শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১, ০১:৪৩ অপরাহ্ন

বসন্তের বাতাসে কৃষ্ণচূড়া

নয়ন রায় ঃ বসন্তের বাতাসে ঋতুরাজ বসন্তের কৃষ্ণচূড়া যখন জ্বলে উঠে এই প্রকৃতির বুকে তখন সব বাঙালীর হৃদয়কেই দোল দেয়। বাংলার প্রকৃতিতে কৃষ্ণচূড়ার উপস্থিতি এত প্রবল যে সব গাছ, সব রংকে ম্লান করে কৃষ্ণচূড়া জেগে ওঠে অম্লান রূপ ও রসে।  গ্রীষ্মে সবচেয়ে চটকদার রঙের যে ফুলটি অনেক দূর থেকে আমাদের দৃষ্টি কাড়ে তার নাম কৃষ্ণচূড়া। কিন্তু এমন টকটকে লাল রঙের ফুলটির নাম কেন কৃষ্ণচূড়া এই প্রশ্ন হয়তো অনেকের মাথায় ঘুরে-ফিরে এসেছে বারবার। শুধু তাই নয়, রাধাচূড়া ও কনকচূড়া নামে আরও দুটো সুদর্শন ফুলও রয়েছে। একদিকে রাধা ও কৃষ্ণের প্রসঙ্গ, অন্যদিকে এই তিন ফুলের নাম নিয়ে রয়েছে বিভ্রান্তি। কেউ কেউ এদের চেনেন ভুল নামে। আসলে এই তিন ফুলের কোনোটিই এখানকার স্থানীয় নয়। কৃষ্ণচূড়ার আদি আবাস পূর্ব আফ্রিকার মাদাগাস্কার, রাধাচূড়ার জন্ম ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর কনকচূড়ার জন্মস্থান শ্রীলঙ্কা বা অস্ট্রেলিয়া। বৃক্ষগুলো ভারত উপমহাদেশে এসেছে বড় জোর তিন থেকে চার শ বছর আগে। কিন্তু অনেকেই মনে করেন মহাভারতের যুগে রাধাকৃষ্ণের নামে ফুলগুলোর নামকরণ করা হয়। মূলত মহাভারতে রাধাকৃষ্ণের প্রসঙ্গ প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো। সেই সূত্রে ফুলগুলোর নামকরণ আরও অনেক পরের ঘটনা। আমরা জানি, শ্রীমতী রাধা মানবিক ও ঐশ্বরিক যে অর্থেই বলি না কেন, শ্রীকৃষ্ণকে ভালোবেসেছিলেন। এই ভালোবাসায় রাধার আকাঙ্ক্ষার তীব্রতাও কম ছিল না। তবুও শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে ফেলে গোকুল ছেড়ে গিয়েছিলেন। রাধাকৃষ্ণের এই প্রেম আখ্যান এখনো অমর হয়ে আছে। কিন্তু কৃষ্ণচূড়া তো দেশি গাছ নয়। আবার কৃষ্ণ হলেন একজন পৌরাণিক পুরুষ। তাহলে বিদেশ থেকে আসা এই ফুলটির নাম কেন কৃষ্ণচূড়া হলো? ধারণা করা হয় যে হয়তো কৃষ্ণের মাথায় চুলের-চূড়া বাঁধার ধরন থেকেই এই নাম হতে পারে। আবার এই নামটি কোনো নিসর্গী, কবি বা উদ্ভিদবিজ্ঞানীও দিতে পারেন বলে মনে করা হয়। তবে কে, কখন, কীভাবে এই ফুলগুলোর নামকরণ করেন, তার সঠিক ইতিহাস এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। রাধাচূড়ার ক্ষেত্রেও প্রায় একই মতবাদ রয়েছে। কৃষ্ণচূড়া এর অন্যান্য নাম : কৃষ্ণচূড়া, গুলমোহর, গুলমো্‌র, রক্তচূড়া। ইংরেজি নাম : Royal Poinciana, Flamboyant, Flame tree, Peacock Flower । বৈজ্ঞানিক নাম : Delonix regia । শ্রীমতী রাধাকে আরও অমর করে রাখতেই পুরাণের রাধাকে বাস্তবের পুষ্পজগতে স্থান দেওয়া হয়। লাল ও হলুদ রঙের কমনীয় এই ফুলের মধ্যেই অনুরাগীরা খুঁজে পাবেন তাঁদের কাঙ্ক্ষিত রাধাকে। সবকিছু মিলিয়ে আমরা পেলাম রাধা-কৃষ্ণ নামে দুটি নান্দনিক ফুল। এবার কনকচূড়া প্রসঙ্গ। এই ফুলের পোশাকি নাম পেলটোফোরাম। আমাদের নিসর্গীরা নামকরণ করেছেন কনকচূড়া। তবে অনেকেই ভুল করে এই ফুলকে রাধাচূড়া নামে ডাকেন। আদতে ভুলের সূত্রপাত ভারত থেকে। সেখানে একসময় কৃষ্ণচূড়াকে রাধাচূড়া আর রাধাচূড়াকে কৃষ্ণচূড়া নামে ডাকা হতো। তবে ইদানীং সঠিক নামের ব্যবহার শুরু হয়েছে। এই তিন ফুলের বর্ণ, গড়ন ও উচ্চতার দিক থেকে নানা বৈসাদৃশ্য রয়েছে। যেমন কৃষ্ণচূড়া ও রাধাচূড়ার লাল ও হলুদ রং দেখা যায়। তবে কনকচূড়ার একটিই রং, হলুদ। কৃষ্ণচূড়া এবং কনকচূড়ার প্রস্ফুটনকাল গ্রীষ্ম হলেও রাধাচূড়া প্রায় সারা বছরই দেখা যায়। তবে এই তিনটি বৃক্ষই Caesalpinaceae পরিবারের। কেবল আনন্দানুভূতির সঙ্গেই নয়, কৃষ্ণচূড়া কখন যেন জড়িয়ে গেছে আমাদের চেতনার অনুষঙ্গে। শুধু ফুল নয়, পাতার ঐশ্বর্যেও কৃষ্ণচূড়া অনন্য। এই পাতার কচি সবুজ রঙ এবং সূক্ষ্ম কারুকর্ম আকর্ষণীয়। নম্র, নমনীয় পাতাদের আন্দোলন দৃষ্টিশোভন। এ গাছে পাতার নিবিড়তা নেই, তবু রৌদ্রশাসনে সক্ষম। কৃষ্ণচুড়া জটিল পত্রবিশিষ্ট এবং উজ্জ্বল সবুজ। পাতা দ্বিপক্ষল, ৩০-৬০ সে মি পর্যন্ত লম্বা, ২০-৪০ টি উপপত্র বিশিষ্ট। পত্রকগুলি ক্ষুদ্র, ১ সে মি লম্বা। দেশে শীত-গ্রীষ্মে কৃষ্ণচূড়ার পাতা ঝরে যায় অনেকটাই। প্রায় পত্রহীন গাছে গাছে বড় বড় থোকায় থোকায় জাপটে আসে কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুল। তখন গাছে অল্প পরিমাণই পাতা থাকে। কিন্তু লাল ফুলের মাঝে পাতাগুলো মিলিয়ে যায়। শুষ্ক অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে কৃষ্ণচূড়ার পাতা ঝরে গেলেও, নাতিষীতোষ্ণ অঞ্চলে এটি চিরসবুজ। যখন খুব ক্লান্ত সময় কাটে তখন এই কৃষ্ণচূড়ার নিচে বসলে আলাদা একটা শান্তি পাওয়া যায়। খোদার কি সৃষ্টি দেখুন এত সুন্দর সব সৃষ্টি করেছেন আমাদের জন্য। প্রেমের সাথে কৃষ্ণচূড়ার একটা গভীর সম্পর্ক আছে। যা অতীতে খুজে দেখা যায়। কৃষ্ণচূড়া দিয়ে কত যে গান, কবিতা, লেখালিখি আছে তার কোন হিসাব নেই। একটা গান মনে হয় আমার সাথে আরও অনেকের পছন্দ হবে সেই বিখ্যাত শিল্পি “কিশোর কুমার” এর গাওয়া “আশা ছিল, ভালোবাসা ছিল” গানটি আজ সবার মন কেরে নিয়েছে। এই গানেও বলা হয়েছে ” এই সেই কৃষ্ণচূড়া, যার তলে দাড়িয়ে, চোখে চোখ হাতে হাত, কথা যেত হারিয়ে” । প্রেমের আরেক নাম “কৃষ্ণচূড়া”। যতই দেখি তবুও দেখতে ইচ্ছে করে। সবার শুভ কামনা করে এখানেই সেস করছি।

নয়ন রায়

সাংবাদিক, ঢাকা, বাংলাদেশ।

noyonroy13@yahoo.com

Please Share This Post in Your Social Media


© All rights reserved ©  jamunanewsbd.com