সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৬:২১ পূর্বাহ্ন

বিদেশে নেওয়ার ব্যাপারে সরকার সহনশীল,রোববারে সিদ্ধান্ত

যমুনা নিউজ বিডিঃ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার ব্যাপারে সরকার সহনশীল। এতে বিএনপি ও খালেদা জিয়ার পরিবারও আশাবাদী। চেয়ারপারসনের উন্নত চিকিৎসায় সরকার সব ধরনের সহযোগিতা করবে বলে মনে করছেন তারা।

ইতিবাচক মনোভাবের পর খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার জোর প্রস্তুতি শুরু করেছে বিএনপি ও তার পরিবারের সদস্যরা। দলটির চেয়ারপারসনের পাসপোর্ট নবায়ন, ভিসাসহ আনুষঙ্গিক কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। যাতে অনুমতি পেলে যে কোনো মুহূর্তে তাকে বিদেশ নেওয়া যায়।

গত বুধবার রাত সাড়ে ৮টায় খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিতে আবেদন নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ধানমণ্ডির বাসায় যান শামীম এস্কান্দার। এরপর থেকেই শুরু হয় নানামুখী তৎপরতা। আবেদন করার ২০ ঘণ্টা পর গতকাল বিকাল সাড়ে চারটায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক খোলাসা করেন যে এদিন আর কোনো অগ্রগতি হবে না। তিনি জানান, আইন মন্ত্রণালয় দ্রুতই মতামত দেবে। সন্ধ্যায় তিনি বলেন, রোববারের আগেই মতামত দেয়া হবে। হয়তো সরকারিভাবে রোববারের আগে তা কার্যকর হবে না।

সূত্র বলছে, খালেদা জিয়াকে বিদেশ নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আরো দুইদিন অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এদিকে বৃহস্পতিবার রাতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার বিদেশ যাত্রার আবেদনের বিষয়ে সরকার ইতিবাচক।

বিএনপি ও খালেদা জিয়ার পরিবারের একাধিক সূত্রে জানা যায়, খালেদা জিয়াকে বিদেশ নেয়ার বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে বেশ কয়েকদিন ধরেই আলোচনা হচ্ছে। কিছুটা সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসনের করোনা পরবর্তী কিছু জটিলতা রয়েছে। তবে বুধবার দুপুর পর্যন্ত সবকিছুই ঠিক ছিল। কিন্তু বেলা তিনটার দিকে সিসিইউতে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। এ সময় তিনি কিছুটা বুকে ব্যথাও অনুভব করেন। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার উন্নতি গত কয়েক দিনে নেই বললেই চলে। এর মধ্যে শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথা হওয়ায় শারীরিক পরিস্থিতি খানিকটা অবনতি হয়। সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করেই মেডিকেল বোর্ড খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেয়ার সুপারিশ করে।

এদিকে করোনামুক্ত হয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বৃহস্পতিবার সকালে তার করোনা পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ আসে। খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ডের এক চিকিৎসক বলেন, ম্যাডামের করোনা টেস্টের ফল নেগেটিভ এসেছে। তবে তার শারীরিক অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। শ্বাসকষ্ট রয়েছে। ডায়াবেটিকসের মাত্রা ওঠানামা করছে।

জানা যায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে দেয়া লিখিত আবেদনে উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেয়া প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানানো হয়েছে চিঠিতে। কোন্‌ দেশে খালেদা জিয়াকে তার পরিবার নিতে চায়, সে সম্পর্কে চিঠিতে কিছু লেখা নেই বলে জানা গেছে।

মির্জা ফখরুল বলেন, চেয়ারপারসনের বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি তার পরিবার ও আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেখছেন।

এদিকে খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়ার অনুমতির ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, তার আবেদনটি পেয়েছি। যাচাই শেষে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। তবে সেটা বৃহস্পতিবার পাঠানো সম্ভব হবে না বলে জানান তিনি।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে খালেদা জিয়ার সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন। হাসপাতালে যাওয়ার আগে গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব বলেন, করোনায় পোস্ট কোভিড জটিলতা হয়, সে জটিলতা মাঝে মধ্যে বিভিন্ন দিকে টার্ন নেয়। ওনার (খালেদা জিয়া) যে বয়স এবং বিভিন্ন রোগের কারণে কিছু জটিলতা হয়েছে। মির্জা ফখরুল আরও বলেন, সেজন্যই আমাদের দেশের প্রায় বেশির ভাগ মানুষের আকাক্সক্ষা তার চিকিৎসাটা উন্নত কোনো হাসপাতালে হোক। বাংলাদেশে উন্নত হাসপাতালেই তিনি চিকিৎসা নিচ্ছেন। বিদেশে আরও উন্নত হাসপাতালে তার চিকিৎসা হোক এটাই প্রত্যাশা। বুধবার তার পরিবার থেকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য অনুমতি চেয়েছেন। আমরা আশা করি, সরকার মানবিক কারণে দেশের ১৮ কোটি মানুষের সবচেয়ে প্রিয় নেতার বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে।

খালেদা জিয়ার মেডিকেল রিপোর্টে যা আছে:
খালেদা জিয়ার কিছু মেডিকেল রিপোর্টের তথ্যে দেখা যায়, High Sensitive Troponin-১ রিপোর্ট ভালো আসেনি। এ ক্ষেত্রে একজন নারীর স্বাভাবিক রেফারেন্স মাত্রা ধরা হয় ১৫.৬-এর কম। বেগম খালেদা জিয়ার সেই মাত্রা ২১.২। এই রিপোর্টের মাধ্যমে তার হার্টের অবস্থা নির্ণয় করা হয়।

রক্ত জমাট বাঁধছে কিনা জানতে D-Dimer পরীক্ষা করা হয়। এর স্বাভাবিক রেফারেন্স মাত্রা ৫০০-এর নিচে। বেগম জিয়ার তা ২১৩৪.৩। স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে তা রক্ত জমাট বাঁধার ইঙ্গিত দেয়। তার হিমোগ্লোবিন মাত্র ৭.৭। স্বাভাবিক অবস্থায় তা ১১.৫-১৬.৫-এর মধ্যে থাকার কথা।

NT- pro BNP পরীক্ষাও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। স্বাভাবিকভাবে ১২৫-এর কম থাকতে হয়। বেগম খালেদা জিয়ার রক্ত পরীক্ষায় তা ২২৩৮ এসেছে। এই পরীক্ষার রিপোর্ট তার হার্ট ও ফুসফুসের অস্বাভাবিক অবস্থা বোঝাচ্ছে।

এ ছাড়া CA ১২৫ পরীক্ষার উচ্চমাত্রা একটি জটিল রোগের ঝুঁকি নির্ণয় করে। ওই পরীক্ষার স্বাভাবিক মাত্রা ১২৫-এর নিচে হলেও বেগম জিয়ার তা ৯৬২। এ দ্বারা শুধু ওই জটিল রোগের ঝুঁকির মাত্রা বোঝায়।
করোনা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে এ সমস্যাগুলো যেকোনো সময় তীব্র থেকে তীব্রতর হতে পারে। তাছাড়া তার ডায়াবেটিক বেশ উঠানামা করছে। এ পর্যন্ত দুইবার ফুসফুস থেকে অতিরিক্ত পানি অপসারণ করা হয়েছে।

যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: খালেদা জিয়াকে বিদেশ নিতে পরিবারের আবেদন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য সর্বোচ্চ সুযোগ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার এসেছিলেন। তিনি জানিয়েছেন, বেগম খালেদা জিয়া হাসপাতালে ভর্তি আছেন। ডাক্তাররা অভিমত দিয়েছেন তাকে বিদেশে নেয়া প্রয়োজন। যদিও আমরা ডাক্তারদের কাছ থেকে শুনি নাই। প্রধানমন্ত্রী এসব ব্যাপারে অত্যন্ত উদার। আমরা পজিটিভলি এই ব্যাপারটি দেখবো।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দারের সাক্ষাৎ শেষে তিনি এসব কথা বলেন।

এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, তাকে বিদেশে পাঠানোর ব্যাপারে অনেকগুলো আইনি বিষয় জড়িত। কোর্টের কোনো নির্দেশ লাগবে কিনা? সেটাও দেখতে হবে। সেজন্য আইন মন্ত্রণালয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছে। প্রসেস শুরু হয়েছে। তাদের মতামত এলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমরা অবশ্যই পজিটিভলি দেখছি। পজিটিভলি দেখছি বলেই তার দণ্ড আদেশ স্থগিত করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

যা বললেন আইনমন্ত্রী: খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার বিষয়ে বৃহস্পতিবার কয়েক দফায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় টেলিফোনে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার বিষয়ে রোববারের মধ্যে হয়তো অভিমত দিবো। তবে রোববারের আগে হয়তো সিদ্ধান্তটা কার্যকর হবে না।

এর আগে বৃহস্পতিবার বিকালে সাংবাদিকদের আনিসুল হক বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেয়ার আবেদনের বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের অভিমত যথা শিগগিরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেয়া হবে।

রোগমুক্তি কামনায় আজ সারা দেশে দোয়া ও প্রার্থনা :
খালেদা জিয়ার আশু রোগমুক্তি কামনায় আজ বাদ জুমা সারা দেশের মসজিদে দোয়া মাহফিল ও বিভিন্ন উপাসনালয়ে প্রার্থনা করবে বিএনপি। বৃহস্পতিবার সকালে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, শুক্রবার পবিত্র জুমাতুল বিদা। সারা দেশে সব মসজিদ, বিভিন্ন প্রার্থনালয় যেগুলো আছে অন্যান্য ধর্মের, সেগুলোয় আমাদের সব ইউনিট খালেদা জিয়ার আশু রোগমুক্তির জন্য দোয়া অনুষ্ঠান ও প্রার্থনা করবেন।

সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিতের দাবি বিভিন্ন দল ও সংগঠনের : এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে বিভিন্ন দল ও সংগঠন। বৃহস্পতিবার জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেন, কোভিড ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে সিসিইউতে স্থানান্তরের সংবাদে দেশবাসীসহ আমরাও উদ্বিগ্ন। দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ খালেদা জিয়ার জীবন সুরক্ষার জন্য জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। এ উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিতকরণে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতিতে গভীর উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে অবিলম্বে পরিবার ও দলের চাওয়া অনুযায়ী বিদেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন-ডিইউজের একাংশ। বিএফইউজের সভাপতি এম আবদুল্লাহ ও মহাসচিব নুরুল আমীন রোকন এবং ডিইউজের সভাপতি কাদের গনি চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মো. শহিদুল ইসলাম এক বিবৃতিতে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি প্রশ্নে যাচাই-বাছাইয়ের নামে কালক্ষেপণের কৌশল পরিহার করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান

Please Share This Post in Your Social Media


© All rights reserved ©  jamunanewsbd.com