Breaking News
Home / ইতিহাস ও ঐতিহ্য / ধামইরহাটের ২শত বছরের পুরনো কালের সাক্ষী ভিমের পান্টি

ধামইরহাটের ২শত বছরের পুরনো কালের সাক্ষী ভিমের পান্টি

যমুনা নিউজ বিডি : নওগাঁ জেলায় বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে। এর মধ্যে ভিমের পান্টি অন্যতম। এ ছাড়াও রয়েছে জগদ্দল বিহার, আলতাদীঘি, মাহিসন্তোষ, আলতাদিঘী জাতীয় উদ্যান শালবন। তবে ঐতিহাসিক এই ভীমের পান্টিটি অযতœ আর অবহেলায় দিন দিন ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। এখুুনি এই ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণের প্রতি সুদৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।

জানা যায়, নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার একেবারে পূর্বপ্রান্তে জয়পুরহাট জেলার সীমানা ঘেঁষে জাহানপুর ইউনিয়নের মুকুন্দপুর-হরগৌরী এলাকায় একটি মাঝারি (বেড় ১৭০ মিটার এবং উচ্চতা ১০ মিটার) আকারের ঢিবি ও ১৪টি বিভিন্ন আকারের পুকুর রয়েছে। ধামইরহাট-জয়পুরহাট সড়কের মঙ্গলবাড়ী নামক বাজার থেকে দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে মুকুন্দপুর গ্রামে হরগৌড়ি মন্দির ভীমের পান্টি অবস্থিত। মঙ্গলবাড়ী থেকে পাকা রাস্তা যোগে কাজীপাড়া যাওয়ার পথে ভীমের পান্টি পাওয়া যাবে। পাকা রাস্তা থেকে মাত্র ৪শত মিটার ইট বিছানো ও মেঠো পথ দিয়ে যেতে হয়।

এর মধ্যে একটি পুকুর অমৃতকুন্ড ও অপরটি কোদাল ধোয়া নামে পরিচিত। এগুলোর মধ্যে পুকুরের পশ্চিমপাড়ে অবস্থিত একটি ঢিবিতে কী রয়েছে তা আজও জানা সম্ভব হয়নি। তবে এর সর্বত্র ইটপাটকেল ও খোলা কুচির ছড়াছড়িসহ কোথাও কোথাও কাদায় গাঁথা ইটের গাঁথুনির পলেস্তরা বিহীন চিহ্ন দেখা যায়। জানা যায়, প্রায় ২০০ বছর আগে বীরেশ্বর-ব্রহ্মচারী নামে এক সাধক এ ঢিবিতে একটি কালো পাথর উত্কীর্ণ মাঝারি আকারের মূর্তি পেয়েছিলেন। তাই তিনি ওই ঢিবির ওপর ছোট আকারের চারটি মন্দির নির্মাণ করে ওই মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ওই সময় ঢিবির ওপর উত্তর-পশ্চিম কোণে ২.৩৯ মিটার ও ৯১ সেন্টিমিটার পরিসরের এক কোঠা বিশিষ্ট একটি পূর্বমুখী স্থাপনা ছিল।

১৯৭৮ সালে ওই ঢিবি থেকে একটি চোকলাতলা কালো পাথরের উমা মহেশ্বর মূর্তি উদ্ধার করে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। ওই ঢিবির দক্ষিণে ৫৮ সেন্টিমিটার দূরত্বে উত্তর-দক্ষিণে লম্বা অনুরূপ আরও একটি ভাঙা দেয়াল ছিল। সেই দেয়ালের উচ্চতা ১.২২ মিটার। এগুলোকেই বীরেশ্বর ব্রহ্মচারী স্মৃতি বিজড়িত নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা যায়। বর্তমানে এগুলোর নিদর্শন নিশ্চিহ্ন করে সেখানে নতুন মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। ঢিবির পাদদেশ থেকে দক্ষিণ দিকে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি শুরু। দূরে একটি উঁচু পাড়ওয়ালা পুকুরও রয়েছে। তবে এ প্রতœস্থলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হলো একটি এক খন্ড কালো পাথরের থাম। যার নাম ভিমের পান্টি। যা ঢিবিটি থেকে মাত্র ৮১ মিটার দক্ষিণে ফসলি জমির মাঝে সামান্য হেলে সম্পূর্ণ অরক্ষিতভাবে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয়দের কাছে এটি ভিমের পান্টি আবার কেউ কেউ কৈবর্ত রাজা ভিমের লাঠি বলে থাকে। দেখতে অনেকটা প্রলম্বিত মোচার মতো। এ থামের গা অত্যন্ত মসৃণ। পাদমূলে এর বেড় ১.৮০ মিটার বর্তমান উচ্চতা ৩.৭৯ মিটার। অতিতে এর ওপর একটি বিষ্ণুর বাহন অর্ধনর ও অর্ধপাখির মূর্তি বসানো ছিল।
কিন্তু বজ্রপাতের আঘাতে সেটি নিশ্চিহ্ন হওয়াসহ থামের মূল অংশের একটি ফালি ধসে গেছে। তবে অক্ষত থাকা অংশের ৫৬.৭ সেন্টিমিটার ও ৪৯.৩ সেন্টিমিটার পরিমাপের একটি চতুষ্কোণাকার উপরের অংশে আজও ২৮ পক্তির একটি সংস্কৃত ভাষ্য উত্কীর্ণ রয়েছে।
এ থামটি বরেন্দ্রর পাল রাজা নারায়ণ পালের মন্ত্রী ভটুগুরুভ (৮৯৬-৯৫০) সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এতে ওই রাজবংশসহ মিশ্র বংশপঞ্জি বর্ণিত রয়েছে। এটি দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসে। মঙ্গলবাড়ী সাহিত্য আড্ডা সংগঠনের সিনিয়র সহকারী সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন,ভীমের পান্টি বরেন্দ্র অঞ্চলের একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। প্রাচীন নিদর্শনটি এখুনি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এছাড়া লোহার এ্যাঙ্গেল দিয়ে ঘেরে দেয়া প্রয়োজন। মুকুন্দপুর গ্রামের প্রবীণ বিশ্বনাথ সিংহ বলেন,এখানে কালিমন্দির,শিব মন্দির,হরগৌড়ী মন্দির এবং ভীমের পান্টি থাকায় হাজার হাজার পূর্ণ্যাথীর আগমন ঘটে। তাছাড়া প্রতি বছর বিশেষ করে মাঘী পূর্ণিমা ও বৈশাখের শেষ সপ্তাহে ১ দিনের জন্য মেলা বসে।

মেলায় হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। কিন্তু মাত্র ৪শত মিটার মেটো পথ থাকায় কষ্ট করে মানুষজন কে আসতে হয়। মন্দির ও ভীমের পান্টি সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি বিজয় চন্দ্র মন্ডল বলেন,হিন্দুদের জন্য একটি তীর্থস্থান। কিন্ত এখানে পাকা রাস্তা নেই,বিদ্যুৎ নেই এবং লোকজনের থাকার কোন সুব্যবস্থা না থাকায় পূণ্যার্থীদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। জাহানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওসমান আলী বলেন,ইউনিয়নের পরিষদ থেকে ২শত মিটার রাস্তা ইট বিছানো হয়েছে। চলতি অর্থ বছরে ৪শত মিটার রাস্তাটি পাকাকরণের পদক্ষেপ নেয়া প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার গণপতি রায় বলেন,ভীমের পান্টি সংরক্ষণ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া তিনটি মন্দির থাকায় ওই রাস্তাটি অচিরে পাকাকরণ,বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান এবং মানুষের থাকার সুব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। অচিরেই সকল কাজ দৃশ্যমান হবে।

Check Also

জীবনের শেষ ভাষণে যা বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু

যমুনা নিউজ বিডি: ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার …

Powered by themekiller.com