসের এই দুর্যোগে সময় সরকারের নিয়ম নীতি মেনে চলতে হবে। এই উপজেলায় এ পর্যন্ত ১শ ৯৭ জন মানুষের করোনা রোগী সনাক্ত হয়েছে এবং তিন জন করোনায় মৃত্যুও হয়েছে। করোনা মহামারীর সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা পেতে টিকা দেওয়া, মাস্ক পড়া, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি মানানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। আর মানুষকে বোঝাতে হবে, আসুন-সবাই মিলে করোনা নিয়ন্ত্রণ করি।

কালাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো.মোবারক হোসেন পারভেজ বলেন, উপজেলায় বিভিন্ন স্থানে মাস্ক না পড়া ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলায় ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা কর হচ্ছে। সেই সঙ্গে উপজেলায় বিভিন্ন যানবাহনে মাস্কের ব্যবহার নিশ্চিতসহ মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য উপজেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তবে করোনা থেকে মুক্তি পেতে হলে সবাইকে মাস্ক পড়া, শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাসহ স্বাস্থ্যবিধি যথযাথভাবে মেনে চলতে হবে।

Please Share This Post in Your Social Media


© All rights reserved ©  jamunanewsbd.com