Home / সারাদেশ / দেড় মাসে উদ্ধার মালয়েশিয়ামুখী ১১৩ রোহিঙ্গা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা

দেড় মাসে উদ্ধার মালয়েশিয়ামুখী ১১৩ রোহিঙ্গা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা

যমুনা নিউজ বিডি:   কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সক্রিয় তৎপরতা চালাচ্ছে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যরা। এসব দালালের খপ্পরে পড়ে প্রতিনিয়ত রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ছেড়ে বের হচ্ছে সাগর পথে মালয়েশিয়া পাড়ি দিতে। গত সাতদিনে টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশ উদ্ধার করেছে ৯৮ জন রোহিঙ্গা নাগরিক। এদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ৪৮ জন। এছাড়া গত জানুয়ারী মাসে উদ্ধার করা হয়েছে ১৫ জন মালয়েশিয়ামুখী রোহিঙ্গা নাগরিক। এনিয়ে প্রায় দেড় মাসে ১১৩ জন মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গা উদ্ধার হয়।

টেকনাফস্থ ২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আছাদুদ জামান চৌধুরী বলেন, ‘গত কয়েকদিনের পৃথক অভিযানে বিজিবি টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়ন ও বাহারছড়া ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম থেকে অর্ধ শতাধিক রোহিঙ্গাকে মালয়েশিয়া পাচারকারীর হাত থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। এসময় দালাল চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্যকে আটক করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘পাচারকারীদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গা নারী-পুরুষদের নিজ নিজ ক্যাম্পে প্রেরণ করা হয়েছে এবং আটককৃত দালালদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। টেকনাফ সাগর উপকূল দিয়ে মানবপাচার ঠেকাতে বিজিবি সার্বক্ষণিক তৎপর রয়েছে বলেও জানান তিনি।’

এ পর্যন্ত পুলিশ ও বিজিবির হাতে উদ্ধার হওয়া মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গারা বিভিন্ন ধরনের তথ্য জানিয়েছেন। তাদের অনেকে বলেছেন, তারা মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত আত্মীয় স্বজনদের সহায়তায় অর্থ উপার্জনের জন্য সেখানে যাচ্ছেন। রোহিঙ্গা যুবতীরা মালয়েশিয়ায় বিয়ের উদ্দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন বলেও জানান। রোহিঙ্গারা জানান, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গা যুবকদের সঙ্গে ক্যাম্পের অনেক রোহিঙ্গা যুবতীদের বিয়ে ঠিক হয়। বিয়ে নিশ্চিত হওয়া ওইসব নারীদের স্বামীর কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয় সাগর পথে ট্রলারে চেপে।

গত বৃহস্পতিবার বিজিবির হাতে উদ্ধার হওয়া টেকনাফের জাদিমুরা ডি ব্লকের রোহিঙ্গা নারী নাসিমা আকতার বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় আমার এক মামাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে ঠিক হয়। তিনি আমাকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরিচিত এক রোহিঙ্গাকে টাকা দিয়েছেন বলে জানতে পারি। পরে তার কথায় আমাকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য ক্যাম্প থেকে বের করে নিয়ে আনা হয়।’

নাসিমা বলেন, ‘ট্রলার নিয়ে আমরা মালয়েশিয়া যেতে শুরুতে অনীহা দেখিয়েছিলাম। কিন্তু যাদের মাধ্যমে যাচ্ছিলাম তারা জানিয়েছেন, সাগরে নাকি বড় জাহাজ অবস্থান করছে। কূল থেকে ছোট নৌকায় করে আমাদের জাহাজে উঠিয়ে দেয়া হবে। জাহাজে কোন ঝুঁকি নেই। এসব কথা বলে আমাদের রাজি করা হয়েছে।’

উখিয়া বালুখালী ক্যাম্পের রোহিঙ্গা হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমার অনেক আত্মীয় মালয়েশিয়ায় থাকে। তারা আমাকে টাকা উপার্জনের জন্য সেখানে চলে যেতে বলে। তাদের কথায় আমি মালয়েশিয়া যেতে এসেছিলাম।’
হাফিজুর বলেন, ‘মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য যাবতীয় খরচ আমার এক বড় ভাই মালয়েশিয়া থেকে পাঠিয়েছেন। তবে যাদের হাতে টাকা দিয়েছেন আমি তাদের ব্যক্তিগত ভাবে চিনিনা। আমাকে শুধু বলা হয়েছে, তোমাকে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য কেউ ডাকলে সাথে যাওয়ার জন্য।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাগর পথে মালয়েশিয়া পাচারের জন্য পাচারকারীদের টার্গেট রোহিঙ্গা ক্যাম্প। স্থানীয়রা এই সময়ে সাগরপথে ট্রলারে চেপে মালয়েশিয়া যাত্রা অনেকটা ঝুঁকি মনে করলেও এক্ষেত্রে ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সহজেই রাজি করানো যায়। তাই প্রতিটি উখিয়া উপজেলা ও টেকনাফের ৩০ ক্যাম্পে মানবপাচার চক্রের সদস্যরা সক্রিয় রয়েছে বলে জানা যায়।

উখিয়ার থাইংখালী তাজনিমার খোলা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের রোহিঙ্গা যুবক আনিসুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গারা মূলত ক্যাম্পে মালয়েশিয়া রোহিঙ্গা পাচারের সাথে জড়িত। তাদের সঙ্গে এদেশের বেশকিছু স্থানীয় প্রভাবশালী ইন্ধন থাকতে পারে। তবে ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা এখানে রোহিঙ্গা নারী পুরুষদের সাগরপথে মালয়েশিয়া যেতে উদ্বুদ্ধ করে। এসব রোহিঙ্গা পাচারকারীদের সঙ্গে অনেক মাঝির  (রোহিঙ্গা নেতা)র সঙ্গেও সম্পর্ক রয়েছে ভালো।
র‌্যাব-৭ টেকনাফস্থ ক্যাম্প ইনচার্জ লে. মির্জা শাহেদ মাহতাব বলেন, ‘ উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে র‌্যাবের আলাদা নজরদারি রয়েছে। ক্যাম্পের অভ্যন্তরে মাদক ও মানবপাচারকারী চক্রের হোতাদের ধরতে প্রতিটি ক্যাম্পে তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া সন্দেহভাজন পাচারকারীদের ব্যাপারে খোঁজ নেয়া হচ্ছে।’

টেকনাফ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, ‘গত দেড় মাসে পুলিশের অভিযানে বেশ কিছু মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গা নাগরিককে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। সাগর পথে রোহিঙ্গা কিংবা বাংলাদেশিদের মালয়েশিয়া পাচার রোধ করতে এবং পাচারকারী চক্রের ব্যাপারে পুলিশ সজাগ রয়েছে।’

আরো ৬ রোহিঙ্গা উদ্ধার, ৫ দালাল আটক
গতকাল মঙ্গলবার ভোরে টেকনাফ ২ বিজিবির সাবরাং খুরেরমুখ বিওপির একটি টহলদল মহেশখালীয়া পাড়ায় অভিযান পরিচালনা করে ঘাটে নৌকায় উঠার সময় একজন দালাল ও ৪ জন রোহিঙ্গা নাগরিককে আটক করে। এ ছাড়া নৌকাটিও জব্দ করা হয়।

অপরদিকে টেকনাফ বিজিবি সদর দপ্তরের টহলদল সকালে টেকনাফের মাঠপাড়ায় মো. এখলাসের ছেলে মো. মুন্নার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে মুন্নাসহ ৩ জন দালাল ও ২ জন রোহিঙ্গা নারীকে আটক করতে সক্ষম হয়।
আটককৃত সন্দেহভাজন দালালেরা হচ্ছে, টেকনাফ সদরের মহেশখালীয়া পাড়ার মো. মনির, মো. নুরুল আবছার, শাহপরীর দ্বীপ মিস্ত্রী পাড়ার মো. ইউনুস, দক্ষিণ পাড়ার মো. আমিন, মাঠ পাড়ার মো. মুন্না।

মালয়েশিয়াগামী ৬ রোহিঙ্গা উদ্ধার ও ৫ দালাল আটকের বিষয়ে সত্যতা নিশ্চিত করে টেকনাফস্থ ২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আছাদুদ জামান বলেন, আটক মানব পাচারকারী দালালদের বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ শেষে টেকনাফ থানায় হস্তান্তর এবং উদ্ধারকৃত রোহিঙ্গাদের স্ব স্ব ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

Check Also

শিক্ষা কর্মকর্তার বদলি বাণিজ্য

যমুনা নিউজ বিডি:   নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণের বিনিময়ে বিধিলঙ্ঘন করে …

Powered by themekiller.com