Home / ইতিহাস ও ঐতিহ্য / ইতিহাসের পথে রোম

ইতিহাসের পথে রোম

যমুনা নিউজ বিডিঃ ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র Ben Hur যারা দেখেছেন তাদের নিশ্চয়ই মনে পড়বে জেরুজালেমের রাজপথে রোমান সৈন্যদের কুচকাওয়াজের দৃশ্যের কথা। অত্যাচারী রোমান শাসনের দাপটের কাছে কী অসহায়ভাবে বন্দী ছিলো জেরুজালেমের জীবন! এই বন্দী জীবনে সান্তনা ও আশার বার্তা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন সেমেটিক নবি যিসাস। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো যিসাসকে সেমেটিক ইহুদি সমাজের ধর্ম নেতারা গ্রহণ করেন নি।

ইহুদি ধর্মযাজক ও ফরীশীদের প্ররোচনায় ইহুদি জনসাধারণ এহুদিয়ার রোমান শাসনকর্তা পিলাতের কাছে যিসাসের মৃত্যুদন্ডের দাবি জানায়। এই দাবির মূখে পিলাত যিসাসকে ক্রশবিদ্ধ করার আদেশ দান করেন। এসব ঘটনার কারণে, সেমেটিক ধর্মগুলোর ইতিহাসের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস। রোমানরাই সেমেটিক ধর্মকে সারা ইউরোপে ছড়িয়ে দেয়। ধর্মীয় ইতিহাস এবং সভ্যতার ইতিহাস- দু’ক্ষেত্রেই রোমান সাম্রাজ্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

71.jpg

চিত্র: শিল্পীর তুলিতে রোমান ফোরাম। এটি ছিলো একটি মার্কেট প্লেস

আলেকজান্ডারের পরে এবং আরব খিলাফতের পূর্বে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য ছিলো রোমান সাম্রাজ্য। রোমানদের সংস্কৃতি ছিলো গ্রিক ও মেসিডোনীয় সংস্কৃতি থেকে কিছুটা ভিন্ন। গ্রিকদের তুলনায় রোমানরা ছিলো অনেক বেশি অত্যাচারী। গ্রিক ও মেসিডোনীয়রা তাদের পশ্চিমের রোমান প্রজাতন্ত্রের প্রতি তেমন উৎসাহী ছিলো না যদিও সেখানকার সভ্যতার সূচনা বেশ আগে থেকেই। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বিশ্ববিজেতা আলেকজান্ডার তাঁর দেশের পশ্চিমের সমৃদ্ধ ইতালির দিকে কোন মনোযোগ দেন নি। পশ্চিমের ইতালির এক ফালি ভূখন্ডের চেয়ে তাকে আকর্ষণ করেছিল পূর্বদিকের বিশাল পারস্য সাম্রাজ্য ও সমৃদ্ধ এশীয় অঞ্চল।

তাই তিন মহাদেশ জুড়ে আলেকজান্ডারের সাম্রাজ্য বিস্তৃত হলেও অনতিদূরের ইতালি দেশটা স্বাধীন থেকে গিয়েছিল। আকস্মিক মৃত্যু না হলে হয়ত তিনি এ দেশটার দিকে মনযোগ দিতে পারতেন। তবে পৃথিবীর ম্যাপ দেখে তিনি তার বিজয়ের বাকী উল্লেখযোগ্য দেশের অভাবে যেভাবে হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন তাতে মনে হয় এ দেশটাকে তিনি মোটেও আমলে নেন নি। তাঁর উত্তরসূরীরাও কখনও এ দেশ দখল করে নি। কিন্তু রোমানদের উত্থানের সময়ে আলেকজান্ডারের পুরো সাম্রাজ্যই দখল করে নিয়েছিলো তারা।

68.jpg

চিত্র: শিল্পীর তুলিতে রোম নগরী

রোমের ইতিহাসের গোড়াটা খুঁজে পাওয়া যায় রোমান মহাকাব্য ভার্জিলের ইনিডের মধ্যে। গ্রিসের হোমারীয় মহাকাব্য ইলিয়াডে অজানা দেশের উদ্দেশ্যে হারিয়ে যাওয়া যে ট্রোজান বীর ইনিসের কথা বলা হয়েছে, তাঁর কাহিনী নিয়ে রচিত হয়েছে ইনিড। ট্রয় নগরী যখন ধ্বংশ হয়ে যায় তখন ইনিস নতুন জায়গার সন্ধানে ঘুরতে এসে পৌঁছায় ইতালির টাইবার নদীর তীরে। সেখানকার রাজকন্যা লেভিনিয়ার সাথে বিয়ে হয় তার। তাদের সন্তান রেমুলাসই একদিন সাত পাহাড়ের কোলে গড়ে তোলে নতুন নগরী রোমা। এর অধিবাসীরা হলো রোমান। এ সবই অবশ্য গল্পের কথা।

ইতিহাসের পথ ধরে হাঁটলে দেখা যায় ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে এক দল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষী (আর্যভাষী) ইতালির উত্তরে বসতি গড়ে তোলে। তাদের বলা হয় ল্যাটিন। তাদের ভাষা ল্যাটিন ভাষা। তাদের রাজা রেমুলাস রোম নগরীর গোড়াপত্তন করেন। ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে আরেকটি গোষ্ঠী – ইট্রুস্কানরা রোম ও এর আশপাশের অঞ্চল দখল করে নেয়। রোমের জীবন ও শিল্পকলার সর্বত্র এদের প্রভাব দেখা যায়। ৫১০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগেই রোমানদের হাতে পরাজিত হয় তারা। এটা সেই সময়ের কথা যখন পারস্য সাম্রাজ্যের ক্ষমতায় ছিলেন সম্রাট দারায়ুস এবং গ্রিসে এথেন্স একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।

69.png

চিত্র: পৌরাণিক বীর ঈনিড

৫০৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমের ইতিহাস বাঁক নিলো রাজতন্ত্র থেকে প্রজাতন্ত্রের দিকে। টারকুইন নামক অত্যাচারী রাজাকে বিতাড়িত করলো রোমের সাধারণ জনতা – প্লেবিয়ানরা। রাজার বদলে জনগণ প্রতি বছরের জন্য দুজন শাসক নির্বাচনের ব্যবস্থা করলো। এদের বলা হতো কনসাল। কনসালরা চলত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত ৩০০ সদস্য বিশিষ্ট সিনেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। রোমানরা এই শাসন ব্যবস্থার নাম দিয়েছিলো ‘Republic’ অর্থাৎ প্রজাতন্ত্র।

তবে এই প্রজাতন্ত্র প্লেবিয়ান শ্রেণিভুক্ত ক্ষুদ্র কৃষক, কারিগর ও বণিকদের ভাগ্যে কোন পরিবর্তন আনতে পারলো না। অভিজাত প্যাট্রেসিয়ানদের (ভূমি ও দাস মালিক)  দ্বারা তারা সবক্ষেত্রে শোষিত ও বঞ্চিত ছিলো। রোমান কাউন্সিল ও সিনেটের সদস্য নির্বাচিত হতো এই প্যাট্রেসিয়ানদের মধ্য থেকেই। ফলে ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে প্লেবিয়ানরা প্যাট্রেসিয়ানদের বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ের আন্দোলন শুরু করে। তারা খাজনা প্রদান বন্ধ করে দেয়। এমনকি সেনাবাহিনী ছেড়ে চলে যাবে বলেও হুমকি দেয়। এতে তারা কিছু কিছু অধিকার লাভ করতে পারলো। এটা ইতিহাসের অন্যতম পুরনো রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন।

70.jpg

চিত্র: ইট্রুস্কান যোদ্ধা

এ আন্দোলনের ফলে প্লেবিয়ানদের দশজন প্রতিনিধি সিনেটের সদস্য হয়। এদের বলা হতো ট্রিবিউন বা ম্যাজিস্ট্রেট। এরা সাধারন প্লেবিয়ানদের দাবির সমর্থনে আইন প্রণয়ন করতে থাকে। ১২টি ব্রোঞ্জপাতে এই আইন লেখা হয়। জনকল্যাণমুখী এই আইনকে বলা হতো হোবিয়াস কর্পাস। হাম্বুরাবি ও ড্রাকোর পরে এটা আইন প্রণয়নের তৃতীয় বিখ্যাত দৃষ্টান্ত। প্লেবিয়ানদের এই অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চলেছিল প্রায় ২০০ বছর ধরে। অধিকার আদায়ের এক পর্যায়ে এসে দু’জন কনসালের একজন প্লেবিয়ানদের মধ্য থেকে নেয়ারও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এভাবে রোমান প্রজাতন্ত্রের চেহারা কিছুটা গ্রিকদের গণতন্ত্রের মতো হয়ে যায়।

কিন্তু এই রাজনৈতিক অধিকার পেয়ে প্লেবিয়ানদের খুব একটা লাভ হলো না। কারণ শাসন পরিচালনার পদ গুলো ছিলো অবৈতনিক। ফলে যারা গরীব, তাদের কাজ ফেলে সিনেটে এসে সময় দেয়ার সুযোগ ছিলো না। এজন্য জমি, ধন, দাস প্রভৃতির মালিক প্যাট্রেসিয়ানরাই কাউন্সিল ও সিনেটের কাজ করতেন অধিকাংশ সময়। আর্থিক মালিকানার পদ্ধতি পরিবর্তন না করে শুধু গণতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্র দিয়েই যে বৈষম্য দূর হয় না, তার সবচেয়ে প্রাচীন দৃষ্টান্ত এটি। আসল ব্যাপার হলো অর্থনৈতিক মালিকানা ও বন্টনের পদ্ধতি। অর্থব্যবস্থায় পরিবর্তন না এনে শুধু শাসন ক্ষমতায় জনগণের অংশগ্রহণ দিয়ে তেমন কিছু হয় না। আজকের যুগেও গণতন্ত্রের ব্যর্থতার প্রধান কারণ এটি। তৃতীয় বিশ্বের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রথম বিশ্বের হাতে থেকে যাওয়ার কারণে তৃতীয় বিশ্বের গণতন্ত্র কোন কাজে আসছে না।

72.jpg

চিত্র: কলোসিয়াম ও রোম নগরী

রোমের রাজতন্ত্রের পতনের পরবর্তী ইতিহাস মূলত প্যাট্রেসিয়ান ও প্লেবিয়ানের সংঘর্ষের ইতিহাস। কিন্তু এতে রোমান প্রজাতন্ত্র গ্রিকদের মতো যথেষ্ট উদার গণতন্ত্রে পরিণত হতে পারে নি। সেনাবাহিনী ও সিনেটে ছিলো অভিজাত প্যাট্রেসিয়ানদের নিরংকুশ প্রাধান্য। এই সেনাবাহিনীর সহায়তায় রোমান রিপাবলিক সমস্ত ল্যাটিন জাতিগুলিকে পদানত করে দক্ষিণ ইতালিতে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করেছিল। খ্রিস্টপূর্ব ২৬৬ সালের দিকে সমগ্র ইতালি রোমানদের পদানত হয়। বিজয়ী রোমানরা পদানত জাতিগুলির ওপর নানারকম করের বোঝা চাপিয়ে দিতো।

পরদেশ দখলের যুদ্ধে রোমানরা যেসব যুদ্ধবন্দীদের ধরে আনতো তারা পরিণত হতো রোমানদের দাসে। বিজিত দেশগুলি হতে তাদেরকে রোমে চালান দেওয়া হতো। এদের একটি বড় অংশ পরিণত হতো সরকারী সম্পত্তিতে। এদেরকে খনিতে, নির্মাণ কাজে ও জাহাজ চালনায় বেগার খাটানো হতো। উদ্ধৃত্ত দাসদের বাজারে নিয়ে নিলামে বিক্রয় করে দেওয়া হতো। প্যাট্রেসিয়ান ও ধনী প্লেবিয়ানরা তাদেরকে কিনে নিতো। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে রোমের সমস্ত উৎপাদন দাস শ্রমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

73

চিত্র: তিউনিসিয়ার উপকূল ঘেষে গড়া ওঠা কার্থেজ নগরী

দাস শ্রেণিকে নিংড়ে গ্রিক সভ্যতার মতো রোমান সভ্যতাও এগিয়ে যায় সমৃদ্ধির দিকে। তাদের দখলে আসতে থাকে একের পর এক গ্রিক রাষ্ট্র। রোমানদের এ আধিপত্য দেখে শংকিত হয়ে পড়ে ভূমধ্যসাগরের অপর পারের কার্থেজিয়ানরা। তখন রোমান আধিপত্যের একমাত্র শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দী ছিলো কার্থেজ। বর্তমান তিউনিসিয়ায় ছিলো কার্থেজের অবস্থান। ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী দেশগুলোতে কার্থেজিয়ানদের একচেটিয়া বাণিজ্য ছিলো।

রোমানরা টেরেন্ট আক্রমণ করলে কার্থেজ টেরেন্টবাসিদের সহায়তায় একটি নৌবহর পাঠায়। ২৬৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোম ও কার্থেজের মধ্যে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ শুরু হয়। রোমানরা এ যুদ্ধকে পিউনিক যুদ্ধ বলতো। পিউনিক যুদ্ধ চলে শতবর্ষব্যাপী। এ যুদ্ধকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথম পিউনিক যুদ্ধ শেষ হয় ২৪১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এ যুদ্ধে কার্থেজিয়ানরা রোমানদের সাথে সন্ধিচুক্তিতে আসতে বাধ্য হয়। সন্ধির শর্ত অনুসারে সার্ডিনিয়া ও সিসিলি উপদ্বীপ কার্থেজিয়ানদের হাত থেকে রোমানদের অধিকারে চলে যায়।

74

চিত্র: পড়াশুনায় মগ্না আর্কিমিডিস

এ সিসিলির সিরাকিউজ শহরে জন্মেছিলেন তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি আর্কিমিডিস। গল্পে আছে, অদ্ভুত অদ্ভুত আবিষ্কার দিয়ে আর্কিমিডিস বার বার রোমান বাহিনীর হাত থেকে তাঁর শহরকে রক্ষা করেছিলেন। অতসী কাচের সাহায্যে তিনি রোমানদের জাহাজে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন। অভিনব কৌশল ব্যবহার করে তিনি রোমানদের জাহাজ শূণ্যে তুলে মোক্ষম আছাড় দিতে পারতেন। আর্কিমিডিস পড়াশুনা করেছিলেন টলেমিদের আলেকজান্দ্রিয়ার শিক্ষাকেন্দ্রে। ইউক্লিডের কাজের ওপর ভিত্তি করে আর্কিমিডিস জ্যামিতির বহু সমস্যার সমাধান দিতে পেরেছিলেন। পৃথিবী থেকে বিভিন্ন গ্রহের দুরত্ব নির্ণয়ের পদ্ধতি তাঁর আবিষ্কার। তাঁর আবিষ্কৃত পদার্থবিদ্যার একটি মৌলিক সূত্রের নাম হয়েছে আর্কিমিডিসের সূত্র। পানি তোলার প্যাঁচালো স্ক্রু, পাখি মারার গুলতি, কপিকল প্রভৃতি তাঁর আবিষ্কার। আর্কিমিডিস মারা যান রোমান সৈন্যদের হাতে ২১২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে।

প্রথম পিউনিক যুদ্ধে রোমানদের সাথে হেরে গিয়ে কার্থেজিয়ানরা মোটেও দমে গেলো না। স্থলপথে রোম আক্রমণের এক দুঃসাহসিক পরিকল্পনা রচনা করলেন কার্থেজিয়ান সেনা নায়ক হানিবল। স্পেন, ফ্রান্স হয়ে উত্তরদিকের আল্পস পর্বতমালা পেরিয়ে ইতালিতে ঢুকে রোম আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। রোমানরা কখনও ভাবতেই পারেনি আকাশছোঁয়া আল্পস পেরিয়ে এসে উত্তরদিক হতে কেউ আক্রমণ করতে পারে। এ অসম্ভবকে সম্ভব করলেন হানিবল। ২১৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দের বসন্তকালে, আল্পস পর্বতমালা পেরিয়ে গেলেন হানিবল। এক লক্ষ চল্লিশ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে এসেছিলেন হানিবল। তার অর্ধেক পরিমাণ সেন্য, ঘোড়া আর হাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় আল্পস পেরুনোর সময় ঠান্ডায় জমে গিয়ে। হানিবল ক্রমান্বয়ে চারটি রোমান সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে এগিয়ে আসলেন রোমের দিকে।

75.jpg

চিত্র: হাতির পিঠে হানিবল

তখন সিপিও নামক একজন রোমান সেনানায়ক আত্মরক্ষার অভিনব উপায় বের করলেন। তিনি প্রতিরক্ষায় গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো দিকে কার্থেজ আক্রমণের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। ফলে বাধ্য হয়ে হানিবল ফিরে এলেন স্বদেশ রক্ষার জন্য। কার্থেজের অদূরে রোমানদের সাথে যুদ্ধে কার্থেজিয়ানরা পরাজিত হলো। এটা ছিলো দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধ। এ যুদ্ধ শেষ হয় ২০২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। তৃতীয় ও শেষ পিউনিক যুদ্ধ হয় ১৪৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এ যুদ্ধেও পরাজিত হয় কার্থেজ। রোমানরা সিদ্ধান্ত নিলো কার্থেজ নগরীকে সম্পূর্ণ ধ্বংশ করে ফেলার। কার্থেজের রাস্তায় তারা নারী-পুরুষ-শিশু সকলকেই হত্যা করলো নির্বিচারে। শহরে আগুন ধরিয়ে দিলো। শস্যভূমিতে ছড়িয়ে দিলো লবণ, যাতে আর কোন শস্য জন্মাতে না পারে। এভাবে কার্থেজ নগরী সত্যি সত্যিই চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

এই সময়ে সমগ্র ইতালিতে দাস শ্রমের নিয়োগ ব্যাপক আকার ধারণ করে। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের মধ্য ভাগে শুধু গ্রিস হতেই সংগ্রহ করা হয় দেড় লক্ষ দাস। এসব দাসেরা মনিবের মুনাফার জন্য সারাদিন খেটে যেতো বড় বড় কৃষি খামারে। এসব কৃষি খামারের নাম ল্যাটিফান্ডিয়া। কয়েকশো হতে কয়েক হাজার দাস একেকটি ল্যাটিফান্ডিয়ায় খাটতো। হাড়ভাঙ্গা খাটুনির বিনিময়ে তারা পেতো শুধু মালিকের অত্যাচার ও শাস্তি। চাবুকের ঘায়ে তাদের পিঠের চামড়া শক্ত হয়ে যেতো।

76.jpg

চিত্র: রোমান-কার্থেজিয়ান যুদ্ধ

রোমান ক্রীতদাসের জীবন মালিকের কাছে হালের বলদ কিংবা লাঙ্গলের চেয়ে মোটেও বেশি মূল্যবান ছিলো না। কারণ বিভিন্ন দেশ দখলের যুদ্ধ হতে রোমানরা পেতো অগণিত যুদ্ধবন্দী ক্রীতদাস। তাই বাজারে সস্তায় দাস পাওয়া যেতো। কার্থেজের সাথে যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকে রোম একটার পর একটা দেশ জয় করে চলছিলো। আর যত যুদ্ধ তত দাস। আর যত বেশি দাস তত সস্তা তাদের জীবনের দাম। এসব ক্রীতদাসের পাঁজরের গাঁথুনি দিয়ে গড়ে উঠেছে সভ্যতার ইমারত।

আগুনে উত্তপ্ত লোহার সাহায্যে ক্রীতদাসদের গায়ে দাগ দেয়া একটা সাধারণ রোমান রীতি ছিলো। দাসদের কোন নাম ছিলো না। গালাগালি করেই তাদেরকে ডাকা হতো। গ্রীষ্মকালে তাদেরকে দৈনিক ১৮ ঘন্টা কাজ করতে হতো। কাজ করতে করতে ক্ষুধার্ত দাস যাতে ক্ষেতের শস্যদানা খেয়ে ফেলতে না পারে সেজন্য তার ঘাড়ে কাঠের চাকা পরিয়ে দেওয়া হতো। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে একজন দাস পঙ্গু ও বিকলাঙ্গ হয়ে যেতো। তাকে নির্জন দ্বীপে ফেলে আসা হতো। সেখানে সে অনাহারে মারা যেতো কিংবা হিংস্র পশুর খাদ্যে পরিণত হতো।

77.jpg

চিত্র: রোমের বাজারে দাস বেঁচা-কেনার দৃশ্য

কৃষির চেয়ে খনির কাজে দাসদের অবস্থা ছিলো আরো করুণ। রুক্ষ পাথরের গুহায় পাথরের দেয়াল কাটতে কাটতে একসময় তারা সেখানেই মরে পড়ে থাকতো। তাদের কঙ্কালের পাশে বসে কাজ করে যেতো নতুন দাসেরা। অল্প দিনের মধ্যে এরাও মারা পড়ত। পলাতক দাসদের নিক্ষেপ করা হতো ক্ষুধার্ত সিংহের মুখে। এমনসব বিভৎস কায়দায় দাসদের নিপীড়ন করা হতো যা শুনলে আজকের যুগের মানুষ চমকে উঠবে। দাসদের ওপর বর্বরতায় রোমান সভ্যতা ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। এ সভ্যতার গৌরবের আড়ালে লুকিয়ে আছে মানবতার পরাজয়ের এক করুন ইতিহাস।

দাস নিপীড়নের কলঙ্ক এ সভ্যতার গৌরবকে ম্লান করে দেয়। সভ্যতার গৌরবের পেছনে লুকিয়ে আছে কলঙ্কের ক্রুর হাসি। দাস নিপীড়নের কলঙ্কে রোমানরা শীর্ষে পৌঁছে যায় গ্লাডিয়েটর প্রথার জন্ম দিয়ে। গ্রিকরা অবসর সময়ে বসে থিয়েটার দেখতো। রোমানরা তাদের অবসর বিনোদনের জন্য এরকম শিল্পসম্মত পদ্ধতির ধারে কাছেও গেলো না। নারকীয় নৃশংসতাই হয়ে উঠল রোমান অভিজাতদের শিল্প। বিনোদনের জন্য তারা সিংহের খাঁচায় ক্রীতদাসকে পুরে দিয়ে মজা দেখতো; দেখতো সিংহ কেমন করে মানুষ ছিঁড়ে খায়।

78.jpg

চিত্র: রোমান গ্লাডিয়েটরের যুদ্ধ

অভিজাতদের বিকারগ্রস্থ রুচি চর্চার সবচেয়ে কুখ্যাত জায়গা ছিলো এরেনাগুলো। এরেনার ভেতরে তারা শক্তিশালী ক্রীতদাসদেরকে বাধ্য করতো পরস্পরের সাথে যুদ্ধ করতে। এদের বলা হয় গ্লাডিয়েটর। যুদ্ধের নিয়ম ছিলো দুজন গ্লাডিয়েটরের মধ্যে একজনকে মরতে হবে। যুদ্ধে যে বিজয়ী হবে সে-ই বেঁচে থাকবে। তাই দুজনেই চাইত অপর জনকে হত্যা করে বেঁচে থাকতে। এই ভয়ংকর নির্মমতায় তারা রাজি না হলে দুজনকেই হত্যা করা হতো।

যুদ্ধে বিজয়ী গ্লাডিয়েটর যখন এরেনার গ্যালারিতে বসা দর্শকদের উদ্দেশ্যে পরাজিত গ্লাডিয়েটরের মাথা কেটে তুলে ধরতো তখন দর্শকরা আনন্দে উঠে দাঁড়িয়ে করতালি দিতো। এটা ছিলো অনেকটা আজকের দিনের ফুটবল খেলায় গোল হওয়ার দৃশ্যের মতো। গ্লাডিয়েটরদেরকে সিংহের সাথেও লড়াইয়ে বাধ্য করা হতো। এ ধরনের নারকীয় জীবন থেকে মুক্তির জন্য ক্রীতদাসেরা সুযোগ পেলেই বিদ্রোহ করতো। মানুষের ইতিহাস শুধু শোষণ আর কলঙ্কের নয়, সংগ্রামেরও। এ সংগ্রামের মহান কীর্তি দাসবিদ্রোহ।

ক্রীতদাসের ওপর মেহনতের সবটুকু দায় চাপিয়ে দিয়ে গ্রিকরা মন দিয়েছিলো শিল্প, সাহিত্য, দর্শন আর বিজ্ঞানের দিকে। কিন্তু রোমানরা মনযোগ দিয়েছিলো শুধুই লুন্ঠনের দিকে; পরের দেশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে লুটতরাজের দিকে। রোমানদের ইতিহাস তাই একের পর এক যুদ্ধের ইতিহাস; লেখাপড়া বা জ্ঞানচর্চার নয়। তাই রোমে কখনও জন্ম হয় নি সক্রেটিস, ডেমোক্রিটাস, এস্কাইলাস, পিথাগোরাস কিংবা পেরিক্লিস-সলোনের মতো ব্যক্তিদের। এ সভ্যতার অন্দরমহলে ক্রীতদাসের বুকফাঁটা কান্না আর সদর মহলে লুটেরাদের উল্লাস। এ উল্লাসে মাঝে মাঝে ভাটার টান দেখা দিতো দাস বিদ্রোহের কারণে।

79

চিত্র: রোমান স্থাপত্যরীতি ছিলো পৃথিবীর মধ্যে সেরা

দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধের পর হতেই রোমান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ছোট খাটো দাস বিদ্রোহ দেখা দেয়। ১৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ হতে বিদ্রোহ ব্যাপক আকার ধারণ করে। রোমে শত শত বিদ্রোহীকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। এটিকার রৌপখনির দাসেরা বিদ্রোহ করে। ডিলবো শহর দাসদের দখলে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলো। একবার তুরস্ক অঞ্চলের এক ল্যাটিফান্ডিয়ার দাস বিদ্রোহীরা কয়েকটি শহর কেড়ে নিয়ে একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। এ রাজ্য পূণর্দখলে রোমান কনসালের সেনাবাহিনী প্রথমে পরাজিত ও পরে সফল হয়েছিলো।

ক্রীতদাস ছাড়াও আরেকটি শ্রেণি অভিজাত শ্রেণির স্বার্থের বলী হয়েছিলো রোমান সাম্রাজ্যে। এরা হলো প্রলেতারিয়ান। সারা দেশের জমি অভিজাতদের ল্যাটিফান্ডিয়ার ভেতরে চলে গেলে প্লেবিয়ানদের একটি বিশাল অংশ পরিণত হয় ভূমিহীন প্রলেতারিয়েতে। কৃষি উৎপাদনে শ্রমের চাহিদা ল্যাটিফান্ডিয়ার দাসদের দিয়ে পূরণ হয়ে যাওয়ায় এরা চুড়ান্তভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ে। তবে ট্রিবিউন নির্বাচনে তাদের সমর্থনের প্রয়োজন হতো। রোমান নাগরিকদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য শ্রেণি হলো ব্যবসায়ী-বণিক-সুদখোর শ্রেণি। সিনেটের ক্ষমতায় অভিজাতদের নিরংকুশ প্রাধান্য থাকায় এরা ছিলো ক্ষমতাবঞ্চিত। তাই ক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্যে তারা প্রলেতারিয়ানদের সমর্থন আদায়ে সচেষ্ট হয়।

80.jpg

চিত্র: জননন্দিত ট্রিবিউন গেইয়াস গ্রেকাস জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছেন

এজন্য টিবেরিয়াস গ্রেকাস নামে একজন অভিজাতকে তারা হাত করে। ১৩৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি ট্রিবিউন নির্বাচিত হয়ে ভূমিহীনদের ভূমি প্রদানের জন্য সিনেটে আইন পাশের প্রস্তাব করেন। কিন্তু রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে তিনি অভিজাতদের হাতে নিহত হন। ১২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তাঁর ভাই গেইয়াস গ্রেকাস ট্রিবিউন নির্বাচিত হয়ে ভূমিহীনদের সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট হন। বণিকরা তাকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলো। তিনি ক্ষমতা থেকে বিদায় হওয়ার পরে টিবেরিয়াসের ভূমি আইন রদ হয়ে যায় এবং সিনেট পুরনো ক্ষমতা ফিরে পায়। তবে এ সময় রোম সাম্রাজ্য নতুন সঙ্কটে পতিত হয়।

টিবেরিয়াস ও গেইয়াসের মতো প্রলেতারিয়ান প্রতিনিধিদের আবির্ভাব অভিজাতদের নিরংকুশ প্রভাবে ফাটলই ইঙ্গিত করে। গেইয়াস গ্রেকাসের পতনের পর রোমান শাসনের বিরুদ্ধে আফ্রিকায় বিদ্রোহ দেখা দেয়, স্পেনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, ইতালিজুড়েও দাস বিদ্রোহের প্রকোপ দেখা দেয়। এর ওপর আবার যাযাবর জার্মান, ডাচ ও স্কেন্ডিনেভিয়ান টিউটন জাতির লোক ইতালিতে এসে ঢুকে যায়। এই গভীর সঙ্কটের মুখে পড়ে রাষ্ট্র রক্ষার জন্য অভিজাতরা প্রলেতারিয়ানদের সাথে আপষে বাধ্য হয় এবং নিরংকুশ অভিজাততন্ত্রে একটি স্থায়ী ফাটল দেখা দেয়।

81

চিত্র: রোমান প্লেবিয়ানদের বিদ্রোহ

সিপিয়োর প্রাক্তন সেনাপতি মেরিয়াস প্রলেতারিয়ানদের নিয়ে রাষ্ট্র রক্ষার জন্য একটি নতুন সেনাবাহিনী গঠনের অনুমতি পেলেন। প্রলেতারিয়ান সেনাবাহিনী গঠনে বণিকরাও সমর্থন দিয়ে গেলো। মেরিয়াস এবার আর ট্রিবিউন নয়, বণিকদের সহায়তায় একেবারে কনসাল পদে নির্বাচিত হলেন। তিনি পাঁচ বছরের মধ্যে রাষ্ট্রের সুরক্ষা ফিরিয়ে আনলেন। কিন্তু অভিজাতদের সাথে বণিক ও প্রলেতারিয়ানদের শ্রেণি-সংঘর্ষ চাপা থাকলো না। ট্রিবিউনদের পরিষদ ও সিনেটের মধ্যে যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন সবসময় লেগে ছিলো তা এবার প্রাকাশ্য রূপ ধারন করলো।

রোম সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ শ্রেণি-বিরোধ অনেক সময়েই মিটমাট হয়ে যেতো লুটের ধন ভাগাভাগি করে। অন্যদেশ দখল ও লুণ্ঠন করে যে জমি ও সম্পত্তি পাওয়া যেতো তা দিয়ে বঞ্চিতদের তুষ্ট করা যেতো অনেক ক্ষেত্রে। দেশ লুন্ঠনে অভিজাতরা নেতৃত্বে দিলেও প্রলেতারিয়ানরা বা প্লেবিয়ানরা সেনাবাহিনীতে অংশ নিয়ে লুটপাটের অংশীদার হতে পারতো। এভাবে পরের ঘরের ধন লুট করে নিজের ঘরের বিরোধ মেটানো যেতো। লুণ্ঠন ছিলো রোমান সমৃদ্ধির মূল চাবিকাটি।

82.jpg

চিত্র: রোমান সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ

জমি, দাস ও সম্পদ – সবই আসত অন্যদেশ দখল ও লুণ্ঠন থেকে। রোমানদের সমৃদ্ধি ও উত্থানের মূল ছিলো লাগাতার দেশ দখল ও লাগামহীন লুণ্ঠন। এ লুণ্ঠনে যেসব প্লেবিয়ান- প্রলেতারিয়ান সৈন্যরা অংশ নিতো তারা লুণ্ঠনলদ্ধ অর্থ পেয়েই সুখী থাকতো। উপ্রি লাভ হতো অভিজাত প্যাট্রেসিয়ানদের। জমি ও দাস দুটোই তাদের হাতে আসতো অগনিতভাবে। তাই সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে রাখলেও অন্যদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়াটা অভিজাতদের জন্য ক্ষতিকর ছিলো না বরং অত্যন্ত লাভজনকই ছিলো।

মেরিয়াস তার অনুগত প্রলেতারিয়ান সৈন্যদেরকে বিজিত দেশ স্পেন, আফ্রিকা ও তুরস্ক হতে ২৫ হেক্টর করে জমি দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এদের নিয়ে গলদেশ অর্থাৎ ফ্রান্স দখলেরও প্রস্তাব করলেন। আর দখল মানেই তো অভিজাতদের হাতে আরও দাসের চালান, আরও ল্যাটিফান্ডিয়া স্থাপনের সুযোগ; বণিকদেরও অবাধ লুন্ঠনের সুযোগ; সেনাবাহিনীরও পোয়াবারো। বিজিত দেশের জমি প্রলেতারিয়ানদের মাঝে বিতরণে অভিজাতদের আপত্তি নেই, কারণ এতে তাদের ল্যাটিফান্ডিয়ায় হাত পড়ে না। অতএব দুটি সিদ্ধান্তেই কেউ আপত্তি তুললো না। সবাই সানন্দে রাজী ছিলো। কিন্তু বাঁধ সাধল সেনাবাহিনী বহির্ভূত প্রলেতারিয়ানরা। তারা দেখলো ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

83.jpg

চিত্র: গেইয়াস মেরিয়াস (জন্ম: ১৫৭ খ্রি.পূ.-৮৬ খ্রি.পূ.)

প্রলেতারিয়ানরা গ্রেকাস ভাইদের ভূমি আইন বাস্তবায়নের দাবি তুললো। এ আইন বাস্তবায়ন হলে অভিজাতদের ল্যাটিফান্ডিয়ার জমিতে হাত পড়বে। তাই তারা গ্রেকাস ভাইদের আইন বাস্তবায়ন যেকোন মূল্যে ঠেকিয়ে রাখতে প্রস্তুত হলো। ফলে মেরিয়াস বঞ্চিত প্রলেতারিয়ানদের কথায় কান দিলেন না। কিন্তু তারা সংখ্যায় ছিলো বিপুল। তারা অচিরেই সংগঠিত শক্তিতে আত্মপ্রকাশ করলো। ট্রিবিউন সেটারনিনাস তাদের নেতা হিসেবে অবির্ভূত হলেন। সমস্ত ইতালির প্রলেতারিয়ানদেরকে তিনি রোমে আসতে আহ্বান জানালেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১১০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মেরিয়াসকে হটিয়ে দিয়ে প্রলেতারিয়ানরা রোম দখল করলো। কারাগার ভেঙে তারা দাসদের মুক্ত করলো। তাদের হাতেও তুলে দিলো অস্ত্র এবং সিনেট ভবন দখল করে নিলো।

প্রলেতারিয়ানদের এই আকম্মিক উত্থানে ভঁড়কে গেলো বণিকরা। তারা এই বিপ্লবে তাদের কোন স্বার্থ খুঁজে পেল না। কিন্তু তারা এতদিন প্রলেতারিয়ানদেরকে ভূমি প্রদানের পক্ষে ছিলো এই কারণেই যে, এতে তাদের কোন ক্ষতি হতো না; হতো ল্যাটিফান্ডিয়ার মালিকদের এবং এতে প্রলেতারিয়ানদের সমর্থন নিয়ে তাদের ক্ষমতায় বসার পথও প্রশস্ত হতো। কিন্তু এখন অবস্থা এমন পর্যায়ে চলে গেলো যে শুধু অভিজাত নয়, তাদেরও অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার আশংকা দেখা দিলো। তাই বিরোধ ভূলে অভিজাতদের সাথে তারা হাত মেলালো এবং উভয়ে মিলে মেরিয়াসের অধীনে পূণর্গঠিত করলো সেনাবাহিনীকে।

84.jpg

চিত্র: রোমান কৃষক

১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মেরিয়াস ও সেটারনিনাসের বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধে সেটারনিনাস নিহত হন ও তাঁর বাহিনী আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। কিন্তু এ বিজয়ে শ্রেণি বিরোধের অবসান হলো না। রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে এ বিরোধ চলেছিলো আরও ৭০ বছর ধরে। এক সময়ের একমাত্র অভিজাতদের স্থলে তখন বণিক ও প্রলেতারিয়ানরা সংগঠিত শ্রেণি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সমাজের রাজনৈতিক ভিত্তিও তিনটি শক্তিকেন্দ্রে ভাগ হয়ে গিয়েছিল।

বণিক ও প্রলেতারিয়ানরা ততদিনে সমাজে স্বতন্ত্রভাবে সংগঠিত রাজনৈতিক সত্ত্বা অর্জন করে ফেলেছে। প্রলেতারিয়ানদের পরাজিত করে বণিক ও অভিজাতরা মিলে উভয় পক্ষ হতে দুজন করে কনসাল নিযুক্ত করতে থাকে রোমে। নতুন কনসালরা প্রলেতারিয়ানদের বিদ্রোহ প্রশমিত করার জন্য তাদেরকে ব্যাপক হারে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করে বিদেশে নিয়ে যায় দখল-লুণ্ঠন অভিযানে।

প্রলেতারিয়ানদের বিরোধ আপাতত নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও বণিক ও অভিজাতদের বিরোধ আর চাপা থাকলো না। নতুন কনসাল সুল্লা ও বণিক ভজা প্রোকনসাল সেনানায়ক মেরিয়াস উভয়েই যখন রোমের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় বিদ্রোহ দমন ও লুণ্ঠনে বেরিয়েছেন তখন হঠাৎ করে মেরিয়াস ফিরে এসে অপর কনসাল সিন্নাকে নিয়ে রোম দখল করে ফেললেন। অভিজাত ও বণিকদের পক্ষ থেকে তখন সুল্লা ও সিন্নাকে কনসাল নিয়োগ দেওয়া হয়েছিলো।

85

চিত্র: রোমের গৃহযুদ্ধ

মেরিয়াস পাঁচদিন ধরে অভিজাতদের হত্যা করতে থাকেন এবং তাদের সম্পত্তি বণিকদের মাঝে বিতরণ করে দেন। ভালো ভালো ল্যাটিফান্ডিয়াগুলো নাম মাত্র মূল্যে বণিকরা কিনে নিলো। সুল্লা দেশে ফিরে এসে পুনরায় রোম দখল করে নেন। মেরিয়াসের সৈন্য ও সমর্থকদের হত্যার জন্য তিনি রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের ব্যবস্থা করলেন। জমিও আবার হাত বদল হলো। এটাই অভিজাতদের শেষ বিজয়। রোম তখন নামে মাত্র বিপাবলিক। সিনেটের কার্যকারিতা লোপ পেয়ে গেছে ততদিনে। সুযোগসন্ধানী সেনানায়করা চাইলেই অভিজাত ও বণিকদের সমর্থন নিয়ে একনায়কের ভূমিকায় আবির্ভূত হচ্ছে।

এতদিন সেনানায়করা এক বছরের জন্য কনসাল নির্বাচিত হতে পারতেন। এক বছর পরে প্রোকনসাল হয়ে তারা বিজিত কোন প্রদেশের ক্ষমতায় বসে অবাধ লুণ্ঠনের সুযোগ পেতেন। রিপাবলিক ব্যবস্থায় স্থায়ীভাবে কনসাল বা একনায়ক হওয়ার সুযোগ আগে ছিলো না। কিন্তু এই অবস্থায় এসে অভিজাত ও বণিকদের মধ্যে সৃষ্ট গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতিতে কোন এক পক্ষকে স্থায়ীভাবে স্বার্থ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একনায়ক হিসেবে ক্ষমতায় বসার সুযোগ সেনানায়কদের হাতে ধরা দিচ্ছিলো। কিন্তু এমন সময় স্পার্টাকাসের নেতৃত্বে দাস বিদ্রোহে তাদের সে উৎসাহে ভাটার টান ধরে যায়।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দাসবিদ্রোহের ঘটনা ঘটে খ্রিস্টপূর্ব ৭০ দশকে। এ বিদ্রোহের সূচনা হয় কাপুয়া শহরের একটি এরেনা থেকে। এর নেতা একজন গ্লাডিয়েটর। তাঁর নাম স্পার্টাকাস। রোমানরা তাকে বন্দী হিসেবে এনেছিলো তুরস্ক থেকে। ৭৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে স্পার্টাকাসের নেতৃত্বে দাস বিদ্রোহের সুচনা ঘটে। এটা অন্যান্য বিদ্রোহ থেকে একেবারেই আলাদা। স্পার্টাকাস তার অনুসারিদেরকে নিয়ে পালিয়ে ভিসুভিয়াস পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখান থেকে রোমান সেনাদের অবরোধ ভেঙ্গে বেরিয়ে এসে তাদের ধ্বংশ করে দেন। স্পার্টাকাসের বিজয়ের সংবাদ চর্তুদিকে ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের শহরের হাজার হাজার বিদ্রোহী ক্রীতদাস তাঁর বাহিনীতে যোগ দিতে থাকে।

86.jpg

চিত্র: স্পার্টাকাস

তিন মাসের মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার ক্রীতদাস এই বিদ্রোহে শামিল হয়। রোমান সিনেট বিদ্রোহ দমনে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে পরাজিত হয়। স্পার্টাকাস তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে সিসিলির দিকে অগ্রসর হন। দক্ষিণ ইতালিতে তিনি রীতিমত একটি স্বাধীন রিপাবলিক স্থাপন করে ফেলেন। স্পার্টাকাস একবার তিনশ রোমান সৈন্যকে ধরে এনে গ্লাডিয়েটরের মতো তাদের একজনকে আরেকজনের বিরুদ্ধে মৃত্যু পর্যন্ত লড়তে বাধ্য করেন। এতে রোমে আংতকের ঢেউ বয়ে যায়। এই সংকটের সময়  কনসাল পদে  প্রার্থী  হতে কেউ  রাজি  হচ্ছিল না। রোমান বাহিনী র্স্পাটাকাসের বাহিনীর কাছে বারবার শোচনীয়ভাবে পরাজিত হচ্ছিল।

অবশেষে ক্রাসাস নামে এক ধনী লোককে রোমের কনসাল পদে বসানো হয়। তাঁর আহ্বানে রোমকে রক্ষা করার জন্য আশপাশের রাষ্ট্র থেকে বিশাল সেনাবাহিনী এসে পৌঁছায়। এই সম্মিলিত বাহিনী বিদ্রোহী বাহিনীর পিছু ধাওয়া করে। খ্রিস্টপূর্ব ৭১ সালে এই সম্মিলিত বাহিনীর কাছে ঝড়ের প্রকোপে বিশৃঙ্খল হয়ে যাওয়া স্পার্টাকাসের বাহিনী পরাজিত হয়। বিদ্রোহীরা দুই বছর ধরে কনসালের সেনাবাহিনীকে ঠেকিয়ে রেখেছিলো। মোট পাঁচবার রোমান বাহিনী পরাজিত হয়েছিলো তাদের কাছে।

87.jpg

চিত্র: রোমান সেনা

শেষ ও চূড়ান্ত যুদ্ধে দাসেরা পরাজিত হলে রোমান সিনেট নারকীয় উল্লাসে বিদ্রোহীদের শাস্তি প্রদান করে। কাপুয়া থেকে রোম শহর পর্যন্ত রাস্তার দুইপাশে হাজার হাজার ক্রীতদাসকে ক্রশবিদ্ধ করে ঝুলিয়ে রাখা হয়। রক্তের বন্যায় এই বিদ্রোহকে ডুবিয়ে দেয়া হলো বটে; কিন্তু এটা সভ্যতার আসল চেহারাই ফুটিয়ে তুললো এবং রেখে গেলো মহান সংগ্রামের উত্তরাধিকার। সভ্যতার ভেতরের কদর্য চেহারাটা বেরিয়ে এলো এই বিদ্রোহে। রোমানদের কদর্য দাস প্রথার বিরুদ্ধে কোন রোমান দার্শনিকই প্রতিবাদ জানাননি। গ্রিকদের মধ্যে থেকে একমাত্র সেনেকা দাসদের পূর্ণ মানুষের মর্যাদায় বিশ্বাস করতেন।

দীর্ঘ যুদ্ধে পরাজিত হলেও দাসেরা ছোট ছোট খন্ডযুদ্ধ পরিচালনা ও সমুদ্রে রোমান জাহাজ লুট করতে থাকে। ফলে রোমে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। এই খাদ্য সংকটের ফলে ভুক্তভোগী প্রলেতারিয়ানদের অসন্তোষ নতুন করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠার উপক্রম হলো। নিরূপায় অভিজাত ও বণিকরা বাধ্য হয়ে সেনানায়কদের হাতে স্থায়ীভাবে ক্ষমতা তুলে দিতে সম্মত হয়। রাষ্ট্রকে পতনের হাত থেকে রক্ষার জন্য সামরিক একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠায় বণিক ও অভিজাতরা সম্মত হলো।

88

চিত্র: শত্রুর তীর ও বর্শার আঘাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য একটি জনপ্রিয় রোমান সমর কৌশল ‘tortoise’

এতে ভূস্বামী অভিজাত প্যাট্রেসিয়ানদের একক আধিপত্য হ্রাস পায়। সিনেট-অভিজাততন্ত্র ধ্বসে পড়ে। সমর নায়করাই তখন উভয়পক্ষের নেতায় পরিণত হয়েছেন। রাজনীতিবিদরা আর নাগরিক নেতা থাকলেন না। সেনানায়কগন দুই পক্ষের যে কোন এক পক্ষে ভিড়ে গিয়ে স্বার্থরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেদের ক্ষমতায় বসার পথ প্রশস্ত করছেন। অন্যদিকে বণিক ও অভিজাতরা রাজনীতি বাদ দিয়ে সেনানায়কদের হাত করে স্বার্থ রক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠছেন। এভাবে তারা ক্রমে আরও বেশি করে সামরিক শক্তির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছিলেন।

ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনৈতিক পদ্ধতিটি এভাবে সামরিক একনায়কত্বের জালে বন্দী হয়ে যেতে শুরু করে। এ সময়ে রোমান অভিজাতদের আর্থ-সামাজিক কর্তৃত্ব তলানীতে গিয়ে ঠেকে। দাসবিদ্রোহ এবং মেরিয়াসের মতো বণিকপন্থী সেনানায়কের উত্থানের কারণে অনেক ভূস্বামীরই সর্বনাশ হয়। যেসব অভিজাতদের হাতে তখনও যথেষ্ট পরিমাণে ভূসম্পত্তি ছিলো তারা বণিকদের সাথে সন্ধি স্থাপন করে দাস ব্যবস্থা কায়েম রাখার সর্বশেষ প্রচেষ্টা হিসেবে সামরিক এনায়কত্ব প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়। কারণ ল্যাটিফান্ডিয়ার উৎপাদন বাঁচাতে দাস শোষণ ছাড়া তাদের আর কোন উপায় ছিলো না।

89.jpg

চিত্র: রোমান ফোরামের বর্তমান দৃশ্য। এটি ছিলো রোম নগরীর কেন্দ্র

সামরিক একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার পূর্বে বণিক ও অভিজাতদের মধ্যে একটা চুক্তি হলো। চুক্তিতে বণিকদের প্রতিনিধিত্ব করলেন ক্রাসাস আর অভিজাতদের প্রতিনিধিত্ব করলেন জুলিয়াস সিজার ও পম্পেই। পম্পেই ও সিজার দুজনেই বিখ্যাত রোমান সেনানায়ক ও বিশাল সৈন্যবাহিনীর অধিকারী ছিলেন। এরা আলেকজান্ডারের সাবেক সাম্রাজ্যভুক্ত এলাকা ও ইউরোপের বিশাল অঞ্চলকে রোমান শাসনের পদানত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। চুক্তি স্বাক্ষরকারী তিনজনই একনায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। ক্রাসাসের পরে পম্পেই ও জুলিয়াস সিজার যৌথভাবে কনসাল নিযুক্ত হন। পম্পেই কনসাল হয়েছিলেন অভিজাতদের পক্ষ হতে আর জুলিয়াস সিজার কনসাল হয়েছিলেন দল বদল করে বণিক প্রতিনিধি হিসেবে।

কনসাল হয়েই তারা প্রোকনসাল ক্রাসাসকে এশিয়া মাইনরে লুণ্ঠনের জন্য পাঠিয়ে দেন। যথারীতি নিজেরাও দেশ ছেড়ে বেড়িয়ে পড়েন দখল-লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে। এ সময়ে সিজার ইউরোপের বিশাল ভূখন্ড দখলে আনতে সমর্থ হন। খ্রিস্টপূর্ব ৬০ সালের মধ্যে ক্রাসাস, সিজার ও পম্পেই রোমান সাম্রাজ্যের সর্বময় কর্তায় পরিণত হন। এদের সময়ে রোমান সাম্রাজ্য সর্বাধিক ব্যপ্তি লাভ করে। ইউরোপের মূল ভূখন্ড প্রথমবারের মতো বিভিন্ন প্রাচীন অর্ধসভ্য জাতির হাত থেকে কেঁড়ে নিয়ে রোমান শাসন ও শোষণের আওতায় আনতে সমর্থ হন জুলিয়াস সিজার। মধ্য ও উত্তর ইউরোপ এই প্রথম রোমান সভ্যতার আওতায় আসে।

90

চিত্র: জুলিয়াস সিজারকে নিয়ে একটি চিত্রকর্ম

আলেকজান্ডারের সাবেক সাম্রাজ্যের একটি বিশাল অংশ নিজেদের দখলে নিয়ে এসেছিলেন পম্পেই ও সিজার। রোমান সাম্রাজ্যের সীমানাকে সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত করেন এরাই। এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপজুড়ে বিশাল ভূখন্ডকে এরা রোমান শাসনের অধীনে নিয়ে আসেন। আলেকজান্ডারের পরে বিশ্বব্যাপী একক আধিপত্য বিস্তারে তাঁর সমকক্ষ হওয়ার যোগ্যতা সর্বপ্রথম অর্জন করেন জুলিয়াস সিজার। আলেকজান্ডারের সাম্রাজ্যের অন্যতম দুটি অংশ মিসর ও সিরিয়াকে প্রথমবারের মতো রোমান শাসনের পদানত করেন পম্পেই ও সিজার। রোম ইউরোপের সবচেয়ে বড় শক্তি হলেও এতদিন পর্যন্ত টলেমিদের মিসর ও সেলুসিড রাজ্য সিরিয়া আংশিক বা পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করেছে। পম্পেই ৬৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সেলুসিডদের সিরিয়া দখল করতে সফল হন এবং জুলিয়াস সিজার ৪৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমের অনুগত ক্লিওপেট্রাকে মিসরের ক্ষমতায় বসান। অবশ্য এর আগেও মিসর কয়েকবার রোমের বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলো।

৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তাঁর সেনাপতিরা নিজ নিজ এলাকার শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। অনিবার্য গৃহযুদ্ধের পর সেনাপতিরা নিজ নিজ এলাকায় রাজা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেন। সিরিয়া অঞ্চলের দখল নেন সেলুকাস নিকাটোর। সেলুকাসের অধীনে সিরিয়া একটি স্বাধীন রাজ্যে পরিণত হয়। এন্টিয়ক ছিলো রাজধানী। সেলুকাসের বংশধরদের বলা হয় সেলুসিড। তাই তাদের রাজ্যকে বলা হয় সেলুসিড রাজ্য। সিরিয়া ও আশপাশের কিছু অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিলো সেলুসিড রাজ্য। এর পাশাপাশি শক্তিশালী রাজ্যের মধ্যে ছিলো টলেমিদের মিসর ও পার্থিয়া (পারস্য)। বর্তমান ইরান অঞ্চলে ছিলো তখনকার পার্থিয়া রাজ্য। জেরুজালেমকেন্দ্রিক ইহুদিদের জুডিয়া রাজ্য ছিলো কখনও টলেমিদের অধীনে আবার কখনও ছিলো সেলুসিডদের অধীনে।

91.jpg

চিত্র: সেলুসিড সৈন্য

আলেকজান্ডারের মেসিডোনিয়ান সেনাপতি প্রথম টলেমি মিসরের রাজা হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বংশধরদেরকেও টলেমি নামে ডাকা হয়। তবে তাদের একেকজনের নামের সাথে একেকটি আলাদা উপাধি যুক্ত আছে। প্রথম টলেমি থেকে শুরু করে দ্বাদশ টলেমি আউলেটসের কন্যা সপ্তম ক্লিওপেট্রার সময় পর্যন্ত প্রায় ৩০০ বছর মিসর একটি স্বতন্ত্র রাজ্য ছিলো। প্রথম টলেমি সটার লিবিয়ার পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ সিরিয়া ও সাইপ্রাস দখল করে টলেমি রাজ্যের অর্ন্তভূক্ত করেছিলেন। এমনকি ইজিয়ান সাগরের দ্বীপগুলিও দখল করে গ্রিসের মল ভূখন্ডে সেনাঘাঁটি স্থাপন করেছিলেন।

দ্বিতীয় টলেমি ফিলাডেলফাসের (২৮২-২৪৬ খ্রি.পূ.) সময়ে টলেমি রাজ্য সর্বাধিক বিস্তার লাভ করে। তাঁর আমলেই আলেকজান্দ্রিয়ার কাছে ফারোজ দ্বীপের ঐতিহাসিক বাঁতিঘরটি নির্মাণ করা হয়েছিলো। প্রাচীন সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম এই আলেকজান্দ্রিয়ার বাঁতিঘর। তৃতীয় টলেমি ইউয়েরগেটস (২৪৬-২২১ খ্রি.পূ.) মিসরের প্রতিদ্বন্দ্বী সেলুসিড রাজ্যের কেন্দ্রীয় অঞ্চল সাময়িকভাবে দখল করতে পেরেছিলেন। চতুর্থ টলেমি ফিলোপেটর (২২১-২০৫ খ্রি.পূ.) সেলুসিডদের শক্তিশালী প্রতিআক্রমণ ব্যাহত করতে সমর্থ হন। তাঁর পুত্র পঞ্চম টলেমি ইপিফেইনস (২০৫-১৮০ খ্রি.পূ.) সাবালক হওয়ার আগেই সিংহাসনে বসেন।

92 (2)

চিত্র: আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘর

এ সময়ে কার্থেজের সংগে দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধে রোমানরা জয়লাভ করে। যুদ্ধজয়ী রোম প্রথমেই নাক গলায় মিসরের ব্যাপারে। ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমান সিনেট একটি পুরনো চুক্তির দোহাই দিয়ে নাবালক রাজা পঞ্চম টলেমির অভিভাবক হিসেবে একজন রোমান অভিজাতকে পাঠায় মিসরে। পঞ্চম টলেমির সময়ে মূল মিসরের বাইরের অধীনস্ত অঞ্চলগুলি হাতছাড়া হয়ে যায়। এর মধ্যে অন্যতম ছিলো ইহুদি রাজ্য জুডিয়া। ১৯৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পঞ্চম টলেমি জুডিয়ার কর্তৃত্ব সেলুসিডদের হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

সিরিয়ার সেলুসিড রাজারা অবশ্য জুডিয়াকে বাগে আনতে যথেষ্ট প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিলেন। এর কারণ ইহুদি বিদ্রোহ। ১৬৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সেলুসিড বংশীয় চতুর্থ রাজা অ্যান্টিওসাস ইপিফানি জেরুজালেমের ধর্মগৃহে সংরক্ষিত ধনরত্ন লুট করায় এবং এ ধর্মগৃহকে গ্রিক দেবরাজ জিউসের মন্দিরে পরিণত করায় ইহুদি বিদ্রোহ শুরু হয়। ম্যাকাবিস পরিবারের নেতৃত্বে ইহুদিরা প্রচন্ড প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং অ্যান্টিওসাসের বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। ইহুদিরা ধর্মগৃহ পুননির্মাণ করে।

রোমানরাও জুডিয়া কব্জা করতে যেয়ে ভয়াবহ প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিলো। শক্তিশালী মিসরকে করদ রাজ্যে পরিণত করতে সফল হলেও ক্ষুদ্র জুডিয়া রোমান সাম্রাজ্যের গলার কাঁটায় পরিণত হয়। ৬৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পম্পেই সেলুসিড রাজ্য জয় করে সিরিয়ান প্রদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর পম্পেই নজর দেন জুডিয়ার দিকে। জুডিয়াকে রোমের অধীনস্ত দেশের পর্যায়ে নিয়ে আসতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন। এর ফলে রোমান সাম্রাজ্য মিসরের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত হলো।

93

চিত্র: রোমান সেনানায়ক পম্পেইর নৌ-সেনাদের ওপর ডাকাত আক্রমণ

পম্পেই প্রোকনসাল আউলাস গেবিনিয়াসকে সিরিয়ার গর্ভনর নিযুক্ত করে রোমে ফিরে যান এবং জুলিয়াস সিজারের সাথে যৌথভাবে কনসাল নিযুক্ত হন। এ সময়ে মিসরের অজনপ্রিয় ও বিলাসী রাজা দ্বাদশ টলেমি আউলেটস গদি রক্ষার জন্য পম্পেই ও সিজারের দ্বারস্ত হন। ক্ষমতায় রাখার বিনিময়ে পম্পেই ও সিজার আউলেটসের কাছ থেকে মিসরের পুরো বছরের রাজস্ব আয়ের সমপরমাণ অর্থ আদায় করেন। কিন্তু এতে রক্ষা হয় না। কারণ এত বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করতে গিয়ে আউলেটস কৃষক প্রজাদের উপর করের বোঝা আরও বাড়িয়ে দেন।

পম্পেই ও সিজার ঘরে বসেই যে রাজস্বের অর্থে ভেসে গিয়েছিলেন তার দায় গিয়ে পড়ল মিসরের গরীব প্রজা ও কৃষকদের ওপর। এমনিতেই কর দিতে দিতে তাদের নিজেদের ফলানো ফসলের প্রায় সবটাই চলে যেতো রাজা আর ধর্মীয় পুরোহিতের ভাঁড়ারে। এর ওপর আরও কর চাপিয়ে দিলে তাঁরা বাঁচবে কী খেয়ে? তাই রাজার ক্ষমতা আর পুরোহিতের ধর্মীয় চোখ রাঙ্গানী উপেক্ষা করে তারা বিদ্রোহে নামতে বাধ্য হয়। আলেকজান্দ্রিয়ার নাগরিকরাও আউলেটসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। উপায়ান্তর না দেখে আউলেটস দেশ ত্যাগ করে রোমে পৌঁছেন।

94

চিত্র: নীলনদের মোহনায় আলেকজান্দ্রিয়া নগরী

এ সময় সিজার বেরিয়েছেন ইউরোপ জুড়ে লুন্ঠনের উদ্দেশ্যে। পম্পেই আউলেটসকে রোমে অতিথি হিসেবে অভ্যর্থনা জানালেন। আউলেটসের অনুপস্থিতির সুযোগে মিসরের অধিবাসীরা তার জ্যোষ্ঠ কন্যাকে শাসনভার অর্পণ করে। রোমান সিনেট মিসরের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের পক্ষপাতী ছিলো না। ৫৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আউলেটস মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন রোমের সিদ্ধান্তের জন্য। অবশেষে ৫৬-৫৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে সিরিয়ার রোমান গভর্নর প্রোকসনাল গেবিনিয়াস জুডিয়া থেকে আক্রমণ চালিয়ে মিসর দখল করেন ও রোমান পুতুল আউলেটসকে সিংহাসন বসান। এই অভিযানে গেবিনিয়াসের অশ্বারোহী বাহিনীর প্রধান ছিলেন মার্ক এন্টনি। গেবিনিয়াসও মিসরের রাজকোষ থেকে বিপুল অর্থ লুট করেন।

মিসর তখন নামে মাত্র স্বাধীন। রোমানদের চাপিয়ে দেওয়া মাত্রাতিরিক্ত করের অর্থ যোগাতে গিয়ে প্রজাদের জীবন অত্যন্ত দুঃসহ হয়ে ওঠে। ফলে তীব্র জনঅসন্তোষের মুখে গেবিনিয়াস মিসর ত্যাগে বাধ্য হন। আউলেটস তাঁর প্রভুদের হাতে যে অর্থ তুলে দিয়েছিলেন তার ঋণ শোধ করার জন্য প্রজাদের মাথায় দুঃসহ শোষণের বোঝা চাপিয়ে দেন। সকল পুতুল শাসকেরই বৈশিষ্ট্য হলো তারা প্রভুকে সন্তুষ্ট করার জন্য জনগণের মাথায় চাপিয়ে দেয় সকল দুঃখের বোঝা।

হাজার হাজার বছরের পুরনো কৃষি জমিতে পরিপূর্ণ মিসর সে সময়ে যথেষ্ট সম্পদশালী ছিলো। অতীতে আলেকজান্ডারের সৈন্যবাহিনী ফিনিশীয়দের বাণিজ্য কেন্দ্র টায়ার ধ্বংশ করার ফলে আলেকজান্দ্রিয়া সেই বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিলো। প্রথম ও দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধে রোমানরা কার্থেজকে পরাজিত করলে আলেকজান্দ্রিয়া ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অপ্রতিদ্বন্ধী শক্তিতে পরিণত হয়। নীল নদ থেকে খাল কেটে লোহিত সাগরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে পণ্যদ্রব্য সমুদ্রপথে ইথিওপিয়া ও সোমালিয়ায় রপ্তানীর ব্যবস্থাও হয়েছিলো। তাই কৃষির পাশাপাশি মিসরের রাজস্বের অন্যতম উৎস ছিলো ব্যবসা-বাণিজ্য। সেই আমলে ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী দেশগুলির মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপন্ন হতো মিসরে। রাজস্ব আয়ের বিশাল উৎস ছিলো মিসর।

95.jpg

চিত্র: ক্লিওপেট্রাকে নিয়ে ইংরেজ চিত্রশিল্পী উইলিয়াম এটির একটি বিখ্যাত চিত্রকর্ম

তাই সম্পদে ভরপুর মিসরের ক্ষমতা নিয়ে অভ্যন্তরীণ মারামারি ছিলো শাসক মহলের স্বাভাবিক চিত্র। এ মারামারিতে যিনি ক্ষমতা থেকে ছিটকে যেতেন বা ছিটকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেন, তিনি ভীনদেশী রোমান পরাশক্তির সহায়তা নিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করতে মোটেও দ্বিধা করতেন না। এজন্য দেশের সার্বভৌমত্ব ভীনদেশী শেকলে বাঁধা পড়লেও তাদের কোন মাথাব্যাথা ছিলো না। কারণ প্রজাদের ঘাড় ভেঙে ঐশ্বর্য্যরে পাহাড়ে বসে লুটেপুটে খাওয়ায় যে আনন্দ তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার দুর্ভাগ্যের কাছে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব নিতান্ত তুচ্ছ বিষয় ছিলো তাদের কাছে। তাই রোমান শক্তির সহায়তা নেওয়ার ক্ষেত্রে টলেমি রাজারা সমানে নির্লজ্জ ছিলেন।

অষ্টম টলেমি ইউয়েরগেটস ১৬২ ও ১৪৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বিদ্রোহী আত্মীয় স্বজনদের সামলানোর জন্য রোমের সহায়তা গ্রহণ করেন। দশম টলেমি আলেকজান্ডার রোমান বিত্তবানদের কাছ থেকে টাকা পয়সা ধার করেন ক্ষমতা পূণর্দখলের জন্য। ৮১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমান কনসাল সূল্লা একাদশ টলেমিকে মিসরের গদিতে বসান। দ্বাদশ টলেমি আউলেটসের কথা তো আগেই বলা হয়েছে। আউলেটস যখন মিসরের ক্ষমতায়, রোম তখন দাস ও প্রলেতারিয়ান বিদ্রোহ এবং ভীনদেশী অর্ধসভ্য যাযাবর জাতিগুলোর আক্রমণের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে আনতে অনেকটাই সমর্থ হয়েছে। একনায়করা ক্ষমতায় এসে নতুন নতুন দেশ দখলে ঝাপিয়ে পড়েছে। পম্পেই সেলুসিড রাজ্য ও জুডিয়া জয় করে মিসরের সীমানায় পৌঁছে যান। এ অবস্থায় আউলেটস পম্পেইর সেনাবাহিনীর জন্য টাকা পয়সা ঘুষ দিয়ে কোনমতে রাজ্য রক্ষা করেন।

কিন্তু মিসর ছিলো রাজস্ব আয়ে ভরপুর ও বিত্তবান। তাই মিসর দখল করা ছিলো রোমান একনায়কদের জন্য কর্তব্য। ক্রাসাস, পম্পেই ও সিজার তিনজনই মিসর দখল করা কর্তব্য মনে করতেন। কিন্তু এমন সময়ে আউলেটস নিজেই এসে এমন ধরা দিলেন যে তার আর দরকার হলো না। অভ্যন্তরীণ কাড়াকাড়িতে নিজের গদি রক্ষার জন্য সাহায্য চেয়ে আউলেটস পম্পেই ও জুলিয়াস সিজারের সামনে টাকার বস্তা খুলে দিলেন। এই বিপূল পরিমাণ অর্থ সিজার ও পম্পেই ঘুষ নিয়েছিলেন খ্রিস্টপূর্ব ৫৮ সালে।

সিরিয়ার গভর্নর প্রোকনসাল গেবিনিয়াস পরের দফায় ঘুষ নেন এর চেয়েও বেশী। জুলিয়াস সিজার, পম্পেই ও গেবিনিয়াস মিসরের রাজকোষ হতে যে পরিমাণ অর্থ লুন্ঠন করেন তা যে কোনো দেশ দখল হতেও পাওয়া যেতো না। এই লুণ্ঠনের ধারাবাহিকতা আউলেটসের কন্যা সপ্তম ক্লিওপেট্রার সময়েও চলতে থাকে। আউলেটস তাঁর কন্যা সপ্তম ক্লিওপেট্রা ও ত্রয়োদশ টলেমিকে মিসরের সিংহাসনের জন্য উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান। ক্লিওপেট্রা তাঁর নাবালক ভাইকে বঞ্চিত করে নিজেই ক্ষমতায় জুড়ে বসেন।

খ্রিস্টপূর্ব ৫১ সালে ক্লিওপেট্রা মিসরের সিংহাসনে বসেন। তাঁর সময়েও মিসর রাজস্ব আয়ে পরিপূর্ণ ছিলো। তাঁর আমলে ফেলাহিন নামে মিসরীয় কৃষকের সংখ্যা ছিলো ৭০ থেকে ৯০ লক্ষের মধ্যে। এদের কাছ থেকে যে রাজস্ব আদায় হতো তা লুটে খাওয়ার জন্য রাজমহলে ক্ষমতা নিয়ে কাড়াকাড়ি হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ কাড়াকাড়িতে ক্লিওপেট্রা প্রথমে উত্রে যান। টলেমিদের প্রথা ছিলো রাজা ও রাণী মুক্তভাবে সিংহাসনে বসবেন এবং রাজাই হবেন প্রধান ব্যক্তি। এজন্য সিংহাসনের দাবীদার ভাই-বোন কিংবা ছেলে ও মায়ের মাঝে প্রতীকীভাবে বিয়ে হতো রাজা-রানী সম্পর্ক স্থাপন  করে যৌথভাবে ক্ষমতা ভোগ করার জন্য।

ক্লিওপেট্রা ১৮ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহন করেন তাঁর ১০ বছর বয়সী ভাইকে বিবাহের মাধ্যমে। কিন্তু তিনি ভাইকে সিংহাসনে আরোহনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেন। ক্লিওপেট্রাও তাঁর বাবার মতই রোমান শাসনের অনুগত ছিলেন। রোম সাম্রাজ্য তখন দেশ জয়ে বিপুল বেগে এগিয়ে যাচ্ছিল। তবে রোমানরা কিছু সংকটের মুখোমুখিও হয়। ৫৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিরিয়ার গর্ভনর থাকাকালীন প্রোকনসাল ক্রাসাস এশিয়া মাইনরের বিথিনিয়া অঞ্চল লুট করতে গিয়ে নিহত হন। সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলে পার্থিয়ান (পারসীয়) সাম্রাজ্যের যৌথবাহিনীর আক্রমণে রোমান বাহিনী পরাজিত হয়। ক্রাসাসের পরে সিরিয়ার গর্ভনর নিযুক্ত হন বিবুলাস। সিরিয়ার সীমানার ভেতর থেকে পার্থিয়ান সৈন্যদের উৎখাতে বিবুলাসকে সহায়তা করতে ক্লিওপেট্রা সম্মত হয়েছিলেন।

ইতোমধ্যে রোমান সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছিলো। ত্রয়ী শাসকদের মধ্যে ক্রাসাস মারা গেলে সিজার ও পম্পেই দুজনেই একক আধিপত্য বিস্তারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন। রোম, সিরিয়া ও মিসরে পম্পেই প্রভাবশালী ছিলেন। আর জুলিয়াস সিজার ইউরোপ জয় করে বিপুল শক্তির অধিকারী হয়ে উঠেন। গল দেশ অর্থাৎ ফ্রান্স ও জার্মানি থেকে যাযাবর অর্ধসভ্য জাতিগুলোকে বিতাড়িত করে তিনি ইউরোপের মূল ভূখন্ডকে নিরংকুশভাবে রোমান শাসনের অধীনে নিয়ে আসেন। এমনকি ইউরোপের উত্তরের ব্রিটেন উপদ্বীপও তিনি দখলে নিয়ে আসেন। স্পেন তো কার্থেজের সংগে যুদ্ধের সময়েই রোমানদের হস্তগত হয়েছিলো। ফলে দক্ষিণের সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ থেকে শুরু করে উত্তরের ব্রিটেন পর্যন্ত ইউরোপের মূল ভূখন্ডজুড়ে রোমান সাম্রাজ্যও বিস্তৃত হলো।

96.jpg

চিত্র: রোমানদের ব্রিটেন আক্রমণ

সিজারের দখলের আগে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানিতে কোন সভ্য রাষ্ট্র ছিলো না। ছিলো অর্ধসভ্য শিকারি টিউটন জাতিগুলোর রাজত্ব। দুর্ধর্ষ টিউটনরা সিজারের বাহিনীর সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়। ফলে ইউরোপে নিরংকুশভাবে সভ্যতা বিস্তার লাভ করে। এর আগে বার বার টিউটনরা রোমানদের সভ্য এলাকায় ঢুকে লুটপাট চালাত। এদের ভয়ে রোমানরা সবসময় ভীত থাকতো। দুর্ধর্ষ শিকারি যোদ্ধা জাতি অধ্যূষিত ইউরোপ পুরোপুরি সভ্যতায় প্রবেশ করে সিজারের অভিযানে বিজয়ের মাধ্যমে।

আজকের ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, সুইটজারল্যান্ডে সভ্য জীবনের সুত্রপাত ঘটায় রোমানরা। পুরো ইউরোপকে সভ্যতার বাঁধনে বাঁধেন জুলিয়াস সিজার। অবশ্য রাশিয়া ছাড়া। সভ্যতা বলতে শিকার ও সংগ্রহ অর্থনীতির স্থলে উৎপাদন অর্থনীতিকে বোঝায়। সভ্যতা মানেই যে মানুষের মুক্তির ব্যবস্থা তা নয়; বরং সভ্যতার মানে হলো যাযাবর আদিম শিকারী জীবন ছেড়ে উৎপাদনমূলক অর্থনৈতিক জীবনে প্রবেশ। প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ নয় বরং প্রকৃতিকে নিজের প্রয়োজন মেটাবার কাজে ব্যবহার করাই হলো সভ্যতার মূলমন্ত্র।

তবে মানুষের মুক্তির নিশ্চয়তা সভ্যতা দিতে পারে না। মানুষের এক দলের ওপর আরেক দলের শোষণ-নিপীড়ন সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসেরই অনিবার্য অংশ। তবুও সভ্যতা এ অর্থে গৌরবের যে তা মানুষকে যাযাবর জীবন থেকে মুক্তি দিয়েছে। জুলিয়াস সিজার ইউরোপ জুড়ে সভ্যতাকে বিস্তৃত করেন। তাঁর প্রভাবে অর্ধসভ্য যাযাবর জাতির অনেকেই সভ্য জীবনে প্রবেশ করেছে। তবে তা মূলত যুদ্ধবন্দী ক্রীতদাস হিসেবে।

ইউরোপ জুড়ে শোষণ ও লুণ্ঠন চালিয়ে সিজার যেভাবে ফুলে ফেঁপে ওঠেন তাতে তাঁর একনায়ক হওয়ার বাসনাটা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। অতএব সিনেটের ক্ষমতায় তাঁর একচ্ছত্র প্রতিপত্তি চাই। এক্ষেত্রে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্ধী অপর কনসাল পম্পেই। তাই সিনেট ক্ষমতায় নিরংকুশ আধিপত্য পেতে হলে পম্পেইকে হটানো প্রয়োজন। পম্পেই নিজেও সিজারকে হটিয়ে একনায়ক হিসেবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে প্রস্তুত। তাই গৃহযুদ্ধ আবারও অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। সিজারের সমর্থনে আছে রোমান বণিক শ্রেণি আর পম্পেইর সমর্থনে আছে অভিজাত ভূস্বামী শ্রেণি।

97

চিত্র: ব্রিটেন জয়ের পর জুলিয়াস সিজারের রোমে ফেরার দৃশ্য

খ্রিস্টপূর্ব ৪৯ সালে পম্পেই ও সিজারের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। সিজার গলদেশ অর্থাৎ ফ্রান্সে থাকাকালীন সময়ে রোমে তাঁর অনুচরদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। এরা প্রলেতারিয়ানদেরকে সিজারের পক্ষে টানতে সমর্থ হয়। ৪৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিজার দেশে ফিরে এসে পম্পেইকে হটিয়ে রোম দখল করে নিলেন। বণিক ভজা সিজারের বিজয়ে অভিজাত ভজা পম্পেই তাঁর সমর্থক সিনেটর ও অভিজাতদের নিয়ে বলকান অঞ্চলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। সেখান থেকে তারা গৃহযুদ্ধ পরিচালনায় নেতৃত্ব দিতে থাকেন। রোম ত্যাগ করার আগেই পম্পেই সামরিক সাহায্যের জন্য তাঁর এক পুত্রকে আলেকজান্দ্রিয়ায় ক্লিওপেট্রার কাছে পাঠান। ক্লিওপেট্রা এ আহ্বানেও সাড়াও দিয়েছিলেন। ৬০টি জাহাজ এবং ৫০০ গেবিনিয়ান সৈন্য পম্পেইকে সাহায্য করার জন্য পাঠানো হয়।

পারিবারিক ভাবে ক্লিওপেট্রা পম্পেইর কাছে কৃতজ্ঞ ছিলেন। কারণ ৫৫-৫৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে পম্পেইর অনুগ্রহপুষ্ট সিরিয়ার রোমান গভর্নর গেবিনিয়াস ক্লিওপেট্রার পিতা দ্বাদশ টলেমি আউলেটসকে মিসরের ক্ষমতায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। গেবিনিয়াস মিসর ত্যাগ করার সময়ে তাঁর সৈন্যবাহিনীকে আউলেটসের অধীনে রেখে যান। এরা আউলেটসের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়েছিলো। এদেরকে বলা হতো গেবিনিয়ান সৈন্য। এ সৈন্যদের থেকেই ৫০০ জনকে ক্লিওপেট্রা পম্পেইর সাহায্যার্থে পাঠিয়েছিলেন। এছাড়া পম্পেইর সেনাবাহিনীর জন্য খাদ্যশস্যও পাঠিয়েছিলেন।

পম্পেইকে সরাসরি সাহায্যদানের জন্য আলেকজান্দ্রিয়ার অধিবাসীরা ক্লিওপেট্রার প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলো। কারণ জনসাধারণ রোমানদের প্রতি প্রচন্ড বিরূপ মনোভাব পোষন করতো। এর কারণ ক্লিওপেট্রার পিতার সুবাধে রোমানরা যেভাবে মিসরের সম্পদ লুট করেছিল তাতে অধিকাংশ জনগনই জর্জরিত হয়েছিলো। জনসাধারণের মধ্যে বিভিন্ন স্তর ছিলো। সর্বাধিক শোষিত ছিলো ক্রীতদাসেরা, তারপর কৃষক প্রজারা, উঁচু স্তরে ছিলো নাগরিকরা। নাগরিক মানে হলো অভিজাত ভূস্বামী ও বণিকরা। এরা সকলেই রোমান লুণ্ঠনের ভুক্তভোগী ছিলো।

দ্বাদশ টলেমির রোমান মদদে ক্ষমতায় ফিরে আসা এরা ভাল চোখে দেখেনি। রোমানদের শোষণের শিকার ছিলো ক্রীতদাস-প্রজা থেকে শুরু করে অভিজাত ও বণিক পর্যন্ত সকলেই। জাতীয় শোষণ এমন একটি ব্যাপার যাতে শোষিত দেশের অভ্যন্তরীণ শোষক ও শোষিত শ্রেণি উভয়েই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সেজন্য রোমের মিসর সম্পর্কিত নীতি এবং রোমান গৃহযুদ্ধের সাথে মিসরকে জড়িত করায় আলেকজান্দ্রিয়াবাসীরা ক্লিওপেট্রার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করলেন ক্ষমতাবঞ্চিত ক্লিওপেট্রার রাজকীয় প্রতিপক্ষ।

মিসরের রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ছিলো একটি নিয়মিত ব্যাপার। এ ষড়যন্ত্রে ক্লিওপেট্রা ধরাশায়ী হলেন। জনঅসন্তোষ এবং প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের চাপের মুখে ক্লিওপেট্রা আলেকজান্দ্রিয়া থেকে পালিয়ে দক্ষিণ মিসরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ৪৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দেশের বাইরে গিয়ে ফিলিস্তিনের কাছাকাছি আরব আদিবাসীদের এলাকায় নিজস্ব সেনাবাহিনী নিয়ে আশ্রয় নেন তিনি। ৫১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ক্লিওপেট্রা সিংহাসনের অংশীদার তার নাবালক ভাই ও স্বামী ত্রয়োদশ টলেমিকে বঞ্চিত করে নিজেই সিংহাসন দখল করে নিয়েছিলেন।

98.jpg

চিত্র: মিসরের টলেমীয় সৈন্য

এবার নাবালক ত্রয়োদশ টলেমিকে একক ভাবে সিংহাসনে বসানো হলো। ক্লিওপেট্রা পালিয়ে যাওয়ার পরে ৪৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে ত্রয়োদশ টলেমিকে সিংহাসনে বসানো হয়। নাবালক টলেমির নামে মূলত রাজ্য শাসন ও ভোগ করছিলেন প্রধানমন্ত্রী পথিনাস। অন্যরাও সুবিধা পাচ্ছিলেন। ত্রয়োদশ টলেমিকে পম্পেই সমর্থক সিনেটররাও গ্রিস থেকে সমর্থন জানালো। রোমান সিনেটের একাংশ তখন সিজারের সমর্থনে রোমে অবস্থান করছে আর বৃহৎ অংশটি পম্পেইর সাথে পালিয়ে গ্রিসে অবস্থান নিয়েছে। সিনেটরদের মাঝে অভিজাতদের সংখ্যা বেশি ছিলো বলে এই অবস্থা।

অতীতের রোমান দখলদারি প্রথা অনুযায়ী পম্পেই ত্রয়োদশ টলেমির অভিভাবক নিযুক্ত হন। তবে পম্পেইর সাথে টলেমির এই সংশ্লিষ্টতা রোমের সাথে ক্লিওপেট্রার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনাকে জোরদার করে। ইতোমধ্যে রোমের গৃহযুদ্ধে অতি দ্রুত পটপরিবর্তন হতে থাকে। ৪৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মাঝামাঝি থেসালির যুদ্ধে পম্পেই সিজারের বাহিনীর হাতে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হন। নতুন সৈন্যবাহিনী সংগ্রহের জন্য তিনি মিসর যাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। আগের বছর তিনি টলেমিকে স্বীকৃতি দিয়েছেন ও তার অভিভাবক নিযুক্ত হয়েছেন। একদিন টলেমির পিতাকেও তিনি সাহায্য করেছিলেন।

৫৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ত্রয়োদশ টলেমির পিতা আউলেটস যখন সাহায্য ভিক্ষার জন্য রোমে পৌঁছেছিলেন তখন কনসাল পম্পেই তাঁকে আদর আপ্যায়ন করেছিলেন এবং মিসরের সিংহাসনে পুনরায় বসার ব্যাপারে সাহায্য করেছিলেন। এর প্রতিদানে পম্পেই ত্রয়োদশ টলেমির সাহায্য পাবেন বলে আশা করলেন। এই সময়ে ক্লিওপেট্রা তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে আলেকজান্দ্রিয়া আক্রমণ করার জন্য এগিয়ে আসছিলেন। টলেমি তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে ক্লিওপেট্রাকে বাঁধা দেওয়ার জন্য মাউন্ট ক্যাসিয়াসে এসে শিবির স্থাপন করেন।

পম্পেই নৌবহর নিয়ে টলেমির সাথে সেখানেই দেখা করতে যান। ফ্ল্যাগশিপ ছেড়ে একটি ছোট নৌকায় চড়ে তিনি উপকূলের দিকে টলেমির শিবিরের কাছাকাছি পৌঁছান। তীর থেকে আর একটি নৌকা পম্পেইকে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে আসে। পম্পেই সে নৌকায় চড়ে তীরে পৌঁছালেন। কিন্তু হায়! তীরে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই পম্পেই আক্রান্ত হলেন। গেবিনিয়ান সেনাপতি সেপ্টেমিয়াসের আঘাতে তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হলেন। নিয়তির কি পরিহাস! স্বার্থ কী বিচিত্র জিনিস! একসময় গেবিনিয়াস ও গেবিনিয়ান সৈন্যরা ছিলো পম্পেইর অধীনস্থ।

99.jpg

চিত্র: রোমান রণতরী

পম্পেই সিরিয়া বিজয় করে গেবিনিয়াস ও তার অধীনস্ত সৈন্যদের রেখে গিয়েছিলেন অবাধে লুটে খাওয়ার জন্য। এর ওপরেও তাদের উপরি লাভ ছিলো দ্বাদশ টলেমির মিসরের রাজকোষ লুটে খাওয়ার সুযোগ। মিসরের সম্পদশালী রাজকোষ হতে উচ্চ বেতন পেয়ে গেবিনিয়ান সৈন্যরা পম্পেইর কথা ভুলে যায়। এই গেবিনিয়ান সৈন্যরা ক্লিওপেট্রার সময়ে সিরিয়ার রোমান গভর্নর বিবুলাসকেও বিপদে সাহায্য করতে অস্বীকার করেছিল। কারণ বিবুলাসকে সাহায্য করলে লুটের বখরা যা আসত, তাতে তারা সন্তুষ্ট ছিলো না।

মিসর হতে সিরিয়ার রাজকোষ নিতান্তই অস্বচ্ছল ছিলো। তাই গেবিনিয়ান সৈন্যরা সাহায্যপ্রার্থী বিবুলাসের দুই পুত্রকে হত্যা করেছিল। অবশ্য ক্লিওপেট্রা হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে বিবুলাসের কাছে পাঠাতে পেরেছিলেন। শোষক মহলে পরস্পরের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতা, ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত ও যুদ্ধ-সংঘাত ছিলো অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। একসময়ের পম্পেইর সমর্থনপুষ্ঠ মিসর তাঁর সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে সেটাই প্রমাণ করলো।

মিসরের যুদ্ধ জাহাজগুলি পম্পেইর নৌবহর আক্রমণ করে কয়েকটি ধ্বংশ করে এবং বাকিগুলি পালিয়ে যায়। কোন কোন ইতিহাসবিদ মনে করেন টলেমির নামে রাজ্য শাসনকারী প্রধানমন্ত্রী পথিনাস যিনি ছিলেন ক্লিওপেট্রা বিরোধী ষড়যন্ত্রের নায়ক, তিনিই এই পরিকল্পনা করেছিলেন। কারণ হয়তো জুলিয়াস সিজারকে খুশি করা। তাছাড়া গৃহযুদ্ধে পম্পেইর বিজয়ের সম্ভাবনা খুবই কমে গিয়েছিল। পম্পেইর মৃত্যুর পরে তাঁর ছেলেরা নেতৃত্ব গ্রহণ করে। পম্পেই নিহত হয়েছিলেন খ্রিস্টপূর্ব ৪৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর।

পম্পেই হত্যার মাত্র চার দিন পর জুলিয়াস সিজার ১০টি যুদ্ধ জাহাজ ও ৪০০০ সৈন্য নিয়ে আলেকজান্দ্রিয়ার উপকূলে এসে হাজির হন। এ পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই পম্পেইর মাথা কেটে সংরক্ষণ করা হয়েছিলো। মিসরের রাজপ্রতিনিধি সিজারের জাহাজে গিয়ে পম্পেইর আংটি ও কাটা মাথা থালায় করে সিজারের সামনে পরিবেশন করলেন। হায় পম্পেই! যিনি ছিলেন একসময় রাজনীতিতে সিজারের সবচেয়ে বড় বন্ধু। এখন সিজারকে খুশি করার জন্য তাঁরই কাটা মাথা পরিবেশন করা হলো। কিন্তু এতে খুশি হয়ে সিজার ফিরে গেলেন না।

কারণ তখন সমগ্র বিশ্বের মধ্যে রাজস্ব আয়ে মিসর ছিলো সবচেয়ে বিত্তশালী দেশ। অতএব সেই রাজস্ব আয়ের ভাগ সিজারের চাই। ত্রয়োদশ টলেমি তখনও মিসরের পূর্বাঞ্চলে ক্লিওপেট্রার আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য সেনাবাহিনীর সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। সেনাপতি অ্যাকিলাসের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীকে রেখে টলেমি সিজারের সঙ্গে দেখা করার জন্য আলেকজান্দ্রিয়ায় এলেন। সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী পথিনাসও ছিলেন। তারা সিজারকে মিসরের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত রাখতে ব্যার্থ হলেন। এরই মাঝে সিজারকে হাত করার জন্য লুকিয়ে দেখা করতে চলে আসলেন ক্লিওপেট্রা।

100.jpg

চিত্র: ক্লিওপেট্রা ও জুলিয়াস সিজার

ঐতিহাসিক প্লুতার্কের ‘সিজার’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ক্লিওপেট্রা লুকিয়ে জাহাজযোগে সমুদ্রপথে এসে টলেমির নৌ-সেনাদের ঘুষ দিয়ে আলেকজান্দ্রিয়া হারবারে প্রবেশ করতে সমর্থ হন। কবি লুকানের রচিত কাহিনী এই ঘটনাকে অমরত্ব দিয়েছে। এই কাহিনী অনুযায়ী একজন সিসিলিয়ান ব্যবসায়ী উপকূলের পাহারাদারদের ফাঁকি দিয়ে ক্লিওপেট্রাকে কম্বলের ভেতরে জড়িয়ে আলেকজান্দ্রিয়ার ভেতরে পৌঁছে দেন। সিজার ও টলেমি তখন আলেকজান্দ্রিয়ায় রাজপ্রসাদে অবস্থান করছিলেন। ক্লিওপেট্রা সেখানে সিজারের সামনে হাজির হলেন।

বিভিন্ন বিবরণ থেকে জানা যায় ২১ বছর বয়সী ক্লিওপেট্রাকে দেখে ৫২ বছর বয়সী সিজার মোহিত হন। অনেকেই মনে করেন সিজারের সাথে তাঁর মিলনের ঘটনা ঘটেছে। ক্লিওপেট্রা তাঁর পিতার মতই রোমান অনুগ্রহে ক্ষমতায় ফিরে আসার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। সিজারের প্রতি তাঁর আনুগত্যের এটাই ছিলো সবচেয়ে বড় কারণ। সিজারের সামনে সৎ বোন ক্লিওপেট্রার এমন উপস্থিতিতে ত্রয়োদশ টলেমি অবাক হয়ে যান। সিজারের সাথে ক্লিওপেট্রার দহরম-মহরম আঁচ করতে পেরে তিনি রাজপ্রসাদ থেকে ছুটে বেরিয়ে গিয়ে আলেকজান্দ্রিয়াবাসীকে সিজার ও ক্লিওপেট্রার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলেন।

আলেকজান্দ্রিয়াবাসী রোমান আধিপত্য ও ক্লিওপেট্রার রোম ভজা নীতির ঘোর বিরোধী ছিলো আগে থেকেই। তের বছর বয়সী বালক রাজা টলেমির আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিক্ষুদ্ধ জনতা রাজপ্রসাদের সামনে ভীড় করে। তারা ক্লিওপেট্রার সিংহাসন দখলের মাধ্যমে মিসরের বুকের ওপর রোমান আধিপত্য চিরস্থায়ীভাবে চেপে বসার আশংকা করছিলো। সিজার রাজপ্রাসাদের সামনে বেরিয়ে এসে জনতাকে বুঝিয়ে সুজিয়ে ঠান্ডা করে আশ্বাস দেন যে, সিংহাসনের বৈধ অধিকারী ভাই-বোন দুজনকেই তিনি ক্ষমতায় বসতে সাহায্য করবেন। সিজার জানতেন ভাই বোনের ক্ষমতার দ্বন্ধ সহজে মিটবে না। তাই তিনি সিদ্ধান্তের ভার তাদের ওপর ছেড়ে দিয়ে অপেক্ষায় থাকলেন।

চিত্র: জুলিয়াস সিজারের আশ্বারোহী সৈন্য

কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলো না। ৪৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দের অক্টোবরের শেষদিকে মিসরের পূর্বাঞ্চলে অবস্থানরত টলেমির সৈন্যবাহিনী পথিনাসের গোপন নির্দেশে আলেকজান্দ্রিয়ার দিকে রওনা হলো। সিজারের সৈন্যসংখ্যা স্বল্প হওয়ায় তিনি এদেরকে ঠেকানোর জন্য সিরিয়া থেকে অতিরিক্ত সৈন্য চেয়ে পাঠালেন। তারা এসে পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত আলেকজান্দ্রিয়ায় খন্ডযুদ্ধ চলতে থাকে। এসময় সিজার টলেমিকে রাজপ্রাসাদে আটকে রেখেছিলেন। টলেমির সৈন্যবাহিনীর নেতৃত্বে এসময় বিরোধ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিলো। কয়েকটি খন্ডযুদ্ধের পর সিজার টলেমিকে আপোষের জন্য ছেড়ে দেন। কিন্তু টলেমি সৈন্যবাহিনীর দায়িত্ব গ্রহণ করে খোলাখুলিভাবে সিজার ও ক্লিওপেট্রার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

খ্রিস্টপূর্ব ৪৭ সালের মার্চ মাসে সিজারের সাহায্যার্তে প্রেরিত সেনাদল এসে পৌঁছায়। এদের মধ্যে ছিলো এশিয়ান, সিরিয়ান ও আরব সৈন্যদল। এমনকি জুডিয়া থেকে একটি ইহুদি সৈন্যদলও যোগ দিয়েছিলো। ইহুদি সৈন্যদের উপস্থিতির ফলে আলেকজান্দ্রিয়াবাসী ইহুদিরাও খোলাখুলিভাবে সিজার ও ক্লিওপেট্টার পক্ষ সমর্থন করে। তৎকালীন আলেকজান্দ্রিয়ার অধিবাসীদের পাঁচ ভাগের দুই ভাগই ছিলো ইহুদি। খ্রিস্টপূর্ব ৪৭ সালের ২৭ মার্চ সিজারের সুসজ্জিত বাহিনীর সাথে যুদ্ধে টলেমির বাহিনী সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয়। টলেমি পালাতে গিয়ে নীল নদে নৌকা ডুবে মারা যান।

সিজারের সহায়তায় ক্লিওপেট্রা মিসরের সিংহাসনে পূণর্বহাল হলেন। যথারীতি সিজারও ক্লিওপেট্রার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করলেন। সিজারের মিসর লুটের ইচ্ছা পূর্ণ হলো। টলেমি বংশের প্রথা অনুযায়ী ক্লিওপেট্রা ১২ বছর বয়সী সর্বকনিষ্ঠ সৎভাইকে বিয়ে করে রাণী হিসেবে রাজ্য শাসনের বৈধতা আদায় করেন। সিজার তাঁর চারটি সৈন্যবাহিনীর তিনটি মিসরে রেখে আলেকজান্দ্রিয়া ত্যাগ করেন। সিজার মিসর ত্যাগের কিছুদিন পরে ক্লিওপেট্রার এক পুত্র জন্মগ্রহণ করে। আলেকজান্দ্রিয়ার অধিবাসীরা রসিকতা করে তার নাম রাখে সিজারিয়ন অর্থাৎ ক্ষুদে সিজার বা সিজারের পুত্র। ক্লিওপেট্রা তাঁর নাম দেন টলেমি সিজার। এই নাম থেকে রসিকতার সত্যতা পাওয়া যায়।

৪৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দের জুন মাসের মধ্যে সিজার সিরিয়া পৌঁছান। সেখান থেকে পশ্চিম তুরস্কে যান। ১ আগস্ট তিনি পন্টাসের রাজা দ্বিতীয় ফারনেসেসকে পরাজিত করেন। এই বিজয়ের সাফল্যে উদ্বেলিত হয়ে সিজার দম্ভভরে লিখেছিলেন “ভিনি, ভিডি, ভিসি” অর্থাৎ ‘‘আমি এলাম, আমি দেখলাম, আমি জয় করলাম”। এরপর সিজার ইতালি হয়ে তিউনিসিয়ায় যান। ৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ৬ এপ্রিল তিনি সেখানে পম্পেই পুত্রদের পরাজিত করেন।

১৫ জুলাই রোমে ফিরে গিয়ে বিজয় উৎসব পালনে মনযোগ দেন সিজার। বিজয় উৎসবের পরে ক্লিওপেট্রা তার ভাই ও স্বামী বালক চতুর্দশ টলেমিকে সঙ্গে নিয়ে রোমে এসে অবস্থান করতে থাকেন। পরের বছর সিজার আবার স্পেনে গিয়ে পম্পেইর পুত্রদের পরাজিত করেন। এ বছর সিজার তাঁর শেষ ইচ্ছা সংবলিত দলিল প্রস্তুত করেন। দলিলে তিনি তার বোনের পৌত্র- গেইয়াস অক্টেভিয়ানকে নিজের পোষ্য-পুত্র হিসেবে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন।

৪৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিজার আজীবন কনসাল নিযুক্ত হলেন। এট্রুস্কানদের বিতাড়নের পর থেকে রাজা শব্দটি রোমানদের অপ্রিয় ছিলো। তাই সিজার রাজা উপাধি না নিয়ে কনসাল নামে থাকতেই পছন্দ করেন। সিজারের জয়ের ইতিহাসে একটি অপূর্ণতা রয়ে গিয়েছিল। এটা হলো পার্থিয়া (পারস্য)। পার্থিয়া তখনও রোমান সাম্রাজ্যের পদানত হয় নি। কয়েক বছর আগে পার্থিয়ার কাছে ক্রাসাস শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিলেন। এর প্রতিশোধ নিয়ে পার্থিয়া দখল করার জন্য খ্রিস্টপূর্ব ৪৪ সালের ১৭ মার্চ সিজারের সামরিক অভিযানে রওনা হওয়ার তারিখ নির্ধারিত হয়। ১৫ মার্চ সিজার সিনেট অধিবেশন আহ্বান করেন।

102.jpeg

চিত্র: জুলিয়াস সিজারকে হত্যার দৃশ্য

সেসময়ে রোমান রাজনীতি ষড়যন্ত্রের খনিতে পরিণত হয়েছিলো। সিজারের ভাগ্যাকাশেও দুর্যোগ ঘনিয়ে আসছিলো। অভিজাতরা তাকে হত্যার চক্রান্ত চূড়ান্ত করে ফেলেছিলো। ১৫ মার্চ সকাল দশটায় সিজার সিনেট অধিবেশনে যোগ দিতে পম্পিয়ান মিলনায়তনের উদ্দেশ্যে রওনা হন। মিলনায়তনে আসন গ্রহণের পর পরই আততায়ীরা তাকে ঘিরে ফেলে। একের পর এক ধারালো ছোরার আঘাতে সিজার রক্তাক্ত হতে থাকেন। ষড়যন্ত্রের অন্যতম নেতা ছিলেন একনায়কত্ব বিরোধী প্রজাতন্ত্রের সমর্থক ও অভিজাতপন্থী মার্কাস ব্রুটাস।

কেউ কেউ বলেন, ছুরি হাতে আঘাত করতে উদ্যত মার্কাস ব্রুটাসকে দেখে, সিজার গ্রিক ভাষায় বলে উঠেছিলেন, ‘বৎস, তুমিও’। হায় সিজার! পম্পেই থেকে সিজারের পরিণতিও কম দুঃখের হয় নি। সিজারের মৃত্যুর পরে রোমান সাম্রাজ্য নতুনভাবে সংঘাতের অন্ধকারে ছেয়ে যায়। স্বার্থ ও ক্ষমতার সংঘাত রোমান সাম্রাজ্যের অনিবার্য অংশে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। সিজারের মৃত্যুর পরে নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে রোমান সাম্রাজ্যে পুনরায় ত্রয়ী শাসনের আবির্ভাব ঘটে।

সিজারের মনোনীত পোষ্যপুত্র অক্টেভিয়ান, সহকারী মার্ক এন্টনি এবং ধনী বণিক ও সেনানায়ক লেপিডাসের মধ্যে রোমান সাম্রাজ্য ভাগাভাগি হয়ে যায়। সিনেট বাধ্য হয়ে ত্রয়ী শাসনব্যবস্থা মেনে নিয়ে পাঁচ বছরের জন্য পূর্ণ ক্ষমতা তাঁদের হাতে ন্যস্ত করেছিল। ৪২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ত্রয়ী শাসকদের অন্যতম অক্টেভিয়ান মেসিডোনিয়ায় পালিয়ে যাওয়া সিজারের হত্যাকারীদের সৈন্যবাহিনীকে সম্পূর্ণ পরাজিত করেন। অপর ত্রয়ী শাসকদের অন্যতম লেপিডাসকে পম্পেইর পুত্রের সাথে যোগসাজশের সন্দেহে করায় অন্য দুজন তাকে আফ্রিকা এলাকার শাসনভার দিয়ে নিজেরা মূল সাম্রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন।

103.jpg

চিত্র: জুলিয়াস সিজারের মৃতদেহের পাশে মার্ক এন্টনি

অক্টেভিয়ান রোমসহ সাম্রাজ্যের সমগ্র পশ্চিমাঞ্চল এবং মার্ক এন্টনি সমগ্র পুর্বাঞ্চলের শাসনভার গ্রহণ করেন। এ ভাগাভাগির পরে মিসরের ক্লিওপেট্রার যোগসূত্র স্থাপিত হয় মার্ক এন্টনির সঙ্গে। এন্টনির সঙ্গেও তাঁর মিলন হয় এবং এন্টনির সন্তানও জন্ম নিয়েছিলো ক্লিওপেট্রার গর্ভে। ৪১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ক্লিওপেট্রা তুরস্কে গিয়ে এন্টনির সঙ্গে দেখা করেন। ৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের গোড়ার দিকে পার্থিয়ানরা সিরিয়া দখল করে নেয়। ৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এন্টনি সাময়িকভাবে এথেন্সে তার রাজধানী স্থাপন করেন। এ বছরের শেষ দিকে তিনি পার্থিয়ানদের হাত থেকে তুরস্ক, সিরিয়া ও জুডিয়া উদ্ধারের জন্য সৈন্য প্রেরণ করেন। তারা সফল হয়েছিলো।

খ্রিস্টপূর্ব ৩৮ ও ৩৭ সালে অক্টেভিয়ান পর পর দুইবার পম্পেইর ছেলের সাথে নৌ-যুদ্ধে পরাজিত হলে এন্টনি তাঁর আহ্বানে জাহাজ নিয়ে ইতালিতে পৌঁছান। ১২০টি জাহাজ দিয়ে তাঁকে সাহায্য করতে এন্টনি রাজি হন। এর বিনিময়ে পার্থিয়া দখলের জন্য অক্টোভিয়ানের ২০০০০ সৈন্য দিয়ে এন্টনিকে সাহায্য করার কথা ছিলো। এন্টনি এ সাহায্য পান নি। খ্রিস্টপূর্ব ৩৬ সালে অক্টেভিয়ান আরও একটি নৌ-যুদ্ধে হেরে যান। কিন্তু এন্টনি এর চেয়েও বহুগুণ বেশি বিপর্যয়ের মুখোমুখি হলেন পার্থিয়া আক্রমণ করতে যেয়ে। এ অভিযানে তিনি ভয়ানকভাবে পর্যদুস্ত হয়েছিলেন। এন্টনির এ পরাজয়ের কারণে আরও দেড়শ’ বছর পার্থিয়ান সাম্রাজ্য অপরাজেয় ছিলো।

৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে অক্টেভিয়ান ও মার্ক এন্টনির মধ্যকার সন্ধিকে আরও স্থায়ী ও শক্তিশালী করার জন্য অক্টেভিয়ানের বিধবা বোন অক্টেভিয়ার পূণর্বিবাহ হয় মার্ক এন্টনির সাথে। অক্টোভিয়ার গর্ভে এন্টনির একটি কন্যা সন্তানেরও জন্ম হয়েছিলো। কিন্তু এন্টনি ক্লিওপেট্রার সঙ্গে তাঁর বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক অব্যাহত রেখেছিলেন। ৩৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এন্টনি অক্টেভিয়ানের বাহিনীকে জাহাজ প্রদান শেষে ইতালি থেকে ফেরার সময় অক্টোভিয়াকে ইতালিতে রেখেই সিরিয়ায় ফিরে আসেন। এতে অক্টেভিয়ান অপমানিত বোধ করেন। এন্টনি সিরিয়ায় পৌঁছেই ক্লিওপেট্রাকে আসতে খবর পাঠান।

কিন্তু অক্টেভিয়ানের প্রতিশ্রুত সৈন্য পাঠাবার কোন লক্ষণ না দেখে তিনি নিজেই আলেকজান্দ্রিয়ায় চলে যান। উদ্দেশ্য ক্লিওপেট্রার সাথে মিলিত হওয়া ও সামরিক সাহায্য আদায় করা। পুরো শীতকাল তিনি সেখানে ক্লিওপেট্রার সঙ্গে কাটান। ক্রমশ এন্টনির সঙ্গেই ক্লিওপেট্রার ভাগ্য জড়িয়ে যায়। এন্টনির জন্য সামরিক ও আর্থিক সাহায্যের প্রতিদানে তিনি রাজ্যসীমাকে বহুদুর বিস্তৃত করে ফেললেন। বহু নতুন অঞ্চল ও শহর তাঁর শাসনাধীনে চলে আসলো। এককালে মিসরের অধীনস্ত জুডিয়াকে তিনি আবারও হস্তগত করার চেষ্টা করলেন। হেরোদ শাসিত জুডিয়ার অনেক অংশ তিনি এন্টনির বদান্যতায় মিসরের অন্তর্গত করতে পেরেছিলেন। কিন্তু পার্থিয়ায় এন্টনির পরাজয়ে ক্লিওপেট্রার সকল স্বপ্ন বৃথা গেলো। এন্টনির পরাজয় ক্লিওপেট্রার জন্যও ছিলো একটি মহাবিপর্যয়।

এন্টনির ব্যর্থতা অক্টেভিয়ানের রোমান সাম্রাজ্যের একক অধিপতি হওয়ার সম্ভাবনাকে জোরদার করে তোলে। ক্লিওপেট্রা এন্টনির উপপত্নী হিসেবে অক্টেভিয়ানের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেলেন। এন্টনির সাথে অক্টেভিয়ানের সম্পর্কের অবনতির অন্যতম কারণ ছিলো অক্টেভিয়ানের বোনকে অপমান ও অপদস্ত করে ক্লিওপেট্রার সাথে সম্পর্কে চালিয়ে যাওয়া। এন্টনি পার্থিয়া থেকে সিরিয়ায় ফেরার পরে তাঁর স্ত্রী রোম থেকে এথেন্সে ফিরে আসলেন। কিন্তু তাঁর ভাইয়ের প্রতিশ্রতি ভঙ্গের ঘটনায় ক্ষিপ্ত এন্টনি স্ত্রীকে চিঠি পাঠিয়ে রোমে ফিরে যেতে বলে অপমানের চূড়ান্ত করলেন।

104.jpg

চিত্র: এন্টনি ও ক্লিওপেট্রা

পরবর্তী তিন বছর এন্টনি তার রাজধানী কখনও আলেকজান্দ্রিয়ায় কখনও সিরিয়ার এন্টিয়কে স্থাপন করেছিলেন। এ সময় তিনি ক্লিওপেট্রার সঙ্গ ছাড়েননি। এ সময়ে এন্টনি আর্মেনিয়ায় সফল অভিযান চালিয়েছিলেন এবং মিডিয়ার আনুগত্য লাভ করেছিলেন। ৩৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আর্মেনিয়া থেকে আলেকজান্দ্রিয়ায় ফিরে বিজয় উৎসব পালন করতে গিয়ে এন্টনি রোমানদের ধর্মীয় রীতি ভঙ্গ করেন। কিছু দিন পরে আরেকটি অনুষ্ঠানে এন্টনি, ক্লিওপেট্রা ও তাঁর সন্তানদের জন্য রোমান সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা দান করলেন। এসব খবর রোমে পৌঁছলে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ক্লিওপেট্রা রোমের শত্রুতে পরিণত হন।

ক্লিওপেট্রা বিরোধী নানা গুজব ও কাহিনীও রোমে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন অমূলক ও অসত্য কাহিনীও পল্লবীত হয়ে ওঠে রোমবাসীদের মুখে মুখে। ৩৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে অক্টেভিয়ানের সাথে এন্টনির সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটে। খ্রিস্টপূর্ব ৩২ সালের মে অথবা জুন মাসে এন্টনি অক্টেভিয়ানের বোন অক্টেভিয়াকে ডিভোর্স করেন। এ বছরেও এন্টনি ও ক্লিওপেট্রা একসাথে সময় কাটিয়েছেন তুরস্ক ও এথেন্সে। এন্টনির রাজত্বে ক্লিওপেট্রা রাণীর মতই আচরণ করতেন; বিদেশী অতিথির মত নয়। এ বছরের শেষ দিকে অক্টেভিয়ান ক্লিওপেট্রাকে পরিত্যাগ করার শেষ অনুরোধ জানান এন্টনিকে। এন্টনি এ প্রস্তাবকে পাত্তাই দিলেন না।

ফলে শীঘ্রই অক্টেভিয়ান আনুষ্ঠানিকভাবে ক্লিওপেট্রাকে রোমের শত্রু ঘোষণা দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। আর শত্রুর সাথে মিত্রতার কারণে আইনিভাবে এন্টনিও শত্রুতে পরিণত হলেন। ক্লিওপেট্রার গর্ভে সিজার ও এন্টনির সন্তান জন্ম নেওয়ায় ভবিষ্যতে এরা রোমান সাম্রাজ্যের কর্তৃত্বের দাবিদার হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছিলো। এন্টনির সাথে যেভাবে ক্লিওপেট্রা একীভূত হয়ে গিয়েছিলেন তাতে এন্টনি শাসিত রোমান সাম্রাজ্য ও মিসরের যৌথ নেতৃত্ব ক্লিওপেট্রা ও তাঁর সন্তানদের হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিলো।

এমনকি এন্টনি নাকি রোমান রীতি ভঙ্গ করে আলেকজান্দ্রিয়ায় সমাহিত হওয়ার ইচ্ছাও তাঁর দলিলে ব্যক্ত করেছিলেন। এতে আলেকজান্দ্রিয়া রোমের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্ধীতে পরিণত হয়। এমনকি ভবিষ্যতে রোমান সাম্রাজ্য আলেকজান্দ্রিয়ার অধীনে চলে যাওয়ারও আশংকা দেখা দিয়েছিলো। অক্টেভিয়ান রোমবাসীদের অনেককেই বোঝাতে সফল হয়েছিলেন যে আলেকজান্দ্রিয়া রোমের জন্য হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। তাই ক্লিওপেট্রাকে সিনেটের মাধ্যমে শত্রু ঘোষণা করা তাঁর জন্য সহজ হয়েছিলো।

তখনও পর্যন্ত সিনেটে প্রতি বছর দুজন কনসাল ও দশ জন করে ট্রিবিউন নিযুক্ত হচ্ছিলেন। পাঁচ বছরের ত্রয়ী শাসনের বৈধতার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যে অক্টেভিয়ান ও এন্টনি কনসালদের অধীন সেনানায়কে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু রোমান সিনেটের ক্ষমতা খুবই সংকুচিত হয়ে পড়েছিলো সেনানায়কদের দাপটের কাছে। কনসালদের কেউ এন্টনির পক্ষে, আবার কেউ অক্টেভিয়ানের পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করতেন।

খ্রিস্টপূর্ব ৩১ সালের বসন্তকালে অক্টেভিয়ানের নৌবাহিনী এন্টনির নৌবাহিনীকে আক্রমণ করে। এতে এন্টনির নৌবহরের বিরাট একটি অংশ ধ্বংস হয়। ইউরোপের উপকূলবর্তী এন্টনির শক্তিশালী নৌঘাঁটিগুলো একে একে পরাজিত হয় অক্টেভিয়ানের নৌবাহিনীর শক্তিশালী আক্রমণের কাছে। খ্রিস্টপূর্ব ৩১ সালের ২ সেপ্টেম্বর অ্যাকটিয়াসের নৌঘাঁটির যুদ্ধে এন্টনি ও ক্লিওপেট্রার যৌথ নৌবহর শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এন্টনি ও ক্লিওপেট্রা ২৩০টি জাহাজের মধ্যে মাত্র ৬০টি জাহাজ নিয়ে মিসরে পালিয়ে যেতে সমর্থ হন।

গ্রিস অক্টেভিয়ানের বশ্যতা স্বীকার করে। ক্লিওপেট্রা ও এন্টনির স্থলবাহিনী উত্তর গ্রিসে আত্মসর্মপণ করে। ক্লিওপেট্রা আলেকজান্দ্রিয়ায় পৌঁছে নতুন সৈন্যবাহিনী সংগ্রহের জন্য ধনসম্পদ কাজে লাগান। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর গর্ভজাত কথিত সিজারের পুত্র সিজারিয়ন ও এন্টনির পুত্র এন্টিলাসকে অক্টেভিয়ান ভবিষ্যতের বিপদ হিসেবে গণ্য করেন। এ দুজনের বয়স ছিলো যথাক্রমে ১৬ ও ১৪ বছর। এ দুজনকে নিরাপদ করার জন্য তিনি ভারতে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। ভারতের সঙ্গে তখন মিসরের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিলো।

105.jpg

চিত্র: অ্যাকটিয়ামের যুদ্ধ

খ্রিস্টপূর্ব ৩০ সালে সিরিয়ার রোমান গভর্নর অক্টেভিয়ানের পক্ষে যোগদান করেন। এমনকি জুডিয়ার রাজা হেরোদও অক্টেভিয়ানের সাথে আপস করেন। ক্লিওপেট্রা ও হেরোদ মনেপ্রাণে শত্রুতে পরিণত হয়েছিলেন। ক্লিওপেট্রা তাঁর পূর্ব পুরুষদের দ্বারা শাসিত জুডিয়াকে মিসরের অংশ বলে বিশ্বাস করতেন। জুডিয়াকে আবারও মিসরের অংশে পরিণত করার জন্য এন্টনিকে রাজি করাতে তিনি হেন কোন প্রচেষ্টা বাকি রাখেননি।

কিন্তু এন্টনি বারবার সামরিক সাহায্যের জন্য হেরোদের কাছে কৃতজ্ঞ ছিলেন। তারপরেও ক্লিওপেট্রা এন্টনির ঘাড়ে ভর করে হেরোদকে শায়েস্তা করার ক্ষেত্রে প্রচেষ্টায় কোন ত্রুটি রাখেননি। হেরোদকে জুডিয়ার স্বাধীন রাজা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন পম্পেই ও সিজার। হেরোদের সহায়তায় অক্টেভিয়ান নীল নদের ব-দ্বীপ এলাকার মিসরীয় শহর পেলুসিয়াম জয় করে আলেকজান্দ্রিয়ার দিকে এগিয়ে যান।

খ্রিস্টপূর্ব ৩০ সালের ১১ আগস্ট আলেকজান্দ্রিয়ার উপকণ্ঠে অক্টেভিয়ানের বাহিনীর কাছে এন্টনির নৌ ও অশ্বারোহী বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। পদাতিক বাহিনীও যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায়। বিনা বাধায় অক্টেভিয়ান আলেকজান্দ্রিয়া দখল করে নেন। এরপরে এন্টনি ও ক্লিওপেট্রার জীবনাবসানের করুণ ইতিহাস নিয়ে নানা কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। তবে সকল কাহিনী থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় তাঁরা উভয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন।

ক্লিওপেট্রা ও এন্টনির আত্মহত্যার করুণ ঘটনাটি ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় অধ্যায়। শোনা যায়, এন্টনির মৃত্যু সংবাদ পেয়ে অক্টেভিয়ান কেঁদেছিলেন। ক্ষমতা নিয়ে হাজারও সংঘাতের পরেও হয়ত অক্টেভিয়ান ভুলতে পারেননি এন্টনি ছিলেন তাঁর পালক পিতা জুলিয়াস সিজারের অকৃত্রিম বন্ধু ও সহকর্মী এবং ত্রয়ী শাসক হিসেবে অনেক ক্ষেত্রে তাঁর নিজেরও সহকর্মী। এছাড়াও বিচ্ছেদ হলেও তো তিনি একসময়ে ছিলেন বোনের স্বামী।

চিত্র: ক্লিওপেট্রার মৃত্যু

এন্টনির মৃত্যুর কয়েকদিন পর ১২ আগস্ট ক্লিওপেট্রা আত্মহত্যা করেছিলেন। জানা যায়, অক্টেভিয়ান নাকি ক্লিওপেট্রার করুণ মৃত্যু চাননি। তিনি ক্লিওপেট্রার সঙ্গেঁ সাক্ষাৎ করে তাঁকে সান্তনাও দিয়েছিলেন। সাক্ষাৎকালে ক্লিওপেট্রা অক্টেভিয়ানের স্ত্রী ও বোনের জন্য নাকি উপহার পাঠাবার আগ্রহও প্রকাশ করেছিলেন। অক্টেভিয়ানের বোনকে তিনি একদা এন্টনির কাছ থেকে বঞ্চিত করেছিলেন। ক্লিওপেট্রা এন্টনির শোক ভুলতে পারেন নি। তাই শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করেন।

অক্টোভিয়ানের উদারতার কারণ হয়ত তিনি আশংকা করেছিলেন ক্লিওপেট্রা আত্মহত্যার সাথে সাথে তাঁর মূল্যবান ধনসম্পদ আগুনে পুড়িয়ে ফেলবেন। ক্লিওপেট্রার ধনসম্পদ হস্তগত করার উদ্দেশ্যেই তিনি মিসর দখল করেছিলেন। তাঁর উদারতার ঘটনার ঐতিহাসিক সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায় না। প্রাচীন কাহিনীকার ডিয়ো ক্যাসিয়াস জানান, ক্লিওপেট্রা কিভাবে মারা যান তা কেউ জানে না। ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর ৭৫ বছর পর জন্মগ্রহণকারী গ্রিক ইতিহাসবিদ প্লুতার্ক বিভিন্ন কাহিনীর কথা উল্লেখ করেন। ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর কারণ সম্বন্ধে তিনিও কোন সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারেন নি।

ক্লিওপেট্রা তাঁর পুত্রদেরকে তাদের শিক্ষকদের সাথে ভারতের পথে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। পুত্র সিজারিয়ন তাঁর শিক্ষক রোডেনের পরামর্শে কিছুদুর যাওয়ার পরে আবার আলেকজান্দ্রিয়ায় ফিরে আসে। অপর পূত্র এন্টিলাসের শিক্ষক থিওডোরাস তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। অক্টোভিয়ানের নির্দেশে দুই পুত্রকেই ধরে এনে হত্যা করা হয়। এন্টিলাস ছাড়া এন্টনির অন্যান্য তিন স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেওয়া ৭ সন্তানকে অক্টেভিয়ান রোমে নিয়ে তাঁর পরিবারের সদস্যদের মতই লালন পালন করেছিলেন।

107

চিত্র: অগাস্টাস সিজারের ভাস্কর্য

ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর আগেই অক্টেভিয়ান আলেকজান্দ্রিয়ায় নিজেকে মিসরের অধীশ্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। এভাবে টলেমি বংশের শাসনের প্রায় তিনশ বছর শেষে মিসর তার স্বাধীন সত্ত্বা সম্পূর্ণভাবে হারালো। অক্টেভিয়ান মিসরকে একটি রোমান প্রদেশে পরিণত করেন। অক্টেভিয়ান রোমের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী মিসরকে সিনেটের শাসনাধীনে না রেখে সরাসরি নিজের শাসনাধীনে রাখেন। অক্টেভিয়ান ছিলেন জুলিয়াস সিজারের বোন প্রথম জুলিয়ার পৌত্র। সিজার পোষ্যপুত্র হিসবে তাকেই উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছিলেন।

ক্লিওপেট্রার গর্ভজাত সিজারিয়ন জুলিয়াস সিজারের পুত্র হওয়া সত্ত্বেও সে বিদেশী হওয়ায় রোমান আইন অনুযায়ী তাকে সিজার উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করতে পারেন নি। সিজারিয়নকে হত্যা করে অক্টেভিয়ান আরও নিশ্চিন্ত হন। অক্টেভিয়ান রোমান সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রলেতারিয়ানদের নেতা ট্রিবিউন সেটারনিনাসের পরাজিত হওয়ার পর শুরু হওয়া রোমান গৃহযুদ্ধ টানা ৭০ বছর ধরে চলার পর অক্টেভিয়ানের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়। প্রায় পাঁচশ বছরের পুরোনো রোমান প্রজাতন্ত্রও বিলুপ্ত হয় স্থায়ী সামরিক একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে।

খ্রিস্টপূর্ব ২৭ সালে রোমান সিনেট অক্টেভিয়ানকে ‘অগাস্টাস’ অর্থাৎ ‘পবিত্র ব্যক্তি’ উপাধিতে ভূষিত করে। তখন থেকে তিনি অগাস্টাস সিজার হিসেবে পরিচিত হন। গেইয়ান অক্টোভিয়ান থেকে অগাস্টাস সিজারে পরিণত হওয়ার পর তিনি রোমান সম্রাটের ভূমিকায় আবির্ভূত হন। ৫০৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমান রাজতন্ত্রের পতনের পরে অগাস্টাস সিজারই প্রথম রোমান সম্রাট হয়ে দেখা দেন। সিনেট প্রজাতন্ত্রের কার্যকারিতা চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। রাজতন্ত্রী শাসনে আবারও বাঁধা পড়ে রোমান সাম্রাজ্য। থেকে যায় পাঁচশ বছরের প্রজাতন্ত্রী সিনেট শাসনের ইতিহাস।

108.jpg

চিত্র: অগাস্টাস সিজারের আমলের মুদ্রা

ল্যাটিন ভাষার বিখ্যাত কবি ভার্জিল ও হোরেসের আবির্ভাব ঘটেছিলো অগাস্টাসের সময়েই। তাই সাহিত্যের ইতিহাসে এই যুগকে অগাস্টীয় যুগ বলা হয়। ভার্জিল ট্রয় যুদ্ধের অন্যতম বীর ইনিয়াসের কাহিনী নিয়ে লিখেছিলেন বিখ্যাত মহাকাব্য- ইনিড। অগাস্টাসের মৃত্যু হয় ১৪ সালে। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তাঁর শাসনে রোমান সামাজ্য মোটামোটি স্থিতিশীল অবস্থায় পৌছায়। খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডারের ১ সাল অতিক্রম করছে তাঁর শাসন কাল। ক্যালেন্ডারে তাঁর নামে অগাস্ট মাসের নামকরণ হয়েছে।

অন্যান্য মাসের নামকরণ করা হয়েছে বিভিন্ন রোমান দেব-দেবীর নাম ও সংখ্যা থেকে। মিসরীয় ক্যালেন্ডার সংস্কার করে উন্নত বার্ষিক ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেছিলেন জুলিয়াস সিজার। জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারেই খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডারের উদ্ভব। খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডারে ১২ মাসের নাম এসেছে নিম্নোক্ত উৎস থেকে :

জানুয়ারি:             রোমান দেবরাজ জুপিটারের স্ত্রী জুনোর নামে।

ফেব্রুয়ারি:            পবিত্রতার প্রতীক ফেব্রুয়ারিয়াসের নামে।

মার্চ:                   যুদ্ধের দেবতা মারসের নামে।

এপ্রিল:                ল্যাটিন ভাষায় এপ্রিলাস মানে ফুল-ফুটা। এ মাসে ফুল ফুটত।

মে:                    প্রধান দেবতা মাইয়াস জুপিটারের নামে।

জুন:                   জুনিয়াসের নামে।

জুলাই:                জুলিয়াস সিজারের নামে।

অগাস্ট:               অগাস্টাস সিজারের নামে।

ল্যাটিন ভাষায় সাত, আট, নয় এবং দশকে বলা হয় সেপ্টাম, অক্টো, নভেম এবং ডেসিম। এই শব্দগুলো থেকে বাকি চারটি-মাসের নাম রাখা হয়েছে। গ্রহের নামকরণেও নিম্নরূপ রোমান প্রভাব প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

মার্কারি (বুধ):        রোমান ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী মার্কারি ছিলেন দেবতাদের দূত।

ভেনাস (শুক্র):       দেখতে সুন্দর গ্রহটির নাম ভেনাস। ভেনাস ছিলেন সুন্দরের দেবী।

মারস (মঙ্গল):        লাল রঙের গ্রহটির নাম মারস। মারস ছিলেন যুদ্ধের দেবতা।

জুপিটার (বৃহস্পতি): সবচেয়ে বড় গ্রহ । সবচেয়ে বড় ও প্রধান দেবতা ছিলেন জুপিটার।

স্যাটার্ন (শনি):       রোমান কৃষি দেবতা স্যাটার্ন।

নেপচুন:               সমুদ্রের দেবতা, জুপিটারের ভাই।

প্লুটো:                 জুপিটারর ভাই, পাতালে থাকেন।

অগাস্টাস সিজারের সময়ের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো যিসাসের জন্ম। খ্রিস্টধর্মের গ্রন্থ ইনজিলের বর্ণনা অনুসারে অগাস্টাসের সময়ে ফিলিস্তিন অঞ্চলে কয়েকটি রোমান প্রদেশের কথা জানা যায়। ফিলিস্তিনে দক্ষিণে ছিলো ইহুদিয়া ও উত্তরে ছিলো গালিল প্রদেশ। গালিল প্রদেশে ১ সালে যিসাসের জন্ম হয়। এ সময়ে এহুদিয়ার রাজা ছিলেন হেরোদ বংশের একজন রাজা। প্রধান বা বড় হেরোদ নামে তিনি পরিচিত। ইনজিলে মোট তিনজন হেরোদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

যিসাসের মা মেরির বাড়ি ছিলো গালিল প্রদেশের নাসরত গ্রামে। মেরির বিয়ে ঠিক হয়েছিলো এহুদিয়া প্রদেশের বেথেলহেম গ্রামের ইউসুফের সাথে। রাজা দাউদের জন্মও নাকি এই গ্রামে হয়েছিলো এবং ইউসুফও নাকি দাউদের বংশের লোক ছিলেন (ইনজিল, লূক:২:৪-৬)। অগাস্টাস সিজারের নির্দেশে রোমান সাম্রাজ্যে তখন আদমশুমারী শুরু হয়েছিলো। সিরিয়ার রোমান শাসনকর্তা তখন কুরিনিয়ে।

আদমশুমারীতে নিজের নাম উঠানোর জন্য ইউসুফ গালিল থেকে মেরিকে সংগে নিয়ে নিজের গ্রাম বেথেলহেমে যান। সেখানেই জন্ম হয় যিসাসের। তাঁর জন্মের অষ্টম দিনে ইহুদি নিয়মানুযায়ী খতনা করানো হয়েছিলো। যিসাস বড় হয়েছিলেন গালিল প্রদেশে তাঁর মায়ের গ্রাম নাসরতে। বড় হয়ে যিসাস এহুদিয়ায় নবি ইয়াহইয়ার কাছে যান। ইয়াহইয়া হোরোদের কাছে বন্দী হওয়ার পরে যিসাস গালিল প্রদেশে চলে যান।

109.jpg

চিত্র: যিসাসের জন্ম

১৪ সালে অগাস্টাস সিজারের মৃত্যুর পর রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট হন টিবেরিয়াস সিজার। তাঁর সময়েই আশা ও আলোর বার্তা নিয়ে হাজির হন যিসাস। তিনি একত্ববাদ প্রচার করতেন। তাঁর বাণীর মাঝে গরিব ও অত্যাচিারিত ইহুদিরা জীবন খুঁজে পেল। অত্যাচারী রোমান শাসনের শেকল চেপে বসেছিলো তাঁদের গলায়। দলে দলে তারা যিসাসের অনুসারি হতে লাগল। শোষণের কারাগারে তারা বাঁচার আশা পেল মানুষের প্রতি দয়ালু ও করুণাময় খোদার আশা ও অনুগ্রহের বার্তা শুনে।

প্রায় তিরিশ বছর বয়সে যিসাস তাঁর কাজ শুরু করেন। সমগ্র গালিল প্রদেশের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে তিনি মানুষের কাছে দয়া, মানবতা, ভালবাসা, ও শান্তির বার্তা নিয়ে হাজির হন। তাঁর আহবানে সাঁড়া দিয়েছিলো মানুষ। সমস্ত সিরিয়ায় তাঁর কথা ছড়িয়ে পড়ে। শহরে শহরে ও গ্রামে গ্রামে গিয়ে ইহুদিদের সভায় তিনি শিক্ষা প্রচার করতেন। তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন বারোজন।

গালিল প্রদেশের যিসাসের কথা শুনে এহুদিয়া, জেরুজালেম, ইদোম, জর্ডান নদীর ওপারের অঞ্চল এবং টায়ার ও সিডন শহর থেকে অনেক লোক তাঁর কাছে এসেছিলো। শিক্ষা প্রচারের একপর্যায়ে যিসাস তাঁর অনুসারিদের নিয়ে জর্ডান নদীর অন্যপাড়ে এহুদিয়া প্রদেশে যান। তাঁর এ আগমনে ইহুদি ধর্মব্যবসায়ী যাজক ও ফরিশীদের টনক নড়ে। জেরুজালেমের ধর্মগৃহে প্রবেশ করে তিনি বলে ওঠেন, ‘‘পাক-কিতাবে খোদা বলেছেন, আমার ঘরকে এবাদতের ঘর বলা হবে, কিন্তু তোমরা এটাকে ডাকাতের আড্ডাখানা করে তুলেছ’’ (ইনজিল: মথি: ২১:১৩)।

শাসক পূঁজারি রোমান ধর্মের স্থলে রোমের প্রজাদের কাছে একত্ববাদী ধর্ম ছিলো অনেক ভাল বিকল্প। গালিলের রোমান শাসনকর্তা হেরোদ কিন্তু একত্ববাদী ধর্মকে ভাল চোখে দেখেন নি। এ ধর্মের প্রতি তাঁর একটি আচরণের নমুনা দেয়া যাক। যিসাসের সমসাময়িক নবি ছিলেন ইয়াইইয়া। হেরোদ তাঁর জন্মদিনে পরকীয়া স্ত্রী ও প্রেমিকার কাছে জানতে চেয়েছিলেন সে কী উপহার পেলে খুশী হবে। উত্তরে সে জানাল নবি ইয়াহইয়ার খন্ডিত মাথা। নবি ইয়াহইয়া তখন হোরোদের কারাগারে বন্দী । হেরোদ সত্যি সত্যিই জেলখানার মধ্যে ইয়াহইয়ার মাথা কাটিয়ে সেটা এনে থালায় করে তাঁর প্রেমিকাকে সামনে উপস্থাপন করেছিলেন (ইনজিল: মথি:১৪)।

বাহ্যিকভাবে যিসাসের ধর্ম বিদ্রোহী বা বিপ্লবী ছিলো না। কিন্তু মূলত তা এমন বার্তা প্রচার করছিলো যা শাসক ও ধর্মব্যবসায়ী উভয় শ্রেণির জন্যই ভবিষ্যতে বিপদের কারণ হয়ে ওঠার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিলো। তাই তারা এই ধর্মের ব্যাপারে শংকিত হয়ে ওঠে। ইহুদি ধর্মযাজকদের নিয়ে রোমান শাসকদের কোন মাথাব্যাথা ছিলো না। কারণ তাদের শাসকবিরোধী কোন ভূমিকা আর ছিলো না এবং ধর্মকে তারা ব্যবসায় পরিণত করেছিল। যিসাসের ভাষায় জেরুজালেমের ধর্মগৃহকে তারা ডাকাতের আড্ডাখানায় পরিণত করেছিল। এটি ছিলো তাদের ধর্মব্যবসার প্রাণকেন্দ্র।

যিসাসের ধর্মমত সর্বপ্রথম তাদের জন্যই বিপদের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দেখা দেয়। ইহুদি যাজকতন্ত্র কঠিন ধর্মীয় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যিসাসের মতবাদের কারণে। তাই নতুন ধর্মের বিরোধীতায় তারা উঠে পড়ে লেগে যায়। এদের সম্পর্কে যিসাস বলেন, “ভন্ড নবিদের বিষয়ে সাবধান হও। তারা তোমাদের কাছে ভেড়ার চেহারায় আসে, অথচ ভিতরে তারা রাক্ষুসে নেকড়ে বাঘের মতো” (ইনজিল : মথি: ৭: ১৫)।

110.jpg

চিত্র: খ্রিস্টধর্মের প্রথম যুগের প্রতীক Chi Rho

গোঁড়া ইহুদি অর্থাৎ ফরীশীরা সব সময়ে যিসাসের পেছনে লেগে থাকতো এবং তাকে কথার ফাঁদে আটকানোর চেষ্টা করতো। ইনজিলের বর্ণনা অনুসারে এই ফরীশীদেরকে নবি ইয়াহইয়া বিষাক্ত সাপের প্রজাতি বলে সম্বোধন করেছিলেন। এরা ছিলো বক ধার্মিক; আচার সর্বস্ব ধর্ম পালন করতো। ধর্মের বাইরে দিকটা অর্থাৎ আচার-প্রথা খুব মেনে চলত। কিন্তু মানুষের দুঃখ দুর্দশায় তারা ভাবিত হতো না। বিপন্ন মানুষের মুক্তির জন্য এগিয়ে যাবার ব্যাপারে তাদের কোন উৎসাহ ছিলো না। এদের উদ্দেশ্যে যিসাস বলেন, “ভন্ড আলেম ও ফরীশীরা, ঘৃণ্য আপনারা; আপনারা পুদিনা, মৌরি আর জিরার দশ ভাগের এক ভাগ খোদাকে দিয়ে থাকেন; কিন্তু ন্যায়, দয়া এবং বিশ্বস্ততা – যা মূসার বিধানের আরও দরকারি বিষয় তা আপনারা বাদ দিয়েছেন।” (ইনজিল : মথি: ২৩: ২৩)

ফরীশী ও ইহুদি ধর্মযাজকরা যিসাসকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলো। তিনি জেরুজালেমের ধর্ম গৃহে যাতায়াত করতেন এবং সেখানে প্রকাশ্যে তাঁর ধর্ম প্রচার করতেন। সেখানে তাকে কথার ফাঁদে আটকাতে ইহুদি ইমামগণ ও ফরীশীরা ব্যর্থ হয়। লোকজন যিসাসের কথা শুনত ও তাকে সমর্থন করতো। উপায়ান্তর না দেখে ইমামগণ ও বৃদ্ধ ইহুদি নেতারা মহাইমাম কাইয়াফার বাড়ীতে একত্র হয়ে যিসাসকে লোক পাঠিয়ে ধরে এনে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। রোমান রাষ্ট্রশক্তি তখনও যিসাসের ধর্ম সম্পর্কে তেমন কিছু জানতো না।

রোমান প্রাদেশিক শাসনকর্তারা এটাকে মনে করেছিলেন অন্যান্য ইহুদি নবিদের মতই ইহুদি সমাজের অভ্যন্তরে চলে আসা ধর্ম প্রচারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। তাই তারা যিসাসকে খুব গুরুত্ব দেননি এবং হত্যার প্রয়োজনও মনে করেন নি তখন পর্যন্ত। কিন্তু ইহুদিরা হত্যা করতে চাইলে তাতে তাদের বাধা দেওয়ারও তেমন কিছু ছিলো না। তাই ইহুদি ইমামগণ ও নেতারা নির্ভয়েই সশস্ত্র লোকজনদের পাঠিয়ে যিসাসকে ধরে আনালেন কাইয়াফার বাড়ীতে। যিসাসের অনুসারিদের পক্ষ হতে যাতে কোন বাধা না আসে সেজন্য তারা তাকে আইনিভাবে হত্যা করাই সুবিধাজনক মনে করলেন।

সেসময় এহুদিয়ার প্রধান রোমান শাসনকর্তা ছিলেন পন্টিয়াস পিলাত। পরদিন সকালে তারা যিসাসকে পিলাতের কাছে নিয়ে যায়। পিলাত তাঁর অপরাধ জানতে চাইলে ইহুদি প্রধান ইমামরা বলল, “আমরা দেখেছি, এই লোকটা সরকারের বিরুদ্ধে আমাদের লোকদের নিয়ে যাচ্ছে। সে সম্রাটকে খাজনা দিতে নিষেধ করে এবং বলে সে নিজেই মসীহ, একজন বাদশাহ’’ (ইনজিল: লূক:২৩:২)। পিলাত যিসাসকে মৃত্যুদন্ড দিতে আগ্রহী ছিলেন না।

তিনি অভিযোগকারীদের কাছ থেকে জানলেন যিসাস গালিল প্রদেশের লোক। সেখানকার শাসনকর্তা তখন হেরোদ। ঘটনার দিন হেরোদ জেরুজালেমে উপস্থিত ছিলেন , যিসাস গালিল প্রদেশের লোক জেনে পিলাত তাকে হেরোদের কাছে পাঠিয়ে দেন। হেরোদ যিসাসকে অনেক প্রশ্ন করে জবাব না পেয়ে তাঁকে পুনরায় পিলাতের কাছে পাঠিয়ে দেন। পিলাত নির্দোষ যিসাসকে ছেড়ে দেয়ায় চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইহুদি ইমাম ও নেতাদের চাপের মুখে বাধ্য হয়ে যিসাসকে হত্যার অনুমতি দিয়ে তাদের হাতে তুলে দেন (ইনজিল: লূক: ২৩:২৪-২৫)।

যিসাসের আবির্ভাব শুধু রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসে নয়, সমগ্র মানব সভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি। ইহুদিদের মধ্যে নবিদের আবির্ভাব ছিলো খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। বলা যায় শত শত বছর ধরে ইহুদি সমাজ কখনোও নবিবিহীন অবস্থায় ছিলো না। এমনকি একই সময়ে ইহুদিদের মধ্যে একাধিক নবির উপস্থিতিও ছিলো স্বাভাবিক ব্যাপার। নবিরা কোন সাংগঠনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় ধর্ম প্রচার করতেন না। তাঁরা সরাসরি মানুষকে ধর্মের পথে ডাকতেন। নবিদের কখনও কোন সংগঠন বা নেটওয়ার্ক ছিলো বলে শোনা যায় নি। তারা সরাসরি মানুষের দ্বারে দ্বারে উপস্থিত হয়ে ব্যক্তিগতভাবে মানুষকে শিক্ষা দিয়ে বেড়াতেন। তাদের জীবন যাপন ছিলো খুবই সাদামাটা ও সরল।

এরকমই একজন বৈচিত্রহীন ও সাদামাটা জীবনধারী মানুষ ছিলেন যিসাস। সম্ভবত তিনি কাঠুরে হিসেবে প্রথম জীবনে জীবিকা নির্বাহ করেছিলেন। তাহলে তাঁর মধ্যে কী এমন শক্তি ছিলো যে, তিনি মানব সভ্যতার গতিপথকেই দিলেন বদলে? নবিদের একমাত্র শক্তি ছিলো তাদের কথা, তাদের কাজ, তাদের আদর্শ। অধিকাংশ নবিদের আদর্শই ইতিহাসকে খুব বেশি প্রভাবিত কওে নি। কিন্তু যিসাসের আদর্শ সমগ্র রোমান সভ্যতার বিবেক ও মূল্যবোধের ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছিলো। এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি বোঝা দরকার।

প্রায় ৫০০ বছরের রোমান প্রজাতন্ত্রের ইতিহাস যেন লাগাতার যুদ্ধ-সংঘাত ও লাগামহীন নৃশংসতার ইতিহাস। বহুমাত্রিক শ্রেণি সংঘর্ষ ও ক্ষমতার দ্বন্দে ভরপুর রোমান প্রজাতন্ত্রের ইতিহাস যেন রক্তের কালিতে লেখা। প্লেবিয়ান-প্যাট্রেসিয়ান সংঘাত, বণিক-প্যাট্রেসিয়ান সংঘাত, কখনও প্যাট্রেসিয়ানদের বিরুদ্ধে বণিক ও প্রলেতারিয়ানদের মিলিত সংঘাত, আবার কখনও প্রলেতারিয়ানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ বণিক ও প্যাট্রেসিয়ানদের সংঘাত, বিদ্রোহী  ক্রীতদাসদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রলেতারিয়ান, বণিক ও প্যাট্রসিয়ানদের সম্মিলিত যুদ্ধ – এতসব সংঘাত ও সংঘর্ষ পৃথিবীকে এতবেশী রক্তাক্ত করেছিল যে পৃথিবী যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো। মানবতা যেন গুমরে কেঁদে মরছিলো। সবচেয়ে সস্তা হয়ে পড়েছিলো মানুষের রক্ত ও জীবন। স্বার্থের কারণে মানুষের জীবন দেওয়া সমাজ জীবনের স্বাভাবিক অংশে পরিণত হয়েছিলো।

111.jpg

চিত্র: রোমান গৃহযুদ্ধ

শ্রেণি সংঘর্ষকে ছাপিয়ে গিয়েছিল সেনানায়কদের ক্ষমতার উচ্চাভিলাষ বাস্তবায়নের জন্য বেঁধে যাওয়া গৃহযুদ্ধ। পম্পেই, জুলিয়াস সিজার, মার্ক এন্টনি, ক্লিওপেট্রা একে একে সকলেই নির্মম পরিণতি বরণ করেছিলেন। নৃশংসতা ও নির্মমতায় ভরপুর রোমান প্রজাতন্ত্রের বিশাল অধ্যায় জুড়ে মহত্ত্ব ও মানবতার কোন ছিটাফোঁটাও ছিলো না। ছিলো শুধু ক্ষমতা, অর্থ, ভোগবিলাস ও শোষণ-লুণ্ঠনের নারকীয় লালসা। কার চেয়ে কে বেশি প্রজাদের শোষণ করবে, কার চেয়ে কে বেশি ক্রীতদাসের মালিক হবে, প্রচন্ড ভোগবাদী জাগতিক স্বার্থ চর্চায় কে কার চেয়ে এগিয়ে যাবে এটা নিয়ে যেন প্রতিযোগিতা লেগে গিয়েছিল। কোন দয়া নেই, মায়া নেই, করুণা ও সহানুভূতি  নেই। সর্বত্রই মানবতার প্রচন্ড হাহাকার। মানুষের প্রতি দয়া বা মানুষের জন্য ত্যাগ ছিলো হাস্যকর ধারণা। পৃথিবী যেন ছিলো এক হৃদয়হীন পাষাণপুরী। ক্রীতদাস, প্রজা ও গরীবের জীবন যে কতটা নারকীয় হয়ে উঠেছিলো, শোষক শ্রেণির ভোগবিলাসের খোরাক যোগাতে গিয়ে – তার খবর কেউ রাখত না।

দাস মালিকদের বিশাল আয়তনের কৃষি খামার ল্যাটিফান্ডিয়ায় সারাদিন পশুর মতো খাটতো অসংখ্য ক্রীতদাস। এছাড়াও বণিকদের জাহাজ ও কলকারখানায় পশুর মতো খাটতো ক্রীতদাসেরা। রাষ্ট্রের মালিকানাধীন ক্রীতদাসেরাও দিন রাত বেগার খাটতো। প্রজাদের চলাফেরার স্বাধীনতা থাকলেও ক্রীতদাসদের তা ছিলো না। তাদের বিয়ে ও সন্তান নেওয়ারও সুযোগ ছিলো না। হালের পশুর অবস্থাও তাদের চেয়ে উন্নত ছিলো। রোমান সাম্রাজ্য তার ভোগের সমস্ত বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিলো ক্রীতদাসদের মাথায়।

কৃষি উৎপাদনের বেশির ভাগই হতো ল্যাটিফান্ডিয়ায়। তাই প্রজা বলতে যারা ছিলো তারা কৃষি কাজে তেমন একটা থাকতো না, বরং সেনাবাহিনীতে কিংবা বেকার অবস্থায় থাকতো। উৎপাদনে শ্রমের চাহিদা দাস শোষণ থেকে মিটে যাওয়ায় জমিতে প্রজা বসানোর দরকার পড়ত না। তাই দেশের মানুষের একমাত্র সুযোগ ছিলো সেনাবাহিনীতে অংশ নিয়ে পরদেশে দখল করে লুণ্ঠনের বখরা নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা। পরদেশ দখলেও দাস মালিকদের লাভের ভাগটা থাকতো বড়। সেনাবাহিনীর কর্তৃত্বও ছিলো তাদের হাতে।

সামাজিক সম্পদের আসল অংশটাই দাস মালিকদের হাতে থাকায় প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক অধিকার প্রজাসাধারণের কোন কাজে লাগেনি। রোমান প্রজাতন্ত্রে কখনোই কৃষকদের জমির অধিকার স্বীকার করা হয় নি। গ্রেকাস ভাইদের আইন ও ভূমি মালিকানা সংকারের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয় নি। গ্রিক গণতন্ত্রেরও একই অবস্থা। এটি ছিলো দাস মালিকদের নিজেদের গণতন্ত্র। প্রজাতন্ত্র ও গণতন্ত্র উভয় ব্যবস্থায়ই উৎপাদনের মূল কারিগর ক্রীতদাসকে দ্বীপদী পশু হিসেবে গণ্য করা হতো। গ্রিক গণতন্ত্র ও রোমান প্রজাতন্ত্রের ভিত্তিই ছিলো দাস শোষণ।

112.jpg

চিত্র: অগনিত ক্রীতদাসের জীবনের বিনিময়ে রচিত হয়েছিল রোমান স্থাপত্যের গৌরব

ইতিহাসে দেখা যায় টলেমিদের মিসর কিংবা সেলুসিডদের সিরিয়ার রাজতন্ত্রী শোষণ ব্যবস্থা রোমান প্রজাতন্ত্রের চেয়ে কম রক্তপাতময় ছিলো। তাহলে গণতন্ত্রই হোক আর প্রজাতন্ত্রই হোক, রাজতন্ত্রের সাথে তার তফাৎ ছিলো উনিশ আর বিশের তফাৎ। গণতন্ত্র-প্রজাতন্ত্র-রাজতন্ত্র সবই ছিলো নিষ্ঠুর দাস নিপীড়ক সমাজ ব্যবস্থা। এসব ব্যবস্থায় ক্রীতদাসের নিজেকে মানুষ বলে দাবী করাটাও ছিলো অপরাধ। অন্যদিকে গণতন্ত্র-প্রজাতন্ত্রের ধারক বাহক শ্রেণি ও সামন্ততন্ত্রী রাজ-রাজড়ারা নিজেদেরকে দেবতা বা প্রভু বলে দাবী করতো। শোষক শ্রেণি তাদের স্বরচিত ধর্মের ছড়ি ঘোরাতো ক্রীতদাস ও প্রজাসাধারণের ওপর।

এসব ধর্মে খোদা ও প্রভুর জায়গায় ছিলেন শাসক নিজেই। মানুষকে শোষণ করা, মানুষকে অত্যাচার করা ও লাগামহীন বিলাসিতা করার সমস্ত অধিকার ও বৈধতা শাসক শ্রেণি নিজেদের বানানো ধর্মীয় বিধান থেকে আদায় করে নিতেন। খোদা যা খুশি করতে পারেন। তাকে ঠেকাবার কেউ নেই। অতএব রাজা যেহেতু খোদা বা দেবতা শ্রেণীর লোক তাকে ঠেকাবার কেউ নেই। তাহলে সেই সকল মানুষ যারা ক্রীতদাস, যারা প্রজা, শোষকের তরবারির নিজে যাদের জীবন পরিণত হয় যন্ত্রণাময় বিভীষিকায় তাদের জীবনে এ ধর্ম আরেকটি বিভীষিকা ছাড়া আর কী হতে পারে?

গ্রিকো-রোমান প্যাগান ধর্মে শাসকের দৈব মর্যাদায় বিশ্বাস ছিলো ধর্মের অনিবার্য অংশ। মিসরীয় ফারাও বা মেসোপটেমিয়ার শাসকদেরকে দেবতা হিসেবে যেভাবে পূঁজা করা হতো সেভাবেই গ্রিকো-রোমান-মেসিডোনিয়ান শাসকদেরকেও দেবতূল্য জ্ঞান করা হতো। ৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তাঁকে আলেকজান্দ্রিয়ায় সমাহিত করে দেবতার মর্যাদা দেওয়া হয়। ফারাওদের মতোই টলেমিদের আমলেও মিসরে শাসকপূঁজা খুবই ব্যাপকতা লাভ করেছিল।

প্রথম টলেমি ও তাঁর রাণী প্রথম বেরেনিসকে ত্রাণকারী দেব-দেবী হিসেবে পূঁজা করা হতো। তাদের মৃত্যুর পরে দ্বিতীয় টলেমি আরও একধাপ এগিয়ে জীবিত অবস্থায়ই রাজা-রাণীকে পূঁজা করার প্রথা রাষ্ট্রীয় ভাবে প্রচলন করেন। দ্বিতীয় টলেমি ফিলাডেলফাস ও তাঁর রাণী দ্বিতীয় আরসিনো জীবিত অবস্থায়ই দেবতার মর্যাদা আদায় করেছিলেন। এই ধর্ম-ব্যবস্থা পরবর্তী রাজা রাণীরাও চালু রেখেছিলেন।

এটা চালু ছিলো ক্লিওপেট্রার সময় পর্যন্ত। সে যুগের বিভিন্ন সরকারি দলিল ও আবেদনপত্রে দেখা যায় ক্লিওপেট্রার পিতা দ্বাদশ টলেমি আউলেটসকে ‘আমাদের খোদা ও ত্রাণকর্তা রাজা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ৫২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্দ্রিয়ার নাগরিকরা আউলেটস ও তাঁর সন্তানদের নামে একটি মন্দির উৎসর্গ করেন। এতে রাণী হওয়ার আগেই ক্লিওপেট্রা দেবী বনে যান।

113.jpg

চিত্র: রোমান প্রজাতন্ত্রের প্রতীক ঈগল

খ্রিস্টপূর্ব ৪২ সালের ১ জানুয়ারি রোমান সিনেট জুলিয়াস সিজারকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেবতা বলে ঘোষণা করে। এরপর অক্টেভিয়ানও নিজেকে ‘দেবতা জুলিয়াসের পুত্র’ বলে ঘোষণা করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৪২-৪১ সালের শীতকালে ইফেসাসে (বর্তমান তুরস্কের পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র বন্দর) মার্ক এন্টনিকেও দেবতার মর্যাদা দেওয়া হয়। ইফেসাসে প্রাপ্ত একটি শিলালিপিতে তাঁকে যুদ্ধের দেবতা মারস ও প্রেমের দেবী ভেনাসের পুত্র এবং মানবজাতির ত্রাণকর্তা বলে উল্লেখ করা হয়।

ক্লিওপেট্রা ও এন্টনির বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ককেও দৈব ব্যাপার বলে গণ্য করা হতো। মিসরীয়রা বিশ্বাস করতো ক্লিওপেট্রা ছিলেন দেবী আইসিসের প্রতিরূপ। দেবী আইসিস ক্লিওপেট্রার রূপ ধরে নাকি পৃথিবীতে এসেছিলেন! মিসরীয়দের বিশ্বাস ছিলো রাজারা দেবতা অসিরিসের অবতার। দেবতা অসিরিসের সাথে দেবী আইসিসের বিয়ের পার্থিব প্রতিফলন ছিলো এন্টনি ও ক্লিওপেট্রার সম্পর্ক।

খ্রিস্টপূর্ব ২৭ সালে রোমান সিনেট অগাস্টাস সিজারকে ‘অগাস্টাস’ অর্থাৎ ‘পবিত্রব্যক্তি’ উপাধী প্রদান করে। ইতিহাসে তিনি এই নামেই পরিচিত। প্যাগান ধর্মে শেখানো হতো শাসকই খোদার প্রতিভূ। শাসকপূঁজারি এসব ধর্মের যুক্তি ছিলো শোষিতদের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে। দাস বিদ্রোহ ছিলো ধর্ম-বিরোধী কাজ। তাই দাস-বিদ্রোহ কোন ধর্মীয় অনুপ্রেরণা প্রসূত ছিলো না; ছিলো ধর্ম-বিরোধী। দাসদের কোন ধর্মীয় অধিকার ছিলো না। দাস বিদ্রোহের ক্ষেত্রে ধর্ম ছিল অন্যতম বাধা।

অন্যদিকে প্রাচ্যের সেমেটিক নবিদের প্রচারিত একত্ববাদ ছিলো ধর্মের আদলে রাজদ্রোহের প্রতীক। শাসকপূঁজারি ধর্মের বিপরীতে একত্ববাদ শুধুমাত্র একজন প্রভুর উপাসনার কথা বলে। ইব্রাহিম ও মুসা রাজদ্রোহী হয়েছিলেন একত্ববাদ প্রচারের কারণেই। শাসকের দৈব মর্যাদাকে অস্বীকার করে একত্ববাদ স্বীকৃতি দিয়েছে শুধুমাত্র একজন প্রভুর দৈব মর্যাদাকে। একত্ববাদ বলে আসল খোদা একজন এবং তিনি অদৃশ্য; তিনি মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। সেমেটিক নবিরা এই ধর্মীয় বিশ্বাসে মানুষকে অনুপ্রাণিত করে শাসকপূঁজারি ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। এই বিদ্রোহ কখনও রাজনৈতিক বিদ্রোহে রূপ নিয়েছে; আবার বিভিন্ন সময়ে তা পরাজিত ও পরাধীন রাজনৈতিক জীবনে সান্তনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

114.jpg

চিত্র: রোমের কলোসিয়াম প্রাচীন পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম

এই নবি আগমণের ধারাবাহিকতায়ই আবির্ভাব ঘটেছিলো যিসাসের। রোমান সাম্রাজ্য তখন গৃহযুদ্ধের সংকট কাটিয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যকে নিয়ে অখন্ড রূপ ধারণ করেছে। রোমের সম্রাট এই অখন্ড সাম্রাজ্যের সর্বময় কর্তায় পরিণত হন। গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত জনজীবনে দেখা দিয়েছে হাহাকার আর স্থবিরতা। প্রবল পরাক্রমশালী নব্য রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিটি বিদ্রোহই শেষ হচ্ছিল ব্যর্থতা ও পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। তাই অখন্ড সাম্রাজ্যজুড়ে পরাজিত প্রজাজীবনে সান্তনা ও আশার প্রতীক হিসেবে একত্ববাদী প্রাচ্য ধর্মই যে একটি শক্তিশালী অবলম্বন হিসেবে দেখা দেবে সে সম্ভাবনা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। রোমান সাম্রাজ্যের অখন্ডতার ফলেই প্রাচ্যের খ্রিস্টধর্ম একসময় পাশ্চাত্যেও ছড়িয়ে পড়তে পেরেছিলো।

অগাস্টাস সিজার বিজয়গর্বে বলেছিলেন, তিনি চিরকালের মতো শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু তিনি জানতেন না এটা ছিলো কবরখানার শান্তি। সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা ধ্বংসের কিনারায় এসে পৌছে গিয়েছিল। শুধুমাত্র মিসরের অর্থনৈতিক জীবন কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলো। তা ছাড়া সাম্রাজ্যের অন্যান্য অংশগুলির অর্থনৈতিক জীবন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌছেছিলো। বাণিজ্য প্রায় বন্ধ; বিক্রেতা আছে ক্রেতা নেই। কারিগরদের অবস্থা শোচনীয়। প্রাচ্যের প্রজাদের ওপর বাড়িয়ে দেয়া হয় করের বোঝা। এর ওপর রাজপ্রভুদের জন্য বাধ্যতামূলক শ্রমের চাপে তারা বিপর্যস্ত।

স্বচ্ছল জীবন ছিলো শুধু ধনবান রোমান দাস মালিকদের। গৃহযুদ্ধের সময় লুটের মাল হাত করে তারা প্রভুত ধনের মালিক হয়। আগে শুধু অভিজাত প্যাট্রেসিয়ানরাই দাস-মালিক হতো। এখন শুধু অভিজাত প্যাট্টেসিয়ানরাই নয়, বণিকরাও প্রচুর পরিমাণে দাস ও জমির মালিক হয়ে গিয়েছে। গৃহযুদ্ধের সময়কার লুণ্ঠনের অর্থ মালিকরা খরচ করছিলো বিলাসিতায়। কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ ছিলো অনিশ্চিত। ধন তারা খরচ করছিলো ঠিকই কিন্তু সঞ্চয়ের নতুন পথ খোলা ছিলো না। কোন দেশ আর বাকি ছিলো না যা রোমান দাস মালিকদের লুণ্ঠনে উজাড় হয় নি।

115.jpg

চিত্র: আগুনে পুড়ছে রোম

প্রথম শতকের সম্রাটরা আর্থ-রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নয়নের চেষ্টা করেছিলেন। আগেকার সিনেটের কনসালরা তাদের ১ বছরের মেয়াদ শেষে প্রোকনসাল হয়ে যেকোনো বিজিত রোমান দেশের গভর্নর হয়ে বসতেন। সেখানে তারা স্বৈরশাসনের মাধ্যমে ব্যাপক লুণ্ঠন চালিয়ে নিজের ধনভান্ডার সমৃদ্ধ করতে পারতেন। সংস্কারের সময় এদেরকে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। স্বৈরশাসনের পরিবর্তে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হয়। প্রদেশের শাসকের নাম হয় প্রকুরেটার। প্রকুরেটারকে শাসন সংক্রান্ত বিবরণ রোমের সদর দপ্তরে পাঠাতে হতো। প্রজাদের অভিযোগে প্রকুরেটারকে অপসারণের ব্যবস্থাও রাখা হয়। প্রজাদের উপর দুটি কর আরোপ করা হয়। পোলকর ও ভূমিকর। বিজিত দেশসমূহের প্রজাদেরকে রাষ্ট্রের নাগরিকত্ত্বও দেয়া হয়।

কিন্তু এসব সংস্কার সাম্রাজ্যকে উদ্ধার করতে পারলো না। শোষণের মাত্রা কমে নি। ক্রীতদাসদের অবস্থা আগের মতই রইল। শতবর্ষব্যাপী গৃহযুদ্ধের ধকল সইতে হলো ক্রীতদাস ও প্রজাদেরকেই। ইতিহাসের একটি আমোঘ সত্য হলো শাসকদের যুদ্ধের ধকল ভোগ করতে হয় জনগণকেই। সেই সময়ে সমগ্র রোমান সাম্রাজ্যের জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। রোমের অধিবাসী ছিলো প্রায় পাঁচ লক্ষ। এদের মধ্যে বেকার প্রলেতারিয়ানদের সংখ্যাই ছিলো দুই থেকে তিন লক্ষ। সম্রাটের পক্ষ থেকে এদের মধ্যে বিনামূল্যে রুটি বিতরণের ব্যবস্থা করা হয় এবং নানা ধরনের বিনোদনের মাধ্যমে তাদেরকে শান্ত রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বিদ্রোহ থেকে তাদেরকে নিবৃত্ত করা পুরোপুরি সম্ভব হয় নি। রুটি ও বিনোদনের মাধ্যমে তাদেরকে কোনমতে শৃঙ্খলায় রাখা সম্ভব হলেও দাস এবং বিজিত দেশের প্রজাদের শান্ত রাখা খুবই মুশকিল হয়ে পড়েছিলো।

রোমান ঐতিহাসিকরা বলেন যিসাসের জন্মের পরের প্রথম শতকেও খন্ড বিদ্রোহ কিছুদিন পরপরই দেখা দিয়েছে। বিদ্রোহ সামলাতে শাসকরা নৃশংস পদ্ধতির আশ্রয় নেন। কঠোর আইনের দ্বারা দাসদেরকে শায়েস্তা করা হয়। একজন ক্রীতদাস বিদ্রোহ করলে মালিকের ঘরে যত ক্রীতদাস রয়েছে তাদের সবাইকেই ফাঁসি দেওয়ার আইন করা হয়। এই জল্লাদের আইনেও দাসদেরকে মুখ বুজে দুঃসহ শোষণ ও অত্যাচার মেনে নিতে বাধ্য করা যায় নি। অন্যদিকে ইতালির বাইরে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে প্রজারা সুযোগ পেলেই বিদ্রোহ করতো। শতবর্ষী গৃহযুদ্ধের খরচের চাপে তাদের অর্থনৈতিক জীবনের মেরুদন্ড ভেঙে গিয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হলেও তাদের অবস্থার বিন্দুমাত্র উন্নয়ন হয় নি।

যিসাসের জন্মের পরে প্রায় পাঁচশ’ বছর রোম সাম্রাজ্য টিকেছিলো। প্রজাতন্ত্র থেকে রাজতন্ত্রী ব্যবস্থায় প্রবেশ করেও রোম সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সংঘাত থেমে যায় নি। উত্থান-পতন, হিংসা-লোভ, বিদ্রোহ-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই ইতিহাস হয়ে আছেন পরবর্তী রোম সম্রাটরা। টিবেরিয়াস সিজার ক্ষমতায় ছিলেন ৩৭ সাল পর্যন্ত। তাঁর সময়েই যিসাসের আগমন ঘটেছিলো। তাঁর পরে ক্ষমতায় আসেন ক্যালিগুলাস (৩৭-৪১ খ্রি.), ক্লডিয়াস (৪১-৫৪ খ্রি.), নীরো (৫৪-৬৮ খ্রি.) প্রমুখ।

এদের মধ্যে সবচেয়ে নিষ্ঠুর ছিলেন নীরো। তিনি ছিলেন যেমনই নিষ্ঠুর তেমনই খামখেয়ালী। গল্পে আছে একবার রোমে আগুন লেগেছিলো। দাউদাউ আগুনে যখন রোম শহর পুড়ে যাচ্ছিল নীরো তখন নিরাপদে বসে পরম নিশ্চিন্তে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। খৃস্টানদের তিনি দুচোখে দেখতে পারতেন না। খৃস্টানদের ওপর তিনি অকল্পনীয় নৃশংসতায় নির্যাতন চালিয়ে ছিলেন। শোনা যায়, নেবুচাঁদনেজারের মতো নীরোও পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন।

গৃহযুদ্ধের পরবর্তী সময়েও রোমান সম্রাটরা অত্যাচার ও বিলাসীতায় একজন আরেকজনের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। অগাস্টাস সিজারের পরবর্তী সম্রাট টিবেরিয়াস সিজার চারশ ইহুদিকে রোম থেকে সার্ডিনিয়ায় নির্বাসিত করেন। সম্রাট ক্যালিগুলাসকে ইতিহাসবিদরা অর্ধ উম্মাদ বলেছেন। লাম্পট্য ছিলো তার প্রবাদপ্রতীম বিলাসিতার সবচেয়ে বড় অনুষঙ্গ। তার বিলাসিতার জন্য রোমান রাজকোষ ব্যয় করতো তৎকালীন রোমান মুদ্রায় বর্তমান ইংল্যান্ডের প্রায় দুই কোটি পাউন্ড সমপরিমাণ অর্থ।

ক্যালিগুলাস জেরুজালেমের রোমান কর্তৃপক্ষকে আদেশ প্রদান করেন অবিলম্বে সলোমনের ধর্মগৃহের পবিত্র হোলিসের ওপর তাঁর নিজের মূর্তি স্থাপনের। এই আদেশ বিদ্রোহী করে তোলেছিলো ইহুদিদের। অত্যাচারী রোমান শাসককে তারা দেবতা হিসেবে মেনে নিতে রাজী হয় নি। ইহুদি, মোয়াবীয়, আমোনীয় প্রভৃতি সেমেটিক জাতির মানুষ কখনও রোমানদের শাসকপূঁজারী ধর্মমত গ্রহণ করেনি। জেরুজালেমের ধর্মগৃহ তাদের সকলেরই শ্রদ্ধার পাত্র ছিলো। ক্যালিগুলাসের দেবতা হওয়ার অভিলাষ তাদেরকে বিদ্রোহের পথে টেনে আনে।

অর্থনৈতিক শোষণের জন্য জুডিয়ায় বার বার বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে। সর্বস্তরের মানুষই এ ধরনের বিদ্রোহে অংশ নিতো। মূলত অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তির আকাঙ্খাই ধর্মীয় প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে বারবার সংগঠিত বিদ্রোহের আকার ধারণ করেছে। রোমান গভর্নর গেসিয়াস কর্তৃক ইহুদি ধর্মগৃহ লুটের কারণে ৬৬ সালে জুডিয়ায় ব্যাপক বিদ্রোহের সূচনা হয়। ৭০ সালে সম্রাট টিটাস নারকীয় নৃশংসতায় জেরুজালেম ধ্বংস করে এ বিদ্রোহ দমন করেন। ক্যালদীয় সম্রাট নেবুচাদনেজারের পর রোমান সৈন্যরা আবারও জেরুজালেমের ধর্মগৃহ ও দাউদের প্রাচীর ধূলায় মিশিয়ে দিলো। দশ লক্ষ ইহুদিদের অনেকেই হয় তাদের তরবারির নিচে প্রাণ দেয় অথবা পালিয়ে যায়। পালিয়ে যাওয়া ইহুদিরা তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী নির্বাসনের (dias pora) মুখোমুখী হয়।

দ্বিতীয় দফায় ব্যাপক ইহুদি-রোমান যুদ্ধ শুরু হয় ১১৫ সালে। অতিরিক্ত করারোপ থেকে মুক্তি লাভের জন্যই সর্বস্তরের ইহুদিরা এ বিদ্রোহে  যোগ দেয়। ১১৫ সালে যখন অধিকাংশ রোমান সৈন্য পার্থিয়ার (পারস্য) সাথে যুদ্ধের জন্য সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্তে অবস্থান করছে তখন সাইরেনিকা, সাইপ্রাস এবং মিসরে ইহুদি বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহীরা এসব অঞ্চল দখল করে নেয় এবং পার্থিয়া যুদ্ধে অংশ না নিয়ে যেসব রোমান সৈন্য পেছনের এসব অঞ্চলে অবস্থান করছিলো সেসব সৈন্যদের গ্যারিসন আক্রমণ করে ব্যাপক হত্যাকান্ড চালায়। ১১৭ সালে রোমান জেনারেল লুসিয়াস কুইটাস ব্যাপক লড়াইয়ের পর এ বিদ্রোহ দমন করেন। এ যুদ্ধকে কিটোস যুদ্ধ বলা হয়।

116

চিত্র: ইহুদি-রোমান যুদ্ধ

তৃতীয় ইহুদি-রোমান যুদ্ধ শুরু হয় ১৩২ সালে, সম্রাট হাদ্রিয়ানের সময়। এটি ছিলো রোমান শাসনের বিরুদ্ধে তিনটি বড় ইহুদি বিদ্রোহের মধ্যে শেষ বিদ্রোহ। সাইমন বার কোখবার নেতৃত্বে জুডিয়ার ইহুদিরা এ বিদ্রোহের সূচনা করে। মূলত অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় নিপীড়নই এ বিদ্রোহের মূল কারণ। বিদ্রোহের তাৎক্ষণিক কারণের মধ্যে ছিলো জুডিয়ায় ব্যাপক সংখ্যাক রোমানদের উপস্থিতি এবং অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার কড়াকড়ি, ইহুদি শিশুদের খতনা নিষিদ্ধকরণ, জেরুজালেমের ধ্বংসস্তুপের ওপর এইলিয়া ক্যাপিটোলিনা নামে একটি নতুন রোমান শহরের নির্মান কাজ শুরু করা এবং টেম্পল মাউন্টের ওপর জুপিটারের মন্দির স্থাপন।

১৩৪ সালে রোমান সম্রাট হাদ্রিয়ান এ বিদ্রোহ দমনের জন্য জেনারেল সেক্সটাস জুলিয়াস সেভেরাসের নেতৃত্বে ছয় লিজিয়নের এক বিশাল সৈন্যবাহিনী পাঠান। ১৩৬ সালের মধ্যে রোমান সেনারা ইহুদি বিদ্রোহ দমনে পুরোপুরি সফল হয়। এ বিদ্রোহ দমনে রোমান সেনারা ভয়ানক নৃশংসতার পরিচয় দেয়। ইতিহাসবিদ ডিও ক্যাসিয়াসের মতে, এ বিদ্রোহে প্রায় ৫৮০০০০ ইহুদি নিহত হয় এবং তার চেয়েও বেশী ইহুদি মারা যায় অনাহার ও রোগের আক্রমণে। যুদ্ধবন্ধী অসংখ্য ইহুদিকে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রয় করে দেওয়া হয়। জুডিয়ার ইহুদি সম্প্রদায় প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়।

সম্রাট হাদ্রিয়ান জেরুজালেমে বাইরে থেকে ইহুদিদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা অরোপ করলে জেরুজালেম প্রায় ইহুদি শূণ্য হয়ে যায়। এ সময় থেকেই পালিয়ে যাওয়া ইহুদিরা সারা আরবে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। জুডিয়ার সকল স্মৃতি মুছে ফেলার জন্য সম্রাট হাদ্রিয়ান মানচিত্রে এর নতুন নামকরণ করেন ‘সিরিয়া প্যালেস্টিনা’। সালে সম্রাট হাদ্রিয়ানের মৃত্যুর পর ইহুদি নিপীড়ন কিছুটা শিথিল হলেও রোমানরা ইহুদিদের জেরুজালেমে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখে; অবশ্য ইহুদিদের বাৎসরিক উপবাস ও শোকের দিন তিশা বা’ব-এ তাদেরকে জেরুজালেমে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হতো। ইহুদিরা তাদের এ পরাজয়ের জন্য তালমুদ পুস্তকে বার কোখবাকে ভূয়া মসিহ বলে অভিহিত করেছে।

ধর্মীয় আদলে এসব বিদ্রোহ হলেও মূল কারণটি ছিলো অর্থনৈতিক শোষণ। কিন্তু প্রতিটি বিদ্রোহই শেষ হয়েছে ব্যার্থতা ও পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। পরাধীনতার শেকল আরও চেপে বসেছে গলায়। এমতাবস্থায় এটাই স্বাভাবিক যে, বিপন্ন মানুষ ধর্মের মধ্যেই সান্তনা খোঁজার চেষ্টা করবে। ধর্ম তখন আর বিদ্রোহী নয় বরং শান্তি ও সমর্পিত জীবনের কথা বলে এবং দুঃখ-বেদনা ও গ্লানিময় জীবনকে সহ্য করে বেঁচে থাকার আধ্যাত্মিক প্রেরণা জাগায়; মানুষের শক্তি দ্বারা মুক্তির আশা ছেড়ে দৈব-শক্তিতে মুক্তি অনুসন্ধানের কথা বলে। দুঃখের দিনে আধ্যাত্মিক প্রেরণা ও সাহস মানুষের বেঁচে থাকার খুবই বড় অবলম্বন।

117.png

চিত্র: ১১৭ খ্রিস্টাব্দের রোমান সাম্রাজ্য

রোমান অত্যাচারে বিপন্ন প্রাচ্যের জীবনে এরকমই একটি বড় অবলম্বন হয়ে দেখা দেয় খ্রিস্টধর্ম। যদিও যিসাসের জীবদ্দশায়ও খ্রিস্টধর্ম প্রাচ্যের প্রজাদের জীবনে খুব বড় প্রভাবক হয়ে উঠতে পারে নি তবুও সময় ও প্রেক্ষপটের কারণে ধীরে ধীরে তাঁর প্রচারিত শিক্ষাগুলোই একসময় রোমান প্রজাদের দুঃখ ও দারিদ্রপীড়িত পরাজিত জীবনে সান্তনা ও স্বস্তি ও এনে দিতে শুরু করে। অধ্যাত্মিক সান্তনায় মানুষ দুঃখ ভুলতে চেষ্টা করে। শুধু ইহুদি প্রদেশগুলো নয়, গ্রিস, রোম ও এশিয়া মাইনরেও তাঁর শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ে। সেমেটিক নবিদের মধ্যে সর্বপ্রথম যিসাসের শিক্ষাই শাসকপূঁজারি ও প্যাগান গ্রিকো-রোমানদের মধ্যে প্রবেশ করে। এটা ছিলো ইতিহাসের অভূতপূর্ব ঘটনা।

এই ইতিহাসটি এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারতো; কিন্তু তা হয় নি। পরবর্তী সময়ে যিসাসের অনুসারিদের প্রচারিত খ্রিস্টধর্ম হঠাৎ করে ছড়িয়ে পড়ে সারা রোমান সাম্রাজ্যজুড়ে। প্যাগানরা একসময় তাদের অদ্ভুত দেব-দেবীদের ছেড়ে দলে দলে এই ধর্মে দীক্ষা নিতে শুরু করে। তবে ইতিহাসে এই ধর্মের গুরুত্ব প্রতীয়মান হয় যিসাসের আবির্ভাবের অনেক দিন পরে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে খ্রিস্ট মতবাদ রোমান ক্রীতদাসদের মাঝে ব্যাপক আবেদন সৃষ্টি করে এবং তারা দলে দলে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা নিতে থাকে।

রোমানদের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে যারা খ্রিস্টধর্মের প্রথম যুগে ভূমিকা রেখেছিলেন তাদের মধ্যে সেইন্ট পল ও সেইন্ট পিটারের অবদান ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। দুজনকেই জীবন দান করতে হয়েছিলো। সেইন্ট পিটারকে যেখানে হত্যা করা হয় বহুদিন পরে রেনেসাঁর যুগে সেখানে নির্মিত হয় সেইন্ট পিটারের গির্জা। খ্রিস্টধর্মের প্রসারে সম্রাট ডায়োক্লেটিয়ান (২৮৪-৩০৫ খ্রি.) শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। এর প্রসার রোধে তিনি যে হত্যাকান্ড চালান, তা খ্রিস্টধর্মের ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্য হত্যাযজ্ঞ। এই নিধনযজ্ঞ খ্রিস্টধর্মকে নির্জীব করতে পারলো না।

খ্রিস্টমতবাদ এক প্রবল জোয়ার সৃষ্টি করে সারা রোমান সাম্রাজ্যজুড়ে। জোয়ারের তোড়ে ভাসিয়ে নেয় দাস ও সাধারণ দরিদ্র রোমানদের। এ পরিস্থিতি শংকিত করে তোলেছিলো রোমান সম্রাট কনস্টানটাইনকে (৩০৬-৩৩৭ খ্রি.)। খ্রিস্ট মতবাদের প্রতি বৈরী মনোভাব ধরে রাখলে পরিণামে তা বিদ্রোহের জন্ম দিতে পারে – এই আশঙ্কা থেকে তিনি সাম্রাজ্যের অখন্ডতা ও শান্তি রক্ষার জন্য খ্রিস্টধর্মীদের প্রতি সহনশীল হওয়ার নীতি গ্রহণ করেন এবং এক পর্যায়ে নিজেও খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা নেন। এটা ৩১৩ সালের ঘটনা। এটা ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব ঘটনা। কোন সম্রাটের সেমেটিক ধর্ম গ্রহণের ঘটনা এটাই প্রথম।

অতীতের ইতিহাসে পারস্য সম্রাট সাইরাস ইহুদিদের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য বিখ্যাত হলেও তিনি মুসার ধর্ম গ্রহণ করেননি। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ইতিহাসে একজন সম্রাট হিসেবে হিসেবে কনস্টানটাইনই প্রথম সেমেটিক ধর্ম গ্রহণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি মানব সভ্যতার ইতিহাসকে অত্যন্ত গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন। রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী তিনি রোম থেকে সরিয়ে এনেছিলেন বাইজানটিয়ামে (বর্তমান তুরস্কের ইতাম্বুল) এবং এর নামকরণ করেছিলেন ‘নোভা রোমা’ অর্থাৎ নতুন রোম। কিন্তু অচিরেই তাঁর নামে এর নামকরণ হয়ে যায় ‘কনস্টানটিনোপল’।

৩৩৭ সালে কনস্টানটাইনের মৃত্যুর পর রোমান সাম্রাজ্যের অধিপতি হন ২য় কনস্টানটিয়াস (৩৩৭-৩৬১ খ্রি.)। এর পরের উল্লেখযোগ্য সম্রাট ভ্যালেন্স (৩৬৪-৩৭৮ খ্রি.)। ভ্যালেন্স এর পর বিখ্যাত সম্রাট ১ম থিওডোসিয়াস (৩৭৯-৩৯৫ খ্রি.)। তিনি ৩৮০ সালে খ্রিস্টধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেছিলেন। অখন্ড রোমান সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট এই ১ম থিওডোসিয়াস ৩৯৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর দুই পুত্র হনোরিয়াস (৩৯৩-৪২৩ খ্রি.) ও আর্কাডিয়াসের (৩৮৩-৪০৮ খ্রি.) মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে রোমান সাম্রাজ্য ভাগ করে দেন।

পশ্চিমাংশ পান হনোরিয়াস। তাঁর রাজধানী হয় মিলান। পূর্বাংশ পান আর্কাডিয়াস। তাঁর রাজধানী কনস্টানটিনোপল। যেহেতু বাইজানটিয়াম দুর্গকে কেন্দ্র করে এই নগরী গড়ে উঠেছিলো তাই সাম্রাজ্যের পুর্বাংশের নাম হয়ে যায় বাইজেনটাইন সাম্রাজ্য। একসময় পশ্চিমাংশের পতন ঘটলেও পূর্বের এই বাইজেনটাইন সাম্রাজ্য টিকে থেকে গিয়েছিল আরও বহুদিন। পশ্চিম ইউরোপ চলে গিয়েছিল যাযাবর টিউটন জাতিগুলোর হাতে। ৪০০ সাল থেকেই ইউরোপজুড়ে টিউটনদের আধিপত্য দেখা দেয়।

118.jpg

চিত্র: বাইজেন্টাইন সৈন্য

কী দাপট ছিলো রোমের সৈনিকদের! তাদের পদভারে কেঁপে উঠত তিন-তিনটে মহাদেশ। ইউরোপ-এশিয়া-আফ্রিকা! হাজার বছরের পুরনো রোমান সভ্যতা। তবু এই বিশাল সভ্যতার রাজধানী রোমই লুটে নিয়ে গেলো একের পর এক অর্ধসভ্য যাযাবর টিউটন জাতির লোকেরা। গথদের কাছে প্রথম মাথা নোয়ালো রোম; তারপর এলো ভ্যান্ডালরা; পরে বার্গান্ডিয়ান, পূর্ব-গথ, এলেমান্নি, ফ্রাঙ্ক – একের পর এক। আজকের ইউরোপের আদি পুরুষ এই টিউটনরা। ইংরেজ, ফরাসি, জার্মান, নরওয়োজিয়ান, হাঙ্গেরিয়ান, রাশিয়ানরা এদেরই বংশধর।

টিউটনরা ৪০০ সালে ব্রিটেন আক্রমণ করে। সেখানকার রোমান সৈন্যরা পরাজিত হয়ে রোমে ফিরে আসে। সে বছর সম্রাট হনোরিয়াস গথদের আক্রমণ থেকে রোম রক্ষা করতে পেরেছিলেন। ব্রিটেন উপদ্বীপে যেসব টিউটনরা বসবাস শুরু করে তাদের নাম অ্যাঙ্গল ও স্যাক্সনস। অ্যাঙ্গলদের নাম অনুসারে তাদের দেশের নাম হয় ইংল্যান্ড। টিউটনদের আরেকটি দল গলদেশ অর্থাৎ ফ্রান্স দখল করে নেয়। এদের বলা হতো ভ্যান্ডাল। এরা যেখানেই যেতো ভয়াবহ তান্ডবলীলা চালাত। তাই এদের নামানুসারে ইংরেজিতে একট শব্দ আছে ‘ভ্যান্ডালিজম’ যার অর্থ মূল্যবান কোন কিছুর ওপর নির্বিচারে ধ্বংসলীলা চালানো।

ইতালির উত্তরের টিউটিনদের নাম গথ্স। এরা সুযোগ পেলেই ইতালিতে ঢুকে পড়তো। প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে এদেরকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছিলো। কিন্তু এর পরেই এদের চাপ বাড়তে থাকে। অন্যদিকে প্রাচ্যের পার্থিয়ান (পারসীয়) ও আর্মেনীয়রাও রোমান সীমান্তের ভেতরে ঢুকে পড়তে শুরু করে। কিন্তু এসব অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য রোমের সেই শক্তি আর অবশিষ্ট ছিলো না। দাসত্বের ভিত্তির ওপর ইতালির অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আর টিকে থাকতে পারছিলো না।

ইতালির অর্থনৈতিক জীবনে তখন অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দাসতন্ত্রী অর্থনীতি চাঙ্গা রাখার জন্য অনবরত দাস সরবরাহ চাই। কিন্তু দাসের যোগান তখনই সম্ভব যখন দেশ জয়ের কাজ চলতে থাকে। রোমের পক্ষে তখন সে পথ বন্ধ। ফলে দাস ভিত্তিক উৎপাদন অচল হয়ে যায়। সামুদ্রিক বাণিজ্যও ছিলো বন্ধের পথে। কৃষি উৎপাদনে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। বাধ্য হয়ে ল্যাটিফান্ডিয়ার মালিকরা তাদের জমি দাসদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া শুরু করে। ফসলের মালিক হতো দাসই। মনিব ফসলের একটি অংশ কর হিসেবে নিতো। প্রলেতারিয়ানদের মধ্যেও জমিবণ্টন হতে থাকে।

এভাবে দাস ও প্রলেতারিয়ানরা পরিণত হয় প্রজায়। এদের নতুন নাম হয় কলোন। ভূস্বামী দাস-মালিকরা পরিণত হয় সামন্ত জমিদারে। ফলে ইতালির অর্থনীতি সামন্ততন্ত্রের আকার ধারণ করতে থাকে। এ অবস্থায় বিশাল সৈন্যবাহিনীর ভরণ পোষণ অসম্ভব হয়ে পড়ে। নতুন দেশ লুণ্ঠনের লোভে কেউ সেনাবাহিনীতে আসবে – সে পথও বন্ধ। চতুর্থ শতকে টিউটনদের অনবরত আক্রমণে রোমান সামরিক শক্তি প্রচন্ড দুর্বল হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে আত্মরক্ষার জন্য সেনাবাহিনী পোষা কঠিন হয়ে পড়ে।

টিউটনরা ইতালিতে ঢুকে পড়ে বিভিন্ন এলাকা দখল করতে থাকে। তারা সেসব এলাকার জমি দখল করে যৌথ গ্রাম ব্যবস্থায় উৎপাদন শুরু করে। বড় বড় ভূ-স্বামীরা নিজস্ব রক্ষীবাহিনী গঠন করে এদেরকে বাধা দিতে চেষ্টা করতেন; প্রায়ই বিফল হয়ে এদের সাথে আপোষ করতে বাধ্য হতেন তারা। শহরের পলাতক দাসেরা এসব ভূ-স্বামীদের কাছে আশ্রয় নিয়ে প্রজায় পরিণত হতো। ধীরে ধীরে এসব ভূ-স্বামীরাই সামন্ত অধিপতি হয়ে উঠতে শুরু করে। সম্রাটের শক্তি বলতে আর কিছু ছিলো না। সম্রাটরা বাধ্য হয়েই এসব সামন্তদের হাতে শাসনভার ছেড়ে দিতেন।

119.jpg

চিত্র: ৯ সালে সংঘটিত টিউটোবার্গ ফরেস্টের রোমান-জার্মান যুদ্ধ

চতুর্থ শতকের শেষের দিকে টিউটনদের আক্রমণ প্রতিরোধ করার আর কোন উপায় থাকে না। গথরাই প্রথম ইতালিতে ঢুকে পড়ে। পঞ্চম শতকে রোমান সাম্রাজ্যের পুরোটাই চলে যায় টিউটনদের দখলে। তখন টিউটনরা আর যাযাবর নেই। রোমানদের কাছ থেকে উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যবহার শিখে তারাও সভ্য জীবনে প্রবেশ করছে। তবে রোম বার বার টিউটন জাতিগুুলোর হাতে লুন্ঠন ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে। রোমান সম্রাটরা টিউটনদের সাথে আপোষ করে কোনমতে টিকে থাকার চেষ্টা করছিলেন।

গথ সেনাপতিরা আপোষ প্রস্তাব অনুযায়ী নিজেদেরকে সম্রাটের সামরিক কর্মচারী পরিচয় দিলেও তারা মোটেও সম্রাটের আদেশের ধার ধারতেন না। পঞ্চম শতকের মাঝামাঝি সময়ে তারাই প্রকৃতপক্ষে রোমের শাসকে পরিণত হন। ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে তারা রোমের বালক সম্রাট রেমুলাস অগাস্টালুসকে সরিয়ে দিয়ে তাদের নেতা ওডোয়েসারকে (Odoecar) রাজা ঘোষণা করেন। মূলত এ ঘটনার মধ্য দিয়েই অবসান ঘটে হাজার বছরের পুরনো রোমান রাষ্ট্রব্যবস্থার। রোমান সাম্রাজ্যের পূর্বাংশ নিয়ে টিকেছিলো শুধু কনস্টান্টিনোপাল।

টিউটনরা ছিন্ন ভিন্ন পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যে শাসন করতে থাকে। টিউটনদের মধ্যেও খ্রিস্টধর্ম প্রসার লাভ করে। রোমানদের কাছ থেকেই টিউটনরা খ্রিস্টধর্মের শিক্ষা পেয়েছিলো। এভাবে রোমানরাই এক সময়ে এসে পরিণত হলো সেমেটিক ধর্মের প্রচারকে। অধিকাংশ টিউটনই খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিল। খ্রিস্টধর্মের তোড়ে টিউটনদের আদি ধর্ম হারিয়ে গেলেও আমাদের জীবনে এখনও তার কিছু নিদর্শন বিদ্যমান। সপ্তাহের কিছু দিনের নাম হয়েছে তাদের দেবতাদের নামে। যেমন-

টিউইসডে: ‘টিউ’ দেবতার নামে হয়েছে টিউইসডে।

উডনেসডে: গথদের শ্রেষ্ঠ দেবতা ছিলো আকাশের দেবতা উডেন।

থার্সডে: ‘থর’ দেবতার নামে হয়েছে থার্সডে।

ফ্রাইডে: ‘ফেরা’ দেবতার নামে হয়েছে ফ্রাইডে।

টিউটনদের মধ্যে একসময় ফ্রাঙ্করা ইউরোপজুড়ে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। এদের ভেতর চার্লস মার্তেল ও পেপিন এই দুই রাজার চেষ্টায় পশ্চিম ইউরোপে একটি সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে। শার্লেমানের সময়ে এ সাম্রাজ্য চূড়ান্ত বিস্তার লাভ করেছিল। নির্মম আক্রমণের মধ্য দিয়ে পশ্চিম ইউরোপজুড়ে তিনি যে বিশাল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেছিলেন তা ছিলো নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যের আগে পর্যন্ত ইউরোপের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য। ৮০০ সালে খ্রিস্টধর্মজগতের গুরু স্বয়ং পোপ তাঁর মাথায় সম্রাটের মুকুট পরিয়ে দিয়েছিলেন। শার্লেমানের মৃত্যুর পর ইউরোপ আবার টুকরো টুকরো হয়ে যায়।

121.jpg

চিত্র: ১৪৫৩ সালে বাইজানটিয়ামের পতন

৪৭৬ সাল পর্যন্ত সভ্যতার ইতিহাসকে প্রাচীন যুগ ধরা হয়। তখন থেকে শুরু হয় মধ্যযুগ। মধ্যযুগ শেষ হয় ১৪৫৩ সালে। মধ্যযুগের সব চেয়ে বড় ঘটনা হলো আরব খিলাফতের আবির্ভাব। ১৪৫৩ সালে ওসমানীয় সুলতান ফাতেহ আল মাহমুদের কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের ঘটনাকে মধ্যযুগের শেষ ধরা হয়। তখন থেকে সূচনা ঘটে আধুনিক যুগের। কনস্টান্টিনোপলের পতনের ফলে ইউরোপের সাথে এশিয়ার বাণিজ্যপথ বন্ধ হয়ে যায়। ইউরোপীয়দের মধ্যে শুরু হয় সমুদ্রপথে ভারতে আসার বিকল্প পথ আবিষ্কারের চেষ্টা। এ চেষ্টা করতে গিয়ে ১৪৯২ সালে কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেন। অবশেষে ১৪৯৮ সালে ভাস্কো দা গামা আফ্রিকার দক্ষিণ হয়ে ভারতে আসার জলপথ আবিষ্কার করতে সমর্থ হন। ইতালিতে শুরু হয় রেনেসাঁ অর্থাৎ পুরনো গ্রিকো-রোমান জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন ও শিল্পকলার পূর্ণজাগরণের প্রচেষ্টা।

— — —

(লেখক: আসিফ আযহার | শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়

Check Also

মহাস্থানগড়ের বিখ্যাত কটকটির ইতিহাস

সামিয়া সুলতানাঃ কোথাও বেড়াতে গেলে আমি সবসময় লোকাল ট্রান্সপোর্টের ওপর নির্ভর করি। কিন্তু বগুড়ার প্রাণকেন্দ্র …

error: Content is protected !!
%d bloggers like this:

Powered by themekiller.com