Home / ইতিহাস ও ঐতিহ্য / পাহাড়ের রাণী সাজেক

পাহাড়ের রাণী সাজেক

যমুনা নিউজ বিডি: জীবনানন্দের রূপসী বাংলার রূপের এক অনিন্দ্যসুন্দর নিদর্শন, অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি, প্রকৃতির রূপসী কন্যা রাঙামাটির সাজেক। ওপারের লুসাই পাহাড় হতে উৎপন্ন কর্ণফুলীর শাখা নদী সাজেকের নামানুসারে এলাকার নাম হয়েছে সাজেক। ৭০২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সাজেক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন। এর উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা, দক্ষিণে খাগড়াছড়ি, পূর্বে ভারতের মিজোরাম, পশ্চিমে রাঙামাটি অবস্থিত।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় আঠারশো ফুট উঁচু সাজেকের দিগন্তবিস্তৃত সবুজাভ ঢেউ খেলানো পাহাড়ের সৌন্দর্য মনকাড়া, হৃদয় হরা। এমন নিসর্গে অবগাহন করলে আশাহতের হৃদয়ে আশা, ভগ্নহৃদয়ে ভালোবাসা জাগবে বৈকি। সাজেকের রূপের এমন সম্মোহনি ক্ষমতা অনির্বচনীয়।

সাজেক ভ্রমণের রোমাঞ্চ শুরু হয় বাঘাই হাট থেকে। চান্দের গাড়ি খ্যাত জীপে উঁচুনিচু পাহাড়ি সর্পিল পথে অবারিত সবুজের সমারোহ ভেদ করে রোলার কোস্টার এর ন্যায় ছুটে চলার আনন্দ অতুলনীয়। সাজেকের প্রকৃত নান্দনিকতার দেখা পেতে খাগড়াছড়ি থেকে দুই ঘণ্টায় প্রায় ৬৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়।

পাহাড়ের রাণী সাজেক। মেঘ পাহাড় বন এই তিনে সাজেক অপরূপা। সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে সাজেকের ঘন সবুজে ঢাকা উঁচুনিচু পাহাড়ের দল সাদা মেঘে ঢাকা থাকে। কখনো মেঘের দল গা ভিজিয়ে দিয়ে যায়। দুই হাত প্রসারিত করলে বোঝা যায় মেঘ ছুঁয়ে যাচ্ছে।রোমাঞ্চকর এমন অনুভূতি বোঝানো যায় না আসলে।

সাজেকে ঘুরে বেড়ানোর যায়গা খুব বেশি নেই। সেখানে আদিবাসী অধ্যুষিত দুটি পাড়া আছে।একটি রুইলুই পাড়া অপরটি কংলাক পাড়া। এছাড়া সরকারি বেসরকারি মালিকানায় বেশ কিছু রিসোর্ট গড়ে উঠেছে যেখান থেকে সাজেকের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ সেখানে তিনটি হেলিপ্যাড নির্মান করেছে যেখান থেকে সাজেকের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এছাড়া ঝারভোজ, মেঘ মাচাং, মেঘ পুঞ্জি, রুন্ময়, সাজেক রিসোর্ট, স্টোন গার্ডেন এসব জায়গা থেকে সাজেকের নান্দনিকতা উপভোগ করা যায়।

কংলাক পাহাড় সাজেকের সবচেয়ে উঁচু যায়গা। কংলাক পাহাড়ে দাড়িয়ে চতুর্পাশের দিগন্তবিস্তৃত হরিৎ অরন্যের শোভায় বিমুগ্ধ হওয়া যায়। কংলাকে বড় বড় কমলার বাগান আছে।কংলাকের কমলা খুব মিষ্টি। কমলার মৌসুমে বাগান থেকে পাকা কমলা পেড়ে খাওয়ার স্মৃতি অমলিন থেকে যেতে পারে বহুদিন।

রুইলুই পাড়া থেকে পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে প্রায় এক ঘণ্টার পথ পায়ে হেঁটে নিচে নামতে হয় সাজেক ঝর্ণায় যেতে। ঘন জংগলের ভেতর বুনো পথ ধরে কেবলই নিচে নামতে হয়। অফুরান সবুজ, পাহাড়ের নান্দনিকতা, কিছুটা দুশ্চিন্তা, কিছুটা ভয় সব মিলিয়ে এক ভয়ংকর সুন্দর অভিজ্ঞতা হবে। নিরব নিথর পাহাড়ের নিস্তব্ধতা ভেঙে দূর থেকেই ভেসে আসে ঝর্ণার কলতান। প্রায় ১০০ ফুট উঁচু পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণার শীতল জলে গা ভিজিয়ে নেয়া যায়।

সাজেকের রঙ রূপ ক্ষণে ক্ষণে পাল্টায়। সকালের সাজেক একরকম তো সন্ধ্যায় অন্যরকম আবার বৃষ্টিস্নাত সাজেকের রূপ আর রৌদ্রকোজ্জল সাজেকের রূপ ভিন্ন! সাজেকের এমন বহুমাত্রিক রূপের বৈচিত্র্য আস্বাদন করতে হলে দুই তিন দিন সময় নিয়ে যেতে হবে।

সাজেকের রুইলুই এবং কংলাক পাড়ায় লুসাই,ত্রিপুরা ও চাকমাদের কিছু বসতি আছে। তারা বাংলা ঠিকঠাক বলতে না পারলেও পর্যটকদের অভ্যর্থনা ও আপ্যায়ণে অকৃত্রিম। মূলতঃ পাহাড়ের গায়ে জুমের ফসল ও ফলমূল চাষ করে জীবীকা নির্বাহ করে পাহাড়িরা।

সাজেক পর্যটন এলাকা লুসাই ও ত্রিপুরাদের সুদিন এনে দিয়েছে। সেখানে গড়ে ওঠা শত শত রিসোর্ট,রেস্তোরাঁ, চা আর কফি শপগুলোর মালিক তারা। এছাড়া সাজেকের পথের ধারে সকাল বেলা কলা, পেপে, আনারস, কমলা, শাক, সব্জী, কাঁকড়া, শামুক ইত্যাদির পসরা সাজায় পর্যটকদের নিকট বিক্রয়ের জন্য। পর্যটকেরাও সাশ্রয়ী দামে এসব ভেজালমুক্ত সব্জী ও সুস্বাদু ফলাহারে পরিতৃপ্ত হয়।

পাহাড়ের লক্ষণীয় একটি বিশেষত্ব হলো সেখানের জুমচাষ, ব্যবসায় পরিচালনা, সন্তান লালন, অতিথি আপ্যায়ন সংসার সামলানো সহ দৃশ্যমান সব পরিশ্রমের কাজই নারীরা করে।বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষদের অলস আড্ডায় সময় কাটাতে দেখা যায়।

নাগরিক ব্যস্ততার ফাঁকে একটু সময় নিয়ে সাজেক ঘুরে আসা যায়। এতে জীবনের একঘেয়েমী কাটবে। প্রাণশক্তি বাড়বে বহুগুন যা আগামীর পথচলায় প্রেরণা যোগাবে।

Check Also

মওলানা ভাসানীর ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে নানা আয়োজন

যমুনা নিউজ বিডি:  আজ শনিবার মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকী। আওয়ামী মুসলিম লীগের এই …

Powered by themekiller.com