বই পড়া

বই পড়ে কী হয়? জবাবে পণ্ডিতেরা কত কী বলবেন। তার সবটাই অন্যের মুখে ঝাল খাওয়া। বইপড়ুয়ারাই জানেন আসলে তাতে কী হয়। ভালো একটি বই পড়া যেন প্রিয়জনের সান্নিধ্যের মধুর অনুভূতি। চারপাশ কেমন অপার্থিব হয়ে ওঠে। ভরে যায় অলৌকিক আলোয়।

‘বই’ শব্দটির উৎস ‘বহি’। ‘বহি’ এসেছে আরবি শব্দ ‘ওহি’ থেকে। এর নামটিতেই তাই অলৌকিকের উদ্ভাস। যেন বই আমাকে নিয়ে এখনই উড়াল দেবে চেনা পৃথিবীর বাইরে, অজানা রোমাঞ্চের ভুবনে।

দুর্লভ বইয়ের জন্য অনেকেই ঢাকার নীলক্ষেতে পুরোনো বইয়ের দোকানে যান। বই পড়ে কী হয়? জবাবে পণ্ডিতেরা কত কী বলবেন। তার সবটাই অন্যের মুখে ঝাল খাওয়া। বইপড়ুয়ারাই জানেন আসলে তাতে কী হয়। ভালো একটি বই পড়া যেন প্রিয়জনের সান্নিধ্যের মধুর অনুভূতি। চারপাশ কেমন অপার্থিব হয়ে ওঠে। ভরে যায় অলৌকিক আলোয়।

‘বই’ শব্দটির উৎস ‘বহি’। ‘বহি’ এসেছে আরবি শব্দ ‘ওহি’ থেকে। এর নামটিতেই তাই অলৌকিকের উদ্ভাস। যেন বই আমাকে নিয়ে এখনই উড়াল দেবে চেনা পৃথিবীর বাইরে, অজানা রোমাঞ্চের ভুবনে।

কিন্তু বই কি কেবলই পড়ার? এখানেও সে প্রিয়জনেরই মতো। সংগ্রহের পর ফিরে ফিরে তার গায়ে হাত বোলানো। পাতার ভাঁজে নাক ডুবিয়ে বুক ভরে মিষ্টি গন্ধ নেওয়া। কয়েকটা দিন শয্যায় পাশে পাশে রাখা। তারপর ধীরে ধীরে তাকে আবিষ্কার।

এমনই যে বই, তারও সেই কুলীনতার দিন কি এখন ঢালুর দিকে? সত্যি বলতে কি, অন্তর্জালের জগতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা নবীন প্রজন্মের যা কিছু পড়ার অভিজ্ঞতা, ছাপার জগৎ থেকে সেটা ক্রমশ চলে যাচ্ছে ইন্টারনেটে। ই-বুকের আবির্ভাবের পর রইরই আওয়াজ তুলে সবাই বলতে শুরু করেছিল, বইয়ের দিন এবার অস্তে গেল। কিন্ডল এসে গেছে, ছাপা বইয়ের এবার দাঁতকপাটি। নতুন কারিগরি উদ্ভাবনের একটা চমক নিশ্চয়ই থাকে। তার ধাক্কা প্রথমে লেগেছিল বটে বইয়ের বাজারে। ই-বুক বা অডিও বুকের প্রসার এখনো বাড়ছে, দিনে দিনে। বইয়ের বাজারে প্রথম প্রথম তার কিছুটা ছায়াও পড়েছিল। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, দেখা যাচ্ছে সেসব অতিরঞ্জিত কল্পনা। চমকজাগানো নতুন প্রযুক্তির পাশের আসনে ছাপা বইয়ের প্রাচীন উদ্ভাবনাটি বহাল তবিয়তেই আছে। তার ওপর মানুষের ভরসা বরং আরও বেড়েছে।

বইয়ের পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে বিশ্বব্যাপী নানা পরিসংখ্যান। যুক্তরাষ্ট্রের স্টাটিসকা নামের এক প্রতিষ্ঠান সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষার ফল দিয়ে দেখাচ্ছে যে ২০১৫, ২০১৬, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে সে দেশে যথাক্রমে ৭২, ৭৩, ৭৪ ও ৭২ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক পাঠক কোনো না কোনো ফরম্যাটে বই পড়েছেন। মোটের ওপর সংখ্যার বড় কোনো তারতম্য এ সময়ে হয়নি।

তবে ফরম্যাট তো বড় কথা নয়, আমরা জানতে চাইছি ছাপা বইয়ের খবর। স্টাটিসকা এ নিয়ে দারুণ ভরসাজাগানো একটি তথ্য দিয়েছে। তারা দেখতে পেয়েছে, সিংহ ভাগ পাঠক এখনো ছাপা বই-ই পড়তে বেশি ভালোবাসেন। এ বছর বই পাঠকদের মধ্যে ছাপা বই পড়েছেন ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের ৭৪ শতাংশ, ৩০ থেকে ৪৯ বছর বয়সীদের ৬৫ শতাংশ, ৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের ৫৯ শতাংশ এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের ৬৩ শতাংশ। অবাক করা তথ্য হলো, অন্যদের হারিয়ে দিয়ে ছাপা বই পড়ায় কিন্তু তরুণেরাই এগিয়ে। তরুণদের আগ্রহই তাহলে আগামী দিনের বইয়ের ভরসা। কবি নজরুল বলেছিলেন না ‘জয়, তরুণের জয়।’

তরুণেরা কেন বইয়ের দিকে ঝুঁকছেন? কারণ, তাঁরা বুঝে ফেলেছেন, সামনের সময়টা হবে জ্ঞানভিত্তিক। উদ্ভাবনী জ্ঞান ছাড়া সেই তরঙ্গসংকুল পথে এগোনোর পথ নেই। অনিশ্চয়তার সেই অপার সমুদ্রে বই-ই আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘর। সেই যে দার্শনিক শোপেনহাওয়ার বলেছিলেন, বইপড়া মানুষ চিন্তা করে একটির বদলে একাধিক মাথা দিয়ে। একেকটি বই একেকটি বুদ্ধিদীপ্ত মস্তিষ্ক। তাই যত বই, তত মাথা।

ইন্টারনেট চটজলদি তথ্য দিতে পারে সত্য, কিন্তু গভীরতর জ্ঞান নয়। যে তথ্যটি আমার দরকার, কম্পিউটারের একটি ক্লিকে দ্রুততম সময়ে আমি সেটি পেয়ে যেতে পারি। অন্য কথায়, আমি যা পেতে চাই, ইন্টারনেট আমাকে তা-ই দেয়। কিন্তু বইয়ের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় আছে চমক, যা আমি খুঁজিনি বা ভেবেও দেখিনি, কিন্তু চারপাশের পৃথিবীকে বোঝার জন্য জরুরি, বই আমাকে দেয় তা-ই। বই পড়া মানে শুধু তথ্য পাওয়া নয়, অনেক তথ্যের বিন্যাসে একটি জ্ঞানসৃষ্টির প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া। যেকোনো বই লেখকের সঙ্গে একটি তর্ক বা বোঝাপড়ার সূচনা, একটি ভাবনাজগতের মধ্যে অভিজ্ঞতাভরা সফর। বই পড়ার আগের আমি আর পরের আমি তাই আলাদা দুজন মানুষ। আগের মানুষটির চেয়ে পরের মানুষটি পৃথিবীকে বুঝতে পারেন আরও অর্থপূর্ণভাবে।

বই মোটাদাগে দুই রকমের। একদিকে যদি থাকে জ্ঞানের বই, আরেক দিকে আছে রসের বই। যাকে আমরা বলি প্রবন্ধের বই, তার লক্ষ্য আমাদের মস্তিষ্ক। সেটি আমাদের বুদ্ধিকে ধারালো করে। আর গল্প-উপন্যাস-কবিতার বইয়ের লক্ষ্য আমাদের হৃদয়। তা আমাদের মনকে নিজের ছোট গণ্ডির বাইরে নিয়ে যায়। মানুষের পৃথিবীর জন্য ভালোবাসা তৈরি করে।

বই পড়া আবার নানা প্রকারের। এখানে একটি প্রকারের কথা বলা যাক। একটি হলো অনুভূমিক পড়া। আমাদের বেশির ভাগ পড়াই তা-ই। আমরা বই পড়ছি, আনন্দ পাচ্ছি, তথ্যও পাচ্ছি কিছু কিছু। আরেক রকমের বই আছে, যেগুলো সভ্যতাকে বদলে দিয়েছে। মানুষ আগে যেভাবে চিন্তা করত, সে বইটি বেরোনোর পর চিন্তার ভিত্তিই আমূল পাল্টে গেছে। যেমন প্লেটোর রিপাবলিক, কার্ল মার্ক্সের ডাস ক্যাপিটাল কিংবা সিমন দো বোভায়ার দ্য সেকেন্ড সেক্স। এ বইগুলোর একেকটি পড়া মানে সভ্যতার একেকটি ধাপে পা দিয়ে ক্রমশ ওপরের দিকে উঠে যাওয়া। এ রকম দু-চারটি বই না পড়লে জীবনই তো বৃথা।

থাক বই নিয়ে অত গুরুগম্ভীর কথা। বই পড়ে আনন্দ আহরণের চেয়ে বেশি কিছু আদার ব্যাপারীদের কী দরকার? একজন মানুষ মগ্ন হয়ে বই পড়ছেন, এর চেয়ে অনুপম দৃশ্য কি আর কিছু হতে পারে!

Check Also

চর্যাপদ ও লোকসংস্কৃতি

প্রাগৈতিহাসিক কালে সমগ্র বাংলাদেশ কয়েকটি ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত ছিল। প্রাচীনকালে এসব দ্বীপে বঙ্গাল, …

%d bloggers like this:

Powered by themekiller.com