Home / সারাদেশ / জমি-বাড়ি দখল করতেই নরসিংদীতে বাড়িতে আগুন

জমি-বাড়ি দখল করতেই নরসিংদীতে বাড়িতে আগুন

যমুনা নিউজ বিডি :   নরসিংদীর রায়পুরায় একটি হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে বিরোধ এবং জমি-বাড়ি দখল করতেই পরিকল্পিতভাবে তিন বোনসহ চারজনকে ঘরে পেট্রল ঢেলে আগুন দিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। ওই মামলার আসামিদের দুজন মাহমুদুল হাসান রবিন ও মামুন মিয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ জেনেছে, এ ঘটনায় জড়িত সাতজন। দুই আসামি গতকাল আদালতে এ ব্যাপারে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম শামীমা আক্তারের আদালতে ১৬৪ ধারায় লিখিত জবানবন্দি দেয় তারা। গতকালই অগ্নিদগ্ধ তিন শিশুর বড় বোন রত্না আক্তার নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে সাতজনের নাম উল্লেখ করে এবং তিন-চারজনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করে রায়পুরা থানায় মামলাটি করেন।

আসামিরা হলো লোচনপুর গ্রামের মৃত দুলাল গাজীর ছেলে রবিন (২৫),  একই এলাকার শিপন মিয়া (৩৫), মামুন (১৯), কাজল মিয়া (৪৫), শোভন মিয়া (২২), আলামিন মিয়া (২৮) ও লোকমান হোসেন (২০)।

নরসিংদীর পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহমেদ গতকাল বুধবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, গ্রেপ্তারকৃত দুই আসমি স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছে, তারা ওই বাড়ির সবাইকে হত্যার উদ্দেশ্যেই পেট্রল ঢেলে আগুন দিয়েছিল। গ্রেপ্তার রবিন ও মামুন অগ্নিদগ্ধ তিন বোনের প্রতিবেশী। পুলিশ সুপার জানান, গত ৬ ফেব্রুয়ারি রায়পুরা উপজেলার উত্তর বাখরনগর ইউনিয়নের লোচনপুর গ্রামে দুলাল মিয়া নামের একজনকে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে দায়ের করা মামলায় দগ্ধ তিন বোনের বড় ভাই সোহাগ মিয়া ও বিপ্লব মিয়াকে আসামি করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পরদিন ৭ ফেব্রুয়ারি হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ এনে দুলাল মিয়ার পরিবারের লোকজন ও স্থানীয়রা মিলে সামসুল মিয়ার (দগ্ধ মেয়েদের বাবা) বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মালপত্র লুট করে। এতে ওই পরিবারের লোকজন এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পান বিপ্লব মিয়া। এরপর গত সোমবার বিকেলে নিজ বাড়িতে আসে বিপ্লব মিয়ার তিন বোন ও এক ফুফু। এরই মধ্যে মঙ্গলবার ভোরে তারা অগ্নিদগ্ধ হয়।

দগ্ধ তিন বোন থানা পুলিশকে জানিয়েই দুই মাস পর বাড়িতে গিয়েছিলেন বলে যে অভিযোগ করেছেন, সে প্রসঙ্গে এসপি মিরাজ উদ্দিন বলেন, তারা (দগ্ধ পরিবারের সদস্যরা) যেভাবে অভিযোগ করেছে বিষয়টি সে রকম নয়। তারা বাড়িতে যাওয়ার আগে থানায় গিয়েছিল, এ কথা ঠিক। তবে পুলিশ তাদের বলেছিল দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেশীর সঙ্গে তাদের বিরোধ মীমাংসা করেই তাদেরকে বাড়িতে উঠিয়ে দেওয়া হবে। এর আগ পর্যন্ত তারা যেন বাড়িতে না গিয়ে স্বজনদের বাসাতেই থাকে। কিন্তু ওই পরিবারের সদস্যরা ঘটনার আগের দিন সন্ধ্যায় পুলিশকে না জানিয়েই বাড়িতে গিয়ে ওঠে। এরপর ভোরের দিকে তাদের বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়।

আদালতে লিখিত স্বীকারোক্তিতে রবিন ও মামুন জানায়, গত মঙ্গলবার বিকেলে তারা রায়পুরার মরজাল এলাকায় একটি পার্কে ঘুরতে যায়। এ সময় তার চাচাতো ভাই শিপন মিয়া মোবাইল ফোনে রবিনকে জানায়, তার বাবা দুলাল গাজী হত্যার প্রধান আসামি বিপ্লবের বোনেরা বাড়িতে এসেছে। খবর পেয়ে দ্রুত তারা বাড়ি ফিরে যায়। এরপর শিপনসহ আরো চার-পাঁচজন মিলে বিপ্লবের বোন মুক্তামণি, সুইটি ও প্রীতির কাছে জানতে চায়, কেন তারা বাড়ি ফিরে এসেছে। এ নিয়ে তাদের সঙ্গে তর্কাকর্কি চলতে থাকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত। পরে তারা বিপ্লবের বাড়ি থেকে ফিরে গিয়ে রাতে তাদের মারধরের পরিকল্পনা করে। সে অনুযায়ী ভোর ৫টার দিকে শিপনের নেতৃত্বে রবিন, মামুনসহ মোট পাঁচজন লাঠিসোঁটা ও প্লাস্টিকের একটি বোতলে পেট্রল নিয়ে বিপ্লবের বাড়ির পেছন দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। বাড়ির ভেতরে যে কক্ষে মুক্তা, সুইটি ও প্রীতিরা ছিল সে কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করতে না পেরে দরজার মধ্যে বিভিন্ন পুরনো কাপড়চোপড় জমিয়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে চলে যায়।

‘ওরা আমাগো পুড়াইয়া মারণের লাইগাই ঘরে আগুন দেয়। কাউকেই বাঁচাইয়া রাখতে চায় নাই। এইডা ক্যামনে হইল, এইভাবে যারা আমাগো আগুন দিল, মাইরা ফালাইতে চাইল? তাগো কি বিচার হইব না? উল্টা আমাগো পুতগোরে (ছেলে) পুলিশ ধইরা জেলে পুইরা রাখছে।’ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন ওই তিন মেয়ের ফুপু খাতুননেছা ওই বর্বর হামলার বর্ণনায় এ কথা বলে ওঠেন। ষাটোর্ধ্ব এই নারী যখন এ কথা বলছিলেন তখন পাশের দুটি বেডে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল তার ভাইয়ের দুই মেয়ে প্রীতি (১১) ও মুক্তামণি (১৬)। তাদের আরেক বোন সুইটির (১৩) নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা চলছে। তিনজনেরই শ্বাসনালি কমবেশি পুড়ে গেছে। হাত, মুখ ও পেটও পুড়েছে। তারা কেউই আশঙ্কামুক্ত নয় বলে কালের কণ্ঠকে বলেন বার্ন ইউনিটের আবাসিক চিকিৎসক পার্থ শঙ্কর পাল।

গতকাল বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, দগ্ধদের প্রত্যেকের মুখে মাস্ক দিয়ে রাখা হয়েছে। তিন বোনই চোখ মেলে তাকাতে পারছিল না। তাদের দেখাশোনার জন্য বড় বোন রত্না আক্তার বার্ন ইউনিটে পাশে ছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাঁকে মামলা দিতে রায়পুরা থানায় ডেকে পাঠায়। তাদের বড় ভাইয়ের স্ত্রী লিপিকে দেখা যায় ওষুধ, রিপোর্ট নিয়ে ছোটাছুটি করছেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘ভাই, এখন আমি কী করব? আমার স্বামী সোহাগকে ছয় মাস আগে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। সে এখন জেলে আছে। শ্বশুর সামসুল মিয়া মারা যাওয়ার পর থেকে এই পরিবারকে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। দেবর বিপ্লব মিয়াও মামলার আসামি। জামিনে থেকেও সে প্রতিবেশী সন্ত্রাসীদের কারণে বাড়ি ফিরতে পারেনি।’ তিনি বলেন, পুলিশের আশ্বাসে তাঁর ননদরা বাড়িতে গিয়েছিল। ঘুমন্ত অবস্থায় তাদের ঘরের দরজায় বাইরে থেকে তালা দিয়ে ঘরে আগুন দেওয়া হয়। এ সময় বোমা হামলাও চালানো হয়।

Check Also

কুলাউড়ায় বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজে অনিয়মের অভিযোগ

যমুনা নিউজ বিডি: কুলাউড়া উপজেলার কাদিপুর ইউনিয়নের মহতোছিন আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজে ব্যাপক অনিয়মের …

Powered by themekiller.com