সোমবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২২, ০১:০৭ পূর্বাহ্ন

পিছিয়ে পড়া এক জনপদের গল্প

প্রফেসর ড. মোহা. হাছানাত আলী
ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এককালের বগুড়া আজ অবহেলিত একটি জনপদে পরিনত হয়েছে। পুন্ড্রবর্ধনের রাজধানী খ্যাত বগুড়া একসময় শিল্প, শিক্ষা, সাহিত্য ও বাণিজ্যে উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র ছিলো বগুড়া। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বগুড়া নর্থ বেঙ্গলের গেটওয়ে হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলো। একটা সময় বগুড়ার মানুষের ঘুম ভাঙতো বগুড়া কটন মিলের সাইরেনের আওয়াজে। কলকারখানায় মুখরিত ছিলো বগুড়ার পরিবেশ। বগুড়ার ভান্ডারী কটন মিলে উৎপাদিত কম্বলের দেশ-বিদেশে ব্যাপক সু-খ্যাতি ছিল। বগুড়ার তাজমা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজের সিরামিক পণ্যের কদর ছিলো দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে উন্নত বিশ্বে। বগুড়ায় উৎপাদিত ম্যাচ ফ্যাক্টরির দিয়াশলাই ও সুগন্ধিযুক্ত জানে সাবা নামক সাবানের চাহিদা ছিলো বিশ্বব্যাপি। বগুড়ার গ্লাস ফ্যাক্টরি আজ ইতিহাস। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে একে একে বন্ধ হয়ে গেছে এসব শিল্প প্রতিষ্ঠান। কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে গেছে কয়েক হাজার পরিবার। এক সময় এসব প্রতিষ্ঠান কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বগুড়ার অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছিলো। নতুন প্রজন্মের কাছে আজ হয়তো এসবের কোন গুরুত্বই নেই। অথবা তারা হয়তো জানেই না এসবের কথা। কিন্ত এক কালের শিল্পনগরীতে আজ গড়ে উঠেছে বড় বড় আবাসিক ভবন।
ঐতিহাসিকভাবেই বগুড়া বিশ্ব দরবারে সমাদৃত একটি প্রাচীন শহর। সেই বগুড়া নামকে বুকে ধারণ করে বগুড়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক বগুড়া পত্রিকার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে বঞ্চিত বগুড়ার কিছু কথা না বললেই নয়। গত এক দশকে বগুড়ায় চোখে পড়ার মত কোন বৃহৎ উন্নয়ন কর্মকান্ড সংঘটিত হয়নি বললেই চলে। শিল্প, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে অনেকটায় পিছিয়ে পড়েছে আজকের বগুড়া।

বগুড়ায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষে বর্তমান সরকার তাদের প্রথম মেয়াদের শাসনামলে (১৯৯৬-২০০১) জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশনে “বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়” আইন পাশ করেছিলো। সংসদ কর্তৃক গৃহীত আইনটি বিগত ১৫ জুলাই ২০০১ তারিখে তদানিন্তন মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সম্মতি লাভ করে। বগুড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য ২০০১ সালে মহান সংসদে পাশকৃত ৪২ নং আইনটি আজও আলোর মুখ দেখেনি। মহান জাতীয় সংসদে আইনটি পাশ হবার দীর্ঘ প্রায় দুই দশক অতিবাহিত হয়ে গেলেও আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি। প্রতিষ্ঠিত হয়নি বগুড়ায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের ছোট বড় প্রায় অধিকাংশ জেলায় সরকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেও দেশের প্রাচীনতম জেলা শহর বগুড়া আজও বঞ্চিতই থেকেছে। ফলে শিক্ষা ক্ষেত্রে অনেকটায় পিছিয়ে পড়ছে অত্র অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয় সংসদে আইন পাস হয়েছে। আইনের গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। এরপর কেটে গেছে প্রায় একযুগ। সরকার এসেছে, সরকার চলেও গেছে কিন্তু কোন সরকারই বগুড়ার শিক্ষার উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় আর এগিয়ে আসেনি।
বিগত বিএনপি সরকার বগুড়ায় একটি বিমান বন্দর স্থাপন করলেও সেখানে আজও বিমান চলাচলের কোন কার্যকরি উদ্যোগ গ্রহন করা হয়নি। বগুড়ায় প্রতিষ্ঠিত বহুল প্রত্যাশিত বিমানবন্দরে বানিজ্যিক বিমান উঠানামা না করলেও প্রশিক্ষণরত যুদ্ধবিমানের নিয়মিত আসা যাওয়া প্রতিনিয়ত বগুড়া বাসীর আক্ষেপকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
সবারই জানা যে, রেলযোগাযোগ অত্যন্ত আরামদায়ক, ঝুঁকিমুক্ত এবং সুলভ যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। কিন্ত বগুড়াবাসীর দীর্ঘদিনের আকাঙ্খিত বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলওয়ে প্রকল্পটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে আজও আলোর মুখ দেখেনি। হবে হবে করেও হচ্ছেনা। অথচ এই একটি মাত্র রেললাইন বগুড়া সহ গোটা উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন করে দিতে পারতো। কৃষিজ পণ্যের জন্য বিখ্যাত বগুড়ার কৃষকরা অতি সহজেই তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য রাজধানীসহ আশে পাশের জেলা গুলোতে পরিবহন করতে পারতো। আর্থিকভাবে লাভবান হতো কৃষক। বিকশিত হতো এতদাঞ্চলের কৃষি। দিনাজপুরের হাজী দানেশ কৃষি কলেজ, পটুয়াখালীর দুমকিতে স্থাপিত কৃষি কলেজ এতদাঅঞ্চলের নেতৃত্বের বলিষ্ঠতার কারণে প্রতিষ্ঠান দুটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরিত হলেও নেতৃত্বের চরম কোন্দলের কারণে বগুড়ায় প্রতিষ্ঠিত কৃষি কলেজটি ধ্বংস হয়ে গেছে। এ ব্যর্থতা বগুড়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব কোনভাবেই এড়াতে পারেনা।
এককালের প্রমত্তা করতোয়া নদী আজ দখলে-দূষণে মরা খালে পরিণত হয়েছে। খননের কথা শোনা গেলেও যথাযথ উদ্যোগের অভাবে সেটি বাস্তবে পরিণত হয়নি। অথচ করতোয়া নদীকে কেন্দ্র করে বগুড়াকে লন্ডনের বিখ্যাত টেমস্ নদীর আদলে গড়ে তোলা যেত। গড়ে তোলা যেত বগুড়াকে দৃষ্টিনন্দন পর্যটন শহরে। এই মুহূর্তে বগুড়া বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পৌরসভা। সিটি কর্পোরেশন হওয়ার সমস্ত শর্তপূরণ করা সত্ত্বেও শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে সেটি হয়ে ওঠেনি। বগুড়ার উন্নয়নে গত এক দশকের বাজেট বরাদ্দ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তা অন্যান্য জেলা থেকে তুলনামূলক ভাবে অনেক কম। ফলে উন্নয়ন কর্মকান্ডে অনেকটায় পিছিয়ে পড়েছে বগুড়া। দেশের সর্ববৃহৎ পৌরসভার বাজেট বরাদ্দের পরিমাণ একেবারেই নগণ্য। প্রথম শ্রেণির সর্ববৃহৎ পৌরসভার বাজেট বরাদ্দ বগুড়ার অনেক নবসৃষ্ট পৌরসভার বাজেট বরাদ্দের প্রায় সমান। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে বৃহৎ পৌরসভাটির উন্নয়ন কাজ। নগরবাসী বঞ্চিত হচ্ছে তাদের প্রত্যাশিত সেবা থেকে। নব্বইয়ের দশকে জনদাবীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলাদেশের বৃহৎ দুটি দল বগুড়াকে একাধিকবার বিভাগ ঘোষণা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো। কিন্তু ক্ষমতায় এসে দু’দলই তাদের প্রতিশ্রুতির কথা বেমালুম ভুলে গেছে। অথচ ভৌগোলিক ও অবস্থানগত কারণে বগুড়া বিভাগীয় শহর হবার দাবিদার।
শিল্পনগরী বগুড়ায় প্রাকৃতিক গ্যাস থাকা সত্বেও নতুন নতুন বৃহৎ শিল্প গড়ে ওঠেনি। বিমান যোগাযোগ না থাকাটাকে এর জন্য বহুলাংশে দায়ী করা হয়ে থাকে। ঘোষিত অর্থনৈতিক জোনের কাজ এখনও শুরুই করা যায়নি। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। তবে এক্ষেত্রে দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি সংস্থা টিএমএসএস বগুড়ায় বহুবিধ কারখানা স্থাপন করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। বগুড়া হতে পারত নর্থ বেঙ্গলের দ্বিতীয় বৃহৎ শিক্ষানগরী। কিন্তু কোন এক অজানা কারনে তা আর হয়ে উঠেনি। বগুড়ায় ভালো মানের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকার কারণে লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়ছে বগুড়ার ছেলে মেয়েরা। সরকারি চাকুরিতে বগুড়ার ছেলে-মেয়েদের অবস্থান দিন দিন কমে যাচ্ছে। যা দীর্ঘমেয়াদে বগুড়াকে অনগ্রসর জনপদের তালিকার দিকে ঠেলে দিবে।
অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বগুড়ার ৭টি নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্যগণ বগুড়ার উন্নয়নে এক টেবিলে আজও বসতে পারেনি। ঐক্যমত্তের ভিত্তিতে মহান জাতীয় সংসদে বগুড়ার মানুষের পক্ষে, বগুড়ার উন্নয়নের স্বার্থে একই সুরে কথা বলেছে এরকম নজির খুঁজে পাওয়া দুষ্কর । অথচ দেশের অন্যান্য এলাকার জনপ্রতিনিধিরা তাদের এলাকার উন্নয়নের প্রশ্নে একাট্টা। দাবী আদায়ে অভিন্ন। আর আমরা? একেবারেই উল্টোপথে আমাদের পথচলা। বগুড়াবাসী বগুড়ার সকল সংসদ সদস্যদের মধ্যে বগুড়ার উন্নয়নে ঐক্য চায়। রাজনৈতিক বিভাজন নয়। বিরোধ নয়, বগুড়ার উন্নয়নে চায় তাদের স্বতঃস্ফূর্ত গঠনমূলক পদক্ষেপ।
নর্থ বেঙ্গল এমনিতেই দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে অনেকটাই অনুন্নত। অনুন্নত বগুড়াকে কেন্দ্র করে অত্র এলাকার উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি বগুড়ার সকল শ্রেণি পেশার মানুষের ঐক্য জরুরী। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা, সুশীল সমাজের নীরবতা, ছাত্র সমাজের নির্লিপ্ততা আজকে বগুড়াকে অনেকটায় পিছিয়ে দিয়েছে। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশের অনেকটা সময় জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বগুড়ার দৃশ্যমান সরব উপস্থিতি।
উন্নয়ন বঞ্চিত বগুড়াকে উন্নয়নের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনাটা জরুরি। এ লক্ষ্যে বগুড়াবাসী প্রত্যাশা করে যে, বগুড়ার সকল সংসদ সদস্য রাজনৈতিক সংকীর্ণতা ও দলীয় মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে বগুড়ার উন্নয়ন ও আপামর মানুষের দাবিকে প্রাধান্য দিয়ে আগামী সংসদে ঐক্যবদ্ধভাবে কথা বলবেন। দাবি আদায়ে অভিন্ন সুরে সোচ্চার হবেন। সরকারের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করবেন। তা করতে না পারলে পিছিয়ে পরা বগুড়াকে হয়ত আর কোনদিনই উন্নয়নের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। দৈনিক বগুড়া এক্ষেত্রে গঠনমূলক ভুমিকা পালন করতে পারে।
লেখক পরিচিতি : শিক্ষক, আইবিএ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Please Share This Post in Your Social Media


© All rights reserved ©  jamunanewsbd.com