Home / খেলাধুলা / পান্তা খাওয়া কৃষকের ছেলে কিনা জিতি সাফের প্রথম স্বর্ণ!

পান্তা খাওয়া কৃষকের ছেলে কিনা জিতি সাফের প্রথম স্বর্ণ!

যমুনা নিউজ বিডি:   বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে তাঁর স্থান চিরকালীন। সাফ গেমসে প্রথম সোনাজয়ীর নাম যে মুজিবর রহমান মল্লিক। আগে-পরে আরো অনেক আন্তর্জাতিক কীর্তির রূপকার এই অ্যাথলেটের সঙ্গে বসেছিলেন নোমান মোহাম্মদ। গল্পে ব্যতিক্রম বোধ হয় এটাই, না পাওয়ার হাহাকার তাঁকে করতে হচ্ছে না। বিজেএমসির চাকরিসূত্রে যাপন করছেন মোটামুটি সমৃদ্ধ জীবন

প্রশ্ন : আপনার সাক্ষাৎকার ওই স্বর্ণপদক জয় থেকে শুরু না করলেই নয়। সাফ গেমসের ইতিহাসে বাংলাদেশের প্রথম স্বর্ণপদক জয় আজও কতটা তৃপ্তি দেয়?

মুজিবর রহমান মল্লিক : জীবনে যদি আর কিছু না-ও করতাম, তবু শুধু এই একটি কারণেই বাংলাদেশ ক্রীড়াঙ্গনে স্মরণীয় হয়ে থাকব। সাফ গেমসে বাংলাদেশের প্রথম স্বর্ণপদক আমি জিতেছি—এই গর্বের কোনো তুলনা হয় না।

প্রশ্ন : ১৯৮৪ সালের কাঠমাণ্ডু সাফ গেমসে ট্রিপল জাম্পে স্বর্ণপদক জেতেন আপনি। মুহূর্তটা নিশ্চয়ই পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে আছে?

মুজিবর : পুরোপুরি। আমার কাছে তো মনে হয়, গতকালের ঘটনা। সেবারের সাফ গেমসে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২১০ জনের দল যায়। একের পর এক ইভেন্ট চলে যাচ্ছে। আমরা কোনো স্বর্ণপদক জিতি না। সাঁতারু মোশাররফ হোসেন দেশে প্রতিবছর আট-দশটি করে স্বর্ণপদক পায়। তিনিও সেখানে সিলভার-ব্রোঞ্জের ওপরে উঠতে পারছেন না। সেখানে আমি যখন ট্রিপল জাম্পে স্বর্ণপদক জিতি, বাংলাদেশ দলের সবার অবস্থা কেমন হয়েছিল, বুঝতেই পারছেন।

প্রশ্ন : ঠিক ওই সময়ে আপনার নিজের অবস্থাটা যদি একটু বলেন…

মুজিবর : আমার তো খুশিতে পাগল-পাগল অবস্থা। কিংবদন্তি সাঁতারু ব্রজেন দাশ সেবার নেপাল যান সাঁতারের টিম ম্যানেজার হিসেবে। স্বর্ণপদক জেতার পর আমাকে জড়িয়ে ধরে দাদার সে কী হাউমাউ কান্না! বিজয়স্তম্ভে গেলাম, বাংলাদেশের নাম ঘোষণা হলো, জাতীয় পতাকা উড়ল, জাতীয় সংগীত বাজল—এগুলো আমার স্মৃতির পাতায় চিরদিন থাকবে। তখন আমার একটা আশ্চর্য কথা মনে হয়েছিল। গ্রামের এক সাধারণ কৃষকের ছেলে আমি। পান্তা ভাত খেয়ে বড় হয়েছি। পান্তা ভাত খেয়ে বড় হয়ে ওঠা কৃষকের ছেলে আমি কিনা সাফ গেমসের স্বর্ণপদক জিতে গেলাম! সেটিও পুরো দেশের মধ্যে প্রথম হিসেবে! এত বড় স্বপ্ন দেখার সাহসও তো আমি কখনো করিনি।

প্রশ্ন : নেপাল যাওয়ার আগে ভাবেননি যে, স্বর্ণপদক জিততে পারেন?

মুজিবর : একেবারেই না। শুধু আমি কেন, বাংলাদেশের কেউ ভাবেননি। ভারত-পাকিস্তান-নেপাল সাফের কোনো দেশের কেউ ভাবেননি। তখন ভারতের বালাসুব্রামানিয়াম চ্যাম্পিয়ন অ্যাথলেট। ওকে হারিয়ে অন্য কেউ স্বর্ণপদক জিতবে—এটি অসম্ভব। আমার জন্য তা আরো অসম্ভব কেন ছিল, জানেন? কারণ নেপালে অ্যাথলেটিকস হয়েছে সিন্ডার ট্র্যাকে। অথচ বাংলাদেশে তখনো অ্যাথলেটিকসের ট্র্যাক বসেনি। আমরা ঘাস-মাটির ওপর দৌড়ে লং জাম্প, ট্রিপল জাম্প করেছি সব সময়। ঘাস-মাটিতে অনুশীলন করে সিন্ডার ট্র্যাকে গিয়ে স্বর্ণপদক জিতব—এটি তাই বিশ্বাস করার মতো কথাও না।

প্রশ্ন : পরে তো ৪ গুণিতক ১০০ মিটার রিলেতেও স্বর্ণপদক জয়ী দলের চারজনের একজন আপনি।

মুজিবর : এটিও আরেক আশ্চর্য। এখানেও আমাদের স্বর্ণজয়ের সম্ভাবনা তেমন একটা ছিল না। আর সত্যি বলতে কি, আমি নিজে তো স্প্রিন্টার ছিলাম না। সেই সাফ গেমস বিদেশে না হলে রিলেতে আমি থাকতাম না। পরের বছর ঢাকায় যে সাফ গেমস হয়, সেখানকার রিলে দলে যেমন ছিলাম না। আবার ১৯৮৭ সালে কলকাতা সাফ গেমসে ঠিকই ছিলাম। সেবার জিতি রৌপ্যপদক।

প্রশ্ন : ঠিক বুঝলাম না। সাফ গেমস বিদেশে না হলে রিলে দলে আপনি থাকতেন না মানে?

মুজিবর : আসলে হয়েছে কী, আমি তো আর জেনুইন স্প্রিন্টার না। কিন্তু ট্রিপল জাম্পের জন্য স্প্রিন্ট অনুশীলন করতে হতো। বাংলাদেশ দল যখন বিদেশে কোনো গেমসে রিলেতে অংশ নিত, সেখানে জেনুইন স্প্রিন্টার নেওয়া হতো তিনজন; সঙ্গে চতুর্থজন হিসেবে আমি। হয়তো খরচ বাঁচানোর জন্যই অমনটা করা হতো। বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমি ছয়বার ৪ গুণিতক ১০০ মিটার রিলে রেসে অংশ নিই। সবগুলোই বিদেশে। দেশে যখন কোনো আন্তর্জাতিক আসর হতো, সেখানে জেনুইন স্প্রিন্টাররাই দৌড়াত। এখানে তো আর খরচ বাঁচানোর ব্যাপার নেই।

প্রশ্ন : তাহলে জেনুইন স্প্রিন্টার না হয়েও সাফে স্বর্ণপদকজয়ী দলের অংশ আপনি!

মুজিবর : সেটিই তো বললাম, আশ্চর্যের ব্যাপার। ১৯৮৪ সালের সাফ গেমসের রিলেতে ছিলাম সাইদুর রহমান ডন, মুজিবর রহমান মল্লিক, শাহ আলম ও আফতাব মোল্লা।

প্রশ্ন : দৌড়ের সিরিয়াল অনুযায়ী বললেন?

মুজিবর : ঠিক তাই। ১৯৮৭ সালে কলকাতা সাফ গেমসের রিলেতে শাহান উদ্দিন, আমি, আনোয়ার হোসেন, শাহ আলম। ’৮৪ সালে প্রথম সাফে পুরো বাংলাদেশ দল সব ইভেন্ট মিলিয়ে জেতে মাত্র দুটি স্বর্ণপদক। একটিতে আমি ট্রিপল জাম্পে ব্যক্তিগতভাবে; আরেকটিতে রিলে দলের অংশ হিসেবে। সেই সাফ গেমস দলের আমিই তখন মধ্যমণি।

প্রশ্ন : এমন পারফরম্যান্সের পুরস্কার পেয়েছেন কোনো?

মুজিবর : এখন যেমন সরকারের পক্ষ থেকে জমি দেওয়া হয়, ফ্ল্যাট দেওয়া হয়—আমি তেমন কিছু পাইনি। কাঠমাণ্ডুতে আমাদের টিম লিডার হিসেবে যান এনএসসির ডিরেক্টর স্পোর্টস  আমিরুল ইসলাম সাহেব। উনি স্বর্ণপদক জয়ের পরপরই ২৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। বাংলাদেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে ফুলের মালা দিয়ে আমাদের বরণ করে নেওয়া হয়। মন্ত্রণালয় সংবর্ধনা দেয়। কিন্তু সেখানে কোনো টাকা দেওয়া হয়নি। কার্পেট দিয়ে কাজ সেরেছিল। দেশকে দুটি স্বর্ণপদক জেতানোর পুরস্কার হিসেবে উপহার পাই কার্পেট। ব্যস, আর কিছু না।

প্রশ্ন : এবার একটু শৈশব-কৈশোরের কথা জানতে চাই। বলছিলেন যে, পান্তা ভাত খেয়ে বেড়ে ওঠা কৃষকের ছেলে আপনি। অ্যাথলেটিকসের সঙ্গে সখ্যের শুরু কিভাবে?

মুজিবর : আমার জন্ম ১৯৬১ সালের ১০ জানুয়ারি যশোরের অভয়নগর থানার নাওলি গ্রামে। আব্বা শাহাদাত হোসেন মল্লিক। মা রাবেয়া বেগম। সাত ভাই এক বোনের মধ্যে আমি পাঁচ নম্বর। কৃষকের ছেলে আমি বাবাকে কত দিন মাঠে গিয়ে কৃষিকাজে সাহায্য করেছি! তবে বড় ভাইরাই তা করতেন বেশি। আমাকে বলতেন পড়ালেখা করতে। তা পড়ালেখা করতাম যেমন, আবার ডানপিটেও ছিলাম খুব। কারো গাছের খেজুরের রস পেড়ে খেয়ে ফেলতাম। ফুটবল খেলার জন্য ভৈরব নদীর ওপারে ফুলতলায় ডাবুর মাঠে চলে যেতাম। খেলা শেষে খালি গায়ে সাঁতরে নদী পার হয়ে আসতাম। বন্ধুরা মিলে বাজি ধরে বিশাল পুকুরের এ মাথা থেকে ও মাথায় চলে যেতাম ডুবসাঁতারে। গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা এসব খেলাও খেলেছি।

প্রশ্ন : অ্যাথলেটিকস?

মুজিবর : অ্যাথলেটিসের মানে তো আর ওই বয়সে বুঝতাম না। দৌড়ঝাঁপ করতাম। স্কুলের দৌড়, লং জাম্পে স্যাররা দাঁড় করিয়ে দিতেন। সেখানে পুরস্কার পেতাম। আর আমার আগ্রহের কথা যদি বলেন, তাহলে দুজন মানুষের কথা বলতে হবে। সম্পর্কে চাচা মহিউল ইসলাম বিশ্বাস এবং এখন যিনি সম্পর্কে আমার সম্বন্ধী শাহজাহান মল্লিক। তাঁদের দেখতাম, পরিস্কার হাফপ্যান্ট-গেঞ্জি এমন সুন্দর পোশাক পরে মাঠে নামতেন। দৌড়ের অনুশীলন করতেন। ওই দুজনকে দেখে আমার মনে হয়, যদি তাঁদের মতো কখনো হতে পারি!

Check Also

ধোনির ফ্যান সেই শিশুটি এখন একসঙ্গে মাঠের লড়াইয়ে

যমুনা নিউজ বিডি: এবারের ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগে (আইপিএল) রাজস্থান রয়্যালস বনাম দিল্লি ক্যাপিটালস ম্যাচ অনুষ্ঠিত …

Powered by themekiller.com