মঙ্গলবার, ০৩ অগাস্ট ২০২১, ০৪:০৮ পূর্বাহ্ন

News Headline :
“করোনা মহামারীতে পাঠদানের ক্ষেত্রে বগুড়া পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ একটি মডেল হতে পারে -আলী আশরাফ ভুঞা বগুড়ায় জনস্রোতে ১ জনের কারাদন্ড ৯৮ ব্যাক্তির জরিমানা ‘বঙ্গবন্ধু মাচাং’ উদ্বোধন করে বহিষ্কার যুবলীগ নেতা বগুড়ায় ২৪ ঘন্টায় করোনায় ও উপসর্গে ২৬জনের মৃত্যু, শনাক্ত ১২৬ স্বেচ্ছাসেবক দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোস্তাফিজুর করোনায় আক্রান্ত প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের তথ্য চেয়েছে সরকার করোনায় আরও ২৪৬ মৃত্যু, শনাক্ত ১৫,৯৮৯ সরকার শ্রমিকদের মানুষই ভাবে না: জিএম কাদের সোনাতলার মানবিক ওসির সততা ও কর্মদক্ষতায় প্রশংসিত জিয়ার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে সরকার নতুন গীত গাইছে: ফখরুল

মানবসৃষ্ট ভয়াবহ বিপর্যয়ে পাহাড়ে কান্না

এমন বেদনাময় মুহূর্তে একটি গানের কলি মনে পড়ছে, ‘পাহাড়ের কান্না দেখে তোমরা তাকে ঝরনা বলো। ’ পাহাড় যে কাঁদে এই বোধটি এত দিন আমাদের মাথায় কাজ করেনি।

রাষ্ট্র-সরকার-প্রশাসন কেউ পাহাড়ের কান্নার শব্দ কান পেতে শোনার চেষ্টা করেনি। ক্রমাগত নির্যাতন করা হয়েছে পাহাড়ের বুকে। পাহাড় কেটে নতুন নতুন বসতি স্থাপন করা হয়েছে। এই মহা সর্বনাশা কাজটি শুরু হয়েছে একজন জেনারেল রাষ্ট্রপতির হাত ধরে। তিনি অনেক বাঙালি সেটলারকে বসতি গড়ার জন্য পাহাড়ে স্থানান্তর করেন। শুরু হয় পাহাড়ি-বাঙালি দ্বন্দ্ব। এর জন্য জাতিকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। অনেক তাজা প্রাণ ঝরেছে সেই দ্বন্দ্বে। পাহাড়িরা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে পাহাড়িদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। তাদের সঙ্গে ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তিচুক্তি করেন। পাহাড়িরা অস্ত্র সমর্পণ করে। তখনো সেই জেনারেলের দল প্রচণ্ড বিরোধিতা করে সেই শান্তিচুক্তির। এমনও বলা হয়, ফেনী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিরাট অঞ্চল ভারতের অঙ্গরাজ্য হয়ে যাবে। সেই দলের নেত্রী এ চুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার ডাক দেন।

সুখের কথা হলো, তাঁর ডাকে কেউ সাড়া দেয়নি। চুক্তি ঠিকই স্বাক্ষরিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি নামে খ্যাত চুক্তিটি পাহাড়ে আবার শান্তি ফিরিয়ে আনে। ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শুরু হয় পাহাড়ে।

কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয় না। চুক্তির ২০ বছর পরও সেই চুক্তির এতটুকু বাস্তবায়ন আমরা দেখতে পেলাম না। পাহাড়িরা আবার অশান্ত হতে থাকে।

আসল যে কাজটি বিশেষ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় তা হলো ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্য। পাহাড় কেটে নতুন বসতি গড়তেই থাকে। কাজটি সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কারো ভাবনায় কখনো ছিল না। প্রভাবশালীরা নিয়মিত প্রকাশ্যে পাহাড় কেটে মাটি নিয়ে যাচ্ছে। আর এ দৃশ্য প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করে চোখ বন্ধ করে থাকত। কারণ মাটি খোদকরা সবাই প্রভাবশালী এবং তারা সরকারি দলের নেতা। প্রশাসনের আর কিছু বলার সাহস থাকে? তারা বরং পরোক্ষভাবে মাটি খোদকদের সহযোগিতা করেছে। আর তারই করুণ পরিণতি পাহাড়ধস।

প্রকৃতির ধর্ম—সে আঘাত সইতে সইতে একদিন এমন ভয়ংকর হয়ে ওঠে, তখন তাকে আর বাগে আনা যায় না। আমরা নিষ্ঠুর মানুষরা নির্মমভাবে পাহাড়ের বুকে নিয়মিত আঘাত করে চলেছি, উল্টো পাহাড় কিছু করবে না, এমন যারা ভেবেছিল তাদের ভাবনা যে বালখিল্যতায় ভরপুর ছিল, তার প্রমাণ আমরা পেলাম দুই দিন আগে। অতিবৃষ্টিজনিত পাহাড়ি ঢল ছাড়াও পাহাড় কেটে অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন ও গাছপালা উজাড় করার কারণে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। প্রকৃতি যখন প্রতিশোধ নেয় তখন তা হয় ভয়ংকর তাণ্ডব এবং প্রলয়ংকরী ও জীবনবিনাশী প্রতিশোধ।

তারই নমুনা দেখলাম আমরা রাঙামাটি ও পার্বত্য অঞ্চলে। পাহাড়ধসে এখন পর্যন্ত ১৫১ জন প্রাণ হারিয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে আরো অনেক মানুষ। ঘুমন্ত মানুষজন কেউ কিছু বোঝার আগেই মৃত্যু তাদের ছিনিয়ে নিয়ে গেছে।

একজন পরিবেশবিদ বলেছেন, মূলত অতিবৃষ্টি ও পাহাড় কেটে অপরিকল্পিতভাবে বসতি স্থাপন করার কারণে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। তিনি আরো বলেছেন, অতীতে আমরা পাহাড়ি লোকদের পাহাড়ধসে মারা যেতে তেমন দেখিনি। কারণ তারা পাহাড় ব্যবহার করতে জানত। সমস্যা বাধিয়েছে সেটলার বাঙালিরা। তারা ইচ্ছামতো পাহাড়কে ব্যবহার করছে। যেখানে-সেখানে পাহাড় কেটে ফেলছে। গাছগাছালি কেটে বন উজাড় করছে। প্রশাসন থাকে চোখ বন্ধ করে। আর স্থানীয় সংসদ সদস্যরা চোখে টিনের চশমা পরে এসব এড়িয়ে চলেন। কারণ সবখানে তাঁদের তৃণমূল নেতারা জড়িত। তাঁদের সবারই মূল ভরসা তৃণমূল নেতাকর্মী। তারাই সংসদ সদস্যকে নেতা বানায়। অতএব, তাদের হাত খরচ বাবদ এ ধরনের কাজকে তাঁরা নীরবে উৎসাহিত করেন। আর তার বলি হলো ১৫১ জন নিরীহ মানুষ।

মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো এসে বিদ্ধ করছে আরো একটি ভয়ংকর ঘটনা। উদ্ধারকাজে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে চারজন সেনা সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।

মঙ্গলবার ভোরে রাঙামাটির মানিকছড়িতে একটি পাহাড়ধসে মাটি ও গাছ পড়ে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এ খবর পেয়ে তাত্ক্ষণিকভাবে রাঙামাটি জোন সদরের নির্দেশে মানিকছড়ি আর্মি ক্যাম্প থেকে একটি দল সেখানে যায়। তারা সড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করতে উদ্ধারকাজ শুরু করে। উদ্ধারকাজ চলার সময় সকাল ১১টার দিকে পাহাড়ের একটি বড় অংশ উদ্ধারকারীদের ওপর ধসে পড়লে তাঁরা মূল সড়ক থেকে ৩০ ফুট নিচে পড়ে যান। পরে একই ক্যাম্প থেকে আরো একটি উদ্ধারকারী দল এসে দুজন সেনা কর্মকর্তাসহ চারজন সেনা সদস্যকে নিহত ও ১০ জন সেনা সদস্যকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে। নিহত সেনা কর্মকর্তারা হলেন মেজর মাহমুদুল হক, ক্যাপ্টেন মো. তানভির সালাম, সৈনিক মো. শাহিন আলম ও করপোরাল মোহাম্মদ আজিজুল হক। আইএসপিআর সূত্র বলছে, আহত সেনা সদস্যদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁদের হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় সিএমএইচে আনা হয়েছে। এ ছাড়া উদ্ধারকাজের সময় ভূমিধসে আটকে পড়া সেনা সদস্য সৈনিক আজিজুর রহমান এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

এমন মর্মান্তিক ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে গেছে গোটা জাতি। তাদের প্রশ্ন, এই যে ট্রাকে ট্রাকে কাঠ বোঝাই হয়ে সেটা প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে রাজধানীতে আসে—সেগুলো কোত্থেকে আসে? যদি সেগুলো পাহাড়ি ও অবৈধ গাছ হয়ে থাকে, তাহলে প্রশাসনের নাগের ডগা দিয়ে সেগুলো রাজধানীতে আসে কিভাবে? আর সেই কাঠের ফার্নিচার ঘরে তুলে আমরা নিজেদের কুলীন ভাবছি। একবারও ভেবে দেখছি না, এ কাঠগুলো কোথা থেকে এলো? এ গাছগুলোর সঙ্গে হাজার হাজার মানুষের জীবন জড়িত।

পাহাড় ফাঁকা হওয়ার কারণে ‘মোরা’র পর এই অতিবর্ষণে মাটি নরম হয়ে ধসে যেতে থাকে। ধসতে ধসতে ঘুমন্ত মানুষদের জানমাল সবই কেড়ে নিয়ে গেছে। কারো পরিবারের সব সদস্য মারা গেছে, কোনো পরিবারে শুধু পুরুষ কর্মী বেঁচে আছে। এটাকে ঠিক বেঁচে থাকা বলে না। সব হারিয়ে একা একজন মানুষ কিভাবে বেঁচে থাকবে। এ দুর্ঘটনায় কোনো নেতা প্রাণ হারাননি। তাই তাঁদের বেদনার ভার নেই। তাঁরা এখন ছুটছেন দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে। এটা তাঁদের এক ধরনের পিকনিক—অর্থাৎ আনন্দভ্রমণ। তাঁরা দুর্ঘটনাস্থলে যাচ্ছেন, সঙ্গে যাচ্ছেন মিডিয়ার কর্মীরা। তাঁরা তাঁদের ছবি তুলবেন এবং সেগুলো নিউজের সময় দেখাবেন। ভাবখানা যে তাঁরা দুর্গতদের জন্য জীবন কোরবান করে দিচ্ছেন! এত দিন তাঁদের হুঁশ হয়নি। এখন হয়েছে, যখন রাতারাতি দেড় শতাধিক মানুষ কাদামাটির তোড়ে ভেসে নিখোঁজ হয়ে প্রাণ হারাল। সে পাহাড়ি ঢলে কেউ মৃত্যুবরণ করেছে। কেউ নিখোঁজ হয়ে গেছে।

আমরা নদী ধ্বংস করেছি। ঐতিহ্যবাহী বুড়িগঙ্গাকে এখন আর নদী বলা যায় না। আমরা পাহাড় কেটে সমতল বানিয়ে ফেলেছি। আমরা বন উজাড় করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করেছি। আমরাই আমাদের হন্তারক। সেই হত্যা আরো ত্বরান্বিত হবে আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে। আমরা প্রকৃতি ধ্বংসকারী। আমরা পরিবেশ ধ্বংসকারী। আমরা প্রাকৃতিক মত্স্য ধ্বংসকারী। এত এত অমানবিক ধ্বংসকারীদের প্রকৃতি ছাড় দেবে কেন? এর জের চলবে আরো অনেক। বছরের পর বছর। যদি সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহল তৎপর না হয়, তাহলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

Please Share This Post in Your Social Media


© All rights reserved ©  jamunanewsbd.com