Home / ইতিহাস ও ঐতিহ্য / মহাস্থানগড়ের বিখ্যাত কটকটির ইতিহাস

মহাস্থানগড়ের বিখ্যাত কটকটির ইতিহাস

সামিয়া সুলতানাঃ কোথাও বেড়াতে গেলে আমি সবসময় লোকাল ট্রান্সপোর্টের ওপর নির্ভর করি। কিন্তু বগুড়ার প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা থেকে মহাস্থানগড় যাবার জন্য সরাসরি কোন লোকাল ট্রান্সপোর্ট নেই। অগত্যা ভেঙে ভেঙে দুই জায়গায় অটো বদলে যখন আমরা মহাস্থানে পৌঁছলাম, তখন বেলা বাড়তে শুরু করেছে। প্রথমে গড়ে নামার কথা থাকলেও, সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে যাদুঘরের দিকে যাওয়া হলো। স্থানীয় এক বড় আপু ছিলেন সাথে। তিনি গড়ের কাছাকাছি নেমে দুই মিনিট সময় চেয়ে নিলেন। সময়টা তখন বর্ষাকাল হলেও ভ্যাপসা গরম ছুটেছে। এদিকে অটোর ঝাঁকুনিতে সকালের নাস্তাও পেট থেকে উবে গেল।

কিছু পেটে পড়লে মন্দ হতো না- এমনটি ভাবতে ভাবতেই দেখি আপু ফিরে আসছে। কাছে এসে আমার হাতে একটি প্যাকেট ধরিয়ে দিলেন। সাদা কাগজে মোড়ানো প্যাকেটটি খুলতেই চারকোণা বিস্কুট আকৃতির অদ্ভুত এক মিষ্টান্ন বের হয়ে এলো। দেখতে বেশ উজ্জ্বল চকচকে। রঙটাও মনে ধরল। আর উপরিভাগের নরম প্রলেপটি একে খুব লোভনীয় করে তুলেছে। নাম জিজ্ঞেস করতেই উনি বললেন, “খেয়ে দেখো আগে। নাম পরে শুনো।”

(কাগজের সুরক্ষায় রাখা মহাস্থানের কটকটি)

আপুর কথা শুনে ঝটপট মুখে পুরলাম একটা। খুব নরম নয়, অথচ মুচমুচে স্বাদে ভরে উঠল মুখটা। আমার চেহারার ভাবভঙ্গি দেখেই কিনা বন্ধুদের মধ্যে কয়েকজন হাতে হাতে খাওয়া শুরু করল। অটোর মধ্যেই জমে উঠল চমৎকার এক স্ন্যাকসের আড্ডা। খাওয়া শেষ হলে যখন তৃপ্তির ঢেকুর তুলছি, তখনই আপু বললেন, “এই হলো মহাস্থানের বিখ্যাত কটকটি।” শুনে আমরা সবাই মিলে হইচই শুরু করে দিয়েছি এই বলে যে, কেন আমাদের আগে বলা হলো না? খেতে খেতে ছবি তুলতে পারতাম।

আপুটি তখন মুচকি হেসে বললেন, “সেই জন্যই আগে বলিনি। ছবি তোলার চেয়ে এর স্বাদ গ্রহণ করা উত্তম। এখন বলো, কেমন লাগল আমাদের কটকটি?” সবাই একবাক্যে উচ্চারণ করলাম, “দুর্দান্ত”। সত্যিই, ছোটবেলায় ভাঙাচোরার বদলে, কিংবা হাট থেকে আনা কটকটিতে একটি শক্ত আর অসাধ্য ব্যাপার জড়িয়ে ছিল। সেটা ছিল আসলেই কটকটে শক্ত এক মিষ্টান্ন। ষাটোর্ধ্ব মানুষের পক্ষে সেই কটকটি কিছুতেই গলাধঃকরণ করার কথা ভাবাও অসম্ভব ছিল। কিন্তু মহাস্থানের কটকটি এতটা শক্ত না হলেও সাধারণ কটকটির প্রায় সব গুণাগুণই বিদ্যমান। কেবল ভিন্নতা এর স্বাদে। প্রতি কামড়ে ভেতরের চালের গুঁড়াগুলো যখন আপনার দাঁত ও মাড়ির আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়বে, তখন আপনার ভেতরটা এর কারিগরদের প্রশংসায় ভাসাবে। আপনার জানতে ইচ্ছে করবে কোন জাদুর ছোঁয়ায় এই অসামান্য মিষ্টান্নটি তৈরী করেছেন তারা!

অথচ এই বিখ্যাত খাবারটি তৈরি করতে আহামরি কিছু ব্যবহৃত হয় না। প্রস্তুত প্রণালীও যে খুব কঠিন, তাও নয়। প্রথমে ভেজা চালকে মেশিনে অথবা ঢেঁকির সাহায্যে গুঁড়া করে আটা করতে হয়। এরপর উক্ত আটার সাথে খানিকটা রান্নার তেল ও পানি মিশিয়ে খামির তৈরি করা বেশ সহজ। খামিরকে একটি পাত্র বা শীটের ওপর নিয়ে ৩/৪ ইঞ্চি পুরুত্বে বিছিয়ে কারিগর সেটা এক বর্গইঞ্চি আকারে চাকু দিয়ে কেটে অন্য পাত্রে জমা করে রাখে।

এরপর একটি কড়াইয়ে সয়াবিন তেল বা ডালডা গরম করে তার মধ্যে কেটে রাখা চালের আটার টুকরোগুলো একটু লালচে করে ভেজে নেওয়া হয়। পাশাপাশি অন্য এক কড়াইয়ে আখের গুঁড় জ্বাল দিয়ে আঠালো ভাব চলে এলে তার মধ্যে বরফি আকৃতির ভাজা টুকরোগুলো ছেড়ে দিয়ে খানিকক্ষণ নাড়াচাড়া করে। জ্বাল দিতে দিতে যখন গুঁড়গুলো বেশ এঁটে আসে এবং বরফিগুলোর গায়ে প্রলেপ আকারে লেগে যায়, তখন তা নামিয়ে রাখা হয়। এভাবেই তৈরি হয়ে যায় মহাস্থানের বিখ্যাত কটকটি।

(দোকানো সাজানো বাহারি রঙের কটকটি)

এবার আসুন জেনে নেয়া যাক এর খানিকটা আদি ইতিহাস। মুসলমান কিংবা হিন্দু, দুই ধর্মের অনুসারীদেরই আদি তীর্থস্থান বগুড়ার এই প্রাচীন নগরী মহাস্থানের ইতিহাস প্রায় দুই হাজার বছরের পুরানো। দ্বাদশ শতাব্দীতে এখানে বসবাসকৃত হিন্দু রাজাদের শোষণ থেকে মুক্তি পায় প্রজাগণ। হযরত শাহ সুলতান মাহীসওয়ার বলখী এর আগমনের পর মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন ঘটে। এর মাধ্যমে পুন্ড্রনগর নামের প্রাচীন সভ্যতাটির বিলুপ্তি ঘটে। পরবর্তীতে শাহ সুলতান ধর্ম প্রচার করতে করতে এখানেই মারা যান। এলাকার মানুষ তার মাজারে নিয়মিত যাওয়া আসা করতেন। সেই সময় থেকেই মহাস্থানের কটকটির প্রচলন শুরু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

তবে লোকমুখে কথিত আছে, আজ থেকে প্রায় ১৫০-২০০ বছর আগে সাধক পুরুষ হযরত শাহ সুলতান বলখী (রঃ) এর মাজারের পাদদেশে জহর মাহমুদ নামক জনৈক ব্যক্তি মহাস্থানে প্রথম কটকটি ব্যবসা শুরু করেন। তার চতুর্থ বংশধর মোঃ আশরাফুল ইসলাম আজও এই ব্যবসার সাথে জড়িত। আর মহাস্থানের বাসস্ট্যান্ড, মাজার গেট, গড়, ঈদগাহ মাঠ, জাদুঘর মিলিয়ে মোট পঞ্চাশটি দোকানে কটকটি বিক্রি হয়। ফেরি করেও অনেক ভ্রাম্যমান বিক্রেতা কটকটি বিক্রি করে থাকেন।

(ভ্রাম্যমান দোকান ফেরি করে কটকটি বিক্রয় করছে)

বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় কটকটির মতো এখনও অনেক ক্ষুদ্রশিল্প আছে, যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে দিনাতিপাত করছে অনেক পরিবার। এমনই এক শিল্প বগুড়ার মহাস্থানের এই কটকটি। ঐতিহ্যের পাশাপাশি জীবিকার মাধ্যম হিসেবে আজও চলমান।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে রংপুরের বাসে গেলে সরাসরি মহাস্থানগড়ের সামনে নামা যায়। এছাড়া শহরের সাতমাথা থেকে সিএনজি রিজার্ভ করে যেতে পারেন। লোকালে যেতে চাইলে শহরের দত্তবাড়ি এলাকা থেকে শেয়ারের সিএনজি করে সহজেই খেতে যেতে পারেন এই ঐতিহ্যবাহী খাবারটি।

দোকানের নাম

মহাস্থান গড়ের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ‘শাহাদত কটকটি ভাণ্ডার’, ‘মিলন কটকটি ভাণ্ডার’, ‘শাহিন কটকটি ভাণ্ডার’, ‘লাল মিয়া কটকটি হাউস’, ‘হামু মামা কটকটি প্যালেস’, ‘লায়েব কটকটি ভাণ্ডার’, ‘ফাতেমা কটকটি ভাণ্ডার’, ‘আলাউদ্দিন কটকটি ভাণ্ডার’, ‘জিন্নাহ কটকটি ভাণ্ডার’, ‘ফাতেমা কটকটি প্যালেস’, ‘আলাউদ্দিন কটকটি ভাণ্ডার’ এর মতো অসংখ্য দোকান। এসব দোকানে গড়ে প্রতিদিন এক থেকে দেড় লক্ষ টাকার কটকটি বেচাকেনা হয়।

দাম

বগুড়ার প্রসিদ্ধ এই খাবারটির জন্যে আপনাকে প্রতি কেজির জন্য গুনতে হবে মাত্র ৮০-১৪০ টাকা।

Check Also

গৌর গোপাল চন্দ্রের জাদুর ছোঁয়ায় বগুড়ার বিখ্যাত দই

যমুনা নিউজ বিডিঃ বাঙালি জাতির একটি অদ্ভুত টাইটেল হলো, ‘ভোজন রসিক’। ভোজন প্রিয় এই জাতির …

error: Content is protected !!
%d bloggers like this:

Powered by themekiller.com