মঙ্গলবার, ০৩ অগাস্ট ২০২১, ০১:২০ অপরাহ্ন

অবৈধ বাল্কহেডের ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেল

যমুনা নিউজ বিডিঃ চ্যানেল ও বহির্নোঙরে অবৈধ বাল্কহেড চলাচল বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকির মুখে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেল। সাগরে প্রায়ই ডুবছে বাল্কহেড। বড় বাণিজ্যিক জাহাজের সঙ্গে ছোট আকারের এসব নৌযানের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। সমুদ্রে চলাচল অনুপযোগী বাল্কহেডের কারণে যে কেন সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এবং তা থেকে বন্দর চ্যানেলে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে পণ্য খালাসে ব্যবহার করা হয় লাইটার জাহাজ। কিন্তু ভাড়া সাশ্রয়ের জন্য কিছু আমদানিকারক গত কয়েক বছর ধরে এ কাজে বালু বহনের জন্য তৈরি করা আরও ছোট আকারের যান বাল্কহেড ব্যবহার করছেন। যা একদিকে সম্পূর্ণ অবৈধ এবং অন্যদিকে বন্দরের জাহাজ চলাচলের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয়ভবে এসব নৌযান ‘ভলগেট’ নামে পরিচিত। লাইটারের অর্ধেক ভাড়ায় বাল্কহেডে পণ্য পরিবহন করা যায়। তাই আমদানিকারকরা আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে বাল্কহেডে পণ্য পরিবহণ করছেন। বন্দর কর্তৃপক্ষ এসব নৌযান নিষিদ্ধ করলেও চলাচল বন্ধ করতে পারছে না। শিপ হ্যান্ডলিংয়ে জড়িত প্রভাবশালী সিন্ডিকেট লাইটারের বিকল্প হিসাবে ব্যবহারের জন্য ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন নৌরুট থেকে নিয়ে এসেছে দুই শতাধিক বাল্কহেড। যা চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও বিভিন্ন ঘাট থেকে পাথর, কয়লা পরিবহণ করছে। নদীতে চলতে সক্ষম এসব যান সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রায়ই পড়ছে দুর্ঘটনার মুখে ।

বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, বাল্কহেডগুলোর অল্প কিছু এক হাজার ২০০ টন পণ্য বহন করতে পারে। তবে বেশিরভাগই ৮০০ টনের নিচে। অপরদিকে লাইটার জাহাজ এক হাজার ২০০ থেকে ৫ হাজার টন পর্যন্ত পণ্য পরিবহণে সক্ষম। সমুদ্রে চলাচলের উপযোগী করে লাইটার জাহাজ তৈরি করা হলেও বাল্কহেডগুলো তৈরি করা হয় নদীপথে বালু বহনের জন্য। এগুলো নির্মাণের ক্ষেত্রে কারিগরি মানও ঠিক থাকে না। ছোট আকারের নৌযান হওয়ায় সমুদ্রে ডুবলে বাল্কহেডের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে এগুলো উদ্ধার করাও সম্ভব হয় না। বছরের পর বছর ডুবন্ত বাল্কহেডগুলো বন্দর সীমানায় অন্য জাহাজের জন্য ঝুঁকি হয়েই থাকে।

৩০ এপ্রিল সকালে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে এক নম্বর বয়া থেকে দেড় নটিক্যাল মাইল দূরে ডুবে যায় এমভি পিংকি নামের পাথরবোঝাই একটি বাল্কহেড। ইঞ্জিন বিকল হওয়ার পর এটি ভাসতে ভাসতে একটি বড় বাণিজ্যিক জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লেগে তলিয়ে যায়। পাঁচ ক্রুকে উদ্ধার করে কোস্টগার্ড। এর আগে ২ মার্চ কর্ণফুলী নদীর কালারপুল এলাকায় ডুবে যায় পাথরবোঝাই আরও একটি বাল্কহেড।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক যুগান্তরকে বলেন, বন্দর চ্যানেল ও বহির্নোঙরে বাল্কহেডের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এরপরও নানা ছলছাতুরীর আশ্রয় নিয়ে এ ধরনের কিছু নৌযান ঢুকে পড়ছে। অনুমতি নেয়ার সময় এসব নৌযান লাইটার নাকি বাল্কহেড সেটা স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয় না। শুধু নামটাই উল্লেখ করা হয়। যেমন শুধু ‘এমভি মধুমতি’ উল্লেখ করলে বোঝার উপায় থাকে না, এটা লাইটার না বাল্কহেড। বন্দর সীমানায় এ ধরনের অবৈধ নৌযান চলাচল বন্ধ করতে আমরা মাসখানেক আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে একটি বৈঠক করেছি। সেখানে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের জেষ্ঠ সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক নবী আলম জানান, নদীপথে স্বল্প দূরত্বে শুধু বালু বহনের জন্য তৈরি বাল্কহেডগুলোর সমুদ্রে চলাচলের সক্ষমতা নেই। সমুদ্রে চলতে হলে দক্ষ ও সার্টিফিকেটধারী মাস্টার থাকতে হবে। কিন্তু এসব নৌযানে কোনো দক্ষ জনবল নেই। বহির্নোঙরে প্রবেশ করতে হলে বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগে। এরা সেটারও তোয়াক্কা করছে না। পণ্য বোঝাইয়ের পর বাল্কহেডের প্রায় পুরো কাঠামোই পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। ফলে এগুলো যখন চলাচল করে, তখন অনেক সময় খালি চোখে দেখাও যায় না। শুধু ইঞ্জিনের দিকটার একটু অংশ পানির উপরের দিকে ভেসে থাকে। এছাড়া এগুলোর কোনো হ্যাচ কভার থাকে না। ফলে লোড করা পণ্যেরও কোনো নিরাপত্তা নেই। সাগরের ঢেউ মোকাবিলা করে বাল্কহেড চলতে সক্ষম নয়। তাই সামান্য বাতাস হলেই এগুলো সাগরে ডুবে যায়। চ্যানেলে জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে পড়ে। চট্টগ্রাম বন্দর, সন্দ্বীপ ও কুতুবদিয়া চ্যানেলে বর্তমানে ২০০-৩০০ বাল্কহেড চলাচল করছে বলে জানান তিনি।

নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেম গিয়াস উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, রেজিস্ট্রেশন থাকলেও বাল্কহেড সমুদ্রপথে চলতে পারবে না। এটাই আইন। এগুলোর চলাচল বন্ধে আমরা কোস্টগার্ডের সহায়তা নিয়ে থাকি। গত ৩ মাসে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও সন্দ্বীপ চ্যানেলে ১০০টি বাল্কহেডের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এগুলো যেন সাগরে চলতে না পারে সেজন্য চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলের মুখে সব সময় একটি টহল যান রাখতে আমরা কোস্টগার্ডকে বলেছি। তারা একাজে সহযোগিতা করছে।

Please Share This Post in Your Social Media


© All rights reserved ©  jamunanewsbd.com