Home / জাতীয় / চাঁদা ছাড়া মেলে না নিবন্ধন

চাঁদা ছাড়া মেলে না নিবন্ধন

যমুনা নিউজ বিডিঃ চক্রে জিম্মি থ্রি হুইলার মিশুকের রিপ্লেসমেন্ট (প্রতিস্থাপন) সিএনজি অটোরিকশা নিবন্ধন। গাড়িপ্রতি দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা চাঁদা ছাড়া তা মিলছে না। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) কর্মকর্তাদের যোগসাজশে চক্রের সদস্যরা প্রায় ২ হাজার গাড়ি থেকে এরই মধ্যে ৪০ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়েছে।

২০১১ সালে সরকার থ্রি হুইলার মিশুক (গাড়ি ২ হাজার ৬৯৬টি) রাজধানীতে চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ২০১২ সালে সরকার মিশুকের প্রতিস্থাপনে ক্ষতিগ্রস্তদের সিএনজিচালিত অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশন নেয়ার সুযোগ দেয়া হয় (যদিও রাজধানীতে অটোরিকশার নিবন্ধন দেয়া বন্ধ ২০০৩ থেকে)।

নিয়মানুযায়ী, মিশুক মালিকরা বিআরটিএ কার্যালয়ে আবেদন জমা দেয়ার পর তারা একটি বরাদ্দপত্র পাবেন। এর ভিত্তিতে তারা অটোরিকশার নিবন্ধন নেবেন। কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এ বরাদ্দপত্র গাড়ির প্রকৃত মালিকদের কাছে না পাঠিয়ে বিআরটিএর অসাধু কর্মকর্তারা তা তুলে দেন চক্রের সদস্যদের হাতে। চক্রের সদস্যরা যোগাযোগ করে গাড়ির মালিকদের সঙ্গে। টাকার বিনিময়ে তা নিতে বাধ্য করে।

মোহাম্মদপুরের আজাহার অটো কর্পোরেশনের স্বত্বাধিকারী আলী আজাহার  বলেন, ২০১৬ সালে আমি ২০টি অটোরিকশা নিবন্ধনের জন্য আবেদন জানাই। কিন্তু বিআরটিএ আমার বরাদ্দপত্র তুলে দেয় চক্রের সদস্যদের হাতে। তারা যোগাযোগ করে জানায়, চিঠি (বরাদ্দপত্র) পেতে হলে ৫০ লাখ টাকা (গাড়িপ্রতি আড়াই লাখ) দিতে হবে। আমি বাধ্য হয়ে তাদের ১৫ লাখ টাকা দিই। গত বছরের মার্চে তারা আমাকে ১০টি গাড়ির কাগজ দিয়ে আরও ৩৫ লাখ টাকা দাবি করে। ওই সময় আমি ৮ লাখ টাকা দিই। চাপের মুখে ১০ মার্চ আমি আরও ৫ লাখ টাকা দিয়েছি। তিনি বলেন, চক্রের সদস্যরা আমার স্ত্রীর নামে থাকা ১৪টি গাড়ির বরাদ্দপত্রের জন্য ২৮ লাখ টাকা দাবি করে। পরে তাদের ২৫ লাখ টাকা দিই।

আলী আজাহার বলেন, বিআরটিএতে এখনও আমার ১০টি গাড়ির আবেদন পড়ে আছে। এ বিষয়ে বিআরটিএতে যোগাযোগ করা হলে তারা আমাকে চাঁদাবাজ চক্রের সদস্য জাকির, জাহাঙ্গীর ও আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা আরও ২০ লাখ টাকা দাবি করে। বিষয়টি বিআরটিএকে জানালে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানটির সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলামের মধ্যস্থতায় জাকির গংয়ের সঙ্গে বৈঠক হয়। বৈঠকে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আপাতত জাকিরকে তিন লাখ টাকা দিন।’ আমার কাছে এ মুহূর্তে কোনো টাকা নেই জানালে রফিকুল জানান, ৩ মাসে তিন লাখ টাকা দিন।

জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এ টাকা দিতে বলেন তিনি। পরে জুলাইয়ে জাকিরকে এক লাখ টাকা দিই। এ বিষয়ে ২৯ জুলাই হাতিরঝিল থানায় মামলা করেছি। পুলিশ জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতার করলেও এরই মধ্যে তিনি জামিন পেয়ে গেছেন। আমাকে এখন হুমকি দিচ্ছেন। বলছেন, ‘রিমান্ড কাটাতে ও জামিন পেতে ৯ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ওই টাকা তোকে দিতে হবে। না হলে তোকে আর কোনো গাড়ির কাগজ দেয়া হবে না।’ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার আতাউল মাহমুদ জানান, আসামিরা খুবই খারাপ প্রকৃতির। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।

চক্রের বিরুদ্ধে ২৯ জুলাই মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী জামালউদ্দিন। তিনি  বলেন, ৫টি অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশনের জন্য চাঁদাবাজ চক্রের সদস্যরা আমার কাছে সাড়ে ১২ লাখ টাকা দাবি করে। আমি ৭ জানুয়ারি তাদের ১০ লাখ টাকা দিই। কিন্তু তারা আমাকে বরাদ্দপত্র না দিয়েই ২১ মার্চ আরও ১০ লাখ টাকা দাবি করে। আমি এ টাকা না দেয়ায় তারা বিআরটিএ উত্তর সার্কেলকে চিঠি দিয়ে আমার সব গাড়ির রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিতে বলে। বিষয়টি নিয়ে মামলার পর চক্রের সদস্যরা মামলা তুলে নিতে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর থানার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোর্শেদ আলম  বলেন, আসামিরা সবাই জামিনে আছেন। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে।

হাতিরঝিল থানায় ২৮ জুলাই দেয়া এক অভিযোগে বলা হয়েছে, নিবন্ধন পাইয়ে দিতে চক্রের সদস্যরা হাসানের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা, হাসেম ও সুলতানের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা করে, জহিরের কাছ থেকে ১৪ লাখ টাকা, নান্টু মিয়ার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং মণ্ডলের ৩০ লাখ টাকা, আলমগীরের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা, মিন্টু মিয়া ও বাবুল মিয়ার কাছ থেকে ১৬ লাখ টাকা করে, আজিজ বেপারির কাছ থেকে ৮০ লাখ টাকা, লিটন মিয়ার কাছ থেকে ১৩ লাখ টাকা, ফারুক ও শিউলি আক্তারের কাছ থেকে ২০ লাখ করে চাঁদা নেয়।  কাছে এদের বেশিরভাগই চাঁদা দেয়ার কথা স্বীকার করেছেন। ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা মালিক ঐক্য পরিষদ মহাসচিব মো. হাসান বলেন, বিআরটিএ কার্যালয়টিই চাঁদাবাজ চক্রের দখলে চলে গেছে।

৩ মার্চ ঢাকা জেলা অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের প্যাডে নিজেকে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দিয়ে জাকির হোসেন বিআরটিএর সহকারী পরিচালককে (ইঞ্জিন) একটি চিঠি দেন। চিঠিতে বলা হয়, আজাহার আলীর সঙ্গে আমাদের কিছু দেনা-পাওনা আছে। বিষয়টির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আজাহার ও অন্যান্য নামের মিশুক প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত রেজিস্ট্রেশন বন্ধ রাখার অনুরোধ করছি। এরপরও যদি আপনারা কোনো নিবন্ধন দেন তাহলে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রকাশ করে দেয়া হবে।

এ বিষয়ে জাকির হোসেন  বলেন, আলী আজাহারসহ দালাল চক্রের কয়েকজন সদস্যের মাধ্যমে বিআরটিএতে অবৈধভাবে মিশুক প্রতিস্থাপন করা হচ্ছিল। এ কারণে অভিযোগ দিয়েছিলাম।

গত বছরের ১৮ মার্চ ঢাকা জেলা অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের তৎকালীন সভাপতি আজিজুল হক মুক্ত বাংলাদেশ সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবের কাছে একটি চিঠি লেখেন। ওই চিঠিতে বলা হয়, অনৈতিক কার্যকলাপের অভিযোগে জাকির হোসেনকে ২০১৬ সালে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি বরকত উল্লাহ বুলু  বলেন, মিশুক রিপ্লেসমেন্টে কোনো চাঁদাবাজি হয়েছে বলে আমার জানা নেই। যারা বেশি খেতে চেয়েছিল তাদের একটু সমস্যা হয়েছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিআরটিএতে চিঠি দেয়ার এখতিয়ার জাকিরের নেই। আর ওই চিঠি বিআরটিএ গ্রহণ করবে বা রেজিস্ট্রেশন দেয়া বন্ধ করে দেবে? তিনি বলেন, মিশুক রিপ্লেসমেন্টে আমাকে অনেক অফার দেয়া হয়েছিল, কিন্তু আমি গ্রহণ করিনি।

জানতে চাইলে সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন  বলেন, বিআরটিএ একবার মিশুক প্রতিস্থাপন বন্ধ করে দিয়েছিল। এ সময় আমিসহ ২০৬টি গাড়ির ৪৩ জন মালিক আদালতে মামলা করি। ওই মামলা চালানোর জন্য সংশ্লিষ্ট মালিকদের কাছ থেকে খরচ নিয়েছি। এর বাইরে কারও কাছ থেকে কোনো চাঁদা নিইনি। বিআরটিএর সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, মিশুক প্রতিস্থাপনের বিনিময়ে কোনো চাঁদাবাজি হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এটা সড়কের বিষয়। এর সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বিআরটিএর চিঠি (বরাদ্দপত্র) চাঁদাবাজদের কাছে কীভাবে যায়- এমন প্রশ্নের উত্তর তার কাছ থেকে মেলেনি।

Check Also

দেশের সব মাধ্যমিক বিদ্যালয় ডিজিটাল হবে: প্রধানমন্ত্রী

যমুনা নিউজ বিডিঃ চাকরির বাজার বিবেচনা করে দেশের সব মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে ডিজিটালে রূপান্তর করা হবে …

error: Content is protected !!
%d bloggers like this:

Powered by themekiller.com