সোমবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২২, ০১:২০ পূর্বাহ্ন

অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলাদেশের অর্জন

অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়নের এক সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে। পঞ্চাশ বত্সরের সময়কালীন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামগ্রিক অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে। স্বাধীনতার পরপরই অনেকে দেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলেছে, অনেকে বলেছে দেশটি উন্নয়নের ‘কঠিন পরীক্ষার’ সম্মুখীন। এসব কিছু অনেকটাই ঝেড়ে ফেলে দিয়ে ঐ দেশটি উন্নয়নের একটি সন্তোষজনক পর্যায়ে এসেছে। এর পেছনে দেশের আপামর জনসাধারণের সমর্থন, রাজনৈতিক নেতা, সরকারি-বেসরকারি খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সবিশেষ অবদান রয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিশেষ করে প্রবৃদ্ধি এবং সামষ্টিক সূচকের সন্তোষজনক অবস্থান ইতিবাচক হতে শুরু করেছে। ১৯৯০ সালে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা শুরু করার পর থেকে, তখন থেকে এ পর্যন্ত সব সরকারই পরোক্ষ অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়। এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে সবাই সচেষ্ট। কোন সরকার কতটুকু অর্জন করেছে তার চুলচেরা বিশ্লেষণ বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে করা যেতে পারে, তবে সবারই সম্মিলিত প্রচেষ্টাই বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের তুলনায় সন্তোষজনক অবস্থায় আছে বিশেষ করে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায়।

দুটি বিশেষ অর্জন নিয়ে এখন আলোচনা চলছে। প্রথমত : বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। মাথাপিছু আয় (বর্তমান বাজার দরে) ২ হাজার ডলারের কাছে পৌঁছেছে। দক্ষিণ এশিয়ার এবং আমাদের প্রতিবেশী অনেক দেশ বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে আছে। আমাদের চ্যালেঞ্জ হলো মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে অবস্থানটি দৃঢ় করে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া। আমরা যেন মধ্যম আয়ের দেশের ফাঁদে না পড়ে যাই, অর্থাৎ এই পর্যায়েই যেন আটকে না থাকি। বেশ কিছু দেশই বছরের পর বছর এই পর্যায়ে আটকে আছে।

দ্বিতীয়ত, বিশেষ অর্জন হলো জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী অনুন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পরিগণিত হবে। সরকার অবশ্য ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময় নিয়েছে আনুষ্ঠানিক ভাবে উন্নয়নশীল দেশ ঘোষণা করার জন্য। কারণ কিছু প্রস্তুতি সমন্বয় করার জন্য এবং এই অবস্থানটি ধরে রাখার জন্য। এই প্রচেষ্টার সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য’ বা ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল’ (মোট কথা ১৭টি লক্ষ্য) অর্জন করা। এর জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, কার্যক্রম এবং অর্থ। সেগুলো খুব সহজ বিষয় নয়।

উন্নয়নের সামষ্টিক অর্থনীতি পর্যালোচনা করে দেখা যায় আমাদের প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে ছয় শতাংশ বেশি হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৪ বিলিয়ন ডলারের মতো হয়েছে, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পেয়েছে, রপ্তানি আয় বেড়েছে এবং বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাত সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। তবে সেগুলোর সুফল সুষমভাবে এবং সমতার মানদণ্ডে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। সমস্যাটা সেখানেই। উপরন্তু ব্যক্তিগত আয় ও সম্পদের বৈষম্য বাড়ছে। কর্মসংস্থানের স্বল্পতার কারণে বেকার মানুষের (বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে) সংখ্যা বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ইদানীং খাদ্যদ্রব্য ও অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রীর (সেবা যেমন যাতায়াত, বাড়িভাড়া, স্বাস্থ্য) জন্য ব্যয়ভার বাড়ছে। যার ফলে দরিদ্র, নিম্নবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তরাও দুর্ভোগে আছে। এখন প্রয়োজন হচ্ছে কীভাবে সমতাভিত্তিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বণ্টনের বিষয়টি সামনে আনা। সেজন্য সরকারের নীতি কৌশল এবং কার্যক্রমকে দরিদ্র ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর সার্বিক উন্নয়ন অর্থাৎ সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন দুটোরই ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়া।

গত তিন দশকে দারিদ্র্যবিমোচনে বাংলাদেশ ভালো অর্জন করেছে, দারিদ্র্যের হার ৫০ শতাংশের অধিক থেকে এখন ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্জন মোটামুটি ভালো। তবে ইদানীং দেখা যাচ্ছে—কোভিড-১৯ এর আঘাতের ফলে দারিদ্র্যের হার আশঙ্কাজনক ভাবে বেড়েছে। কৃষিজাত পণ্য বিশেষ করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা আংশিক হয়েছে এর প্রতিফলন হলো বাংলাদেশ এখন চাল আমদানি দেশ সমূহের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। কৃষি, মত্স্য, পশুপালন, সবজি, হাঁস-মুরগি এবং অকৃষিভিত্তিক কাজ সহকারে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য অধিকতর মনোযোগ দিতে হবে।

কোভিড-১৯ মহামারির ফলে সমগ্র বিশ্বের সব দেশের স্বাস্থ্য-আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক সব ক্ষেত্রেই নতুন করে অনেক চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে, সেই সঙ্গে পুরাতন চ্যালেঞ্জগুলো আরো কঠিন হয়েছে। গতানুগতিক ধারায় সব কিছু আবারও স্বাভাবিক হবে এবং দেশ এগিয়ে যাবে। আগেই উল্লেখ করেছি দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান এবং অন্যান্য সমস্যাগুলো যেগুলো কোভিড-১৯ উত্তর আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কোভিড-১৯ এর মহামারিতে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ঘাটতি ধরা পড়েছে। আমাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার কিছুটা উন্নতি হলেও রোগের পরের ধাপ এবং নিরাময়ের ক্ষেত্রে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগণ ভুগছে, শিশু ও মাতৃ অপুষ্টির হার, বিশেষ করে চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো আশঙ্কাজনক। শিক্ষার হার বেড়েছে আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে, কিন্তু শিক্ষার মান বাড়েনি। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ অনেক ক্ষেত্রে বিষয়াদির যথার্থতায় কিছুটা ঘাটতি থাকাতে শিক্ষা শেষে কর্মজীবন এমনকি আত্মকর্মসংস্থানেও তরুণ ও যুবকদের বেগ পেতে হচ্ছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যেমন :ব্যাংক, বিমা, ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দুর্বলতার জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরো দ্রুত ও জনগণের কল্যাণের জন্য সুষম হচ্ছে না। বিনিয়োগ আশানুরূপ নয় বিশেষ করে কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে খুবই স্বল্প। এগুলো হলো—মোটা দাগে আমাদের মূল সমস্যা। সব কিছু ছাড়িয়ে যেটা দেখা যাচ্ছে, দুর্নীতি এবং অর্থের অপচয়।

নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় শক্ত প্রয়োগ এবং আইন ও নীতিমালার প্রয়োগ ও পরিপালনের অভাবে দিন দিন সব অর্জনগুলো হুমকির মুখে পড়ছে। এর ফলে হচ্ছে অর্থ পাচার, কিছু সংখ্যক ব্যক্তির অযৌক্তিক ভোগ-বিলাস এবং সাধারণ জনগণের ওপর আর্থিক ও মানসিক চাপ, যাতে স্বাধীনতার মূল উদ্দেশ্যগুলোও ব্যাহত হতে পারে।

আমাদের প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজন বেশকিছু বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেওয়া ও সেগুলো বাস্তবায়ন। প্রথমত, আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বিশেষ করে নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো, বাজার ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা ও সুষম ক্ষেত্রে আনা, যা সব উদ্যোক্তা ও সৎ ব্যবসায়ীদের প্রেরণা জোগাবে। দ্বিতীয়ত, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় সংস্কার আনা, ব্যাংক কোম্পানি আইন, বিমা আইন, পুঁজিবাজার সম্পর্কিত আইন, প্রতিযোগিতা আইন এগুলোকে যুগোপযোগী করা এবং কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা। তৃতীয়ত, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা আরো স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু করা।

সরকারি অর্থায়নে গ্রহণকৃত বিভিন্ন প্রকল্প, বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে দুর্নীতি অপচয় বন্ধ করা। প্রশাসনকে আরো স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক করা। সরকারের রাজস্ব আদায় ও কর ব্যবস্থাকে আরো দক্ষ, কর্মতত্পর, ব্যবস্থা ও জনগণবান্ধব হিসেবে পরিণত করতে হবে। একই সঙ্গে এসব ক্ষেত্রে সব প্রক্রিয়া ও কার্যক্রম হতে হবে সুষম উন্নয়ন ও বৈষম্য হ্রাসের মাধ্যম হিসেবে। চতুর্থত, সরকারি প্রশাসন ও উন্নয়ন কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।

সবকিছুই রাজধানী এবং কিছু বৃহৎ শহরভিত্তিক হয়ে যাচ্ছে, সেটার বিপরীত স্রোতে এখন যেতে হবে। স্হানীয় প্রশাসন, পল্লি অঞ্চলে সার্বিক উন্নয়ন, কৃষি ও সংশ্লিষ্ট, অত্যাশ্যকীয় ক্ষেত্র (পশুপালন, মত্স্য উত্পাদন ইত্যাদি) এবং পল্লি অঞ্চলে শিল্প বাণিজ্যের বিস্তার এসব ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। পঞ্চমত, শিল্প বাণিজ্য প্রসারের ক্ষেত্রে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোকে সরকারি ও বেসরকারি সব পর্যায়গুলোতে সম্প্রসারিত করতে হবে।

ইদানীং কোভিড-১৯-উত্তর সরকারি আর্থিক প্রণোদনার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর এসব কর্মকাণ্ড মোটেও সন্তোষজনক নয়, এরকম যেন পুনরাবৃত্তি না হয়। ষষ্ঠত, দেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর, শৃঙ্খলা এবং জবাবদিহিতা আনতে হব। সব শেষে যেটা উল্লেখ্য, সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং সবক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে আমাদের যে চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলা করতে হবে সেগুলোর সুরাহা করা অত্যন্ত কঠিন হবে। সেজন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আপামর জনসাধারণের সহযোগিতা ও কার্যকরী অংশগ্রহণ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পেছনে দুটি প্রধান কারণ ছিল : প্রথমত, পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক স্বাধিকার, দ্বিতীয়ত, এই ভূখণ্ডের মানুষের সার্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। স্বাধীনতার ৫০ বছর আমরা উদযাপন করছি।, এটাকে সুসংহত এবং জনকল্যাণমুখী করতে হবে। কয়েকটি সূচকে আর্থিক উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু সার্বিক এবং ব্যাপকভাবে জনকল্যাণমুখী আর্থিক উন্নয়ন এখনো দূরে, তদুপরি সামাজিক উন্নয়ন, নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা এসব ক্ষেত্রে এখনও অপূর্ণতা রয়েছে। সবগুলো চ্যালেঞ্জ সমাধান করা এখন অত্যাবশ্যক।

লেখক : অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাক্তন গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

Please Share This Post in Your Social Media


© All rights reserved ©  jamunanewsbd.com