Breaking News
Home / নারী ও শিশু / অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে ঘরে আড়াই বছর মেয়েটি

অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে ঘরে আড়াই বছর মেয়েটি

যমুনা নিউজ বিডি: অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে ঘরে আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে আটকে রাখায় স্নাতকপড়ুয়া মেয়েটির হাত-পায়ের আঙুল কুঁকড়ে গেছে। জীর্ণশীর্ণ ফ্যাকাসে শরীর ধুঁকছে রক্তশূন্যতায়, বাসা বেঁধেছে চর্মরোগ। এত সব সমস্যা নিয়ে মেয়েটি মরতে বসেছিলেন। শেষ পর্যন্ত গত বুধবার তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।

২২ বছরের এ তরুণীকে তাঁর মা-বাবাই অন্ধকার ঘরে এত দিন আটকে রেখেছিলেন। প্রতিবেশীরা বলছে, বিরোধ আছে—এলাকার এমন এক পরিবারের ছেলের সঙ্গে মেয়েটির প্রেমের সম্পর্ক হয়েছে, এই সন্দেহে তাঁকে ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল।

এ বিষয়ে ছাত্রীটির মা-বাবার কাছে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তাঁরা কিছু বলতে চাননি। মা দাবি করেন, মেয়েটি অসুস্থ হওয়ায় কবিরাজ ও স্বপ্নে দেখা এক ব্যক্তির পরামর্শে তাঁকে ওইভাবে ঘরে আটকে রেখেছিলেন।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আশরাফুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি তিনি দুই বছর আগে থেকেই জানতেন। তিনি ওই বাড়িতে গেলেও মেয়েটির পরিবার বিষয়টি তাঁদের পারিবারিক বলায় ফিরে আসেন।

প্রতিবেশীরা জানায়, দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে মেয়েটি ও তাঁর এক ভাই যমজ। তাঁদের বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকলেও যে ঘরে মেয়েটিকে আটকে রাখা হয়েছিল, সেই ঘরে কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না। এমনকি ঘরের দরজা-জানালা সব সময় তালা মেরে রাখা হতো। তাঁকে গোসল করতে দেওয়া হতো না। আধাপাকা ঘরটি স্যাঁতসেঁতে। বর্ষায় ঘরের ভেতর পানি পড়ে। প্রতিবেশীদের জানানো হয়েছিল, মেয়েটি মানসিক রোগী। তাই তাঁকে আটকে রাখা হয়েছে। তারা সহযোগিতা করতে চাইলেও মেয়েটির মা এটি তাঁদের পারিবারিক ব্যাপার বলে এড়িয়ে যান।

প্রতিবেশীরা আরো জানায়, বিরোধ আছে—এমন পরিবারের এক ছেলের সঙ্গে ওই মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে সন্দেহে তাঁকে শাস্তি দিতে ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। মেয়েটি মাঝেমধ্যে চিৎকার করতেন। কিন্তু পারিবারের লোকজন মেয়েটিকে আটকে রাখায় কেউ কিছু করতে পারেনি। কয়েক দিন ধরে মেয়েটির কোনো চিৎকার শুনতে না পাওয়ায় এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে মেয়েটি হয়তো ঘরে মরে পড়ে আছে। পরে তারা বাধ্য হয়ে ইউএনওকে জানালে তিনি পুলিশ নিয়ে এসে মেয়েটিকে উদ্ধার করেন।

বুধবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে মেয়েটিকে উদ্ধার করে ভর্তি করা হয় নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা গেছে, মেয়েটি বসে থাকতে বা দাঁড়াতে পারছেন না। কথা বলতে গেলে শরীর কাঁপুনি দিচ্ছে। দুর্গন্ধ বের হচ্ছে তাঁর শরীর থেকে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন অপচিকিৎসায় ও বদ্ধ ঘরে থাকায় ছাত্রীটির রক্তশূন্যতা দেখা দিয়েছে। আলো-বাতাসে না আসা এবং হাঁটাচলা না করায় দেখা দিয়েছে হাড়ক্ষয় রোগ। সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে চর্মরোগ, আর মুখে ফাঙ্গাস। ছাত্রীটি শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। এভাবে কিছুদিন থাকলে যেকোনো মুহূর্তে মৃত্যু হতে পারত তাঁর। এখন তাঁকে সুস্থ করতে সব ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তিনি সবাইকে চিনতে পারছেন। তাঁর মানসিক কোনো সমস্যা নেই। তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন।

হাসপাতালে তরুণীর সঙ্গে থাকা তাঁর খালাতো বোন সাংবাদিকদের জানান, এক বছর ধরে চেষ্টা করেও তিনি তাঁর খালাতো বোনের (ছাত্রীটির) সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। তিনি আরো জানান, রংপুরের একটি স্কুলে মানবিক বিভাগ থেকে ২০১১ সালে এসএসসি ও নবাবগঞ্জের একটি কলেজ থেকে ২০১৩ সালে এইচএসসি পাস করে স্নাতকে ভর্তি হন তাঁর বোন। তাঁর স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া ইউএনও মো. মশিউর রহমান জানান, আড়াই বছরের বেশি সময় মেয়েটিকে আটকে রাখা হয়েছে—এমন খবর পেয়ে তাঁর মাদরাসাশিক্ষক বাবাকে ডেকে পাঠান তিনি। বাবা জানিয়েছেন, মেয়ের মা একক কর্তৃত্বে তাঁকে আটক রেখেছিলেন।

মশিউর রহমান বলেন, ‘কোনো পরিবার তাদের সন্তানকে এভাবে বন্দি করে রেখে তিলে তিলে মৃত্যুর মুখে নিয়ে যেতে পারে, তা ভেবে অবাকই হচ্ছি।’ ছাত্রীটি সুস্থ হয়ে আবারও লেখাপড়া শুরু করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন ইউএনও।

নবাবগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আতিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, উদ্ধারে গেলে প্রতিবেশীরা জানায়, দুই থেকে আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে ওই ছাত্রীকে আটকে রাখা হয়েছিল।

নবাবগঞ্জ থানার ওসি সুব্রত কুমার সরকার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মেয়েটিকে আটকে রাখা হয়েছিল প্রেমঘটিত কারণে। তবে মেয়ের পরিবার পুলিশের কাছে দাবি করছে, মেয়েটি যে ছেলেকে ভালোবাসতেন তাঁর সঙ্গে বিয়ে না হওয়ায় তিনি ইচ্ছা করেই ঘর থেকে বের হতেন না। তারাও মেয়েকে বাইরে যেতে দিত না। মেয়েটি সুস্থ হয়ে উঠলে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে বলে মনে করেন ওসি।

Check Also

সিরাজগঞ্জে মাটিচাপায় দুই নির্মাণ শ্রমিক নিহত, আহত ৫

যমুনা নিউজ বিডি:   সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার পৌর এলাকায় ধানবান্ধি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের …

Powered by themekiller.com