Home / আন্তর্জাতিক / ভারতে বেশির ভাগ গণধোলাইয়ে মৃত্যুর কেন্দ্রে এখন গরু

ভারতে বেশির ভাগ গণধোলাইয়ে মৃত্যুর কেন্দ্রে এখন গরু

যমুনা নিউজ বিডি ঃ ভারতে গত চার-পাঁচ বছরে যে সব ‘মব লিঞ্চিং’ বা গণধোলাইয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে, তার বেশির ভাগের মূলেই গরু রক্ষার ইস্যু আছে বলে জানাচ্ছে একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন।

শুধু তাই নয়, পরিসংখ্যান আরও বলছে এই সব লিঞ্চিংয়ের শিকার হয়ে যারা মারা গেছেন তাদের বেশির ভাগই মুসলিম।

গণধোলাই বা গণপিটুনি ভারতে যে আগে ঘটত না এমন নয় – কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই মারধরের প্যাটার্নে বিরাট পরিবর্তন এসেছে।

কমনওয়েলথ হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভ জানাচ্ছে, গরু রক্ষার বাহানায় দেশের নানা প্রান্তে মুসলিম বা দলিতরা এখন হামলার শিকার হচ্ছেন, আর আইনি প্রতিকারও তাদের অধরা রয়ে যাচ্ছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই।

বছর কয়েক আগেও ভারতে যে সব গণধোলাইয়ের ঘটনা ঘটত তার বেশির ভাগই ছিল ডাইনি সন্দেহে কাউকে পিটিয়ে মারার ঘটনা, কিংবা দলিতদের ওপর উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সংগঠিত হামলা।

কিন্তু সোয়া চার বছর আগে ভারতের বর্তমান বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেখা যাচ্ছে, ওই ধরনের হামলার তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে গরু বাঁচানোর নামে মব লিঞ্চিং আর তাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত হচ্ছেন এক বিশেষ ধর্মের মানুষজন।

দিল্লিতে কমনওয়েলথ হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভ বা সিএইচআরআইয়ের কোঅর্ডিনেটর দেভিকা প্রসাদ বলছিলেন, “এই মৃত্যুর ঘটনাগুলোয় বেসিক পোস্ট মর্টেম বা সাধারণ একটা কাটাছেঁড়া করলে দেখা যাবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আক্রমণের নিশানা হচ্ছেন মুসলিমরা, আর সেই সব হামলার কেন্দ্রে আছে গরু।”

“পুলিশের কাছ থেকে আক্রান্তরা প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাচ্ছেন না, কোনও কোনও রাজ্যে তো পুলিশ হামলাকারী গোরক্ষক বাহিনীর মতো আইন-বহির্ভূত সংস্থাগুলোর সঙ্গে হাত হাত মিলিয়েও কাজ করছে। আর দেশের ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের কাছ থেকে ভিক্টিমদের যে প্রতিকার পাওয়া উচিত ছিল, সেটাও তারা পাচ্ছেন না!”

কিন্তু গরু-কেন্দ্রিক মব লিঞ্চিংয়ের ঘটনা ভারতে গত তিন-চার বছরে ঠিক কতটা বেড়েছে?

ভারতে ডেটা জার্নালিজমের ক্ষেত্রে একটি শীর্ষস্থানীয় সংস্থা ইন্ডিয়াস্পেন্ডস, তাদের সমীক্ষা বলছে ২০১২ ও ২০১৩ সালে যেখানে দুবছরে সারা দেশে এই ধরনের মাত্র দুটো ঘটনা ঘটেছিল, সেই জায়গায় ২০১৪ সালের পর থেকে এখনও পর্যন্ত এরকম ঘটনা ঘটেছে আরও অন্তত ৯২টি।

ইন্ডিয়াস্পেন্ডসের সহ সম্পাদক অ্যালিসন সালদানহা বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “গত আট-নবছরে আমরা মোট গরু-কেন্দ্রিক যে ৯৪টা হামলার প্রমাণ পেয়েছি, তার ৯৭ শতাংশই ঘটেছে ২০১৪-র মে মাসে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর।”

“আমাদের ডেটা আরও বলছে, ৫৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই আক্রান্তরা ছিলেন মুসলিম আর লিঞ্চিংয়ের শিকার হয়ে যারা নিহত হয়েছেন তাদের তো প্রায় ৯০ শতাংশই মুসলিম। হামলাকারীরা এই ভাবনা থেকেই প্রণোদিত হয়েছেন যে আমাদের গোমাতাকে যে কোনও মূল্যে বাঁচাতে হবে এবং তার জন্য মানুষ হত্যা করলেও কোনও সমস্যা নেই।”

সিএইচআরআইয়ের আন্তর্জাতিক অধিকর্তা সঞ্জয় হাজারিকা অবশ্য বিশ্বাস করেন, এই সব মব লিঞ্চিংয়ের মনস্তত্ত্বের পেছনে নানা জটিল আর্থসামাজিক ফ্যাক্টরও কাজ করছে।

ড: হাজারিকা বিবিসিকে বলছিলেন, “খালি চোখে যেটুকু আমরা দেখতে পাচ্ছি তার গভীরে গেলে বা পর্দার আড়ালে উঁকি দিলে হয়তো আমরা দেখব এই সব লিঞ্চিংয়ের পেছনে অর্থনৈতিক কারণটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।”

“দ্বিতীয়ত, এই দোষীদের আইনের কাঠগড়ায় আনতে খুব কড়া ব্যবস্থা নেওয়া দরকার – কিন্তু খুব কম রাজ্যের পুলিশ-প্রশাসনের ভেতর আমরা সেই তাগিদটা দেখছি।”

“লিঞ্চিং ঠেকাতে তো সুপ্রিম কোর্টের আদেশও এসেছে, কিন্তু সব কিছু নির্ভর করে কীভাবে আপনি সেই আদেশের রূপায়ন করবেন তার ওপর।”

“আসলে আইন করে তো ঘৃণা ঠেকানো যায় না, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বোঝাপড়াটাই হল আসল চাবিকাঠি”, বলছেন সঞ্জয় হাজারিকা।

বস্তুত স্বাধীনতার সত্তর বছরেরও বেশি সময় পর এসে ভারত যেন এখন হঠাৎ আবিষ্কার করছে, নতুন এক ধরনের গণধোলাইয়ের ভাইরাস এখন দেশময় ছড়িয়ে পড়ছে।

আর তাতে কখনও গরু-মহিষের ট্রাক নিয়ে যেতে গিয়ে মারা পড়ছেন মুসলিমরা, কিংবা মৃত গরুর ছাল ছাড়াতে নিয়ে যাওয়ার সময় কোপ পড়ছে দলিতদের ওপর!

Check Also

পাকিস্তান সীমান্তে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর ১১ সদস্য অপহৃত

যমুনা নিউজ বিডি:  পাকিস্তান সীমান্ত থেকে ইরানের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর ১১ জন সদস্যকে সন্ত্রাসীরা অপহরণ …

Powered by themekiller.com