রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:০৮ অপরাহ্ন

সরকার বিরোধী কট্টরপন্থীদের নেতৃত্বে যাচ্ছে হেফাজত!

যমুনা নিউজ বিডিঃ  যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনরত শাহবাগীদের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে আলোচনা-সমালোচনায় আসা অরাজনৈতিক সংগঠন বলে দাবীদার কওমী মাদ্রাসা ভিত্তিকি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ কোন পন্থিদের নেতৃত্বে যাচ্ছে হেফাজত, কে ধরবেন সংগঠনটির হাল। এনিয়ে চলছে হেফাজত নেতৃবৃন্দসহ নানা মহলে চলছে বেশ জল্পনা-কল্পনা।
গত ১১ মাসে সংগঠনটির তিন শীর্ষ নেতার মৃত্যু তথা সর্বশেষ গত ১৯ আগস্ট দুপুরে হেফাজতের সর্বশেষ দ্বিতীয় আমির এবং চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষা পরিচালক শাইখুল হাদিস আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর মৃত্যুর দিন রাতে জানাজার নামাজের আগে সংগঠনটি প্রধান উপদেষ্টা ফটিকছড়ি মাদ্রাসার মহাপরিচালক শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী আমির (ভারপ্রাপ্ত) নির্বাচিত হওয়ার পর এমন প্রশ্ন লোকমুখে। যদিও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সবার অভিমতের ভিত্তিতে নতুন আমির নির্বাচনের বিষয়টি ফয়সালা করা হবে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছিল হেফাজতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা ছালাহ উদ্দিন নানুপুরী।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে হেফাজতের সাবেক কমিটির এক নায়েবে আমির জানান, আমিরের দায়ত্বি পাওয়া মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী সম্পর্কে জুনাইদ বাবুনগরীর মামা হন। প্রায় ৮৭ বছর বয়সী মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমির প্রয়াত আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বাধীন কমিটিতে তিনি (মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী) সিনিয়র নায়েবে আমির ছিলেন। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি মিললে আল্লামা শফীর ঢাকায় শোকরানা মাহফিলের আয়োজনের বিরোধিতা করে ২০১৯ সালে পদত্যাগ করেন। যদিও তার পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছিল কী তা কখনোই স্পষ্ট করেননি আল্লামা শফী। গত বছর সেপ্টেম্বরে তার মৃত্যুর পর নভেম্বরের কাউন্সিলে গঠিত হেফাজতের কমিটিতে প্রধান উপদেষ্টা করা হয় মুহিবল্লাহ বাবুনগরীকে।
এরমধ্যে জুনায়েদ বাবুনগরীর মৃত্যুর দিন রাতে আনুষ্ঠানিক বৈঠক ছাড়াই সংগঠনটির বর্তমান মহাসচিব নুরুল ইসলাম জিহাদী মজলিসে শূরার সদস্যদের সাথে ফোনালাপের মাধ্যমে সংগঠনটির প্রধান উপদেষ্টা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী নাম আমির হিসেবে ঘোষণা করার পর ফের আলোচনার নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। সংগঠনের নেতৃবৃন্দের নতুন চিন্তা, সরকারের নানামুখি চাপে নতুন এই কান্ডারী মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী নেতৃত্বে সংগঠনটির ঘুরে দাঁড়াবো নাকি সংগঠনটি পড়বে অস্তিত্ব সংকটে। বিষয়টি নিয়ে প্রয়াত আমির জুনায়েদ বাবুনগরী পস্থি সংগঠনটির নেতাকর্মীরা গোপনে কানাঘোষাসহা নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
তবে আল্লামা শফি পস্থিরা এ ব্যাপারে অনেকটা সরব রয়েছেন। তারা সংগঠনটির সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন জানিয়ে হেফাজতের সাবেক এক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, সর্বজন শ্রদ্ধেয় আল্লামা শফী গত বছরের সেপ্টেম্বর ইন্তেকালের পরপর হাটহাজারী মাদ্রাসায় অবৈধ কাউন্সিলের মাধ্যমে হেফাজতের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। ওই কমিটিতে আমির নির্বাচিত হন জুনায়েদ বাবুনগরী, আর মহাসচবি হন নূর হোসাইন কাসেমী। আমির ও মহাসচিবের বলয়ের লোকজন একচেটিয়া কমিটিতে জায়গা পান। এতে আল্লামা শফীর ছেলে আনাস মাদানীসহ হেফাজতে প্রতিষ্ঠাকালীন নেতৃত্বে থাকা শফিপস্থিদের বাদ দিয়ে করা হয়েঠিল সেই কমিটিতে। ফলে তৎসময় হেফাজতের একাংশের নেতাকর্মীরা ওই কমিটিকে ‘ফটিকছড়ি কমিটি’ বলে অখ্যায়িত করেছিলেন। পরবর্তীতে শফীপন্থীরা বিকল্প কমিটি করবেন ঘোষণা দিলেও শেষ র্পযন্ত তাদের কমিটি আলোর মুখ দেখেনি।
তাছাড়া হেফাজতের সাবেক কমিটির যুগ্ন মহাসচিব মাওলানা মইনুদ্দিন রুহি এ প্রতিবেদককে জানান, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের বাবুনগর গ্রামে জন্ম নেয়া ফটিকছড়ি উপজেলার আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরের মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকা সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর চট্টগ্রামরে বাইরে তাঁর তেমন প্রভাব কখনও ছিল না। তবে বর্তমান সচিব আল্লামা নুরুল ইসলাম জিহাদীর বাড়িও ফটিকছড়ি এবং তিনি হাটহাজারী মাদ্রাসায় তার প্রয়াত ভাগিনা জুনায়েদ বাবুনগরীর বলয়ের আস্থাভাজন হওয়ায় তিনি ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়ত্বি পেয়েছেন।
তিনি আরও জানান, সরকার বিরোধী কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিতি মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী এর আগেও বিভিন্ন সময় আলোচিত হন। তিনি মুফতি ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোটের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। তবে ইসলামী ঐক্যজোট বিএনপি জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর তিনি পদত্যাগ করনে। এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদ- প্রাপ্ত বিএনপি নেতা সালাউদ্দনি কাদের চৌধুরীর জানাজার নামাজে ইমামতি করে তিনি আলোচনায় আসনে।
এদিকে, হেফাজতে ইসলামের আমির জুনায়েদ বাবুনগরীর মৃত্যুর পরপরই নতুন আমির ঘোষণা নিয়ে সংগঠনের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মাঝে প্রশ্ন সরকার বিরোধী নতুন ভারপ্রাপ্ত আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী কি পারবেন আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেল করতে? তাই খুব শীঘ্রই সবার অভিমতের ভিত্তিতে নতুন আমির নির্বাচনের প্রত্যাশা করছে নেতাকর্মীরা।
হেফাজতের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, হাটহাজারী মাদ্রাসা হেফাজতের সদর দপ্তর নামে পরিচিত এই মাদ্রাসার শীর্ষ পর্যায়ের আলেমরাই বরাবরের মত হেফাজতের আমির নির্বাচনে প্রধান্য পাবে। সে হিসেবে মাদ্রাসার পরিচালনা পরিষদের অন্যতম সদস্য মুফতি আবদুস সালাম চাটগামি হেফাজতের পরবর্তী আমির হওয়ার সম্ভাবনা সবচাইতে বেশি। এছাড়া সংগঠটির নায়েবে আমির পদে আসিন থাকা ওই মাদ্রাসার অপর দুজন পরিচালক শেখ আহমদ, মাওলানা ইয়াহহিয়া ও মুফতি জসিম উদ্দিন।
সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মীর ইদরীস জানান, হেফাজতের জ্যেষ্ঠ নেতা ও দেশের শীর্ষ আলমদের মতামতের ভিত্তিতে গঠনতন্ত্র মোতাবেক কেউ আমির নির্বাচিত হবেন। তবে এক্ষেত্রে হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্টা লগ্ন থেকে হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে পরিচালিত হওয়ায় আমির নির্বাচনের ক্ষেত্রে হাটহাাজরী মাদ্রাসার জ্যেষ্ঠ মুরব্বিদের মধ্যে যে কাউকে দায়িত্ব দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে মারা যান হেফাজতের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী। এর আগে ২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর পরে ওই বছরের ১৫ নভেম্বর জুনায়েদ বাবুনগরীকে আমির ও নূর হোসাইন কাসেমীকে মহাসচিব করে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয় হেফাজত। এ বছরের মার্চে মোদিবিরোধী সহিংস আন্দোলন করতে গিয়ে চাপে পড়ে হেফাজত। এক পর্যায়ে কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণা দেন বাবুনগরী। গত ৭ জুন বাবুনগরীর নেতৃত্বে ৩৩ সদস্যবিশিষ্ট নতুন কমিটি ঘোষণা করে হেফাজত। এই কমিটির প্রধান উপদেষ্টা করা হয় মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীকে।

Please Share This Post in Your Social Media


© All rights reserved ©  jamunanewsbd.com