মঙ্গলবার, ০৩ অগাস্ট ২০২১, ০৩:৫০ পূর্বাহ্ন

News Headline :
“করোনা মহামারীতে পাঠদানের ক্ষেত্রে বগুড়া পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ একটি মডেল হতে পারে -আলী আশরাফ ভুঞা বগুড়ায় জনস্রোতে ১ জনের কারাদন্ড ৯৮ ব্যাক্তির জরিমানা ‘বঙ্গবন্ধু মাচাং’ উদ্বোধন করে বহিষ্কার যুবলীগ নেতা বগুড়ায় ২৪ ঘন্টায় করোনায় ও উপসর্গে ২৬জনের মৃত্যু, শনাক্ত ১২৬ স্বেচ্ছাসেবক দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোস্তাফিজুর করোনায় আক্রান্ত প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের তথ্য চেয়েছে সরকার করোনায় আরও ২৪৬ মৃত্যু, শনাক্ত ১৫,৯৮৯ সরকার শ্রমিকদের মানুষই ভাবে না: জিএম কাদের সোনাতলার মানবিক ওসির সততা ও কর্মদক্ষতায় প্রশংসিত জিয়ার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে সরকার নতুন গীত গাইছে: ফখরুল

পাহাড়ধসে মানবতার সমাধি : সমাধান কোন পথে?

প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসে আদমসন্তানের জীবন্ত সমাধিস্থ হওয়ার নিয়তি মৃতদেহ উদ্ধার, সংবাদমাধ্যমে লেখালেখি, শোক প্রকাশ, টিভি টক শোতে আলোচনার ঝড়, দু-একটি তদন্ত বা বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন, তদন্ত ও বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদন প্রণয়ন, কিছু সাহায্য বিতরণ, পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের পুনর্বাসনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ওষ্ঠসেবা তথা মিথ্যা আশ্বাসের ফাঁদে আটকা পড়েছে। ঘটনার পর কয়েক দিন এ নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা, তারপর নতুন কোনো জাতীয়-আন্তর্জাতিক ঘটনার নিচে পাহাড়ধস নিজেই চাপা পড়ে।

নতুন বছরে নতুন করে পাহাড়ধস না হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে অপেক্ষা। এভাবেই চলছে ক্রমবর্ধমান হারে পাহাড়ধসের ফলে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হওয়া মৃত্যুর মিছিলের প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়া। অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া স্মরণকালের ভয়াবহতম পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৫৮-তে দাঁড়িয়েছে। রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার—এই পাঁচ জেলার প্রায় ২০টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রাম মহানগরীর সাতটি স্থানে পাহাড়ধসে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। পাহাড়ধসে ক্রমবর্ধমান হারে প্রাণ ও সম্পদহানির ঘটনায় এটা সুস্পষ্ট যে অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ (যেমন—সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা) মোকাবেলায় আমরা সক্ষমতা অর্জন করলেও পাহাড়ধসের দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি ও দক্ষতায় যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তার চেয়েও বড় কথা, পাহাড়ধসের জন্য দায়ী মানবসৃষ্ট কারণগুলো প্রতিরোধে আমরা ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছি। ফলে পাহাড়ের ওপর ক্রমাগত অত্যাচারে ফুঁসে উঠছে পাহাড়, ঘটছে পাহাড়ধসের ঘটনা। গত সোমবার ও মঙ্গলবারের পাহাড়ধসের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই খাগড়াছড়ির মৌলভীবাজারে পাহাড়ধসে তিন শিশুসহ পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। মহান রব কোরআনে ঘোষণা করেছেন, পাহাড়-পর্বতগুলো হলো পেরেকস্বরূপ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এটি কি সত্য নয় যে আমি জমিনকে শয্যা বানিয়েছি। পাহাড়কে কীলক (পেরেক) বানিয়েছি। ’ (সুরা : নাবা, আয়াত : ৬-৭)। অর্বাচীন মানুষ যদি এ পেরেকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করে, কেটে ফেলে, তাহলে বিপর্যয় অনিবার্য। পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে বলা হয়েছে যে জলে-স্থলে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয় তা মানুষেরই কৃতকর্মের ফল। উদাহরণস্বরূপ সুরা রুমের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের দরুন জলে-স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। ’ (সুরা : রুম, আয়াত : ৪১)।

পাহাড়ধসকে প্রায়ই প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পাহাড়ধসের এ মানবিক বিপর্যয়ের জন্য প্রাকৃতিক কারণ যতটা দায়ী তার চেয়ে মনুষ্যসৃষ্ট কারণই বেশি দায়ী। জিও সায়েন্স অস্ট্রেলিয়ার এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পাহাড়ধসের পেছনে প্রাকৃতিক কারণ ও মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। প্রাকৃতিক কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভূ-তাত্ত্বিক গঠন। পাহাড়ের ভূ-তাত্ত্বিক গঠনে কঠিন শিলার অস্তিত্ব কম থাকলে মাটি সহজেই বৃষ্টির পানি শুষে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে মাটি নরম ও পিচ্ছিল হয়ে যায়। ফলে ভারি বর্ষণে মাটি ভেঙে পড়ে। এ ছাড়া অন্যান্য প্রাকৃতিক কারণ, যেমন—ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং পাহাড়ের পাদদেশের নদী ও সাগরের ঢেউ থেকেও পাহাড়ধস হতে পারে। আর মনুষ্যসৃষ্ট কারণ হিসেবে গবেষণায় বলা হয়েছে, পাহাড়ের গাছপালা কেটে ফেলা, মাটি কেটে ফেলা, পাহাড়ে প্রাকৃতিক খাল বা ঝরনার গতি পরিবর্তন, পাহাড়ের ঢালুতে অতিরিক্ত ভার দেওয়া ও খনি খননের কারণে পাহাড়ধস হয়।

বাংলাদেশের পাহাড়গুলোর ভূ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাহাড়ের ওপরের দিকে কঠিন শিলার অভাব। আমাদের বেশির ভাগ পাহাড়ের ভূ-প্রকৃতির গঠন হলো বালু ও কাদামাটির মিশ্রণে। এসব পাহাড়ের উপরিভাগে রয়েছে মোটা দানার বালুর স্তর আর নিম্নভাগে রয়েছে কাদামাটির স্তর। এভাবে একটার পর একটা বালু ও কাদামাটির স্তরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এ দেশের বেশির ভাগ পাহাড়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরন, সময় ও মাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টি হলে বালু ও কাদামাটির এ স্তরকে দুর্বল করে তোলে, যা একসময় পাহাড়ধসে রূপ নিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের গবেষণা বলছে, আমাদের পাহাড়ধসের মূল কারণ প্রাকৃতিক নয়, বরং মনুষ্যসৃষ্ট। যেসব পাহাড় কাটা হয়নি কিংবা পাহাড়ের বন উজাড় করা হয়নি এমন পাহাড়ধসের ঘটনা বিরল। অন্যদিকে যেসব এলাকায় বেশি পাহাড় কাটা হয়েছে, প্রকৃতি সেসব এলাকাতেই অধিক পরিমাণে ফুঁসে উঠে প্রতিশোধ নিয়েছে, ব্যাপক পাহাড়ধস হয়েছে। অবৈধ হাউজিং ব্যবসা, শিল্প-কলকারখানা স্থাপন, চাষাবাদ, ইটভাটা, মাছ চাষ ও নিম্নাঞ্চল ভরাটের প্রয়োজনে পাহাড়ের ওপর হামলে পড়ে এক শ্রেণির লোভী মানুষ। পাহাড়খেকোদের দ্বারা পাহাড়ের মাটি কেটে ফেলা ও বনখেকোদের দ্বারা বড় গাছপালা কেটে বন উজাড় করার কারণে পাহাড়ের ভূ-প্রকৃতির যে রূপান্তর ঘটে সে অবস্থায় প্রবল বৃষ্টিপাত বা ভূমিকম্প হলে পাহাড়ধস হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৪০ ডিগ্রির বেশি ঢালে পাহাড় কাটা হলে পাহাড়ের ঢালুতে অতিরিক্ত ভার পড়ে, যা বৃষ্টিপাত, ভূমিকম্পসহ নানা কারণে ধসে যেতে পারে। পাহাড় কাটার আগের ধাপ হচ্ছে বন সাফ করা। পাহাড়ি বন সাফ করার ফলে রৌদ্রের তাপ সরাসরি মাটিতে পড়ে মাটি প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়। ফলে পাহাড়ের গায়ে অসংখ্য ফাটল সৃষ্টি হয়। এসব ফাটল দিয়ে অতি সহজেই অতিবৃষ্টির পানি ঢুকে মাটি আলগা করে দেয়। ফলে সৃষ্টি হয় পাহাড়ধস।

নির্বিচার ও অবৈধ পাহাড় কাটা প্রতিরোধ করতে ২০১০ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ সংশোধন করে পাহাড় কাটায় বাধা-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের সংশোধিত ৬(খ) ধারায় বলা হয়েছে, অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া ‘ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারি বা আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করা যাবে না। ’ এ আইনের ১৫(১) ধারায় অবৈধভাবে পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করার শাস্তির বিধান করা হয়েছে। এ বিধান অনুযায়ী ৬(খ) ধারা লঙ্ঘনকারী সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। পাহাড় কাটা রোধে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৪(খ) ধারায় পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককেও প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এ ধারার ক্ষমতাবলে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ‘পরিবেশ অবক্ষয় ও দূষণের কারণ হতে পারে এ ধরনের সম্ভাব্য দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, নিরাপদ ব্যবস্থা গ্রহণ ও অনুরূপ দুর্ঘটনার প্রতিকারমূলক কার্যক্রম নির্ধারণ এবং এসংক্রান্ত যেকোনো নির্দেশ দিতে পারবেন। ’ পরিতাপের বিষয় হলো, আইনের এ বিধানাবলি সত্ত্বেও চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলায় গত তিন দশকে সাফ করা হয়েছে শতাধিক পাহাড়। আরেক পরিসংখ্যান বলছে, গত ২৫ বছরে শুধু চট্টগ্রামেই ১১০টি পাহাড় নিশ্চিহ্ন হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে মানুষ সোচ্চার হলেও পাহাড় কাটা বন্ধ হয়নি। আগে পাহাড়খেকোদের সিন্ডিকেট বুলডোজার চালাত দিনের বেলা আর এখন রাতের আঁধারে চলে পাহাড়নিধন। অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা, পাহাড় ন্যাড়া করার কারণে পাহাড়ধসে যে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে তা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, এটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বর্ষা আসবে, আর পাহাড়ধসে মানুষের মৃত্যু হবে না, এ যেন এখন ভাবনাতীত বিষয়। তাই পাহাড়ধসে জীবন্ত সমাধি অস্বাভাবিক মৃত্যু নয়, এটি হত্যাকাণ্ড। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি, সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে এ হত্যাকাণ্ডের দায় বহন করতে হবে। পাহাড় তো এক ঘণ্টায় বা এক দিনে রাতের আঁধারে কাটা হয়নি। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ধরে পাহাড় কাটা হলো, বন উজাড় করা হলো, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা এ বিষয়ে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন, তা জবাবদিহি করতে হবে। পাহাড়ধসে মৃত্যু হলে এ বুলি আউড়ে দায় থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না যে ‘আমরা তাদের ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থেকে সরে যেতে মাইকিং করেছিলাম, তারা সরেনি’ কিংবা ‘তাদের উচ্ছেদ করেছিলাম; কিন্তু আবার চলে এসেছে’। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০১২ সালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনের ২(১১) ধারায় পাহাড়ধসকে দুর্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ আইনের ২(১৩)(ই) ধারায় যেকোনো দুর্যোগ বিষয়ে আগাম সতর্কতা, হুঁশিয়ারি, বিপদ বা মহাবিপদ সংকেত প্রদান ও প্রচারের বাধ্যবাধকতা আছে। অন্যথায় ৪৪ ধারাবলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য শৃঙ্খলা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা যাবে এবং বিভাগীয় কার্যক্রম রুজু করা যাবে। পাহাড়ধসে শত শত প্রাণহানি হলেও কোনো সরকারি কর্মকর্তার অভিযুক্ত হওয়ার দৃষ্টান্ত আমাদের জানা নেই।

সরকারি পাহাড়গুলো ইজারা দেওয়ার পর এসব পাহাড় দেখভালের কোনো সমন্বিত ব্যবস্থা নেই। ফলে চাষাবাদের নামে পাহাড়ে চলছে প্রকৃতি ও পরিবেশবিরোধী ইচ্ছাখুশি অত্যাচার। যে যার ইচ্ছামতোই কাটছে পাহাড়। সমানে চলছে গাছ কাটার মহোৎসবও। প্রতিটি পাহাড়ি অঞ্চলের মাটিতে সেখানকার আবহাওয়া উপযোগী গাছপালা, লতা-গুল্ম ও ক্যাকটাস জন্মায়। কিন্তু বসবাস বা চাষাবাদ ইত্যাদির প্রয়োজনে সেসব গাছপালা, লতা-গুল্ম ও ক্যাকটাসকে বাদ দিয়ে ভিন্ন আঙ্গিকের চাষাবাদ শুরু হলে মাটির গুণগত পরিবর্তন হয়, যা কখনো কখনো ভারি বর্ষণ ও ভূকম্পনের ফলে মাটিধসে রূপ নেয়। পাহাড়ি খাসজমি ইজারা নিয়ে কিংবা এক শ্রেণির ভূমিদস্যু অবৈধভাবে পাহাড় দখল করে বসতবাড়ি তৈরি করে তা নিম্ন আয়ের হতদরিদ্র শ্রেণির কাছে ভাড়া দিচ্ছে। ইচ্ছামতো পাহাড় কেটে, বন উজাড় করে তৈরি করা এসব বসতি মূলত গণমৃত্যু ফাঁদ হয়ে উঠছে।

অনেকের মতে, পাহাড়ধসে ব্যাপক প্রাণহানির জন্য পাহাড়ের ঢালে বসতি গড়ে তোলা মানুষের অজ্ঞতাই দায়ী। তাদের যুক্তি, সমতলের বাঙালিদের পাহাড়ের ভিন্নধারার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব মৃত্যুর মিছিলকে দীর্ঘায়িত করেছে। যুক্তির সমর্থনে উদাহরণ হিসেবে তারা উল্লেখ করে যে গত ছয় বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামে যত মানুষ মারা গেছে, তাদের ৬৪ শতাংশই বাঙালি। নিহত এসব বাঙালির মধ্যে প্রায় সবাই সমতল থেকে যাওয়া পুনর্বাসিত বাঙালি। দুর্যোগ ও ভূ-তত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সত্তরের দশকের মাঝামাঝি রাষ্ট্রীয়ভাবে পাহাড়ে বাঙালি পুনর্বাসন শুরু হলে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় অনেক বসতি গড়ে ওঠে। পাহাড়ের ভিন্ন ভূ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কথা তখন মাথায় রাখা হয়নি, যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে জীবন দিয়ে।

একাধিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলায় প্রায় এক লক্ষাধিক এবং চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরীতে প্রায় এক লক্ষাধিক জনগোষ্ঠী পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে। প্রশাসনের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরীর ১৩টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও টিলার মধ্যে ১১টিতে ৬৬৬টি পরিবার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে। এরই মধ্যে আবারও ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ধসের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, পাহাড়ে কোথাও কোথাও ফাটল দেখা দিয়েছে বলে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। আর বিলম্ব নয়। আরেকটি পাহাড়ধসে আবারও মানবতা ধসের নিচে চাপা পড়ার আগেই পুনরাবৃত্তিরোধে ওষ্ঠসেবার পরিবর্তে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, এবারের পাহাড়ধস বেঁচে থাকা মানুষের জন্যও নতুন হুমকির মাত্রা যোগ করেছে। পাহাড়ধসের পর সাত দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো রাঙামাটির সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ফলে খাদ্য, চিকিৎসাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে।

পাহাড়ধসে মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করতে কালবিলম্ব না করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যেসব ব্যবস্থা পাহাড়ধসে মৃত্যুর মিছিল বন্ধে সহায়ক হতে পারে তা হলো—এক. পাহাড়ে বসবাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি স্থাপনকারীদের স্থায়ীভাবে স্থানান্তরের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা চিহ্নিত করে জরুরি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, সাইক্লোন শেল্টারের আদলে পাহাড়ধস আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ কিংবা বিদ্যমান স্থাপনাকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করে পাহাড়বাসীদের মধ্যে প্রচার; দুই. পাহাড় কাটা বন্ধ করতে সরকারের পাশাপাশি সরকারি প্রতিনিধি, এনজিও ও সুধীসমাজের প্রতিনিধি নিয়ে পাহাড় কর্তন প্রতিরোধ কমিটি গঠন, পাহাড়খেকোদের নাম-পরিচয় প্রকাশ এবং পাহাড় কেটে তৈরি স্থাপনা উচ্ছেদসহ সব আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ, মাটির গভীরে শিকড় প্রোথিত হয় এমন বৃক্ষ দিয়ে বনায়ন এবং তিন. সমন্বিত পাহাড় ও ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতি প্রণয়ন, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু পাহাড়কে সংরক্ষিত ঘোষণা করা এবং পাহাড় লিজ দেওয়া বন্ধ করা।

পাহাড় কাটা, বন উজাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন বন্ধে সাহসী পদক্ষেপ না নিতে পারলে সামনের দিনগুলোতে ভয়ংকর ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। পাহাড় কাটা ও বন উজাড় পাহাড়ধসের পাশাপাশি পরিবেশ বিপর্যয়েরও অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত। যথেচ্ছ পাহাড় কাটার ফলে ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ত্বরান্বিত হচ্ছে, ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে জলবায়ু, পরিবেশ, মাটি, পানি ও প্রাণীবৈচিত্র্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব সৃষ্টি করছে, যা পাহাড়ধসের চেয়েও ভয়ংকর ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ,

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

zhossain@justice.com

Please Share This Post in Your Social Media


© All rights reserved ©  jamunanewsbd.com