শনিবার, ১৯ Jun ২০২১, ০৩:৩৬ অপরাহ্ন

বাসদের তিস্তা রোড মার্চ বগুড়া অতিক্রম

তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) উদ্যোগে বগুড়ায় মিছিল সমাবেশ করা হয়েছে।
শনিবার বেলা ১১ টার দিকে শহরের সাতমাথা এলাকায় ঢাকা-তিস্তা ব্যারেজ রোডমার্চ উপলক্ষে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।

সমাবেশে সভাপতিত্¦ করেন বাসদ’র জেলা কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম পল্টু। এতে বক্তব্য রাখেন বাসদ’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বজলুর রশীদ ফিরোজ, রাজেকুজ্জামান রতন, কেন্দ্রীয় পাঠচট্রের সদস্য নিখিল দাস, জয়নাল আবেদীন মুকুল, নব কুমার কর্মকার, আলফাজ হোসেন যুবরাজ, বাসদ’র জেলা কমিটির সদস্য মাসুদ পারভেজ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের জেলার সভাপতি ধনঞ্জয় বর্মন।

অনুষ্ঠিত সমাবেশ পরিচালনা করেন বাসদ’র জেলা শাখার সদস্য সচিব সাইফুজ্জামান টুটুল। এতে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজুল হক দুলু, সিপিবি’র জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ফরিদসহ আরো অনেকে।

বক্তব্যে বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ‘মানব দেহের শিরা-উপশিরার মতো ছড়িয়ে থাকা নদী ও পলি দিয়ে গঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি আজ পানির অভাবে মরুকরণের হুমকির মুখে। এই অভাব প্রাকৃতিক কারণে নয়, মানুষের সৃষ্টি। চীন, নেপাল, ভুটান ও ভারত থেকে আসা নদীগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করে জালের মতো ছড়িয়ে গেছে। এই নদীগুলোই বাংলাদেশের প্রাণ প্রবাহ।’

তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সমস্ত আইন ও নীতি লঙ্ঘন করে ভারত ৫৪টি নদীর উজানে বাঁধ দিয়ে একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নেয়ার তৎপরতা চালাচ্ছে। এতে করে পানির প্রবাহ কমে গেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে দেশের অভ্যন্তরে নদী দখল ও দূষণ। এক সময় দেশে ১ হাজার ২০০টি নদী ছিল। সরকারসমূহের ভ্রান্তনীতি ও দখল-দূষণের কারণে নদীগুলো মরে গেছে। এখন নদীর সংখ্যা ২৩০-এ নেমে এসেছে। খরা মৌসুমে বেশিরভাগ নদীতেই পানি থাকে না। একসময়ের প্রমত্তা অনেক নদীই এখন খাল-নালায় পরিণত হয়েছে।’

বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, দেশের চতুর্থ বৃহত্তম আন্তর্জাতিক নদী তিস্তা। ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থিত জলপ্রবাহ নিয়ে এ নদীর অববাহিকার পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার বর্গ কিলোমিটার। যার মধ্যে বাংলাদেশে ২০ হাজার বর্গ কিলোমিটার আর ভারতে ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার (কি.মি)। বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে প্রায় ৭০ কি.মি. উজানে গজলডোবায় বাঁধ দেয়ার কারণে শুস্ক মৌসুমে ২০১১ এর পর থেকে পানি পাচ্ছে না বাংলাদেশ। খরা মৌসুমে আসতে না আসতেই পানি প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে কখনো ৫০০ কিউসেক এর নিচে নেমে যায়। অথচ ঐতিহাসিক গড় (১৯৭৩-১৯৮৫) অনুযায়ী পানির প্রবাহ থাকার কথা কমপক্ষে ১০ হাজার কিউসেক।
তিনি বলেন, ‘তিস্তা ব্যারেজের বিভিন্ন ক্যানেলের মাধ্যমে সেচ মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা রংপুর, দিনাজপুর ও নীলফামারী কমান্ড এলাকায় ১ লাখ ১০ হাজার হেক্টর জমিতে যে সেচ সুবিধা প্রদান করা হতো; এখন তা কমে শুধু নীলফামারীতে ৮ হাজার হেক্টরে নেমে এসেছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাবার কারণে বিকল্প সেচ ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়ে আর্সেনিকের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।’

তিনি এই আগ্রসনের অবসান করতে রোডমার্চে দেশের সর্বস্তরের জনগণকে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ‘৩১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘তিস্তা’ আন্তর্জাতিক নদী হওয়া সত্বেও ভারত বাংলাদেশের স্বার্থ উপেক্ষা করে একতরফা বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের জন্য পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ পানি পাচ্ছে না। ভারত থেকে আগত সকল আন্তর্জাতিক নদীর পানি বণ্টনের বিষয়টি ভারতের শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগিয়ে সমস্ত প্রকারে বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করে চলেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের শাসক শ্রেণির একাংশ ভারতকে বন্ধু রাষ্ট্র এবং আরেকাংশ হিন্দু রাষ্ট্র বলে ভোটের রাজনীতিতে ফায়দা তুলতে চায়। কিন্তু বাস্তবে ভারত বন্ধু বা হিন্দু রাষ্ট্র নয়, একটি সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র। ফলে সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র অনুযায়ী ভারত পাশর্^বর্তী দেশের উপর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামরিক-সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব ও প্রভাব বিস্তার করতে চায়। সুন্দরবন ধ্বংস করে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, বাংলাদেশের উপর দিয়ে ট্রানজিট ও বন্দর ব্যবহারে একের পর এক চুক্তি করে যাচ্ছে। অথচ তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা এবং নেপাল-ভুটানের সাথে যোগাযোগের জন্য মাত্র ৩০ কিলোমিটার করিডোর করতে দিচ্ছে না। সীমান্ত হত্যা, বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি দূর করতে কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না। আবার বাংলাদেশে নজরদারি করার জন্য উপকূলে রাডার স্থাপন করছে।’

সভাপতির বক্তব্য সাইফুল ইসলাম পল্টু বলেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা আসবেন। এর আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দোহাই দিয়ে ভারত সরকার তিস্তা চুক্তি পাশ কাটিয়ে গেছে। এটা একটা ছেলে ভুলানো যুক্তি। কারণ চুক্তি হবে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের মধ্যে। ভারত সরকার আন্তর্জাতিক নীতি লঙ্ঘন করে ভাটির দেশ বাংলাদেশের ন্যূনতম স্বার্থ বিবেচনা না করে একের পর এক নদীর পানি প্রত্যাহার করছে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক সমস্ত ফোরামে বিষয়টি উপস্থাপন করা। কিন্তু সে ধরনের কোন পদক্ষেপ আজও পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বাসদসহ বিভিন্ন বাম প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলসমূহের পক্ষ থেকে বারবার দাবি জানানো সত্ত্বেও ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের কারোরই কানে এই দাবি প্রবেশ করছে না। কারণ ভোটের রাজনীতির কাছে দেশ, জনগণ, নদী ও প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ কোন কিছুই গুরুত্ব পায় না।’

সমাবেশে বক্তারা তিস্তাসহ সকল নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, তিস্তা বাঁচাতে, নদী, পানি ও প্রাণ-প্রকৃতি বাঁচাতে সকল বাম প্রগতিশীল দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল, পরিবেশ ও নাগরিক আন্দোলনের প্রতিনিধি এবং সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

সমাবেশে ভারতের পানি আগ্রাসন, নদী দুষণ ও দখলদারদের রুখে দাঁড়াতে তিস্তা রোডমার্চ-এ অংশগ্রহণ করতে সর্বস্তরের জনগণকে আহ্বান করা হয়েছে।-খবর বিজ্ঞপ্তী

Please Share This Post in Your Social Media


© All rights reserved ©  jamunanewsbd.com