Home / অর্থনীতি / বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের আলামত : আমাদের করণীয়

বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের আলামত : আমাদের করণীয়

যমুনা নিউজ বিডিঃ করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে একাধিক দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। গত ৭ মে সংস্থাটির মানবিকবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি মার্ক লোকক এই সতর্কতার কথা জানান।

একাধিক দুর্ভিক্ষের অপচ্ছায়া তাঁতিয়ে উঠছে। এর আগে মার্চে করোনার কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করে জাতিসংঘ। এদিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সাম্প্রতিক এক ভার্চুয়াল সেশনে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক ডেভিড এম বিসলে বলেছেন, করোনার কারণে বিশ্বে বর্তমানে প্রতি রাতে ক্ষুধা নিয়ে ঘুমাতে যাওয়া ৮২ কোটি মানুষের সঙ্গে আরও ১৩ কোটি মানুষ যুক্ত হবে।

এদিকে খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘ শিশু তহবিল এবং আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের যৌথ উদ্যোগে গত বছর ১৫ জুলাই প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্বে প্রতি নয়জনের একজন ক্ষুধায় ভুগছে। ফলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ে তোলার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের সংখ্যা ২০১৭ সালে ছিল ৮১ কোটি ১০ লাখ। সে সংখ্যাটি গত বছর রিপোর্ট প্রকাশের সময় দাঁড়ায় ৮২ কোটি ১০ লাখে। প্রতিবেদন মোতাবেক, বিশ্বজুড়েই বাড়ছে অপুষ্টি ও ক্ষুধায় ভোগা মানুষের সংখ্যা। তবে শতকরা হারে এ সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে আফ্রিকান অঞ্চলগুলোতে। সেখানকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশই অপুষ্টিতে ভুগছে। সংখ্যার হিসাবে তা ২৫ কোটি ৬১ লাখ।

লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে এ হার ৭ শতাংশের কাছাকাছি। আর শতকরা হিসাবে আফ্রিকায় অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের সংখ্যা বেশি থাকলেও সংখ্যায় এশিয়ায় বেশি মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। এশিয়ায় প্রায় ৫১ কোটি ৩৯ লাখ মানুষ পুষ্টিহীনতার শিকার। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্ষুধা ও অপুষ্টি নিবারণে উন্নতি করলেও এখনও অঞ্চলটির ১৫ শতাংশ মানুষ ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভুগছে।

গত বছর পর্যন্ত যখন বিশ্বে ক্ষুধা ও অপুষ্টির এই প্রকোপ, তখন এ বছর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো এসেছে করোনার আঘাত। বিশ্ব যে একটি ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ এমন ধারণা এ মুহূর্তে অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়েছে করোনার কারণে। করোনায় আক্রান্ত প্রায় সব দেশই নিজেদের জনগণকে সুরক্ষা দিতে নিয়েছে সংরক্ষণশীল পদক্ষেপ। বেশিরভাগ দেশ তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। যাত্রীবাহী আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ব্যবস্থা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। করোনার প্রভাব পড়েছে বিশ্ব বাণিজ্যে।

বিশ্বব্যাপী আমদানি-রফতানি হ্রাস পেয়েছে। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বিশ্বব্যাপী করোনার প্রাদুর্ভাব কতদিন চলবে সে সম্পর্কে এ মুহূর্তে সঠিক উত্তর কারও জানা না থাকায় নিজ নিজ দেশের জনগণকে সাশ্রয়ী মূল্যে খাবার সরবরাহের তাগিদে খাদ্যপণ্য রফতানি সীমিত অথবা বন্ধ করে দিয়েছে রফতানিকারক অনেক দেশ। ফলে খাদ্য আমদানিকারক দেশগুলো খাদ্যপণ্যের সংকটে পড়তে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোতে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা দেখছে জাতিসংঘ।

প্রশ্ন হল, করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী দুর্ভিক্ষের আলামতে আমাদের কী করণীয়? অবশ্য এ প্রশ্নের উত্তর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই দিয়েছেন। ১০ মে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে এক ভিডিও কনফারেন্সে বলেছেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে নভেল করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী যে দুর্ভিক্ষের আলামত দেখা যাচ্ছে, যে মহামারীর কথা বলা হচ্ছে, তাতে যেন আমাদের দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। অন্তত তাদের খাদ্য নিরাপত্তা যাতে নিশ্চিত হয়।’

করোনার কারণে গত ২৬ মার্চ দেশ লকডাউনের মতো অবস্থায় চলে আসে। শারীরিক তথা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে করোনা বিস্তার রোধে কৃষি খাত বাদে অন্যসব খাতে উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। হোটেল, রেস্তোরাঁ, ট্যুরিজমসহ বন্ধ হয়ে পড়ে এডিপিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা সেবা খাত। যাত্রীবাহী বিমান, ট্রেন, বাস ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় কাঁচাবাজার, ওষুধ, সুপারশপ ও নিত্যপণ্যের দোকান ছাড়া সব ধরনের দোকান-মার্কেট। অধিকাংশ অফিস এবং সব ধরনের আদালত বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বন্ধ ঘোষণা করা হয় সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তে ১০ মে থেকে দোকানপাট, শপিংমল খোলার অনুমতি দিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে হাইকোর্টে এবং অধস্তন আদালতে বিচার কাজ শুরু হয়েছে। তবে আন্তঃজেলা যাত্রীবাহী বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও বিমান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বন্ধ অবস্থা শিথিলের সিদ্ধান্তের পরপরই করোনায় শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। ফলে জীবিকা ও জীবনের মধ্যে কোনটি আগে, তা নিয়ে সমাজে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘মানুষের জীবন-জীবিকা অব্যাহত রাখতে বন্ধ অবস্থা শিথিল করা হচ্ছে’। তবে বন্ধ অবস্থা ধীরে ধীরে শিথিল করা হলেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপে সরকারের কোনো প্রকার শৈথিল্য প্রদর্শন করা উচিত হবে না।

এটা ঠিক, গত দুই অর্থবছরে এবং চলতি অর্থবছরে অনুকূল আবহাওয়ার কারণে দেশ বর্তমানে প্রধান খাদ্য চাল উৎপাদনে স্বনির্ভরতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, চলতি অর্থবছরে আমন, বোরো ও আউশ মিলে ৩ কোটি ৭০ লাখ টন চাল উৎপাদন হবে (বণিক বার্তা ১০ মে), যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫ লাখ ৪১ হাজার টন বেশি। তবে চাল উৎপাদনে দেশ বর্তমানে স্বনির্ভরতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হলেও তা বাহ্যিক আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না।

এর সমর্থনে রয়েছে একাধিক উদাহরণ। আমরা দেখেছি ২০০৭-০৮ অর্থবছরে একাধিক প্রলয়ঙ্করী বন্যা ও সাইক্লোন সিডর কীভাবে আমন ফসলের মারাত্মক ক্ষতি করেছিল। আমনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি ৩০ লাখ ৪৫ হাজার টনের বিপরীতে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৯৬ লাখ ৬২ হাজার টনে (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০০৯)। ওই সময় বৈশ্বিক আর্থিক মন্দার কারণে ভারত ও ভিয়েতনামসহ বেশ কয়েকটি দেশ খাদ্যশস্য (চাল, গম) রফতানির ওপর স্থগিতাদেশ আরোপ করেছিল। এতে উন্নয়নশীল বিশ্বের ক্রেতা দেশগুলোর খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল।

দেশের তৎকালীন নির্দলীয় সরকার চাল আমদানিতে ভীষণ অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিল। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের অকাল বন্যায় সিলেটের হাওর অঞ্চলে বোরোর উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি হিসাবে এ ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয় ১০ লাখ টন, যদিও বেসরকারি হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ১৫ থেকে ২০ লাখ টনে। সরকারের বোরো উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১০ লাখ টন কমে যাওয়ায় এবং উচ্চ শুল্কহারের (২৮ শতাংশ) কারণে চাল আমদানির পরিমাণ পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় (ওই অর্থবছরে শুধু বেসরকারি খাতে ১ লাখ ৩৩ হাজার টন চাল আমদানি করা হয়) ২০১৭-১৮ অর্থবছরের শুরুতে দেশের কমবেশি ৮০ শতাংশের বেশি মানুষের প্রধান খাদ্য মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ৫০-৫২ টাকায় পৌঁছায়, যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছিল। মাঝারি ও সরু চালের দাম ছিল আরও অনেক বেশি।

চাল উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা আমনের উৎপাদন অনেকটা প্রকৃতিনির্ভর। প্রলয়ঙ্করী বন্যা, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, খরা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ ফসলটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নজিরের অভাব নেই। আগামী আমন ফসল যে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? একইসঙ্গে আর যে বিষয়টি মনে রাখতে হবে তা হল, করোনার স্থায়িত্বকাল। যদি ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার গবেষক দলের গবেষণার ফল অনুযায়ী করোনার স্থায়িত্বকাল দু’বছর হয় এবং/অথবা ১৯১৮-১৯ সালের স্পানিস ফ্লুর মতো (স্পানিস ফ্লুতে প্রথম ধাপে ৩০-৫০ লাখ মানুষের মৃত্যু হলেও দ্বিতীয় ধাপে বিশ্বে ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু হয় বলে জানা যায়) সংহার মূর্তি নিয়ে করোনা দ্বিতীয় ধাপে ফেরত আসে, যার আশঙ্কা অনেকে উড়িয়ে দিচ্ছেন না, তখন আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াব?

এমতাবস্থায়, কমপক্ষে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত করোনার স্থায়িত্বকাল বিবেচনায় নিয়ে আমাদের দেশীয় উৎপাদনের সম্পূরক হিসেবে কয়েক লাখ টন চাল আমদানি করে প্রধান খাদ্যের নিরাপত্তা মজুদ গড়ে তুলতে হবে। বেসরকারি খাতে এই আমদানি উৎসাহিত করতে পণ্যটির আমদানি শুল্কে কিছুটা ছাড় দিতে হতে পারে।

খাদ্য চাহিদায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা গমের বার্ষিক চাহিদা কমবেশি ৭০ লাখ টন। সরকারি তথ্য মোতাবেক, চলতি অর্থবছরের ১০ মে পর্যন্ত ৫৯ লাখ ৩৩ হাজার টন গম আমদানি করা হয়েছে, যদিও সরকারি গুদামে পণ্যটির মজুদ দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ লাখ ৭৯ হাজার টনে। সরকারিভাবে আরও অন্তত ৫ লাখ গম আমদানি করে পণ্যটির সরকারি মজুদ বাড়ানো দরকার। মাংস, ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি, গুঁড়াদুধ, ফলমূল, পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ বিভিন্ন মসলায় আমরা বহুলাংশে আমদানিনির্ভর। এসব খাদ্যপণ্যের নিরাপত্তা মজুদ গড়ে তুলতে এখনই পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

সবশেষে ‘মানুষের জীবন-জীবিকা অব্যাহত রাখতে বন্ধ অবস্থা শিথিল করা হচ্ছে’- প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলতে চাই, বন্ধ অবস্থা শিথিল করার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি যেন নিশ্চিত করা হয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা পরিহার করার পরিণতি কী হয়, আমরা যেন দক্ষিণ কোরিয়ার সর্বশেষ অবস্থা থেকে সে শিক্ষা গ্রহণ করি। আর আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতকে আমাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে, যার আভাস ইতোমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

Check Also

তিন শতাংশ প্রবৃদ্ধি যাবে ‘করোনার পেটে’

যমুনা নিউজ বিডিঃ চলতি অর্থবছরে প্রায় ২ দশমিক ৯৫ (প্রায় তিন) শতাংশ জিডিপি (মোট দেশজ …

%d bloggers like this:

Powered by themekiller.com